মণিময়বাবু...” ডাক শুনে দাঁড়াতে হল মণিময় মুখোপাধ্যায়কে। রাস্তার পাশে বাতাসপুর খেলার মাঠ। গোলপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে আছে অবয়বটা। সন্ধ্যা পেরিয়েছে, তাই ভাল করে দেখা যায় না। মণিময়বাবু স্কুটির ইঞ্জিন বন্ধ না করেই জানতে চাইলেন, “কে?”
“আমি, মণিময়বাবু...”
আলোছায়ার আড়াল ছেড়ে সামনে এল ছেলেটা। বছর পঁচিশ-ছাব্বিশের একটা ছেলে। মণিময়বাবু প্রথমটায় চিনতে না পারলেও, শেষে মনে পড়ল, “আচ্ছা, তুমি...”
ছেলেটা উৎসাহী হয়ে ওঠে। কিন্তু মণিময়বাবুর কোনও উৎসাহই নেই, এখন রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে কথা বলার। শহরে গিয়েছিলেন। সারা দিনের পরিশ্রম শরীর জুড়ে লেগে।
“হ্যাঁ, সন্ধ্যায় দেখা করতে বলেছিলেন, তাই অপেক্ষা করছিলাম। দেখেছিলেন আমার ওই...”
ছেলেটাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে মণিময়বাবু বললেন, “পরশু রবিবার, বাড়িতে এসো না! তখন কথা হবে ভাল করে। দেখছই তো, সারা দিনের যত মামলা-মোকদ্দমার ধকল সামলে এই ফিরছি।”
ছেলেটা ম্লান হেসে ঘাড় নাড়ল শুধু। মণিময়বাবু স্কুটি ছুটিয়ে যেতে গিয়ে আবার ব্রেক কষলেন, “ও হে ছেলে, কী যেন নামখানা তোমার?”
“সর্বোত্তম, সর্বোত্তম মালাকার।”
*****
সর্বোত্তম কয়েক মাস হল ঘুরছে। দক্ষিণডাঙা থেকে বাতাসপুর। দক্ষিণডাঙা আর বাতাসপুর পাশাপাশি গ্ৰাম। মণিময়বাবুর বাস বাতাসপুরে হলেও, সুনাম সারা অঞ্চলেই। হবে না-ই বা কেন, ওঁর মতো এমন মাতব্বর মানুষ এই গাঁ-দেশে ক’জনই বা আছেন? খাস কলকাতা হাই কোর্টে আইনি লড়াই করে করে চুল পাকিয়েছেন। সুনাম বা প্রতিপত্তি যা-ই বলা হোক, তা ওঁর আছেই। তবে শুধু কালো কোর্টের কারণেই নয়, মণিময়বাবুর সুখ্যাতির অন্য বিশেষ কারণ আছে।
মণিময়বাবু আইনি কাজকর্মের ফাঁকে কবিতা, গল্প নিয়ে চর্চা চালান। অন্তত মানুষজন তেমনটাই জানেন। তাই বছরের প্রায় সব সময়ই মণিময়বাবুকে প্রধান অতিথি হয়ে যেতে হয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানের নানা অনুষ্ঠানে। ওঁর পদধূলি ও বক্তৃতায় ধন্য হয় আয়োজক কমিটি।
দক্ষিণডাঙার একটি স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে মণিময়বাবুকে প্রথম দেখেছিল সর্বোত্তম। শুধু দেখেনি, রোমাঞ্চিতও হয়েছিল এক জন সাহিত্যিককে চোখের সামনে দেখে। মণিময়বাবু সেদিনকার অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছিলেন।
হাতের কাছেই যে এমন এক জন আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব থাকতে পারে, তা কল্পনাতীত ছিল সর্বোত্তমের। তাই দীর্ঘ দোনামোনা শেষে এক বুক সাহস সঞ্চয় করে খুঁজে খুঁজে এক দিন সাইকেল চালিয়ে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল বাতাসপুরে।
মণিময়বাবু ব্যস্ত মানুষ। সাত গাঁয়ের লোক সর্বক্ষণ ভিড় করে থাকে ওঁর বৈঠকখানায়। ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়নি সেদিন। সুযোগ হয়েছিল তৃতীয় দিন গিয়ে। কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে সর্বোত্তম গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মণিময়বাবুর টেবিলের সামনে।
“কী চায় ছোকরা?” ভুরুজোড়া নাচিয়ে বলেছিলেন মণিময়বাবু।
“আজ্ঞে আমি আসছি দক্ষিণডাঙা থেকে...” সর্বোত্তম কী ভাবে ওর কথাটা বলবে বুঝতে পারে না। তাই ভণিতা টানতেই হয়, “দক্ষিণডাঙার দীপেন মালাকার আমার বাবা।”
“দীপেন মালাকার, ছোটবাজারের মোড়ে যার মনোহারি দোকান?” পাশের লম্বা বেঞ্চে বসে থাকা বঙ্কিম হালদার ফুট কাটেন।
“হ্যাঁ...” মাথা নাড়ায় সর্বোত্তম।
“সে সব তো বুঝলাম, কিন্তু এখানে চাই কী তোমার? কোনও মামলা আছে নাকি?” আগের মতোই গম্ভীর কণ্ঠ মণিময়বাবুর।
সর্বোত্তম আর দেরি না করে পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজটা বার করে সাবধানে টেবিলে রাখল।
“কী এটা?” মণিময়বাবু কাগজটা তুলে নিলেন টেবিল থেকে। দেখতে লাগলেন মন দিয়ে। অল্প সময় পর মণিময়বাবু মুখ তুলে তাকালেন। মুখে বিস্ময়ের ভাব সুস্পষ্ট। আবার এক বার কাগজটার দিকে তাকালেন উনি, তার পর সর্বোত্তমের দিকে, “গল্প!”
সঙ্কুচিত ও সলজ্জ ভাবে মাথা নাড়ে সর্বোত্তম।
“এখনকার ছেলেপুলেরা ফোন ছেড়ে গল্পও লিখছে তা হলে!” মৃদু কটাক্ষ মণিময়বাবুর কথায়। সর্বোত্তম মাথা চুলকোয়।
“তা ভাল,” তার পর সর্বোত্তমকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত মেপে নিলেন উনি, “করা হয় কী?”
“ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছি। কাজের চেষ্টায় আছি। মাঝে মাঝে বাবার দোকানে বসি।”
“অ... বুঝেছি।”
খানিক নীরবতার পর সর্বোত্তমই বলল, “আপনি তো এ-সবের মর্ম বোঝেন। একটু যদি দেখে দিতেন...”
“দেখে দেওয়া মানে, কোথাও ছাপিয়ে-টাপিয়ে দেওয়ার কথা বলছ নাকি?” হেসে ওঠেন মণিময়বাবু।
এর মধ্যে একটা গোপন ব্যাপার আছে। অঞ্চলে সুখ্যাতি থাকলেও, মণিময়বাবু নিজে জানেন, আসলে তিনি কিছুই নন। কবিতা-গল্প লেখেন ঠিকই, তবে সবটাই মন-ভোলানো, সময় কাটানো ব্যাপার। সারা জীবন ধরে বহু পত্রপত্রিকায় কবিতা, গল্প পাঠিয়েছেন। কলকাতার নামীদামি পত্রিকার অফিসে গিয়ে জুতো ছিঁড়েছেন। কিন্তু সোজা রাস্তায়, লেখার গুণমানের বিচারে কোথাও এক লাইন লেখাও প্রকাশিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত গাঁটের কড়ি খরচা করে নিজেই বই ছাপিয়েছিলেন দু’বার। চেনা-পরিচিতদের মধ্যে বিলিয়েছিলেন হরির লুটের বাতাসার মতো। সেই বই দু’টিই অঞ্চলের সংস্কৃতিমনস্ক মানুষজনের কাছে মণিময়বাবুকে ‘সাহিত্যসিংহ’ বানিয়ে রেখেছে এখনও। প্রকৃত সাহিত্যিক হতে না পারলেও, পাঁচ জনের কাছে এই সাহিত্যিক-সাহিত্যিক ব্যাপারটা তিনি বেশ উপভোগ করেন।
খানিকটা বিব্রত হয়ে পড়েছে সর্বোত্তম। আসলে ঠিক ছাপিয়ে দেওয়ার জন্য ওর আগমন নয়। নিজের লেখাটা কতখানি চলনসই, সেটা বিচার করাই ওর উদ্দেশ্য। মণিময়বাবু ছাড়া আর কে আছেন এই অঞ্চলে, যিনি এর মর্ম বুঝবেন!
মণিময়বাবু কাগজখানা ধরেই বললেন, “এখন বাপু আমার হাতে একদম সময় নেই এ-সব পড়ে দেখার। দেখছ তো লোকজন অপেক্ষা করে আছে নানা দরকারে।”
“না না... এখনই নয়। গল্পটা থাক, সময়মতো পড়ে দেখবেন।”
“সেই ভাল,” কাগজখানা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন মণিময়বাবু।
আজ ছুটির দিন। মণিময়বাবু খবরের কাগজ নিয়ে বসেছিলেন নিজের চেয়ারে। সর্বোত্তমকে সাইকেল চালিয়ে আসতে দেখালেন খোলা জানালা দিয়ে। সাইকেল রেখে ও ঘরে ঢুকতেই মণিময়বাবু কিছুটা বিচলিত ভঙ্গিতে বললেন, “তোমার লেখাটা আমি খুঁজে পাচ্ছি না বাবা। আসলে এত দরকারি কাগজপত্র, ফাইল চার দিকে...”
“মণিময়বাবু...” সর্বোত্তমের মুখে উজ্জ্বল হাসি, “ওই গল্পটা একটা ম্যাগাজ়িনে প্রকাশিত হয়েছে! এই দেখুন।” বলেই মণিময়বাবুকে হতবাক করে দিয়ে ম্যাগাজ়িনটা টেবিলের উপর রাখল সর্বোত্তম।
“তোমার লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে...” একটু যেন অপ্রতিভ হলেন মণিময়বাবু সর্বোত্তমের ঝকঝকে হাসিটা দেখে, “কী পত্রিকা এটা?”
“খুব নামী নয়, আমাদের জেলা শহর থেকে বার করেন কয়েকজন। তবে মানসম্মত।”
“ও... তাই বলো। নাম শুনিনি তো কোনও দিন, তাই ভাবছি...” স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন মণিময়বাবু। পত্রিকাটা হাতে নিয়ে বাঁকা হাসি ফোটে ওঁর মুখে, “এখন তো চার দিকে ব্যাঙের ছাতার মতো পত্রিকা। বর্ষার প্রয়োজন হয় না। আর মানসম্মত কি না, সে বিচার করে কে?”
সর্বোত্তমের আনা ম্যাগাজ়িনটা টেবিলের অন্য পাশে সরিয়ে খবরের কাগজটা টেনে নিলেন মণিময়বাবু, “এই ‘দিনলিপি’ খবরের কাগজে রবিবারের গল্প বিভাগে আজ অমরেশদার একটা গল্প বেরিয়েছে। অমরেশদাকে চেনো তো? সাহিত্যিক অমরেশ সরকার।” সাহিত্যজগতের সঙ্গে ওঁর বিশেষ ঘনিষ্ঠতা বোঝাতেই এই ‘দাদা’ সম্বোধন। পত্রিকাটি সর্বোত্তমের দিকে এগিয়ে ধরেন, “প্রকৃত মানসম্মত বলতে কী বোঝায়, এক বার পড়ে দেখো, বুঝতে পারবে।”
*****
শীত গিয়ে বসন্ত এসেছে। কিছু দিন হল মণিময়বাবু আবার প্রাতর্ভ্রমণে বেরোচ্ছেন শীতকালীন অবসর ভেঙে। প্রথমে কয়েক মাইল হাঁটা। তার পর ঘনরামের চায়ের দোকানে আড্ডা। সর্বোত্তম জানত। তাই কাগজটা হাতে নিয়ে ঘনরামের দোকানেই হাজির হয় ও।
ঘটনাটা আশ্চর্য হলেও সত্যি। বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘দিনলিপি’ গল্প ছেপেছে সর্বোত্তমের! মণিময়বাবুর সেই মানসম্মত পত্রিকা ‘দিনলিপি’!
“এ ছেলে তো কামাল করল হে মণিময়! একেবারে দিনলিপির মতো খবরের কাগজে নাম তোলা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়!” বঙ্কিম হালদার যেন টিপ্পনী কেটেই বললেন বন্ধু মণিময়বাবুকে উদ্দেশ্য করে।
মণিময়বাবু সহজে হারার পাত্র নন। তা ছাড়া এটা ওঁর নিজের সাম্রাজ্য। দু’দিনের একটা ছেলে এসে ভিত নাড়িয়ে দেবে, তা কী ভাবে হয়! স্বভাবগম্ভীর গলায় বললেন, “সর্বোত্তমের লেখার মান আমি জানি। হাত আছে ওর...” অল্প করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “তবে বেশ কিছু দিন লক্ষ করছি, ‘দিনলিপি’ আর সে ‘দিনলিপি’ নেই। মান অনেক পড়ে গেছে। আগের সে মর্যাদা এখন অতীতের ছায়া। যা সব ছাপা হয়, তাকে সাহিত্য বলে না। কয়েক মাসের পাতা তো উল্টেই দেখিনি আমি।” এ বার সর্বোত্তমের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তবে তোমার লেখা যখন, নিশ্চয়ই এক বার পড়ে দেখব সময় করে।” কাগজখানা ভাঁজ করে প্রসঙ্গ বদলালেন মণিময়বাবু, “আফ্রিকার এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরি নাকি হঠাৎই জেগে উঠেছে। শুনলে তোমরা?...”
সর্বোত্তম দাঁড়িয়ে থাকে...
*****
সময় যত অতিক্রান্ত হয়েছে, সর্বোত্তম যেন চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে মণিময়বাবুর কাছে। দু’দিনের ছোকরা মণিময়বাবুকে টেক্কা দিতে উঠেপড়ে লেগেছে একেবারে! ছেলেটা নানা পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়া নিজের গল্প, কবিতা এনে এনে মণিময়বাবুকে যেন আঘাত করতে চায়! হেয় প্রতিপন্ন করতে চায় হাবেভাবে। ওর নম্র, ভদ্র চালচলন আসলে চালাকি।
তবে ওই চতুর ছেলেকে কী ভাবে কাত করতে হয়, তা মণিময়বাবু ভাল ভাবেই জানেন। যখন সর্বোত্তম কোনও লেখা পড়তে দিয়ে মান জানতে চায়, তখনই ভুরু কুঁচকে বলে ওঠেন, “এখানে ওখানে লিখছ ঠিকই, কিন্তু আসল জায়গায় যে বাকি।”
“আসল জায়গা?”
“হুম... যেখানে না লিখলে লেখক হিসেবে জাতে ওঠা যায় না। সত্যিকারের সাহিত্যের মান এখনও ধরে রেখেছে একমাত্র যে পত্রিকা, সেই ‘ভারত’ পত্রিকার কথা বলছি।”
না, সর্বোত্তমের এখনও সৌভাগ্য হয়নি বাংলাবিখ্যাত ‘ভারত’ পত্রিকায় লেখার। স্বাধীনতার আগে থেকে এখনও পর্যন্ত সগৌরবে বাঙালি পাঠকের মন দখল করে আছে ঐতিহ্যবাহী ‘ভারত’ পত্রিকা। প্রতি মাসেই সর্বোত্তম একটা করে সংখ্যা কেনে, আর স্বপ্ন দেখে ‘ভারত’-এ নিজের লেখা ছাপা হওয়ার। কিন্তু স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যায়...
আজ অনেক দিন পর সর্বোত্তমকে আসতে দেখে বঙ্কিম হালদার আগ বাড়িয়ে বলে ওঠেন, “কবি সর্বোত্তম, তা তোমার নতুন কবিতা আবার কোথাও বেরোল নাকি?”
সর্বোত্তম আগের মতোই লাজুক হাসে, “না কাকাবাবু। এ বার আর কবিতা বা গল্প নয়। একটা সুখবর দিতেই এখানে এলাম।”
মণিময়বাবু ফাইল থেকে চোখ তুলে আলগোছে দেখে নেন সর্বোত্তমকে। বঙ্কিম হালদাররাই প্রশ্ন তোলেন, “কী রকম? কী রকম?”
“তার আগে বোসো ভায়া এখানে...” এক জন সর্বোত্তমকে জায়গা করে দেয়। কাঁধের ঝোলা নামিয়ে রেখে থিতু হয় সে। তার পর ধীরেসুস্থে ঝোলা থেকে বার করে আনে ওর সুখবরটা, “আমার লেখা, প্রথম কবিতার বই!” সর্বোত্তম বলল সলজ্জ ভাবে।
“তোমার লেখা! বই! বলো কী!”
সত্যি অবাক করা বিষয়। এই গ্ৰামদেশে এমন ঘটনা ক’টা ঘটে? নিদেনপক্ষে টুকিটাকি কবিতা, গল্প ছাপা পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু আস্ত একটা বই! কে-ই বা ভাবে, কারই বা হয়! এক ওই মণিময়বাবুর মতো কলকাতা-ঘেঁষা গণ্যমান্য মানুষ এই আশ্চর্য করে দেখিয়েছিলেন। আর বই ছিল মহেশখালির চন্দ্রনাথ মাস্টারের। তাঁদের পর এই সর্বোত্তম। বঙ্কিমবাবুরা তো হতবাক হবেনই, “বেঁচে থাকো বাবা। পাঁচ গ্ৰামে নাম ছড়াক তোমার।”
কেউ বললেন, “এ বার তবে সত্যিকারের কবি, সাহিত্যিক হলে। বই ছাড়া কী সাহিত্যিককে মানায়...”
পাঁচ জনের প্রশংসা শেষে মণিময়বাবুর হাতে এসে পৌঁছল বইটা। মুখের ভাবভঙ্গি দেখে বোঝা যায় না কিছুই। সর্বোত্তম উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বইটা না খুলেই কিছু ক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখার পর মণিময়বাবু আলতো স্বরে বললেন, “বেশ হয়েছে গড়নখানা। তা খরচপাতি কেমন পড়ল? আমাকে বলতে পারতে। কমে-টমে ব্যবস্থা করে দিতাম।”
একটু কুণ্ঠিত ভাবেই সর্বোত্তম বলল, “সব কিছু প্রকাশনীই করেছে মণিময়বাবু। স্যোশাল মিডিয়া থেকে যোগাযোগ। আমার শুধু পাণ্ডুলিপি।”
“শুধু পাণ্ডুলিপি! টাকাপয়সা লাগেনি!” মণিময়বাবু অবিশ্বাসী চোখে তাকালেন।
সর্বোত্তম মাথা নাড়ে।
সর্বোত্তমের প্রশংসায় মুখরিত হতে লাগল মণিময়বাবুর বৈঠকখানা।
*****
মণিময়বাবু অবসর নিয়েছেন মাস কয়েক হল। কলকাতা আর যেতে পারেন না। শরীর ভেঙেছে। সভা-সমিতিতেও বিশেষ যাওয়া হয় না আর। মানুষজনের সমাগম কমেছে অনেক। এখন হাতে-গোনা কয়েক জন আসেন শুধু ওঁর বৈঠকখানায়।
তেমনই তিন জন পুরনো বন্ধু সহযোগে মণিময়বাবু বসেছিলেন সন্ধ্যার আসরে। আলোচনার বিষয়, দিনে দিনে নতুন প্রজন্মের আত্মকেন্দ্রিকতা সমাজকে কী ভাবে উচ্ছন্নে নিয়ে যাচ্ছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব-নিকাশ। এই সব কথার মাঝেই উমাপদ রাহা জিজ্ঞেস করলেন, “তা মণিময়, তোমার সেই কবির খবর কী? অনেক দিন যে দেখি না? মাঝে খুব লিখছিল-টিখছিল, বই বেরোল...”
“সত্যিই তো! ছোকরার হল কী?” বঙ্কিমবাবুর কপালেও চিন্তার ভাঁজ।
“আরে তোমরাও যেমন! বোঝো না, ওরা সব দু’দিনের যোগী!” মণিময়বাবু যেন ধর্তব্যের মধ্যেই রাখেননি সর্বোত্তমকে, “অমন কত দেখলাম... বয়স কম, কী আর বলি। দু’-একটা কাব্যি কোথায় ছাপল না ছাপল, তাতেই তুমি সাহিত্যিক বনে গেলে ভায়া? এ কি ছেলের হাতের মোয়া! এ কঠোর সাধনার ব্যাপার! সারা জীবন লেগে যায়...”
মণিময়বাবুদের কথার মাঝেই ওঁর ছেলে মণীশ এসে উপস্থিত হল বৈঠকখানায়, “বাবা, খবর শুনছেন?”
“কী আবার হল মণীশ? এত চঞ্চল দেখাচ্ছে কেন?” মণিময়বাবু সোজা হয়ে বসলেন।
“চঞ্চল হওয়ার মতোই খবর...” মণীশ এগিয়ে গেল বাবার টেবিলে কাছে, “আপনার কাছে যে ছেলেটা আসত মাঝে মাঝে...”
“ছেলে? কোন ছেলে?”
“ওই যার কথা বলতেন আপনি। কবিতা-টবিতা লেখে। দক্ষিণডাঙার।”
“সর্বোত্তম?” বলেন মণিময়বাবু।
“হুম, সে-ই। এই দেখুন, কী কাণ্ড!” হাতের মোবাইলটা মেলে ধরল সবার সামনে।
মোবাইল স্ক্রিনে একটা খবরের চ্যানেলে দেখা যাচ্ছে সর্বোত্তমকে! উপরে বড় বড় করে শিরোনাম, ‘এ বছর রাজ্য সাহিত্য সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত সেরা তরুণ সাহিত্যিক সম্মাননায় ভূষিত হলেন সর্বোত্তম মালাকার।’
সাংবাদিক নানা প্রশ্ন করছেন সর্বোত্তমের মুখের কাছে বুম ধরে। মৃদুভাষী সর্বোত্তম লাজুক ভঙ্গিতে উত্তর দিচ্ছে যথাসম্ভব।
সাংবাদিকটি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বাড়ি নদিয়া জেলার দক্ষিণডাঙা গ্ৰামে। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এমন একটা গৌরবময় সম্মাননা পাওয়ার ঘটনা বেশ বিরল। আপনার সাফল্যের পিছনে কার বা কাদের অবদান সবচেয়ে বেশি?”
“বাবা-মা সব সময় সঙ্গে ছিলেন, আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। কিন্তু আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন আমাদের অঞ্চলের বিশিষ্ট সাহিত্যিক শ্রীমণিময় মুখোপাধ্যায়। যিনি আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। চিনিয়েছেন সাহিত্যের বৃহৎ জগৎ। চিনতে শিখিয়েছেন সাহিত্যের মান, উৎসাহ দিয়েছেন বড় পত্রিকায় লেখার জন্য। তাই এই পুরস্কার ওঁকেই উৎসর্গ করলাম...”
বৈঠকখানার নিস্তব্ধতা ভাঙলেন বঙ্কিম হালদার, “শুনলে! শুনলে! তোমার কথা বলছে হে মণিময়! তোমার নাম করছে!”
স্তম্ভিত মণিময়বাবু বিড়বিড় করে বলে উঠলেন কিছু একটা, বোঝা গেল না। শুধু দুঁদে উকিল মণিময় মুখোপাধ্যায়ের চোখে এই প্রথম জল দেখলেন সবাই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)