আরেব্বাস! এ কালের বাঙাল শিশুরাও তোড়ে ইংরেজি বলে। মুগ্ধ হই, ঘাবড়েও যাই। কানে যতটুকু বাজে তাতে বুঝি, উচ্চারণও চোস্ত। মুশকিল অন্যত্র, মায়ের ভাষাতেও ইংরেজির হামলা। কথায় অনায়াসে নানা ভিন্শব্দ জুড়ে নেওয়া; উচ্চারণে জিভ গোটানো ‘র’, ‘ল’; ‘ক চ ট ত প’-র সঙ্গে অক্লেশে হালকা ‘হ’ যোগ করে ‘খ ছ ঠ থ ফ’ করে ফেলা। সে এক বিড়ম্বনা! তবে ওরা দিব্যি ভাব প্রকাশ করে ফেলে। বুঝতে অসুবিধে হয় না। ভাষা তো সেখানেই সার্থক!
খিচুড়ি ভাষা আর বিচিত্র উচ্চারণের বিড়ম্বনা? বাংলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজানো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের অবদান। কিসের মোহে যেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ অবোধ শিশুই পরের ধাপের লেখাপড়ার জন্য বিদেশে পাড়ি দেয়, থেকে যায়। সেখানে এই পাঠ আর চর্চা খুব খুব কাজে দেয় নির্ঘাত! কিন্তু সংস্কৃতি? বিভুঁইয়ে কি তা মেলে! ভাষা আর সংস্কৃতির তো গলাগলি বন্ধুত্ব। পরস্পরের পরিপূরক। বোধ করি সকলেই মানেন— আপন চিন্তা-ভাবনা-চেতনা-প্রত্যয়, ঐতিহ্য আর প্রথা নিয়ে যাপিত জীবনের তাবৎ চর্চা একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সংস্কৃতি। যে সব কিছু প্রকাশের সর্বেসর্বা সে গোষ্ঠীর ভাষা। তা হলে!
ভাষা ও সংস্কৃতি দ্রুত বিবর্তনশীল। তবে মাতৃভাষা রক্ষা আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে কেড়ে নেওয়া ঠেকাতে পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে বাঙালির যে প্রাণপণ আন্দোলন, তার মাহাত্ম্য অন্তরে ধারণ করাও জাতীয় কর্তব্য। রক্তঝরা ওই ফাল্গুনই বাঙালির মনে মুক্তির বীজ বুনেছে। জাতীয়তাবোধের দোর্দণ্ড প্রতাপ, দুই দশকের দুর্দমনীয় সংগ্রাম-বিপ্লব। বাঙালি দু’টুকরো করেছে পাকিস্তানকে। আত্মপ্রকাশ করেছে বাঙালির স্বভূমি, বাংলাদেশ। আগের এক টুকরো পাকিস্তান এল কোথা থেকে? ‘দুই জাতি দুই জাতি’ বুলি আউড়ে ছল-চাতুরি। দ্বিজাতিতত্ত্ব! হল ধর্মের বিচারে ভাগাভাগি। ১৯৪৭ সালে জন্ম ভারত ও পাকিস্তানের। ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাত থেকে পশ্চিমের ভিন্ভাষা ও সংস্কৃতির খপ্পরে পড়ল বাংলার মানুষ। প্রথম প্রথম পরম উৎসাহে বাঙালি তার শিল্প-সাহিত্যে আমদানি করতে থাকে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ, অভিব্যক্তি। বাঙালিকে নিম্নস্তরের নাগরিক মনে করে সংখ্যালঘু শোষকরা জেঁকে বসল। শুরু হল বাংলা বর্ণমালাকে আরবি হরফে রূপান্তরের পাঁয়তারা। বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বিতাড়নের নীল নকশা!
সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করলেন পাকিস্তান গণপরিষদে। তৎক্ষণাৎ নাকচ। বাঙালি প্রথম আঁচ করল, এরা তো আমাদের নয়! অসন্তোষ। দিনে দিনে তাপ চড়ছে। আন্দোলন দানা বাঁধে। সূচনা ‘তমদ্দুন মজলিস’-এর। নব্য পাকিস্তানকে ভালবেসে বাঙালিরা গড়েছিল ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠন। নিয়েছে আরবি নাম। ‘তমদ্দুন’ অর্থ সংস্কৃতি, ‘মজলিস’ মানে আসর বা বৈঠক। কিন্তু তাই বলে প্রাণের ভাষা বাংলাকে জলাঞ্জলি দেওয়া! পাকিস্তানের জন্মের মাস না পূর্ণ হতেই দাবি তুলল— বাংলা হবে এই অঞ্চলের তথ্য আদানপ্রদান, শিক্ষার প্রধান মাধ্যম এবং আদালত-সহ সার্বিক দফতরের ভাষা।
মোটেই পাত্তা পায়নি বাঙালির দাবিদাওয়া। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ঢাকায় জিন্নার ঘোষণা, ‘একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ ফুঁসে ওঠে বাঙালি। তৈরি হল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। প্রতিবাদের অফুরান ঢেউ তোলে আন্দোলনের জোয়ার। গড়া হল সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। বাংলাভূমি উত্তাল। বাহান্ন সালের জানুয়ারিতে বাংলাকে আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেললেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন। ফের উর্দুর পক্ষ নিয়ে আগুনে ঘি ঢাললেন এক বাঙালি! নাকি, বাঙালির বিশ্বাসঘাতক! দেশ জুড়ে শুরু হয় নির্ভীক বিক্ষোভ-সমাবেশ। নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দেশের ছাত্রসমাজ।
২১ ফেব্রুয়ারি। ধর্মঘট ও বিক্ষোভ ডেকেছে রাষ্ট্রভাষা আদায়ের জন্য গড়া সর্বদলীয় পর্ষদ। সরকারের পাল্টা হুমকি। জারি হল ১৪৪ ধারা। মানেনি ছাত্র-জনতা। ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ওই ৮ ফাল্গুনে সব ভয়ভীতি-নিষেধাজ্ঞা ভেঙে ওরা রাজপথে। তখন পাকিস্তানের পুবের অংশের মুখ্যমন্ত্রী, পশ্চিমের প্রভুদের পদলেহনকারী নূরুল আমীন। বাঙালির উপর গুলি চালানোর হুকুম দিলেন সে জাতিরই আর এক মিরজাফর। কেবল বিশ্বাসের শ্বাসরোধ নয়, হত্যা করলেন মানুষ। লাশ গুম হল। মৃতের মিছিল থেকে আবিষ্কৃত হল গুটিকয় নাম— রফিক, শফিক, জব্বার, সালাম, বরকত।
শত ষড়যন্ত্র আর নিপীড়নেও রোখা যায়নি বাঙালিকে। তারা আদায় করে নিয়েছে রাষ্ট্রভাষা। উপলব্ধি ঘটেছে, স্বধর্মী হলেই মহব্বত চলে না, পারস্পরিক শ্রদ্ধা চাই। বিশ্বাস জন্মেছে, বাঙালি জাতীয় স্বার্থে এককাট্টা হতে জানে। স্বপ্নের আভাস পেয়েছে, পাকিস্তানের নাগপাশ থেকে পূর্ণাঙ্গ মুক্তির। শোষণ-বঞ্চনা-দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মুখের বুলি নিয়ে অস্তিত্বসঙ্কটের সম্মুখীন বাঙালির প্রথম বিজয়। অর্জনের পথে মিলেছে স্বায়ত্তশাসন আদায়ের দিশা। ১৯৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে তার প্রতিফলন। বাঙালির একচেটিয়া বিজয়। খুলে যায় স্বায়ত্তশাসনের দরজা। নির্বাচনের ফল অবজ্ঞা করে নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালির উপর চড়াও হয় সশস্ত্র পাকিস্তান। আচম্বিত এবং দীর্ঘকালীন গণহত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও। মানবতার চরম বিপর্যয়। সব পেরিয়ে অদম্য বাঙালির বিজয়। রচিত হয় ভাষার আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ থেকে গনগনে স্বাধীনতার মহাকাব্য।
মহাকাব্যের প্রথম অধ্যায় ভাষা আন্দোলন। সেই ভাষার নানা রূপ। বিদেশ-বিভুঁইয়ের মতো স্বাধীন এ দেশেও হাত ধরাধরি করে চলছে আঞ্চলিক, শহুরে খিচুড়ি আর মান্য ভাষা। মান্য বাংলার রাজত্ব দফতরের কাজ, শিক্ষাক্রম, আনুষ্ঠানিক বিষয় আর প্রচারমাধ্যমে। লিখিত রূপ দেশব্যাপী এক নির্দিষ্ট ছকে চলে। যে যার অঞ্চলে নিজের ভাষায় কথা বললেও বড় বড় শহরে বেশি করে কানে খেলে ভাষার খিচুড়ি। তাতে ইদানীং কালের প্রবল অনুপ্রবেশ, ইংরেজি।
কোনও অঞ্চলে গিয়ে অন্য এলাকার মানুষ সেখানকার স্থানীয় ভাষা বলে বসলে, তা হাস্যকর ঠেকে বইকি। সবাই কি আর একাধিক ভাষায় পারঙ্গম হয়! তেমনই, আঞ্চলিক ভাষা আড়াল করে মান্য বাংলা বলতে গিয়েও হাসির খোরাক হন অনেকে। তবে এ সব চেষ্টা যে চলে, তা বিড়ম্বনা নয়, বরং প্রশংসার। সবচেয়ে বিব্রতকর, না জেনেও নানা ইংরেজি শব্দ ঠুসে ঠুসে বাংলা বলা। অবশ্য অনেক ইংরেজি বা বিদেশি শব্দ বলতে বলতে এমনিতেই সেগুলো বাংলার ঘরে পড়ে গেছে। প্রচলিত সেই বিদেশি শব্দগুলোই সহজবোধ্য। সে-সবের বাংলা বরং ক্ষেত্রবিশেষে দুর্বোধ্য। আবার সব বিদেশি শব্দের এক কথায় বাংলা অনুবাদও হয় না। তবু সবাই যে কেন একাধারে বাংলা বা ইংরেজিতে কথা বলে যাওয়ার দক্ষতা রপ্ত করতে পারে না!
ছোট ছোট বাক্যে, জুতসই শব্দচয়নে কথা বলার চর্চা আর প্রয়াস বরাবরই ছিল। দিনে দিনে তা আরও ছড়িয়েছে। বিশেষ করে বিগত শতকের ছয়ের দশক থেকে কাজী আনোয়ার হোসেনের গোয়েন্দাগল্প এবং পরের দশকের শেষ থেকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আড্ডা আর পাঠচক্র তরুণ সমাজকে ভাষামাধুর্যের ছোঁয়া দিয়েছে।
তবে ‘অ’ আর ‘এ’ যে ‘ও’ এবং ‘অ্যা’-এর মতো উচ্চারিত হতে পারে, তা জানা হয়নি বলে একই সঙ্গে নানা উচ্চারণ শোনা যায়। বাংলার সাত স্বরধ্বনির মধ্যে তো শুধু ওই দুটোরই একাধিক উচ্চারণ। এবং কোথায়, কেন, কেমন হবে, তার ব্যাখ্যাও আছে। ইংরেজির পাঁচ পূর্ণ স্বরধ্বনির প্রতিটাই তো বহুরূপী। এর বাইরে প্রতিবেশের প্রভাবে বাঙালের ‘চ’, ‘ছ’-এর উচ্চারণ প্রায়শই ‘স’-এর মতন। ‘জ’ আর ‘য’ হয়ে ওঠে ইংরেজির ‘জ়েড’। উধাও হয়ে যায় চন্দ্রবিন্দু। গোল বেধে যায় ‘র’, ‘ড়’, ‘ঢ়’-তে। অমর একুশের সত্তর এবং স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও সুরাহা হয় না এ সব বিভ্রান্তির।
বলার ভাষায় খামতি রয়ে গেলেও বাংলা লেখা অনেক এগিয়ে। তবু চোখ আটকে যায় কিছু শব্দে। অতীতের সঙ্গে মিল রেখে লেখা হয়ে যায় ‘পরবর্তীতে’; পরিবার-সহ না লিখে ‘সপরিবারে’ লেখায়; অন্য অন্যের বদলি ‘অন্যান্যদের’-এ; গালিগালাজকে ঠিক মেনে ‘গুলিগালাজ’ লিখে বসায়; লেখালিখির বদলে ‘লেখালেখি’তে। হা কপাল, বলবার কি লোক নেই! -অনেকেই বলেন ‘শ’, ‘স’, ‘ষ’-এর উচ্চারণ একই। যেমন ‘ন’ আর ‘ণ’-এরও। হ্যাঁ। মুক্তবর্ণ হিসেবে এক শোনালেও, যুক্ত বর্ণে ঠিকই সবাই আলাদা বলেন। অজানতে। কেউ বলে দেন না। জানতে পারে না বাংলার মানুষ। বিবর্তন তো আসবেই। মানিয়ে নিতে হবে। তবে আদত রূপগুলো ভুলে গেলে কী করে চলবে!
আপন ভাষার জন্য লড়তে লড়তে মুক্তির স্বপ্নোদয়, বাংলা নামে দেশের অভ্যুদয়। পরম আদর-নিষ্ঠায় দেশ-ভাষা-সংস্কৃতি লালন করে আত্মপরিচয়ে বলীয়ান হওয়া বোধকরি সকল বাঙালিরই কর্তব্য। যার পরিচয় পেয়েছি সন্জীদা খাতুনের মধ্যে। তাঁকে পাওয়া গেছে বাহান্নের ফাল্গুনে, রক্ত আর দ্রোহে পলাশের লালে রঞ্জিত দিনগুলোতে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সভা করেছেন, একুশের শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে নারীদের মিছিল সংগঠিত করেছেন। সে-সব দিনের অনুভবেই তাঁর অভিষেক। আজীবনের সঞ্চয় ও কর্ম, বাংলা-সংস্কৃতি-মানবতা-দেশ নিয়ে পথ চলা।
তিন ছেলে-মেয়ে, পাঁচ নাতি-নাতনি। সন্জীদা ছাড়া কেউ বাংলা ভাষা-সাহিত্যের ছাত্রী নয়। সবার লেখাপড়া বাংলা মাধ্যমে, ইংরেজি মাধ্যমে দু’জন। হড়বড় করে ইংরেজি বলে। সবাই কিন্তু সমান তালেই পাল্লা দেয়। লক্ষ্য তো একটিই, মনের ভাব প্রকাশ। বাড়ির সবার কথা শুনে, লেখা পড়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সন্জীদার। বেপথু হননি। ঘরে-বাইরে সবার মধ্যে ভাষাকে ভালবাসার মনন জাগিয়ে তুলে, সচেতনতা উস্কে দিয়ে এক সম-চিত্রের অভিজ্ঞান সঞ্চার করেছেন। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে ভাষার বোধ, গাঁথুনি, ছন্দ, উচ্চারণ, বানান সবই নজরে এনেছেন। অ-জানা মনে অজস্র জিজ্ঞাসা। ব্যতিব্যস্ত করে তুললে পালাতেন, “আমি তো আর ভাষা বা ধ্বনিবিজ্ঞানের লোক না, ওদের গিয়ে ধরো।”
তবে কর্তব্য জেনেছি, সচেতন, জাগরূক। কাটাছেঁড়া চলে চলুক, ভাষা-সংস্কৃতির চর্চা স্বমহিমায় টিকে থাকুক বাংলার গোটা জনপদে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)