E-Paper

অর্থে অনর্থ, বেহাল শিল্পের হাল কাদের হাতে, খোঁজ সরকারে

আইন-শৃঙ্খলা সামলানোর জন্য পুলিশ দফতরের ভার তাঁর পূর্বসূরিদের মতো নিজের হাতেই রাখবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। রাজ্যের কোষাগারের হাল গত কয়েক বছরে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, শুভেন্দু নিজেই সেই বিষয়ে সম্যক অবহিত।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ০৭:২১
(বাঁ দিকে) নরেন্দ্র মোদী এবং শুভেন্দু অধিকারী (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) নরেন্দ্র মোদী এবং শুভেন্দু অধিকারী (ডান দিকে)। — ফাইল চিত্র।

প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে গিয়েছে। ভোটের বাক্সে ‘ভরসা’ রেখেছে জনতাও। এ বার আশ্বাস পূরণের পথে এগোনোর জন্য চাই ‘কাজের লোক’। নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ হয়ে গেলেও তেমন মুখের সন্ধান এখনও শেষ হয়নি বিজেপিতে।

ব্রিগেড ময়দানের বৃহৎ মঞ্চ থেকে শনিবার শপথ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে উষ্ণ আলিঙ্গন করে সব রকম সহায়তার আশ্বাস দিয়ে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ব্রিগেডের মঞ্চে শপথ নিয়েছেন পাঁচ মন্ত্রী। রাজ্যের ইতিহাসে প্রথম শপথের নিরিখে সংক্ষিপ্ততম মন্ত্রিসভা বলা হচ্ছে যাকে! মোদীর তোলা ‘চলো পাল্টাই’ স্লোগান যে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে বিপুল সাফল্য দিয়েছে, সেখানে গোটা রাজ্য থেকে জিতে এসেছেন ২০৭ জন বিধায়ক। এত সংখ্যক জয়ী প্রার্থীর মধ্যে থেকে যেমন মন্ত্রিসভায় বেশ কিছু মুখ বেছে নিতে হবে, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ দফতরের ভার দিতে হবে দক্ষ হাতে। এই দুই চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সব সূত্র এখনও মেলেনি বলেই সূত্রের ইঙ্গিত। মন্ত্রিসভার কলেবর ও দায়িত্ব বণ্টন চূড়ান্ত করতে গিয়ে দলের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের মতের সেতুবন্ধনের কথাও ভাবতে হচ্ছে বিজেপিকে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অবশ্য বার্তা দিয়েছেন, ‘‘আইন-শৃঙ্খলা নেই, শিক্ষা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। দ্রুত নবনির্মাণের কাজ শুরু করতে হবে।’’ আর সেই সঙ্গে প্রথম দিনেই তিনি বলে রেখেছেন, ‘‘এখন আর রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। কাজ করতে চাই। এখন আমি সকলের মুখ্যমন্ত্রী। কোনও বিতর্কিত মন্তব্য করব না।’’

আইন-শৃঙ্খলা সামলানোর জন্য পুলিশ দফতরের ভার তাঁর পূর্বসূরিদের মতো নিজের হাতেই রাখবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। রাজ্যের কোষাগারের হাল গত কয়েক বছরে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, শুভেন্দু নিজেই সেই বিষয়ে সম্যক অবহিত। প্রতিশ্রুতি মতো নতুন সরকারের কাজ শুরু করতে হলে অর্থের সংস্থান লাগবে, ভাঁড়ারের হিসেব বুঝতে হবে। কে নেবেন সেই ভার? বিজেপির একটি সূত্রের ইঙ্গিত, রাসবিহারীর বিধায়ক স্বপন দাশগুপ্তকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। কিন্তু অন্য মত হল তাঁকে শিক্ষা দফতরের ভার দেওয়া এবং প্রাক্তন সাংবাদিক স্বপন নিজেও তাতে তুলনায় বেশি ‘স্বচ্ছন্দ’। এমতাবস্থায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশ চাইছেন, আপাতত বর্তমান বিধায়কদের মধ্যে কাউকে অর্থ দফতর দিয়ে কাজ চালানো হোক। তার পরে অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ কাউকে নিয়ে আসা হোক।

রাজ্য বিজেপির এক প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘‘আমরা জিতেছি কিন্তু এই মুহূর্তে হাতে টাকা-পয়সার অঙ্ক করার লোক নেই! অশোক লাহিড়ীকে প্রার্থী করা হয়নি, তিনি ইতিমধ্যে নীতি আয়োগে চলে গিয়েছেন। ওই রাস্তাও তাই বন্ধ। এখন প্রধানমন্ত্রীর এক বাঙালি অর্থনৈতিক উপদেষ্টাকে নন্দীগ্রামের মতো কোনও আসন থেকে উপনির্বাচনে জিতিয়ে আনার কথা ভাবা হতে পারে।’’ দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর ও পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম, দুই বিধানসভা কেন্দ্র থেকেই এ বার জিতে এসেছেন শুভেন্দু। তৃণমূল নেত্রী ও সেই সময়ের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে জয় করা ভবানীপুর রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দিতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী এবং সে ক্ষেত্রে নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের প্রার্থী নিয়ে তাঁর নিজস্ব ভাবনাও রয়েছে। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নন্দীগ্রামে ‘চমক’ দেখা যেতে পারে বলে সূত্রের খবর।

অর্থের মতোই প্রশ্ন ঘুরছে শিল্প ও বাণিজ্য দফতরের সম্ভাব্য মন্ত্রী নিয়েও। কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের সরকার তৈরি হওয়ার পরে বঙ্গে বিনিয়োগের খরা কাটতে পারে বলে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ভিন্ রাজ্য থেকে কিছু উৎসাহী বিনিয়োগকারী বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য-সহ নতুন শাসক দলের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগও করছেন। শিল্প দফতরের ভার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে রাজ্যের স্তব্ধ চাকায় গতি আনার কাজে কে উপযুক্ত হতে পারেন, তা নিয়েও নানা আলোচনা জারি রয়েছে বিজেপি শিবিরে।

প্রথম দফায় ব্রাক্ষণ, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি), মতুয়া, মহিলা, আদিবাসী ও রাজবংশী— নানা অংশের প্রতিনিধিত্ব স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিসভায়। শুভেন্দুর পরে শপথ নিয়েছেন দিলীপ ঘোষ, অশোক কীর্তনিয়া, অগ্নিমিত্রা পাল, ক্ষুদিরাম টুডু ও নিশীথ প্রামাণিক। সেই সঙ্গেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, মমতার জমানার মতো কলকাতা-কেন্দ্রিক হবে না শুভেন্দুর সরকার। জেলায় জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে নানা দফতরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী। তবে তার জন্য মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ। যা হওয়ার কথা আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে। বিজেপির এক শীর্ষ নেতার বক্তব্য, ‘‘মন্ত্রিসভা অহেতুক বড় হবে না, আবার একেবারে ছোটও হবে না। প্রয়োজনে দফায় দফায় সম্প্রসারণ হবে। আপাতত এখানে উপ-মুখ্যমন্ত্রী রাখা না-ও হতে পারে।’’

ব্রিগেডে শমীক ভট্টাচার্য। শনিবার।

ব্রিগেডে শমীক ভট্টাচার্য। শনিবার। —নিজস্ব চিত্র।

শপথ অনুষ্ঠান ও জোড়াসাঁকোয় রবি-প্রণাম সেরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু গিয়েছিলেন ময়দানে পূর্ত দফতরের ছাউনিতে। রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি-র সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা সেরেছেন। পরে রাতে তিনি বলেছেন, ‘‘যাঁরা শপথ নিয়েছেন, তাঁদের দফতর বণ্টন হবে সোমবার। তার পরে প্রশাসনিক বৈঠক।’’ সব ঠিক থাকলে, নবান্নের সভাঘর থেকে প্রশাসনিক কর্তা ও জেলার পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকে নতুন সরকারের মনোভাব স্পষ্ট করে দিতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। সে দিনই পরীক্ষা শুরু হবে শুভেন্দুর প্রিয় ‘চরৈবতি’ মন্ত্র প্রয়োগের!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal government Suvendu Adhikari

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy