E-Paper

যত ড্রোন চলেছে সমরে

মণিপুরে চলতে থাকা সংঘর্ষেই দেশে প্রথম ড্রোন থেকে বোমা ফেলার ঘটনাটি ঘটেছে। গত দু’বছর ধরেই মায়ানমারে চলতে থাকা সংগ্রামে ভারতীয় সেনার লড়াই প্রথাগত রাইফেল-আরপিজির যুদ্ধ থেকে অনেকটা সরে এসেছে। ক্রমশ তার জায়গা নিয়েছে ড্রোন, স্যাটেলাইট।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ ০৯:৩১
যুদ্ধকালীন: ম্যাথু ভানডাইক (মাঝে) ও তার ‘সলি’ দলের কয়েক জন সদস্য।

যুদ্ধকালীন: ম্যাথু ভানডাইক (মাঝে) ও তার ‘সলি’ দলের কয়েক জন সদস্য। ডান দিকে, ড্রোন নিয়ে মহড়ারত ভারতীয় সেনারা

ঘটনা ১: ড্রোনে লাগানো ক্যামেরা থেকে হাতের মোবাইলে আসছে লাইভ ফিড। বিপক্ষের গ্রামের উপরে পৌঁছে ড্রোনের পেটে বাঁধা মর্টার শেলের লক খুলে গেল। ১০-১২ সেকেন্ড লাগল নীচের বাড়িগুলোর উপরে শেল আছড়ে পড়তে। ড্রোনের ক্যামেরাতেই দেখা গেল ছোট্ট মাশরুম ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ভিডিয়োয় স্পষ্ট ধরা পড়ে ড্রোনচালক আর তার সঙ্গীদের উল্লাস।

ঘটনা ২: বেশ কয়েকটা সামরিক ড্রোন সীমান্তের ও-পারে উড়ে গেল। ততক্ষণে ও-পারে জঙ্গি শিবিরের অবস্থান ও ছবি সার্ভেল্যান্স ড্রোনের দৌলতে ডেটাবেসে উঠে গিয়েছে। নিখুঁত লক্ষ্যে জঙ্গি শিবিরের উপরে আছড়ে পড়ে বোমা।

ঘটনা ৩: মণিপুরের সুপরিচিত কিশোরী পরিবেশকর্মী সামাজিক মাধ্যমে বিশ্বজোড়া আবেদন রাখলেন, লড়াই করতে অনেক ড্রোন প্রয়োজন। টাকা চাই। বিভিন্ন স্থান থেকে জমা পড়ল টাকা। শতাধিক ড্রোন কেনা হল।

ঘটনা ৪: পাহাড়ের ও-পার থেকে এ-পার থেকে উড়ছে ড্রোন, পড়ছে বোমা। নজিরবিহীন পরিস্থিতি সামলাতে, সীমান্তে নয়, দেশের ভিতরেই সেনা, আধা-সেনাকে ড্রোন মোকাবিলা করার বন্দুক কিনতে হল।

ঘটনা ৫: কলকাতা বিমানবন্দর থেকে ধরা পড়ল আমেরিকান নাগরিক ম্যাথু ভ্যানডাইক। প্রায় একই সময় লখনউতে তিন জন এবং দিল্লিতে আরও তিন জন ইউক্রেনের নাগরিককে গ্রেফতার করা হল। নাম হুরবা পেত্রো, স্লিভিয়াক তারাস, ইভান সুকমানোভস্কি, স্টেফানকিভ মারিয়ান, হনচারুক ম্যাক্সিম এবং কামিনস্কি ভিক্টর।

ঘটনা ৬: অগস্ট, ২০১৪। সাংবাদিক জেমস ফোলি ও স্টিভেন সটলফের শিরশ্ছেদের ভিডিয়ো আইসিস পাঠিয়ে দিল সংবাদমাধ্যমে।

আপাতদৃষ্টিতে শেষ ঘটনার সঙ্গে বাকিগুলোর মিল চোখে পড়ে না। কোথায় মণিপুর, কোথায় ইউক্রেন, কোথায় আইসিস, কোথায় মায়ানমার! কিন্তু পাসপোর্ট আইন ভেঙে বিদেশিদের উত্তর-পূর্ব সফরের আম মামলার তদন্তে উঠে এল চমকে দেওয়া তথ্য! জানা গেল, কলকাতা, গুয়াহাটি ও মিজ়োরামকে ব্যবহার করে বিদেশি ভাড়াটে সেনারা ভারতে আনাগোনা চালাচ্ছে। পড়শি মায়ানমারের বিদ্রোহী জঙ্গি গোষ্ঠীরা বিদেশি এই ভাড়াটে সেনাদের কাছ থেকে কিনছে ড্রোন, শিখছে ড্রোন যুদ্ধের কৌশল। সেই ড্রোনের লড়াই যেমন মায়ানমার সেনাকে পিছু হঠতে বাধ্য করেছে, তেমনই, ভারতীয় জঙ্গিরাও বর্মি জঙ্গিদের সৌজন্যে জেনে নিচ্ছে ড্রোনের লড়াইয়ের খুঁটিনাটি। পাচ্ছে ড্রোন আর বিদেশি অস্ত্র!

কী ভাবে? সেই গল্পে পরে আসছি।

অস্ত্রবাহী ড্রোনের ব্যবহার বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের চেহারা বদলে দিয়েছে। শক্তিশালী রাশিয়াকে দুর্বলতর ইউক্রেন যে এত দিন ঠেকিয়ে রেখেছে, তার পিছনে রয়েছে এই ড্রোনের দাপট। গত বছর অপারেশন সিঁদুরে ভারত ও পাকিস্তান প্রথম বার ব্যাপক ভাবে ড্রোন ব্যবহার করল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে মণিপুরের সংঘর্ষে ব্যাপক ভাবে ড্রোন থেকে বোমা ফেলার ঘটনা ঘটেছে, যা গোটা বিশ্বে নজিরবিহীন। এ বছর ৬ মে রাতে নাগা গ্রামের উপরে কুকি জঙ্গিদের সীমান্তপার থেকে বোমাবর্ষণেও কেরামতি দেখিয়েছে সেই বিদেশি ড্রোন। আর সেখানেই এ দেশের সেনা গোয়েন্দারা পশ্চিমি হাতের সন্ধান করছেন।

দেশের তিন বিমানবন্দরে ধরা পড়া আমেরিকান ও ইউক্রেনীয়দের ধরা পড়ায় সাধারণ ভাবে মনে হতে পারে যে, বিদেশি নাগরিকরা প্রতিবেশী মায়ানমারে বিদ্রোহী কার্যকলাপে সহায়তা করছিল। ভারতের সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পর্ক নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে মণিপুরে কুকি-মেইতেই সংঘাতের মধ্যে ঘটে যাওয়া ড্রোন বোমা হামলার ঘটনাগুলো। মণিপুর পুলিশ জানায়, কুকি জঙ্গিরা উচ্চপ্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করে রকেট-চালিত গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে গ্রামগুলিতে। দূরপাল্লার স্নাইপার রাইফেলের ব্যবহারে সেনা-পুলিশও অসহায় হয়ে পড়েছে। কারণ, রাস্তায় এসকর্ট-সেনা টহল থাকছে, কিন্তু তবুও দূর পাহাড় থেকে ছুটে এসে গাড়িচালকদের বিদ্ধ করছে স্নাইপারের গুলি।

সেনা গোয়েন্দাদের দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে এই ধরনের সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার প্রায় অসম্ভব। কারণ আরপিজি শেল আকাশ থেকে নিক্ষেপের জন্য সম্পূর্ণ সামরিক মানের ড্রোন ও বিশেষজ্ঞের জ্ঞান প্রয়োজন। নিরাপত্তা সংস্থাগুলি তখনই এই হামলায় বিদেশি যোগসাজশের ইঙ্গিত দিয়েছিল। সেনার মত ছিল, ড্রোনের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটানোর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা থাকতে পারে। তদন্তের পর এনআইএ জানতে পারে, দিল্লি ও হরিয়ানা থেকে ড্রোনগুলি কেনা হয়েছিল। কিন্তু তাকে বোমা ফেলার উড়ন্ত যন্ত্রে রূপান্তরিত করার শিক্ষা সীমান্তের ও-পারের।

মায়ানমার দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সংঘর্ষে জর্জরিত। কিন্তু তাতেও তারা বিশ্বের মধ্যে দু’টি জিনিসে পয়লা সারিতে রয়েছে। সামরিক ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশ্বে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পরেই এখন মায়ানমার। আবার মায়ানমারের শান ও চিন রাজ্য বিশ্বের বৃহত্তম অবৈধ মাদক উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৩ সালে তালিবান আফগানিস্তানে পপি চাষ নিষিদ্ধ করার পর মায়ানমার বিশ্বের এক নম্বর অবৈধ আফিম উৎপাদক দেশেও পরিণত হয়েছে। মায়ানমার-মণিপুর করিডোর মাদক পাচারের হাইওয়ে। আফিম, হেরোইন, মেথামফেটামিন— সবই এই পথে ভারতে প্রবেশ করে। ২০২৫ সালের মধ্যে মায়ানমারে আফিম চাষ ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যার বড় অংশ ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় তৈরি হচ্ছে। মাদক ব্যবসায় আসছে টাকা এবং সেই টাকার বড় অংশ ব্যবহার হচ্ছে অস্ত্র ও সরঞ্জাম কিনতে।

এই অস্ত্র প্রশিক্ষণের প্রসঙ্গেই নাম জড়িয়েছে ভ্যানডাইকের। ঘটনা ৫-এ যার উল্লেখ ছিল।

ভ্যানডাইকের মাস্টার্স ডিগ্রি ছিল পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি। ডিগ্রি পাওয়ার পরে তিনি মোটরবাইকে সেই সব দেশ ঘুরতে রওনা হন। চষে বেড়ান মরক্কো, টিউনিজ়িয়া, লিবিয়া, মিশর, জর্ডন, সিরিয়া, আফগানিস্তান। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে অভিযানের খরচ চালাতে ভ্যানডাইক ইরাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়াতেন। পাশাপাশি ইরাকে আমেরিকান সেনার সঙ্গেও কাজ শুরু করেন। কাজ করেন যুদ্ধ-সংবাদদাতা হিসেবেও। ২০১০ সালে তিনি ইরাক থেকে ইরান হয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত ছ’মাসের একটি মোটরসাইকেল যাত্রা করেন। ২০১১ সালে গদ্দাফি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্বে দেন ভ্যানডাইকের কয়েক জন বন্ধু। তাঁদের ডাকে লিবিয়া গিয়ে ভ্যানডাইক নিজেও জড়িয়ে পড়েন লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে। যুদ্ধবন্দিও ছিলেন অনেক দিন। ২০১১ সালে লিবিয়ায় বিপ্লব চলাকালীন, জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ম্যাথু ভ্যানডাইকের সঙ্গে আমেরিকান সাংবাদিক জেমস ফোলি এবং স্টিভেন সটলফের বন্ধুত্ব হয়।

আইবি-র এক কর্তা জানান, ২০১৪ সালে আইসিস জেমস ফোলি ও সটলফের শিরশ্ছেদের দৃশ্য প্রচার করার পরেই ভ্যানডাইক ‘সন্স অব লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল’ বা ‘সলি’ প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থার প্রথম লক্ষ্য ছিল আইসিস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বাহিনীগুলিকে প্রশিক্ষণ প্রদান। পরে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে, এমন সব বাহিনীকে সামরিক প্রশিক্ষণ, কৌশলগত পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করাই ‘সলি’-র কাজ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, হাতে হাত মিলিয়ে যুদ্ধে করা তো বটেই, সেই সঙ্গে তুলনামূলক ভাবে পিছিয়ে পড়া বাহিনীকে আধুনিক রণকৌশল, সমরপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলার দায়িত্ব নেয় ‘সলি’। ভ্যানডাইকও সমর-সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন। তিনি নিজে যেমন একাধিক তথ্যচিত্র বানিয়েছেন, তাঁকে নিয়েও তথ্যচিত্র ও সিনেমা তৈরি হয়েছে। তাঁর বাহিনী নিয়ে বহু আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র, ম্যাগাজ়িনে খবর বেরিয়েছে। তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবেও কাজ করছেন।

আমেরিকা ‘সলি’কে প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় দেয়নি। আবার কোনও বাধাও দেয়নি। কিন্তু সেনা গোয়েন্দারা দাবি করছেন, ভ্যানডাইকের কর্মকাণ্ডের পিছনে আমেরিকা তো বটেই, এমআই-৬ ও ন্যাটো গোষ্ঠীর এজেন্সিগুলিরও প্রত্যক্ষ মদত ছিল। রাশিয়ার সঙ্গে যে দেশই বন্ধুত্ব করতে চায়, তাদেরই দুর্বল করতে সচেষ্ট ওই চক্র। তাই তাদের নজর এখন ভারতীয় উপমহাদেশে।

২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইরাকে আইসিস-এর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল ভ্যানডাইকের বাহিনী। ২০১৬ সালে ‘সলি’ আসিরীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়। ২০১৮ সালে ফিলিপাইন্সের একটি সন্ত্রাস-দমন বাহিনীকে প্রশিক্ষিত করে। ২০১৯ সাল থেকে ভেনেজ়ুয়েলার বিদ্রোহীদের সঙ্গে মিলে ‘সলি’ বাহিনী নিকোলাস মাদুরোর শাসনব্যবস্থা উৎখাত করতে অভিযান চালাচ্ছিল। ২০২২-এর মার্চে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের সূচনা থেকেই ‘সলি’ ইউক্রেন সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং রসদ সরবরাহ করা শুরু করে। ২০২৩ সালে তারা ‘মাইন অপসারণ কর্মসূচি’ হাতে নেয় এবং ২০২৪ সালে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও কৌশল তৈরির কাজ শুরু করে।

উত্তর মায়ানমারের কাচিন বাহিনীকে সামরিক কৌশল শেখাতে যাওয়াই কাল হল ভ্যানডাইকের। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে যখন তাঁকে ধরা হয়েছিল, তখনও জানা ছিল না, কলকাতা ও গুয়াহাটিকে ব্যবহার করে বিদেশি ভাড়াটে সেনারা ভারতে আনাগোনা চালাচ্ছে। আমেরিকান ও ইউক্রেনের বন্দিদের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থা জেরা চালাচ্ছে। তা থেকেই জানা গিয়েছে, মায়ানমারের কাচিন জঙ্গি বাহিনী প্রচুর টাকা খরচ করে বিদেশি ভাড়াটে সৈনিকদের নিয়ে এসে রণকৌশল শিখছে। বিশেষ করে শিখছে আধুনিক ড্রোন যুদ্ধের কলাকৌশল। এনআইএ-সূত্রে খবর, আরও অন্তত ৭-৮ জন বিদেশি অসম থেকে গা-ঢাকা দিয়েছে। যদিও বিদেশিরা ভারতের মাটিতে কোনও কাজ করেছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

কিন্তু মায়ানমারে কেন প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ইউক্রেনের সৈন্যরা?

সেনা গোয়েন্দাদের মতে, গত দু’বছর ধরেই মায়ানমারে চলতে থাকা সংগ্রাম ও সেখানে ঘাঁটি গাড়া জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনার লড়াই প্রথাগত রাইফেল-আরপিজির যুদ্ধ থেকে অনেকটা সরে এসেছে। তার জায়গা নিয়েছে ড্রোন, স্যাটেলাইট। আইবি-সূত্রে বলা হয়, মায়ানমারের সেনার সঙ্গে বর্মার জঙ্গি ও পিডিএফ বাহিনী যুদ্ধ চালাতে গিয়ে বুঝেছিল, নিছক গেরিলা যুদ্ধে সরকারি বাহিনীকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সামরিক ড্রোন জনপ্রিয় হয় বর্মি জঙ্গিদের কাছে। এই ড্রোনের জোরেই তারা সরকারি সেনাকে টক্কর দিচ্ছে এত দিন ধরে। এমনকি সামরিক বাহিনীর যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারের মোকাবিলা করতে মায়ানমারের প্রতিরোধ-গোষ্ঠীগুলি— বিশেষ করে কেএনডিএফ স্থানীয়ভাবে পরিবর্তিত, থ্রি-ডি প্রিন্টেড ‘ড্রপ-বোমা’ বহনে সক্ষম বাণিজ্যিক ড্রোনও ব্যবহার করছে! বলা হয়, খ্রিস্টানবাহিনীর পক্ষ নিয়ে লড়াই চালানোও ছিল ‘সলি’ ও তার মদতদাতাদের প্রচ্ছন্ন এজেন্ডা। সেই সূত্র ধরেই সম্ভবত মায়ানমারের কাচিন প্রদেশে কাজ শুরু করেন ভ্যানডাইক। কারণ, কাচিনদের ৯৫ শতাংশই খ্রিস্টান। মনে রাখতে হবে, মণিপুরের কুকিরাও কিন্তু ‘পৃথক কুকিল্যান্ড’, অন্যথায় ‘বৃহত্তর মিজ়োরাম’ গঠনের দাবিতে সরব। আবার মিজ়োরামের মুখ্যমন্ত্রী লালডুহোমা আমেরিকায় গিয়ে মণিপুর, মায়ানমার, মিজ়োরাম, বাংলাদেশের সব কুকি-জ়ো এলাকা মিলিয়ে ‘পৃথক খ্রিস্টান দেশ’ গঠনের দাবি জানিয়ে এসেছেন।

মণিপুরে চলতে থাকা সংঘর্ষেই দেশে প্রথম ড্রোন থেকে বোমা ফেলার ঘটনা ঘটেছে। বোঝা গিয়েছে, মায়ানমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা মেইতেই ও কুকি উভয় পক্ষের জঙ্গিরা আগে থেকেই ড্রোনযুদ্ধের কৌশলে হাত পাকাচ্ছিল, যে কৌশলে ভারতীয় সেনা এখন জোর দিচ্ছে। গত বছর থেকে উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন সেক্টরে বার বার ড্রোন-যুদ্ধকৌশলের মহড়া চালানো হচ্ছে। বারকয়েক সীমান্তের ও-পারে ড্রোন হামলা করেছে ভারতীয় বাহিনী। কাঙ্ক্ষিত ফলও মিলেছে।

ধৃতদের জেরা করা এক তদন্তকারী বলেন, “ভাড়াটে সেনা বলা হলেও ধৃত ইউক্রেনীয়রা আদতে আমাদের আইটি-তে চাকরি করা মেধাবী যুবকদের মতোই। তাঁরা চশমা এঁটে, কম্পিউটার ও ড্রোনে যুদ্ধ জয়ের কৌশল বানায়। এদের মধ্যে তিন জন গুয়াহাটি এসে তিনটি হোটেলে চার দিন কাটিয়ে গিয়েছে। গুয়াহাটি থেকে তাঁরা সড়কপথে মিজ়োরামে যায় এবং সেখান থেকে সীমান্তের দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে মায়ানমারে প্রবেশ করে।”

জিজ্ঞাসাবাদে ধৃতরা স্বীকার করেছেন, তাঁরা কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি-র সদস্যদের জন্য বিদেশ থেকে শক্তিশালী ড্রোন এনে দেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক ড্রোন-যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। কিন্তু মিজ়োরাম হয়ে বিনা অনুমতিতে মায়ানমার যাওয়ার আগে, গুয়াহাটিতে তারা কী করেছেন, কোথায় গিয়েছেন তা এখনও জানা যায়নি। গোয়েন্দারা নিশ্চিত, তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েক জন বিদেশি ছিল, যাঁদের ধরা যায়নি। আইবি-র সন্দেহ, ইউক্রেনের ওই ভাড়াটে সেনাদের উপরে রুশ গোয়েন্দারাও নজর রাখছিলেন। সম্ভবত তাঁদের কাছ থেকে আসা খবরের সূত্রেই ওই পাঁচ জনকে ধরা হয়।

সেনা গোয়েন্দা-সূত্রে জানানো হয়, ধৃত মারিয়ান ইউক্রেনের অন্তর্ঘাত ও গোয়েন্দা শাখা জিইউআর-এর এজেন্ট। কোড নেম ‘ফক্স’। তিনি সামরিক নজরদারি ড্রোন বিশেষজ্ঞ। ক্রিমিয়ায় যুদ্ধও করেছেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি তারাক সিলিয়াক ইউক্রেন সেনার এয়ারবোর্ন অ্যাসল্ট গ্যালিসিয়ান ব্রিগেডের মেডেলপ্রাপ্ত স্পেশ্যাল এজেন্ট। ইভান ইউক্রেন বাহিনীর রেডিয়ো-টেকনিক্যাল ব্যাটেলিয়নের সদস্য। চতুর্থ ম্যাক্সিম ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ। তিনি নাবালকদেরও সামরিক প্রশিক্ষণ দিতেন। এঁদের আরও এক সাধারণ পরিচয় হল, সকলেই নাৎসিবাদের প্রকাশ্য সমর্থক।

ধরা পড়ার পরেই আমেরিকা ও ইউক্রেন জানিয়ে দিয়েছে, এদের সঙ্গে তাদের সরকার বা সামরিক বাহিনীর কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড, লক্ষ লক্ষ ডলারের ড্রোন, সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে মায়ানমারে জঙ্গি ও সরকারবিরোধী বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে। মিজ়োরাম থেকে ২০২৪ সালেই ধরা পড়েছিলেন ব্রিটিশ সেনা-এজেন্ট আলেকজ়ান্ডার গ্রান্ট ও ড্যান নিওয়ে। তাঁরাও মায়ানমারে বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণের কাজে গিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী লালডুহোমা মেনে নিয়েছেন, গত দুই বছরে আমেরিকান ও ব্রিটিশ বিদেশি ভাড়াটে সেনারা প্রচুর সংখ্যায় মিজ়োরাম সীমান্ত ব্যবহার করে মায়ানমারে গিয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালের জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যেই হাজার দুয়েক বিদেশি সেনা মায়ানমার গিয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, ছয় জনের ধরা পড়াটা হল হিমশৈলের চূড়া। কিন্তু বৈদেশিক সম্পর্কের সংবেদনশীল অবস্থায় ভারত আপাতত ধৃত ‘ধুরন্ধর’দের কাছ থেকে যত বেশি সম্ভব খবর বার করার চেষ্টা করলেও, তাঁদের পরিচয় নিয়ে আমেরিকা, ইউক্রেন, ব্রিটেনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাচ্ছে না।

এই গোটা পর্ব দেখিয়ে দিল, বর্তমান জঙ্গি কার্যকলাপ তার গতানুগতিক ধারা থেকে কতটা সরে এসেছে। দেখিয়ে দিল, ড্রোন-যুদ্ধের সামনে এখন কতটা অসহায় প্রথাগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দেখিয়ে দিল, পশ্চিমি শক্তি কী ভাবে সরাসরি প্রাচ্যের রণক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে। সেনাকর্তারা মানতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁরাও এই ধরনের হামলা সামলাতে পুরোপুরি প্রস্তুত নন। ‘আসাম রাইফেলস’ মণিপুরে কুকি ও মেইতেই উভয় পক্ষের ড্রোন-যুদ্ধ সামলাতে ‘ড্রোনম’ নামে দেশীয় ড্রোন-ধ্বংসী বন্দুক কিনেছে। মণিপুরের লেইমাখং মিলিটারি স্টেশনে সেনারা রেড শিল্ড ডিভিশন ড্রোন ল্যাব বসিয়ে ফেলেছে এবং সেখানে দেশীয় প্রযুক্তিতে ড্রোন সংযোজন, মেরামত এবং ড্রোন-যুদ্ধ সংক্রান্ত বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়াও চলছে। অবশ্য পরিকল্পিত ড্রোন-যুদ্ধ এক জিনিস, কিন্তু সীমান্তের ও-পার থেকে জঙ্গিরা কখন এ-পারে ড্রোন হামলা চালাবে, সেই আশঙ্কায় উত্তর-পূর্বের সীমান্তে ড্রোন-বিধ্বংসী পরিকাঠামো মোতায়েন করার মতো পরিস্থিতি হয়েছে এখন। সে ক্ষেত্রে ‘বেল’, ‘ভার্গবাস্ত্র’, ‘ইন্দ্রজাল’ বা ‘দুর্গা’র মতো ড্রোন-রোধী প্রযুক্তিকে এখন পশ্চিম সীমান্তের পাশাপাশি মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচলের সীমান্তেও নিয়ে আসতে হবে, যা সময় ও বাজেটসাপেক্ষ বিষয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Manipur Myanmar

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy