E-Paper

বাসন্তী পোলাও

খুবই অত্যাচার হয়েছে! আচ্ছা একটা কথা বলুন, সে যে বাসন্তী পোলাওই খাচ্ছিল, সেটা রাস্তার উল্টো দিক থেকে বুঝলেন কী করে? হলুদ রঙের ভাত গোত্রীয় কিছু কি...

বিতান সিকদার

শেষ আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৬
ছবি: রৌদ্র মিত্র।

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

ওই তৃপ্তি, মুখ জুড়ে মুগ্ধতা, শেষ তিন বার চিবিয়ে গিলে ফেলা— এ যেন, এ যেন তেহাইয়ের পর সম! না মশাই, এ বাসন্তী পোলাও ছাড়া হয় না!

পেড়ে ফেললেন আমায়! বাসন্তী পোলাও? যে সে জিনিস? রাঁধলে তপস্যা, খেলে মোক্ষ! যাকগে— তা আপনি কি ওই পোলাওটাকে দেখে বয়ে গেলেন? নাকি ওটা যে খাচ্ছিল, তাকে দেখে?

বয়ে যাওয়ার একটা কারণ বোধহয় ছিল না। চার পাশ থেকে আক্রমণ করা হয়েছিল। বিচ্ছিরি একটা দিন ছিল মশাই! সকালবেলায় চারু নন্দীর কী দরকার ছিল আপিসে ডেস্ক অবধি এসে আমার পিঠ চাপড়ে বলার— ‘ব্রিলিয়ান্ট পারফরম্যান্স!’ তার পর ধরুন গিয়ে লাঞ্চ সেরে নেমে গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে একটা সিগারেট খাব, তা নয়, গাছের তলায় অমন একটা ‘তুমি না, যাচ্ছেতাই’-মার্কা হাওয়া? কী দরকার ছিল বলুন তো পলাশ গাছটারও তখন অমন লজ্জায় লাল হয়ে থাকার? আর তার আক্কেলটাও ভাবুন! বসবি তো বস, একেবারে উল্টো দিকে, পার্ক লাগোয়া বেঞ্চে? সঙ্গে টিফিনবক্স, চামচ আর বাসন্তী পোলাও! ভাবতে পারছেন পরিস্থিতিটা?

ঘিরে ফেলেছিল আপনাকে। খুবই অত্যাচার হয়েছে! আচ্ছা একটা কথা বলুন, সে যে বাসন্তী পোলাওই খাচ্ছিল, সেটা রাস্তার উল্টো দিক থেকে বুঝলেন কী করে? হলুদ রঙের ভাত গোত্রীয় কিছু কি...

শুনুন শুনুন, প্রতিবার মুখে দেওয়ার পর ঠোঁটের পাশ থেকে একটা নরম আরাম গাল বেয়ে উঠে চোখের কোণ অবধি পৌঁছে মিলিয়ে যাচ্ছে, এ বাসন্তী পোলাও ছাড়া আর কিছুতে হয়?

ওহ্‌! শান্তিপুর ডুবু ডুবু, নদে ভেসে যায়!

আজ্ঞে?

কিছু না। তো, আপনি কাত হয়ে পড়লেন?

হব না? পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেল যে। সারা রাত ঘুম হল না। মোবাইলে সলিল। লতার সঙ্গে বেসুরো গলা মেলাচ্ছি, ‘আমি যে তোমারই শুধু...’, সেই দুপুর, সেই হাওয়া, সে আর বাসন্তী পোলাও!

বাসমতী। ধুয়ে ভিজিয়ে রাখার মতো। ভিজে রয়েছেন আপনি।

কিছু বললেন?

কিছু না। তার পর?

তার পর, পরদিন...

গেলেন?

অবশ্যই।

দেখলেন?

নাহ্‌!

যাহ্‌!

পরদিনও না, তার পরদিনও না। কিন্তু...

কিন্তু?

পরদিন আবার।

এই তো।

দু’জন ছিল সঙ্গে। মনে হয় কোলিগ গোত্রীয়।

কোলিগ? ঘটনাটা ঠিক কোথায় ঘটছে বলুন তো!

কলকাতার উপকণ্ঠে কোনও এক আপিসপাড়ায় ধরে নিন না কেন। জ্যামিতিটা সোজা। কয়েকটা ধেড়ে ধেড়ে চৌকো বিল্ডিং এ দিক-ও দিক ছড়িয়ে। সব ক’টাতে চৌকো-চৌকো আপিস। মাঝখানে মাখো-মাখো হয়ে কিছু ন্যালাক্ষ্যাপা খাবারের দোকান। পাশে একটা বৃত্তাকার পার্ক। একটা সরু সামন্তরিক মার্কা রাস্তা। এইখানে আপিসের লোকজনরা বসে এবং দাঁড়িয়ে লাঞ্চের সময় নিজের নিজের বসের গুণগান করতে আসে...

সে-ও কি ওর মধ্যে কোনও একটা আপিসে...?

মনে হয়।

আগে দেখেননি?

মনে তো পড়ে না।

তার পর কী করলেন?

সেদিন আমার নয়, তার করার দিন ছিল, মশাই। চোখে চোখ পড়ায় তার অভিব্যক্তি যা হল, দেখে মনে হল যেন বলছে, ‘একেবারে যা তা...’।

ওহ্‌! তুমি কী যে করো ছাই, আমি লাজে মরে যাই!

আবারও কিছু বললেন মনে হল?

ছাড়ুন। আমার কী মনে হয় জানেন? আপনি বোধহয় প্রথম দিন হ্যাংলার মতো ওই বাসন্তী পোলাওটার দিকে চেয়ে ছিলেন।

শিয়োর নই। পোলাও হলে ঠিক আছে। কিন্তু কোনও ভাবে তার দিকে ওভাবে তাকিয়ে ফেলিনি তো?

বাদ দিন। তার পর কী হল বলুন। কোলিগদের এমন কিছু বলল কি যে, ‘জানিস, এ আর একটু হলে আগের দিন আমার টিফিন খেয়ে নিচ্ছিল...?’

আরও ভয়ঙ্কর! কাউকে কিচ্ছুটি বলল না। শুধু এক জনের পিছনে গিয়ে নিজেকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে তার ঘাড়ের উপর দিয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল। ভাবতে পারছেন পরিস্থিতিটা? শুধু চোখদুটো দৃশ্যমান!

বলে যান। থামবেন না।

একটু পর চোখ নামিয়ে হেঁটে চলে গেল।

আর আপনি?

গভীর ভাবে আহত! মশাই, কারও অমন দুটো চোখ থাকলে আইলাইনার লাগানো উচিত। চোখ একটা ভয়ঙ্কর জিনিস! ভাবতে পারেন, শুধুমাত্র চেয়ে থেকে সৃষ্টি, স্থিতি, লয় করে দেওয়া যায়।

আর আইলাইনার লাগালে?

দৃষ্টির ধারটা কমে আসে। না হলে বুকে বেঁধার সময় যে যন্ত্রণাটা হয়, সে কী বলব, যে না আক্রান্ত হয়েছে, সে ছাড়া মশাই আর কেউ...

শুকনো কড়াইতে মাঝারি আঁচে মশলাটা ভাজা হচ্ছে।

আজ্ঞে?

কিছু না। আর কী দেখলেন?

কচি কলাপাতা রঙের ছাপা ছাপা সালোয়ার-কামিজ। কানে একটা দুল, তিনটে পাথর ঝোলানো। কপালে ছোট্ট একটা টিপ। চুলটা চুড়ো করে একটা কালো ক্লাচ দিয়ে আটকানো। গলায় ফিনফিনে একটা হার, ভাবখানা যেন, বেখেয়ালে জড়িয়ে ধরে ফেলেছি।

বলতে থাকুন, বলতে থাকুন...

গ্রীবায় অহঙ্কার। ঠোঁটে হালকা শেডের একটা লিপস্টিক। আর...

আর?

আর একটা ঘামের ফোঁটা কপালের পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে নীচের দিকে নেমে আসছে...

উফ! চোখ বটে মশাই আপনার! এত দূর থেকে ঘামের ফোঁটাটা পর্যন্ত...আদাবাটা, লঙ্কাবাটা, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ...

আপনি থেকে থেকে বড় ডান দিক-বাঁ দিক চলে যাচ্ছেন।

ও ধরবেন না। একটু ঘি দিন।

অ্যাঁ?

তার পর কী হল?

তার পর তার পর করবেন না! মুহূর্তগুলোকে একটু স্থির হতে দিন।

হোক!

প্রায়শই লাঞ্চের সময় নীচে নেমে আসতাম। তার সঙ্গে দেখা হত। দেখা মানে দেখা-ই। আমি প্রায় আধ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতাম রাস্তার এ-পারে। সে এসে রাস্তার ও-পারে দশ মিনিট ঘোরাঘুরি করেই চলে যেত। কিন্তু ওই যে দশটা মিনিট, ওহ্‌! সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। হয়তো হাতে গুনে বার পাঁচেক সে দেখত আমার দিকে।

চোরা চাহনি?

না না, ও-সব চুরিচামারির ব্যাপার নেই। কনফিডেন্ট লুক। কিন্তু চোখ মিললেই দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া।

কিন্তু তার মধ্যেই গেঁথে ফেলত আপনাকে?

গেঁথে মানে? এফোঁড়-ওফোঁড় মশাই! তবে, যন্ত্রণাও যে এত আনন্দদায়ক হতে পারে...

ডোপামিন সিক্রেশন। ওই চোখাচুখিগুলো মগজের একটা রিওয়ার্ড সিস্টেমকে ট্রিগার করছিল।

আর সারা দিন জুড়ে সলিল। মুগ্ধ, আনন্দিত, রোমাঞ্চিত। মনে পড়লেই হ্যাপি হাই!

এটা অক্সিটোসিন। ন্যাচারাল মুড স্টেবিলাইজ়ার।

সংস্কৃতে কথা শুরু করলেন যে...

বায়োকেমিস্ট্রি... আপনি বরং ম্যারিনেশন ধরে চলুন। চাল আর মশলা মিশছে। নাড়তে থাকুন, নাড়তে থাকুন। তলা না ধরে যায়...

ধুর! কী যে বলেন!

আমি যতটুকু বুঝতে পারছি তাতে বলা যায়, সে নিঃসন্দেহে আপনার উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু কোনও দ্বিধা কাজ করছে কি তার মধ্যে? আপনারই মতো আধ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যাপারটা খুব বেশি স্পষ্ট হয়ে যেত কি? হতে পারে হয়তো সে নিজেও বুঝতে পারছে না, আপনার প্রতি কেমন অনুভূতি তার কাজ করছে! বা আর একটা কারণ হতে পারে। এটা মোক্ষম! সেও হয়তো একটু দূরত্ব রেখেই এই অদ্ভুত বোঝাপড়াটা ধরে রাখতে চাইছে!

সোজা টোল থেকে কাউন্সেলিং-এ চলে এলেন!

আরে না। রান্না করছি বলতে পারেন বড়জোর। আচ্ছা আপনার কি কখনও মনে হয়েছে, চোখে চোখ পড়ার মুহূর্তে কখনও একটু হাসা যেতে পারে, বা হালকা মাথা নাড়ানো যেতে পারে? কিছুই না, ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার হত, এই আর কী।

আত্মঘাতী পদক্ষেপ!

তবে থাক। আচ্ছা, এই যে তুরীয় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন, কাজকর্ম ঠিকঠাক হচ্ছিল?

আর কাজ! বসের চিৎকারও তখন কানে মধু ঢেলে দিচ্ছিল।

অথচ বলছেন কখনও এগিয়ে গিয়ে কথা বলার... মানে ‘হাই, হ্যালো’ করার কথা মনে হয়নি?

...

কী হল? বলুন।

একেবারে যে হয়নি, তাও কি আর মশাই বুক ঠুকে বলতে পারব? তবে, বাধো-বাধো ঠেকত। এত সুন্দর দৃষ্টিতে বলা কথা যদি শেষ হয়ে যায়...

বুঝতে পারছি, এই অনুভূতিটাই আসল। এটা যেন হুট করে মাটি না হয়ে যায়, আবার একঘেয়েও না হয়ে পড়ে। তার মানে, একটু ধীরলয়ে চলা। একটু অপেক্ষা, একটু অনিশ্চয়তা— এই মিশেলটা সাংঘাতিক! তা, মাঝখানে রাস্তার দূরত্বটা কি রয়েই গেল?

শুনুনই না। এক দিন তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। আপিসেও ঢুকে পড়তে হবে কিছু ক্ষণের মধ্যে। হয়তো আসেনি আজ। সিগারেটটা নিয়ে ভাবলাম পার্কে ঢুকে পলাশ গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে খাই। যেই ঢুকতে যাব, দেখি ওদিক থেকে সে বেরোচ্ছে। সঙ্গে সেই দুই কোলিগ। গেটের এ পাশে আমি। গেট ধাক্কা দিয়ে আমায় ঢুকতে হবে। ও পাশে সে। গেট ধাক্কা দিয়ে তাকে বেরোতে হবে। হয় সে সরবে, নয় আমি। সে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে।

জমে যাচ্ছে। একটু জল দিন তো।

আমি তার দিক থেকে চোখ না সরিয়ে পিছিয়ে এলাম। সে চোখ নামিয়ে বেরিয়ে গেল। সেই প্রথম এতটা কাছে। একদম, সামনে।

চোখদুটো দেখে মনে হল না কিছু বলছে? কী বলছিল?

‘সরো’!

ওহ্‌! কাজু বেটে দিচ্ছেন মশাই আপনি, কাজু বেটে দিচ্ছেন।

আপনি আবার পুব-দক্ষিণ গুলিয়ে ফেলছেন।

বাদ দিন। আচ্ছা, একটা কথা বলুন। এই যে নিজের মনে উড়ছেন, প্যাঁচ খেলার বিন্দুমাত্র আগ্রহ হচ্ছে না— এমন কেন? শুধুই অনুভূতি চটকে যাবে বলে?

আসলে কী জানেন, কেন জানি না মনে হত, তারও এই চেয়ে থাকায় একটা ভাললাগা মিশে আছে। আগ বাড়িয়ে এটাকে ছাপিয়ে কিছু করতে যাওয়া মানে এই মুহূর্তগুলোকে যেন ঠেলে সরিয়ে দেওয়া।

ভাল বললেন। চাল মশলার ঘ্রাণে ভিজে উঠছে।

আরও একটা ব্যাপার। কেন জানি না মনে হত, এই দূরত্বটুকুতে সে বেশ স্বচ্ছন্দ। আর তাকে অস্বস্তিতে ফেলে আমি কিছু করতে চাইনি কখনও। কে বলতে পারে, সেও হয়তো এমন ধরনেরই কিছু না-বলা মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করত! হতেও তো পারে?

এটা আরও ভাল বললেন। তার মানে এই আনন্দঘন দর্শনেই তৃপ্তি।

অদর্শনে যে খারাপ লাগত না, তা অবিশ্যি বলছিনে। আবার ধরুন না কেন, মাঝেমধ্যে আমিও লাঞ্চের সময় নীচে নামতাম না।

আবার অন্য দিকে হাঁটছেন।

কী জানি! মনে হত, আজ না-হয় থাক। খারাপ লাগবে, তবু থাক। ওকে একটু স্পেস দেওয়া দরকার। ওর যেন এ-সব কিছু কখনও একঘেয়ে না মনে হয়। আসলে আমি তখন কয়েকটা মুহূর্তে বেঁচে রয়েছি।

এবং এর পর কী, তা নিয়ে কিছু ভাবছেন না। মানে প্রণয় হয়ে পরিণয় জাতীয় কিছু? আপনার বয়স কত?

তিরিশের কোঠায়।

আপনি কি সামাজিক ভাবে হাতান্যাতা গোত্রীয় কেউ?

হাতা নই, ন্যাতা বলতে পারেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত সংসার। মফস্সলে বাড়ি। আহামরি স্টুডেন্ট ছিলাম না। আহামরি চাকরিও জোটেনি সেই জন্য। চাকরি করার উদ্দেশ্য, এরা ফ্যামিলি মেডিক্লেমটা দেয়। বাপ-মা বেঁচে। এলআইসি-তে টাকা জমাই, বুড়ো বয়সে খেয়ে-পরে বাঁচব বলে। আর প্রভিডেন্ট ফান্ড। বোন আছে। বিয়ে দিতে হবে।

খুব একটা উজ্জ্বল কিছু দেখতে পেলাম না। তবে পরিস্থিতিটা যে নিম্ন-মধ্যবিত্তের রোম্যান্সের সঙ্গে যায়, এ কথা স্বীকার করতেই হবে। তা, আপনি বিয়ে-থা করবেন না?

কোত্থেকে কোথায় চলে যাচ্ছেন?

ওইখান থেকে তো এইখানেই এসে পড়ার কথা।

বড় দান হয়ে যাচ্ছে না? দিন থেকে একেবারে রাত, রাত থেকে লাফ মেরে দিন। মাঝখানে গোধূলি বা ভোর বলে একটা ব্যাপার থাকে না?

তা তো থাকেই। বলতে গেলে বড় মোলায়েম সময় সেটি।

তাই তো বলছি। শুনুন তবে সেই গোধূলিতে কী হয়েছিল।

কিছু হয়েছিল নাকি? বলুন বলুন।

আপিস থেকে বেরিয়ে অটো করে বাসস্ট্যান্ড অবধি আসতাম রোজ। আমার বেরোনোর কোনও ফিক্সড টাইম ছিল না। তো সেদিন বেরিয়েছি। গোধূলির সময় ছিল। অটোর লম্বা লাইন। আমি লাস্ট। হঠাৎ দেখি সে আসছে। একা। অ্যাম্বিয়েন্সটা খেয়াল করুন। শেষ গোধূলির কনে দেখা আলোয় দেখলাম সে আসছে। আমি লাইনে লাস্ট। আমার ঠিক পিছনটাতে এসে তার দাঁড়ানোর কথা। আমি ভাবছি কী করি। তালু ঘামতে শুরু করেছে। শেষ মুহূর্তে কী হল কে জানে, একটু পিছিয়ে সামনে জায়গা করে দিলাম। সে এক বার থমকাল, আমার দিকে দেখল, তার পর আমার ঠিক সামনেটায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।

লাইন ছেড়ে জায়গা দিলাম সর্বনাশের আশায়!

লাইন আস্তে আস্তে এগোচ্ছে।

সেদ্ধ হচ্ছে। আঁচটা একটু কমান।

আর মশাই আঁচ। আমি তখন পুড়ে কাঠ। একেবারে সামনেটায় সে। সেদিন সেই গলার হারটা নেই। গ্রীবার অহঙ্কার আমার চোখের সামনে। লাইন এগোচ্ছে। মুহূর্ত, এই প্রথম বার, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

তার পর?

কপালও মাইরি খুলেছিল সেদিন। কেন যে শালা লটারির টিকিট কাটলাম না একটা! ভাবুন এক বার, সামনে থেকে শুরু করে আমি অবধি পৌঁছে অটো ভরে গেল। মানেটা ধরতে পারলেন?

এক অটোয়?

পাশাপাশি। ওঠার আগে তার দিকে তাকাতে সে চোখ নামিয়ে একটু সরে দাঁড়াল। বুঝলাম, ধারে বসতে চায়। আমি উঠে ঢুকে পড়লাম ভিতরে। সে বসল আমার পাশটাতে। তার পর মশাই, সেই অটো, বাঁ পাশে চাপাচাপি করে সে —আর সেই হাওয়া। তার ওড়নাটা থেকে থেকেই উড়ে আমার মুখ-চোখে এসে পড়ছে।

ওহে নটবর, সরো হে সরো...ছি ছি কী করো, বসন ধরো...

ডান পাশে এক ভদ্রমহিলা বসেছিলেন। আহ্লাদে তাকেই দু’বার, ‘মাসিমা, অসুবিধে হচ্ছে না তো!’, ‘মাসিমা, অসুবিধে হচ্ছে না তো!’ বলে ফেললাম।

সাবধানে! ছানা কেটে না যায়।

বাঁ পাশে সে। বাঁ হাতে চুড়ি, ডান হাতে ঘড়ি। ডার্ক শেডের নেলপালিশ। হাতদুটো কোলের উপর রাখা। মোবাইলের কভারটা গোলাপি রঙের। আমি পাশ থেকে তার কানের দুলটার দিকে তাকিয়ে আছি জেনেও সে বাইরের দিকে তাকিয়ে। আমি না দেখতে পেলেও জানি, তখন তার মুখ জুড়ে একটা প্রশান্তি ছড়িয়ে ছিল!

থামবেন না। ঢাকনাটা সরিয়ে একটু জল দিন।

ক্লাইম্যাক্স এখনও বাকি।

বলেন কী?

এতটা সময় এক সঙ্গে এই প্রথম। এই যে দীর্ঘতম মুহূর্ত, এই যে সময় কাটানো এক সঙ্গে, এটা মশাই লাখ টাকার। যদিও সব কিছুরই শেষ আছে। ঘাটের মড়া অটো ঠিক স্টেশনে পৌঁছেও গেল।

তার পর?

সে নামল। ব্যাগ থেকে টাকা বার করে অটোওয়ালাকে দিয়ে বলল, ‘দুটো।’ তার পর চলে গেল। ভাবুন এক বার। আমি তাও কিছু বলতে পারলাম না।

...

কী মশাই? কিছু বলবেন না?

এর পরও আপনি এগোতে ভরসা পাচ্ছেন না? চিনিটাও তো ছড়িয়ে দিল সে।

এর পরই তো আসল কথা।

আবার কী?

গতকাল লাঞ্চের সময় যথারীতি তার সঙ্গে দেখা। আজ আমি ঠিক করেই রেখেছিলাম। পথে নামলাম। রাস্তা পার হচ্ছি। সে আমার দিকে ঠায় তাকিয়ে। আমাকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে শেষে উল্টো দিকে ফিরে একটা দোকানে ঝুরিভাজার প্যাকেট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগল। আমি গিয়ে একটা সিগারেট চাইলাম। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। ভাবছি কী ভাবে শুরু করি। হঠাৎ সে তার পাশে দাঁড়ানো কোলিগটিকে বলে উঠল, “শোন, কাল দেড়টার সময় এই পার্কের ঈশান কোণের বেঞ্চটাতে আমার জন্য অপেক্ষা করবি।”

...

বুঝলেন কিছু?

...

কী মশাই, চুপ মেরে গেলেন যে।

মোক্ষম! দমে বসানো হয়ে গেল। এ বার বিশ্রাম।

বলছেন?

আলবাত! তো আজ দেড়টায় গেলেন পার্কে?

...

কী? গেছিলেন তো?

...

কী হল? ও মশাই!

না।

না? না মানে?

...

কী হল মশাই? গেলেন না?

না।

সে কী! কিন্তু কেন?

...

ওই দেখো, এ বার যে আপনি চুপ মেরে গেলেন...

আপনি একটু আগে বললেন না, বাসন্তী পোলাওয়ের রান্নাটা তপস্যা, খেলে মোক্ষ!

বটেই তো!

...

কী হল, আপনি হাসছেন যে! আরে! বলুন কিছু।

আমায় তপস্বী হয়েই আরাধনা করতে দিন। মোক্ষে আমার রুচি নেই। শোনেননি, ‘...মোক্ষে কী আছে বল/ জলেতে মিশায় জল।’

কী বলছেন বলুন তো!

মিশে গেলে আর কী বাকি থাকে, বলুন। তাই বলছিলাম আর কী...

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Short Story Short story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy