E-Paper

দেখা হবে

সত্যি বলতে কী, বিভুকে সে বেশ সমঝে চলে। গোপনে সে এক বার রূপেশ বর্মণের মাল টেনেছিল। সে রাতে, শালা তার কপালের ফের, অল ক্লিয়ার সিগনাল থাকা সত্ত্বেও গুলি চলেছিল।

বিপুল দাস

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ০৭:২৭
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পূর্বানুবৃত্তি: নৃপেনকে অবাক করে মন্তেশ্বরের সঙ্গে তার জমি দেখতে যেতে চায় মনোতোষ। মন্তেশ্বরের জমিতে অপূর্ব রঙিন সব ফুলগাছের সৌন্দর্য দেখে ভাল লাগায় চোখে জল এসে যাচ্ছিল মনোতোষের। ফেরার সময়ও খুব অন্যমনস্ক ছিল মনোতোষ। অসতর্কতার কারণে উল্টো দিক থেকে তীব্র গতিতে আসা একটা এসইউভি তার গা ঘষে বেরিয়ে যায়। নৃপেন ছিটকে পড়ে। মনোতোষ স্কুটার নিয়ে অনেকটা ঘষটে গিয়ে স্থির হয়। অন্য দিকে ভুজঙ্গ হালদার ভাবছিল সেই অদ্ভুত গাড়ি দুর্ঘটনার কথা। সেই সুন্দরী মহিলার মারা যাওয়ার আর তার বিগশপার থেকে ডেলিভারির সুটকেসটা বের করে নেওয়ার কথা। লুকিয়ে রাখা সুটকেসটার লক এখনও মাঝে মাঝে খোলার চেষ্টা করে সে। তার পরও নিয়ম করে বিভু সমাদ্দারের কাজগুলো করে দেয় ভুজঙ্গ। ভুজঙ্গ আয়নায় দেখে দিন কয়েক ধরে তার নাকের মাথাটা লাল হয়ে আছে। এক বার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা মনে হয় তার।

ইদানীং ঘন ঘন বিভুর কাজ পাচ্ছে ভুজঙ্গ। পেমেন্টের ব্যাপারে বিভু কোনও ঝামেলা করে না। বেশির ভাগই ডেলিভারির কাজ।একান্ন বাইশ বাইক নিয়ে এদিক-ওদিক আসা-যাওয়া। মাল ডেলিভারি দেওয়া। আজ পর্যন্ত সে মালের প্যাকেট খুলে দেখেনি ভিতরে কী আছে। শেষ বার, এই গত সপ্তাহেই, পলাশগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার নতুন রাস্তায় চুমুকপুরে মাল দিয়ে এল। কী দারুণ রাস্তা হয়ে গেছে! ফরেস্ট ঘেঁষে পথ চলে গেছে কেশব আশ্রমের পাশ দিয়ে সোজা শিলিগুড়ি। এই প্রথম ওই পথে গেল ভুজঙ্গ। বাইক চালাতে চালাতে তার মনে হচ্ছিল, এই পথ যদি না শেষ হয়... আহা, পিছনে যদি রসিক পালের বৌ-টা থাকত। দুরন্ত ফিগার, অনন্ত লীলা! সব বাসনা কি আর এক জীবনে পূর্ণ হয়!

সত্যি বলতে কী, বিভুকে সে বেশ সমঝে চলে। গোপনে সে এক বার রূপেশ বর্মণের মাল টেনেছিল। সে রাতে, শালা তার কপালের ফের, অল ক্লিয়ার সিগনাল থাকা সত্ত্বেও গুলি চলেছিল। কোনও মতে হামা টেনে বর্ডার পার হয়েছিল ভুজঙ্গ। পড়ে রইল দামি মাল। অনেক টাকা লস হয়েছিল রূপেশের। সেই লাস্ট তার বর্ডারে মাল টানা। এখন মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। একটা সিসার গুলি তার বেঁচে থাকা শেষ করে দিতে পারত। ওপাশে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড, এপাশে বিএসএফ। মালভর্তি কার্টন ফেলে সে পালাচ্ছিল। রূপেশ নাকি বলেছে, ভুজঙ্গ তার অনেক লস করিয়ে দিয়েছে। ছাড়বে না বলেছে। বিভু তাকে এ ব্যাপারে বেশ চাপে রেখেছে। প্রায় ব্ল্যাকমেল করেই তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে।

তরাই স’মিলের ম্যানেজার অনঙ্গ হালদারের ছেলে ভুজঙ্গ। ফরেস্ট অফিস থেকে চোরাই কাঠের তল্লাশিতে এসে প্রায় দু’শো সিএফটি মাল সিজ় করে নিয়েছিল ওরা। লগের হিসাব দেখাতে পারেনি ম্যানেজারবাবু। বন দফতরের হ্যামার মার্ক ছিল না লগে। কাগজপত্র ছিল না। মিল সিজ় করে দিলে অনঙ্গ লটারির টিকিটের ব্যবসা শুরু করেছিল। কিন্তু অনঙ্গর কাউন্টার থেকে একটা দীপাবলি বাম্পার সুধন্য মেরে দিলে অনঙ্গ প্রচুর বাংলা দারু খেয়ে ফেলেছিল। এমনিতেও সে নিয়মিত রামুর ঠেকে যেত। রাতেই ভুজঙ্গর সঙ্গে তার বাবার প্রচুর বকোয়াস হয়।

“ভুজঙ্গ, তোর মা কিন্তু শ্যামাসঙ্গীত গ্রুপে ফার্স্ট হয়েছিল। বড় ভাল গাইত রে। শ্যামা মায়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন। কোথায় যেন সার্টিফিকেটটা রেখেছি। ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখব। নীচে কার সই ছিল জানিস?”

“ওটা তুমি কোনও দিনই বাঁধাবে না। তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। মায়ের বাক্সে যা যা ছিল, সব ঝেড়ে দিয়েছ। বিয়ের বেনারসি দিয়ে ছ’টা স্টিলের গ্লাস আর একটা থালা রেখেছ। তুমি জানো, জরি-বসানো পুরনো দিনের বেনারসি আজকালকত দামে বিক্রি হয়? ছেলের বৌকে দেবে বলে চারগাছা সলিড সোনার চুড়ি রেখে গিয়েছিল। কী করেছ সেগুলো?”

“হ্যাঃ, ভারী এক সিএফটির বেনারসি, তার আবার দাম! পড়ে থাকলে তো পোকায় কেটে নষ্ট করে দিত। তার চেয়ে... ছ’টা গেলাস আর একটা থালা, খারাপ কিসে হল। শ্যামাসঙ্গীত বড় ভাল গাইত রে বৌটা। বল রে জবা, বল... আহা, কী গাইত!”

“একদম কুমিরের কান্না কাঁদবে না। আমি একটা দামি টেপ কিনে দিয়েছিলাম মাকে। ধনঞ্জয়, পান্নালালের ক্যাসেট। রাতারাতি সেই টেপ ঘর থেকে হারিয়ে গেল। তুমি বললে মায়ের দোষ। জানালার পাশে রেখেছিল, কেউ হাত বাড়িয়ে নিয়ে গেছে। তুমি কী ভেবেছ, আমি জানি না টেপ কে সরিয়েছে? আমার না মাঝে মাঝে তোমাকে বাবা বলে ডাকতেও ঘেন্না করে।”

“ঠাকুর, এ কথাও আমাকে শুনতে হল! আমায় একটু জায়গা দাও, মায়ের মন্দিরে বসি। বর্ডারের টানা মাল এনে বলছিস দামি টেপ কিনে দিয়েছিস। আমারও মনে হয় না তুই আমার পুত্র। মূত্র, মূত্রের সমান তুই। এক পথ দিয়েই তো বেরোয়। তোর স্বভাবচরিত্র আমার সব জানা। দুনিয়ার লোক তোর লুচ্চামির খবর জানে। হারামজাদা, কেষ্টলীলা করে বেড়াও। এস্‌মাগলিং করে ক’পয়সা কামাস! এক দিন তো বেঘোরে মারা পড়বি। ভাবছি, গুলি খেয়ে তো শিগ্‌গিরই মরবি, অ্যাডভান্স তোর শ্রাদ্ধটা করে রাখব। বলা তো যায় না, আমিই হয়তো আগে ফুটে গেলাম। কারে দাও মা ব্রহ্মপদ, কারে করো অধোগামী, সকলি... মা, মা গো...”

কে জানত, অনঙ্গ হালদার তার দু’দিন বাদে সত্যিই ফুটে যাবে! এখন ভুজঙ্গ দুটো ঘর পেল নিজের করে। আঃ, একটু হাত-পা ছড়িয়ে থাকা যাবে। বাবার ঘরের বাক্স-তোরঙ্গ এলোমেলো করে বিশেষ কিছু পেল না ভুজঙ্গ। ব্যাঙ্কের বইয়ে এক লাখ আটাশ হাজার। বাপ রে! লাখ টাকা জমিয়ে ফেলেছিল বুড়ো। থ্যাঙ্ক ইউ বাবা! ওটাই যা সলিড পাওয়া যাবে। আর, বড় খাট, একটা স্টিলের আলমারি। স্টিলের ট্রাঙ্ক একটা। আলমারি আর ট্রাঙ্কের চাবি বাবার বিছানার নীচেই পাওয়া গেল।

বাবার মুখে ইদানীং একটা কালচে ছাপ লক্ষ করেছিল ভুজঙ্গ। কোনও কোনও রাতে বমির আওয়াজও পেয়েছে। করাতকলের চাকরিটা চলে যেতে একটু টালমাটাল হয়ে পড়েছিল অনঙ্গ। মদ খাওয়া বেড়ে গিয়েছিল। এই বয়সেও বাবা মদ খাওয়া কন্ট্রোল করতে পারত না, সে কী করবে! আকুল বিশ্বাসের কথা মনে পড়ল। মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরলে ছেলে আর বৌ মিলে তাকে বাথরুমে ঘাড় ধরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে ছিটকিনি তুলে দেয়। কর তুই, বমি-পায়খানা যা করবি ভিতরে কর। কোনও দিন যদি ফিরতে বেশি রাত হয়ে যায়, বাইরের গেট খোলে না। বহুক্ষণ ধরে আকুল তার বৌয়ের নাম ধরে, ছেলের নাম ধরে ডাকাডাকি করে, পায়ে ধরে ক্ষমা চায়, মা কালীর নামে দিব্যি কাটে, আর কোনও দিন মদ ছোঁবে না। ভবি ভোলে না। কারণ এ রকম ‘কসম খাওয়া’ তার অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু ভুজঙ্গ তো আর তার বাবাকে গালাগালি দিয়ে রাতভর গেটের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারবে না। আকুল তার সঙ্গে বর্ডারে মাল টানত। কখনও চায়ের দোকানে বসে ঘরে তার দুর্গতির কথা বলত।

“বল, রিক্সের লাইফ আমাদের। এই আছি, এই নেই। বর্ডারের ক্যারিয়ার আমরা, পোকামাকড়ের জীবন। মশামাছির মতো এক থাপ্পড়ে গন। জহিরুলের কথা ভাব। সারা রাত গুলি-খাওয়া বডি পড়ে রইল। বাবলু বৈদ্যর কী অবস্থা হল। উফ, কী স্যাড! তারকাঁটার বেড়ায় গুলিখাওয়া বডি ঝুলে রইল হোল নাইট। ক’টা টাকার জন্য লাইফ অ্যান্ড ডেথ নিয়ে আমাদের চলতে হয়। দেখ, আমাদের মনে কি ভয় নেই! যখন মনে পড়ে বাবলুর কথা, ইচ্ছে করে পুরো বোতল গলায় ঢেলে দিতে। শালা, জ্বলেপুড়ে যাক আমার গলা, আগুনটা শরিল জুড়ে ছড়াক। বৌগুলো কিছুই বোঝে না। পুরুষমানুষ কি চোখের জল ফেলবে?”

“খাওয়াটা এবার একটু কমা আকুল। লিভারটা এত তাড়াতাড়ি পচিয়ে ফেলিস না। অল্প করে খা, বেশি দিন ধরে খেতে পারবি। বেশি করে খেলে অল্প দিনেই কোটা ফুরিয়ে যাবে।”

“আকুল বিশ্বাস মাল খায় ঠিকই, কিন্তু কোনও দিন টাল খেতে দেখেছিস? ভুজঙ্গ, ভগবান মনে হয় জন্মের সময় কপালে মালের কোটা লিখে দেয়। আমার জন্য ভাবিস না, আমারটা এখনও ফুল হয়নি। কিন্তু কে বোঝাবে বল? পুয়োর উয়োম্যান। চিন্তা কর, আমার গায়ে হাত তোলে! জানিস, আমার সিংহরাশি। কী লাভ হল বল? আসলে মনে হয় ওটা চাপরাশি হবে। কী আশায় বাঁধি খেলাঘর, বেদনার বালুচরে। গুরুর গান। যাই, রাত হল। আজও মনে হয় বাইরে রাত কাটাতে হবে।”

“কাঁদিস না। তুই তো বললি, পুরুষমানুষকে চোখের জল ফেলতে নেই।”

“কে যেন বলেছিল উঠে দাঁড়াতে, রুখে দাঁড়াতে। মনে হয় বিধান রায়। দেব শালা এক দিন সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে। কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝে হাত-পা কেমন কাঁপে। দেশলাই জ্বালাতেই পারব না। ভোরের দিকে এমন অ্যাসিড হয়, মাল না খেলেও, বমি এসে যায়। বিশ্বাস কর, প্রত্যেক দিন সকালে উঠে ভাবি আজ থেকে আর বোতল ছোঁব না। সন্ধের পর থেকেই না ইচ্ছেটা কেমন একটা নীল ডুমোমাছির মতো আমার মাথার চারপাশে ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে। আর তখনই বাবলুর কথা, জহিরুলের কথা, রঞ্জুর কথা মনে পড়ে। ওদের কথা ভুলতে চাই। না খেয়ে করব কী। কোথায় যে হারিয়ে গেল রঞ্জু দেবনাথ! কী সুন্দর ছিল ওর বৌটা! ওপারের মেয়ে ছিল।”

“জানি। লাইনে নেমে গেছে। রোজ সন্ধের পর সেজেগুজে বাইপাসের মোড়ে ধাবার সামনেদাঁড়িয়ে থাকে।”

“কী লাইফ আমাদের। মাইরি, একটা কথা রাখবি? আমার কিছু হলে বৌটা আর যা-ই করুক, লাইনে নামতে দিস না। উপর থেকে রণচণ্ডীমার্কা হলেও আসলে নরম টাইপের। অত ধকল নিতে পারবে না।”

“নেশা আজ তোর একটু বেশি হয়ে গেছে। একা বাড়ি যেতে পারবি? দিয়ে আসব আমি?”

“উঁহু, শিখা তোকেও আজেবাজে কথা বলে দিতে পারে।”

ফোঁত ফোঁত করে কাঁদছিল আকুল। উঠতে গিয়ে একটু টাল খেল। ভুজঙ্গ তাকে ধরার জন্য উঠল না। আকুলের শেষের কথাগুলোর জন্য তারও কেমন যেন কান্না পাচ্ছিল।

ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে প্রচুর হয়রানি গেছে তার। তার মূর্খ বাপ নমিনি পর্যন্ত করে যায়নি। ডেথ সার্টিফিকেট, এফিডেভিট, ব্যাঙ্কের কাগজে বন্ড, ডিসক্লেমার— বহুত ঝঞ্ঝাট গেছে। সে সব মিটলে অনঙ্গ হালদারের ঘর দখল করল তার ছেলে ভুজঙ্গ হালদার। প্রথমেই সেই ভাঙা গাড়ি থেকে চুরি করে আনা সুটকেস নিয়ে স্টিলের আলমারির একদম উপরের তাকে রেখে আলমারিতে চাবি মেরে রাখল। এক দিন সে এই সুটকেস খুলবেই। গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়ে বিভু তার সঙ্গে কথা বলেছিল। ভুজঙ্গ একদম নিপাট মিথ্যে বলে দিয়েছে। মেয়েটার হাত থেকে বিগ-শপার বার করে অ্যাটাচি নেওয়া ছাড়া আর সব বলেছে। অ্যাক্সিডেন্টের কথা সে পরে শুনেছে। পেপারেও নাকি দিয়েছিল। বিভু খুব চিন্তায় পড়েছে, মনে হয়েছিল তার। সম্ভবত নিজের লোকজন পাঠিয়ে অ্যাটাচির খোঁজখবর নিয়েছে। ধরেই নিয়েছিল কেউ তুলে নিয়েছে, অথবা ছিটকে জঙ্গলের কোথাও বা হয়তো নদীতেই পড়ে গিয়েছে। এখানকার নদী পনেরো মিনিটের জোর বৃষ্টিতেই আচমকা প্রবল স্রোতে বইতে থাকে। পাহাড়ে আধঘণ্টা বৃষ্টি হলেই এদিককার নদীর দু’পার উপচে ওঠে। আবার আচমকাই জল নেমে যায়। ঠিক যেমনটা ভেবেছিল ভুজঙ্গ, বিভুও তাই ভেবেছে। নিশ্চিন্ত হয়েছিল ভুজঙ্গ।

সবাই মোটামুটি জানে, লাইনের কাজ ভুজঙ্গ ছেড়ে দিয়েছে। সে এখন তারাকান্ত মজুমদারের জুতোর দোকানের কর্মচারী। কাস্টমারের পা দেখেই বলে দিতে পারে, কত নম্বর জুতো লাগবে। মাঝে মাঝে তার ভয় করে, ভিতর থেকে কেউ যদি পুলিশের কাছে চুকলি করে, পুলিশ এসে যদি দোকান সার্চ করে, তবে তারাকান্তর সঙ্গে সেও ভিতরে চলে যাবে। বিভু কি তখন তাদের বাঁচাতে আসবে? তা হয়তো হবে না। সব জায়গায় বিভু ফিট করে রেখেছে। পুজো পেলে সব ঠাকুর সন্তুষ্ট। আর, কোন ঠাকুর কোন প্রসাদে খুশি হয়, সে সব বিভু ভালই জানে।

ক’দিন আগে বিভু অনেক ক্ষণ ভুজঙ্গর মুখের দিকে তাকিয়েছিল। অস্বস্তি হচ্ছিল ভুজঙ্গর। তার মুখের রেখায় বা চোখের তারায় কি বিভু কিছু দেখতে পাচ্ছে? অপরাধের ছায়া। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া একটা সাদা গাড়ির বাঁ দিকের ভাঙা জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ভুজঙ্গ। মেয়েটার হাতে বিগ-শপার ঝুলছে। ভুজঙ্গ সেই ব্যাগ থেকে অ্যাটাচি বার করে নিচ্ছে। না, কেউ দেখেনি। বিভুর জানার কথা নয়। পরে ভুজঙ্গ জেনেছে, গাড়ির দু’জন লোকই স্পট-ডেড। ওরা কথা বলবে না। মরা মানুষের সাক্ষ্য দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিভুর নিজের ছেলেরা তন্নতন্ন করে অ্যাটাচি খুঁজেছে। পায়নি। ভুজঙ্গসমস্ত সন্দেহের বাইরে। তবে কেন তার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে বিভু সমাদ্দার? ভাল লাগছিল না ভুজঙ্গর।

“তোর নাকের মাথা, কানের লতি এরকম লাল হয়ে আছে কেন রে? আগেও লক্ষ করেছি। মুখটাও ফুলো-ফুলো দেখছি কিছু দিন। দেখি, হাতদু’টো সামনে বাড়া তো।”

সে তো ভুজঙ্গও লক্ষ করেছে। ভেবেছে ডাক্তার দেখাবে। হয়ে উঠছে না। শুধু আয়নার সামনে দাঁড়ালে কেমন যেন অস্বস্তি হয়।

“শোন, লাইফ লাইনে বসে ডক্টর সুজিত সেনগুপ্ত। স্কিন স্পেশালিস্ট। দেরি না করে এক বার দেখিয়ে নে। খারাপ কিছু না-ও হতে পারে, আবার হতেও পারে। ডাক্তার কী বলল, আমাকে জানাবি। যেখানে সেখানে যাস, কোথা থেকে কী বাঁধিয়েছিস, কে জানে। বিয়ে কর না। যা কামাচ্ছিস, দু’জনের চলে যাবে।”

বিভু সমাদ্দার, তুমি কী বুঝবে। আছ তো সুখে! সুন্দরী স্বাস্থ্যবতী বৌ, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, গাড়ি, ক্ষমতা। তুমি কী করে বুঝবে, মাঝে মাঝে এই শরীর কেমন জানোয়ার হয়ে যায়। একটা মেয়েছেলের শরীরের জন্য কুকুরের অধম হয়ে যায়। বাতাসি, এক বার— পায়ে ধরে কাঁদে ডাকাবুকো পুরুষ। ভগবান কী যে জ্বালা দিয়েছে পুরুষের শরীরে।

রবিবারে ‘পদপল্লব’ বন্ধ থাকে। ভুজঙ্গ ঠিক করে রেখেছিল ডাক্তার দেখাবে। খোঁজ নিয়েছে রবিবারে ডাক্তার সেনগুপ্তের চেম্বার খোলা থাকে। তাড়াতাড়ি গিয়ে নাম লেখাতে হবে। বেরনোর আগে একবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ভুজঙ্গ। লালচে ভাবটা আরও একটু বেড়েছে মনে হচ্ছে।

ক্রমশ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Novel Novel

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy