আজন্ম লালিত স্বপ্নপূরণের ঐতিহাসিক উদযাপন করল বিজেপি! ব্রিগেড ময়দানে শনিবার রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের শপথ-অনুষ্ঠানকে কার্যত সেই বিজয়োৎসবের চেহারাই দিল গেরুয়া শিবির।
গত এক দশকে দেশের সিংহ ভাগে প্রশ্নহীন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরে গেরুয়া পতাকা আকাশ ছুঁল দীর্ঘ দিনের অধরা বাংলার মাটি থেকে। তাই ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে এ দিন এক আকাশ-ছোঁয়া মুহূর্তও তৈরি করল বিজেপি।
‘ভারতীয় জনসঙঘে’র প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এ রাজ্যকে যে ভাবে দেখতে ও দেখাতে চেয়েছিলেন, শুভেন্দু অধিকারীকে সামনে রেখে সেই পথেই এক নতুন যাত্রা শুরু করলেন প্রধামন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পরেই অপূর্ণতা দূর হওয়ার বার্তা স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘আজ, যখন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকার শপথ গ্রহণ করছে, তখন আমাদের সকলেরই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কথা এবং দেশ ও বিশেষত, পশ্চিমবঙ্গের প্রতি তাঁর চিরস্থায়ী অবদানের কথা স্মরণ করা অত্যন্ত স্বাভাবিক’। প্রতিশ্রুতি হিসেবে তিনি আরও লিখেছেন, ‘তাঁর (শ্যামাপ্রসাদ) স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখব না’। ব্রিগেডের শপথ- মঞ্চে হাঁটু মুড়ে বসে জনতাকে প্রণাম জানিয়ে কৃতজ্ঞতাই ফেরাতে চেয়েছেন তিনি।
শপথ অনুষ্ঠানের মঞ্চে জনসঙ্ঘে শ্যামাপ্রসাদের সহযোদ্ধা নবতিপর মাখনলাল সরকারকে উপস্থিত করেছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা এ বারের নির্বাচনী লড়াইয়ে দলের আর এক মুখ শমীক ভট্টাচার্য। শপথ-মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী যখন তাঁকে সম্মান জানাচ্ছেন, মাইকে শমীকই তখন তাঁদের কাশ্মীরের সংগ্রামী অতীত মনে করিয়ে দিয়েছেন। এ রাজ্যে সরকার পরিচালনায় তাঁর রাজনীতি ও ভাবনা যে কী ভাবে থাকবে, শপথ গ্রহণের দিনই ভবানীপুরে শ্যামাপ্রসাদের বাড়িতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। এ রাজ্যে বিজয়ী বিজেপির অভিমুখ বোঝাতে শমীক বলেন, ‘‘বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ যে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ জাগ্রত করেছিল, শ্যামাপ্রসাদের দেখানো পথে তা আজ পূর্ণতা পেয়েছে।’’ তাঁর মতে, শাসন ক্ষমতা নয়, এ বারের ভোটে ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’ জয় করেছেন তাঁরা।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সাফল্য দেশজোড়া গেরুয়া রাজনীতিতে যে ব্যতিক্রমী, তা এক বাক্যে মানেন জাতীয় স্তরে বিজেপির সব সফল কারিগরেরা। তাই নিজেদের সাফল্যের শংসাপত্র হিসেবে এ বারের ভোটের ফলকে তুলে ধরতে চেয়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব। শপথের সাক্ষী, ময়দানে সমবেত বিপুল ভিড়ের উৎসাহে শমীক আর শুভেন্দুকে নিয়ে হুডখোলা গাড়িতে মোদী যখন মঞ্চে পৌঁছেছেন, তাঁর সর্বাঙ্গে তখন সেই তৃপ্তিই ফুটে বেরিয়েছে। নানা বর্ণে সাজানো পথ জুড়ে তাঁর নামে মুহুর্মুহু স্লোগান উঠলেও এ দেশে হিন্দুত্বের রাজনীতির প্রতীক হয়ে ওঠা মোদী যেন মঞ্চে হাজির ১৯ রাজ্যের দলীয় মুখ্যমন্ত্রী, শরিক নেতা ও তাঁদের প্রতিনিধিদের এই ‘পূর্ণতা’রই স্বীকৃতি চেয়েছেন।
নেহরু-ক্রুশ্চেভ, ইন্দিরা-মুজিবকে নিয়ে আন্তর্জাতিক গুরুত্ববাহী সমাবেশের পাশাপাশি বাংলার রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য জনসভার সাক্ষী ব্রিগেড ময়দানকে এই শপথের জন্য বেছে নেওয়াও সেই ভাবনারই প্রমাণ। পঁচিশে বৈশাখ, তারই বাতাসে ‘হে নূতন’ সুর বেঁধে, মঞ্চে কবিগুরুর ছবি, তার সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র, শ্যামাপ্রসাদকে মিলিয়ে এই স্বীকৃতির শেষ ফাঁকটুকু বোজাতেও ভুল করেননি তাঁরা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)