Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৭ নভেম্বর ২০২১ ই-পেপার

রবিবাসরীয় ম্যাগাজিন

২৬ জুন ২০১৬ ০০:২৬

আরও আম

পিনাকী ভট্টাচার্য

Advertisement

১২৪ কিসিমের আমের রকম পাওয়া গেল শুধু মুর্শিদাবাদেই! মুর্শিদকুলি খান ১৭০২ সালে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী সরিয়ে এনে, সেখানে অনেক আমের বাগান বানান। গাছের কলম নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে সংকর জাতির আমও তৈরি করেন। তাদের নামগুলো খাসা। নবাবপসন্দ, মিরজাপসন্দ, রানিপসন্দ, সারেঙ্গা, কালাসুর, এমন কত কী! তার আগে বাংলার আম-ভালবাসা নিয়ে লিখেছেন বিজয়গুপ্ত। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে। কিন্তু মুসলিম শাসকদের, বিশেষত মুঘলদের আম-পাগলামির কাছে বাকি সব নস্যি।

ইসলামধর্মী শাসকদের মধ্যে প্রথম আম-প্রেমী ছিলেন আলাউদ্দিন খিলজি। প্রতি বছর তাঁর দুর্গে এক আমের ভোজের ব্যবস্থা করতেন। সেখানে আম দিয়ে তৈরি পদ ছাড়া অন্য কিছু থাকত না। আর মুঘলরা তো আমের জন্য জান বাজি রাখত। বাবর মেবারের রানার সঙ্গে যুদ্ধ লড়েছিলেন আমের প্রেমে পড়েছিলেন বলে! দৌলত খান লোদি সাম্রাজ্যের অংশ আর যুদ্ধের অংশীদার হওয়ার আশ্বাস দিলেও, বাবর ভয়ে রানা সঙ্গার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাননি। রানার মহা বিক্রমী যুদ্ধবাজের খ্যাতি ছিল যে! বাবর ঠিক করেছিলেন প্রাণ আর মান হারানোর চেয়ে দেশে ফিরে যাওয়াটাই ভাল। দৌলত খান লোদি তখন তাঁর ব্রহ্মাস্ত্র বার করেন। বাবরকে আম খাইয়ে দেন। বাবর তো আত্মহারা। এই ফলের উৎসভূমি জয়ের জন্যে জান লড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। তার পর মেবারের পরম প্রতাপশালী রানাকে যুদ্ধে হারিয়ে এ দেশে নিজের মৌরসিপাট্টা কায়েম করেন। সঙ্গে কায়েম হয় বংশানুক্রমে মুঘল সম্রাটদের আম-প্রীতিও। হুমায়ুন যখন শের শাহের কাছে তাড়া খেয়ে ভারতবর্ষ ছেড়ে কাবুলের পথে দৌড়চ্ছেন, কখনও কখনও সম্রাটের কর্তব্যও ভুলে গিয়েছেন, কিন্তু মরশুম এলে, রানারের মারফত তাঁর কাছে যাতে নিয়মিত ভাল জাতের যথেষ্ট পরিমাণ আম পৌঁছয়, সে ব্যবস্থা করতে ভোলেননি। দ্বারভাঙার কাছে আকবরের একলাখি বাগের কথা তো আগেই হয়েছে। আম দিয়ে নতুন উপাদেয় খাবার বানালে, জাহাঙ্গির তাঁর খানসামাদের পুরস্কার দিতেন। নূরজাহান আম আর গোলাপজল দিয়ে অনবদ্য সব সুরা তৈরি করতেন। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন শাহজাহান। তিনি আমের জন্য ছেলেকে গৃহবন্দি করেছিলেন। শাহজাহানের সবচেয়ে প্রিয় ছিল বুরহানপুরের আম। তা আসত ঔরঙ্গজেবের শাসনাধীন দাক্ষিণাত্য থেকে। ঔরঙ্গজেব সে বছর নিজের বাবাকে সেই আম না পাঠিয়ে নিজে খাবেন বলে তুলে রেখেছিলেন। ঔরঙ্গজেবের তাঁর বাবার সঙ্গে মনোমালিন্যের অনেক কারণের মধ্যে বুরহানপুরের আমও পড়ে! বাবার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করার আগে, পারস্যের শাহ্‌ আব্বাসকে সঙ্গী পেতে, ঔরঙ্গজেব তাঁকে ভেট পাঠান বুরহানপুরের আম!

শেষ পাতে মহাকপি জাতকের গল্প। কাশীর কাছে গঙ্গার পাশে মস্ত এক আমগাছ। তাতে অনেক অনুচরের সঙ্গে থাকতেন বোধিসত্ত্ব মহাকপি। সে গাছের আম বড় সুস্বাদু। সে কথা সাধারণ লোক জানত না। কারণ, সব আমই মহাকপির অনুচর বাঁদররা খেয়ে নিত। মহাকপির নির্দেশ ছিল, একটা আমও যেন জলে না পড়ে। সেটা কারুর হাতে গেলে আমগাছটা আর বাঁদরদের দখলে থাকবে না। কিন্তু অসাবধানতায় একটা আম গঙ্গায় পড়ে যায়। ভাসতে ভাসতে পৌঁছয় কাশীর গঙ্গার ঘাটে, পড়বি তো পড় স্নানরত রাজারই হাতে। রাজা আম খেয়ে মজে গেলেন। এত ভাল আম আগে তো খাননি! হুকুম দিলেন, আমগাছটা খুঁজে বার করো। সৈন্যদল গঙ্গার পাড় ঘেঁষে চলল সেই গাছের সন্ধানে। মহাকপি জানতে পেরে গঙ্গার অন্য পাড়ে যাওয়ার জন্য এক সাঁকো বানানোর চেষ্টা করলেন। এক প্রান্ত নিজে ধরে রইলেন আর অন্যদের বললেন, তাঁর পিঠে চড়ে গাছের ডাল ধরার চেষ্টা করতে। শেষে ছিলেন দেবদত্ত। তিনি গাছের ডালের নাগাল পেয়েই জোরে পদাঘাত করলেন মহাকপিকে। কোমর ভেঙে গিয়ে মহাকপি আর গঙ্গার ও-পারে যেতে পারলেন না। তাঁকে রাজার সামনে নিয়ে এলে মৃত্যুপথযাত্রী মহাকপি জানালেন, তিনি তাঁর প্রজাদের প্রাণ রক্ষা করে রাজধর্ম পালন করেছেন, তাই মৃত্যুতে তাঁর কোনও দুঃখ নেই। তার পর তিনি বিনীত ভাবে রাজাকে প্রশ্ন করলেন, ‘মহারাজ, আপনার তো সবই আছে। এইটুকু না পেলে কি কিছু অসম্পূর্ণ থাকত?’

মহাকপি জাতকের এই প্রশ্নের উত্তর আজও আমরা সকলে মিলে খুঁজে চলেছি ।

pinakee.bhattacharya@gmail.com

হাতির পিঠে চেপেও ট্যুরে গিয়েছি

প্রা য় ষাট বছর আগে এক হস্তরেখাবিদ বন্ধু বলেছিলেন, আমার ভাগ্যে চাকরির সম্ভাবনা নেই। বন্ধুর ভবিষ্যদ্বাণীকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই কি না মনে নেই, চাকরির সন্ধানে হাজির হয়েছিলাম একেবারে মহাকরণে। দোতলায় হোম পাবলিসিটির অফিসে। কী আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারভিউ, আর নিয়োগপত্রও! চার মাসের অস্থায়ী সরকারি চাকরি। যেতে হবে ডুয়ার্সে, তিন দিনের মধ্যে। হেডকোয়ার্টার্স জলপাইগুড়ি। জানা গেল, আমার আগে আরও চার জন নিয়োগপত্র হাতে নিয়েও পরে ডুয়ার্সে রিপোর্ট করেনি।



১৯৫৬ সাল। নানা দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে রওনা দিলাম। রাত্রে নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস গঙ্গার পারে থামল। স্টিমারে গঙ্গা পারাপার। আবার ট্রেন। অজানা ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে আছি। সকালে শিলিগুড়িতে ট্রেন বদলে জলপাইগুড়ি। স্টেশনের কাছেই ‘হিন্দু নিবাস’ হোটেলে উঠে, বিকেলে ‘এস. ডি. পাব’-এর অফিসে রিপোর্ট করেছিলাম। অফিসার, সুভাষচন্দ্র বিশ্বাসকে খুব পছন্দ হল। আমার বয়স অনুমান করে বললেন, বড্ড ধকলের চাকরি, পারবেন তো? হেসে সম্মতি জানাতে পিঠে হাত রেখে অভয় দিলেন। রাতে হিন্দু নিবাসে চৌকিতে বসে মজাসে ডিনার খাওয়া হল। সুভাষদা পরে হাকিমপাড়ায় ‘ফ্রেন্ডস লজ’ নামের মেসে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।

আমাদের কাজ ছিল ডুয়ার্সের গ্রামগঞ্জের সরকারি ওয়েলফেয়ার সেন্টারে, চা-বাগানের ক্লাবে ও আদিবাসীদের পল্লিমঙ্গল কেন্দ্রে ব্যাটারি-চালিত রেডিয়ো স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা। তখন রেডিয়োই ছিল সরকারের মুখ। পাবলিসিটি ভ্যানে সিনেমা আর সংবাদ দেখানো হত।

প্রথম ট্যুর ছিল ময়নাগুড়ি। বিশাল নদী তিস্তা। নদীর বুক জুড়ে বিরাট বিরাট চর। সরকারি নৌকোয় করে সেই চরে যেতে হবে। হাঁটাপথে মাইলখানেক কাশবন পেরিয়ে ফের নৌকো, তার পর ও-পারে ময়নাগুড়ি।

আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তিস্তার চরে। দু’খানা হুডবিহীন মোটরগাড়ি। এরাই নাকি ‘চরের ট্যাক্সি’। বসে, নীচে তাকিয়ে দেখি, ঘাস, কাদা, বালি দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভার দড়ি দিয়ে কষে গাড়ির দরজা বাঁধতে বাঁধতে বললেন, ‘ব্রেক নাই। ভয়ও নাই। স্টার্ট বন্ধ হলেই ব্রেক।’ গিয়ার চেঞ্জ হচ্ছে তারের সাহায্যে। পথে ট্যাক্সির তলা দিয়ে অনবরত জলকাদা ছিটকে ছিটকে যাত্রীদের পায়ে লাগছে। ময়নাগুড়িতে দ্রুত কাজ সেরে ফিরে এলাম জলপাইগুড়ি। সূর্যাস্তের পরে সরকারি নৌকো বন্ধ হয়ে যায়। সুভাষদা সব শুনে বললেন, দাঁড়াও, এ তো সবে শুরু!

এমনই এক বার ট্যুরে গিয়ে খরস্রোতা নদী হেঁটে পার হয়েছি। বাটার কনসাল জুতো, প্যান্ট, সব মাথায়। কম জলে নৌকো অচল, আবার পাহাড়ে বৃষ্টি হলেও পারাপার বন্ধ। আর এক বার একাই ইন্সপেকশনে যাচ্ছি, পথে পড়ল ভরা নদী। স্রোতের বিপরীতে, মাঝি প্রায় দু’মাইল গুণ টেনে পৌঁছে দিয়েছিল!

মনে আছে, রাজাভাতখাওয়া স্টেশন থেকে কম করে পাঁচ মাইল হাতির পিঠে চড়ে সরকারি কাজে গিয়েছিলাম, জমিদারবাড়িতে। খড়ের গদিতে বসে শরীরে এমন টুইস্ট হয়েছিল, জলপাইগুড়ি ফিরে এক দিন ছুটিতে ছিলাম। সে বার কাজ সেরে পর দিন হাতির পিঠেই বাসরাস্তায় পৌঁছেছি। পথে নদী পেরোতে হয়েছিল। মাঝনদীতে হাতি-মহাশয়া শুঁড়ে জল টেনে পিঠ ধুয়ে দিলেন— নিজের, আমারও। আবার পাড়ে উঠে শুঁড় দিয়ে বালি স্প্রে! আমার তখন করুণ অবস্থা।

ভুটান পাহাড়ের গা ঘেঁষে হান্টাপাড়া চা-বাগান। মালিক এক লালমুখো সাহেব। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা এক অপূর্ব মনোরম স্থান। পাইপ মুখে সাহেবের কথাবার্তা দুর্বোধ্য। সরকারি চিঠি হাতে দিয়ে আমি তিন রকম ভাষায় কাজের কথা বুঝিয়েছিলাম। পরে চা আর থাকারও ব্যবস্থা হয়েছিল। কয়েক জন কলকাতার ছেলের সঙ্গে আলাপ হল, চা-বাগানেই কাজ করে। আমাকে পেয়ে ওরাও খুব খুশি।

ছবি: সুমিত্র বসাক

এক বার যাচ্ছি মেটেলি। ময়নাগুড়ি থেকে সারা দিনে একটাই বাস যাতায়াত করে। অতুলনীয় সুন্দর পরিবেশ, লাটাগুড়ি রিজার্ভ ফরেস্ট। নিঃশব্দ অরণ্য। বিশাল বাগানের মাঝে লম্বা লম্বা গাছের গুঁড়ির ওপর চার দিকে বারান্দাওয়ালা কাঠের বাংলো। রাতে হিংস্র জীবজন্তু বাংলোর তলা দিয়ে দূরের ঝরনায় জল খেতে যায়। চৌকিদার সন্ধেয় ডিনার খাইয়ে, একটা হ্যারিকেন-ল্যাম্প জ্বালিয়ে রেখে নীচের গ্রামে চলে গেল। সাবধানবাণীও শুনিয়ে গেল, যেন রাতে ঘরের বাইরে না যাই, আর ঘরের জানলা যেন অবশ্যই বন্ধ রাখি। রাতে বিছানায় টর্চ আর লাঠি নিয়ে শুয়েছিলাম। ঘণ্টাখানেক বোধহয় ঘুমিয়েছি। দেখেছি, নিঃসীম অন্ধকারে জেগে আছে শুধু তারারা। দেওয়ালে মৃদু কাঁপুনির অনুভূতি হয়েছিল, পরে শুনলাম, ভালুক এসে নাকি বাংলোর গুঁড়িতে গা ঘষে!



ভোরে বেরিয়ে দেখি, বাংলোর এক ধারে গাছভর্তি লিচু, লালে লাল। চা, রুটি, লিচু দিয়ে ব্রেকফাস্ট হল। ফেরার পথে আর এক কাণ্ড। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই বাস মিস হয়। শেষ পর্যন্ত এক ট্রাকচালকের দয়ায় মালবোঝাই গাড়ির ছাদে দড়ি ধরে ময়নাগুড়ি ফিরলাম।

এক বার সুভাষদা আর আমি গরুর গাড়িতে করে ট্যুরে গিয়েছিলাম। শরীরের ধকলটুকু বাদ দিলে, ভারী মজা হয়েছিল। বেশ কিছু ক্ষণ সুভাষদাই ছিলেন গাড়োয়ানের ভূমিকায়। বনবাংলোতে পৌঁছে সুভাষদার ক্যাপস্টান মিক্সচার দিয়ে চুপিচুপি সিগার বানিয়ে ধূমপানের চেষ্টা করে সারাটা দিন নষ্ট করেছিলাম, মনে আছে।

মাসের শেষ সপ্তাহে হেডঅফিসেই নানা কাজ সারতাম। কোয়ার্টার্সের সঙ্গেই লাগোয়া অফিস। বড়বাবু ছিলেন ক্ষেত্রবাবু। জীবনের প্রথম মাইনে পেয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করেছিলাম ওঁকে। ফ্রেন্ডস লজ-এর স্থায়ী ম্যানেজার মাঝিবাবু, নেপালি রাঁধুনি পুষ্পরাজকে মনে পড়ে। ফুটবল প্লেয়ার মন্‌কা আর পাখি, ওঁরাও বোর্ডার ছিলেন। ছুটির দিনগুলো কেটে যেত ডুয়ার্সেরই গল্প শুনে। সবার বয়স কম, কিন্তু অভিজ্ঞতা অনেক।

তারে তারে এক দিন ‘টার্মিনেশন অর্ডার’ এসে হাজির। জলপাইগুড়িকে বিদায় জানিয়ে ফিরলাম। ডুয়ার্স তত দিনে আমাকে অনেক পরিণত, সাহসী করে তুলেছে।

শ্যামাপ্রসাদ সেনগুপ্তƒ বোড়াল, কলকাতা

যেখানেই কাজ করুন, ব্যাংক, রেস্তরাঁ, আইটি, অন্য কোথাও— আপনার অফিসের পরিবেশ পিএনপিসি

হুল্লোড় কোঁদল বস কলিগ ছাদ ক্যান্টিন— সব কিছু নিয়ে ৭০০ শব্দ লিখে পাঠান।
ঠিকানা: অফিসফিস, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০১

ফুল ফুটুক না ফুটুক, তিনি আছেন

পজ সাহা

সব সময়েই কোনও এক জন কবি ‘সেই সময়ের কবি’ হিসেবে পরিচিত, চিহ্নিত হয়ে যান সাধারণ মানুষের কাছে। আমরা যখন এখানে টেলিভিশন শুরু করি, প্রথম একক কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান করি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সুভাষদা পড়লেন, ‘ফুলগুলো সরিয়ে নাও/ আমার লাগছে।/ মালা/ জমে জমে পাহাড় হয়/ ফুল জমতে জমতে পাথর।’ এই কবিতাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর প্রিয় লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণের অনুষঙ্গ। একটি নির্ভার প্রেমের কবিতা শুনিয়েছিলেন, ‘মুখখানি যেন ভোরের শেফালি/ নেমে গেল এক্ষুনি।/ দু-অধরে চেপে চাঁদ একফালি/ নেমে গেল এক্ষুনি।’ বলেছিলেন, শুধু ‘সংগ্রামের ডাক আর চড়া গলার দাবি’ নিয়ে প্রগতিশীল কবিতা হয় না। বলেছিলেন, তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার বলে মনে করতেন তাঁর স্কুলের শিক্ষক কবি কালিদাস রায় তাঁকে নিজেই সাহিত্যকৃতির জন্য যে পুরস্কার দিয়েছিলেন, সেটিকেই। সাহিত্যে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল গদ্য দিয়ে। কিন্তু খবরের কাগজে প্রথম নাম বেরোয় ফুটবলে গোল করে! সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের টিমে ভাড়াটে খেলোয়াড় হয়ে ঘুরেছেন অনেক জায়গায়। তাঁর ছেলেবেলার বন্ধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কথাও শুনিয়েছিলেন। হেমন্ত তখন গল্প লেখেন আর শাঁখারিপাড়ায় কল্যাণ সংঘ পাঠাগারের সাহিত্য বিভাগের দায়িত্ব সামলান।



সুভাষদা নিজের বাজার করার প্রীতি নিয়ে গল্প করেছিলেন, বলেছিলেন, ‘বাজার হচ্ছে সাধারণ মানুষের মনের মুকুর।’ তাঁর মা যামিনী দেবীরও নিজের হাতে বাজার করার খুব শখ ছিল। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তেই যান না কেন, সময় পেলে সেখানকার বাজারে এক বার ঢুঁ মারবেনই। এক দিন সুভাষদার বাড়িতে ঢোকার মুখে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। একটা খালি প্যারাম্বুলেটর নিয়ে বেরোচ্ছেন। বললেন, ‘একটু বোসো, বাজার করে নিয়ে আসি।’ প্যারাম্বুলেটর নিয়ে! বললেন, ‘হ্যাঁ, বাচ্চারা বড় হয়ে গেছে, এটা তো এমনিই পড়ে থাকে, তাই কাজে লাগাচ্ছি।’ সুভাষদার স্ত্রী গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলতেন, ‘সুভাষের বাজার করা জানো না! বাজারে গিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে টাকা বের করতে গিয়ে বেরল মস্কো যাওয়ার সে দিনের প্লেনের টিকিট। সেখান থেকে বাজারের ব্যাগ নিয়েই প্লেনে উঠে সোজা মস্কো।’ সুভাষদা হেসে বলতেন, ‘গীতা একটু বাড়িয়ে বলে।’ খুব অন্য রকম দাম্পত্য জীবন ছিল তাঁদের। এক দিন সুভাষদার বাড়ি যেতেই গীতাদি জোরাজুরি করতে লাগলেন, রাতে তাঁদের সঙ্গে খেতে হবে। খাওয়ার টেবিলে দেখি অনেক আয়োজন। একই সঙ্গে চিংড়ি, ইলিশ। গীতাদি বললেন, ‘আমি চিংড়ি পছন্দ করি আর সুভাষ ইলিশ। আজ দুজনের পছন্দমতই রান্না হয়েছে।’ বললাম, আজ কি আপনাদের বিবাহবার্ষিকী? দুজনেই সলাজ হাসি হাসতে লাগলেন।

দূরদর্শনের প্রথম দিকে এক বার আন্দোলন হচ্ছে, ঠিক হয়েছে আমরা অনশনে বসব। সুভাষদাকে গিয়ে জানালাম। শুনে বললেন, ‘আমিও বসব তোমাদের সঙ্গে অনশনে। শুধু আগের দিন জোলাপ খেয়ে পেটটা পরিষ্কার করে নিতে হবে।’ মনে পড়েছিল, জেলে সুভাষদার একটানা সাতচল্লিশ দিন অনশনের অভিজ্ঞতা আছে।

এক বার আমাদের শারদ সাহিত্য অনুষ্ঠানে সুভাষদার অল্প বয়সের বন্ধু সন্তোষকুমার ঘোষ বললেন, এ বারের কয়েকটি শারদ সংখ্যায় সুভাষদার কবিতায় ছন্দের নিজস্ব নিপুণ ব্যবহারে তিনি মুগ্ধ। পাশে বসে-থাকা সুভাষদা খুব সরল ভাবে বললেন, ‘আমি তো অত ছন্দ-টন্দ বুঝি না, ছন্দ কখনও শিখিওনি। যেমন প্রাণ চায় তেমনি লিখি।’ সন্তোষদা খুনসুটি করে বললেন, ‘সুভাষ, এ-সব বললে হবে! প্রবোধচন্দ্র সেনের মতো ছান্দসিক যে তোমার ‘পদাতিক’ বইয়ের ছন্দ ব্যবহার দেখে বিস্মিত হয়ে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় এত কথা লিখেছেন!’ অপ্রস্তুত সুভাষদার মুখে ছড়িয়ে পড়ল শিশুর মতো সারল্যের হাসি।

আমাদের কোনও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে হলে, সুভাষদার সঙ্গে কখনও টেলিফোনে আলোচনা করতাম না। সোজা চলে যেতাম তাঁর ৫বি শরৎ ব্যানার্জি রোডের বাড়িতে। এক দিন গিয়ে দেখি, সুভাষদা খালি গায়ে মেঝেয় বসে ঘড়ি সারাচ্ছেন। ভীষণ গরম, কিন্তু ঘরে ফ্যান চলছে না। বললেন, ‘এত লোডশেডিং হয়, তাই যখন কারেন্ট থাকে তখনও মাঝে মাঝেই ফ্যান বন্ধ রেখে শরীরটাকে সইয়ে রাখি। একটু বোসো, ঘড়িটা সারিয়ে নিই। তোমাদের কোনও ঘড়ি বা টেবিল-ল্যাম্প খারাপ থাকলে আমাকে দিয়ো, সারিয়ে দেব।’ গীতাদি শুনতে পেয়ে বললেন, ‘কক্ষনও ঘড়ি-টড়ি সুভাষকে দেবে না, আরও খারাপ করে দেবে।’ এক দিন বাড়িতে যেতেই গীতাদি আমাদের সামনে দু’বাটি পায়েস রাখলেন। বললেন, ‘আগে পায়েস খেয়ে নাও, পরে কথা বলবে।’ পায়েস কেন, জিজ্ঞেস করতেই দেখি সুভাষদার মুখে অনাবিল হাসি, বুঝলাম আজ ওঁর জন্মদিন। এই রে, কোনও উপহার তো আনিনি আমরা! সহকর্মী শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত তক্ষুনি সুভাষদাকে নিয়ে একটি ছড়া লিখে উপহার দিলেন। ছড়াটার খুব প্রশংসা করে বললেন, ‘এই যে তোমরা এসেছ, আবার কী সুন্দর ছড়া লিখে দিলে, এর চেয়ে ভাল উপহার আর কী হতে পারে!’ এক বার পুরো একটা ফিল্ম করেছিলাম সুভাষদার ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক/ আজ বসন্ত’ কবিতাটি নিয়ে। দেখে সুভাষদা খুব খুশি হয়েছিলেন।

ষাটের দশকের শেষের দিকে ইন্সটিটিউট অব অডিয়োভিস্যুয়াল কালচার-এর তরফ থেকে কেবলমাত্র কবিতা আবৃত্তি নিয়ে নানা কর্মকাণ্ড শুরু করেছি। সুভাষদার বাড়ির দু-একটা বাড়ি পরেই ছিল আমাদের আখড়া। সুভাষদাকে নিয়ে আসতাম সেখানে। প্রথমে যে সমবেত আবৃত্তির অনুষ্ঠান, সেটা শুরু করতাম ওঁর কবিতা দিয়েই। ‘একটি কবিতা লেখা হবে। তার জন্যে/ আগুনের নীল শিখার মতন আকাশ/ রাগে রী-রী করে, সমুদ্রে ডানা ঝাড়ে/ দুরন্ত ঝড়।’

সুভাষদার ৭৫ বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠান হয়েছিল ভারতীয় ভাষা পরিষদে। আমরা দূরদর্শন থেকে অনুষ্ঠানটি কভার করেছিলাম। আমার উপর দায়িত্ব ছিল মঞ্চে অনুষ্ঠানটি সংযোজনা করার। দেখেছিলাম, অনেক হইচইয়ের মধ্যেও সুভাষদা কেমন উদাসীন নির্জনতার মধ্যে ডুবে।

১৯৮৪ সালে এক লাইভ কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে সুভাষদাকে নিয়ে এসেছি। রিহার্সালের মধ্যে তৎকালীন ডিরেক্টর আমাকে ডেকে জানালেন, নির্বাচনের তারিখ একটু আগেই ঘোষিত হয়েছে। শুনেই সুভাষদা উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘আমি ইলেকশনে কংগ্রেসের হয়ে ক্যাম্পেন করছি, আজ আমার এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ঠিক হবে না।’ কংগ্রেসের হয়ে ক্যাম্পেন! বামপন্থী সুভাষদার! বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই শুনেছ।’

২৩ আষাঢ় ১৪১০, মঙ্গলবার কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর স্মরণ-অনুষ্ঠানে উচ্চারিত হয়েছিল তাঁর অনেক কবিতা। শেষে ছিল: ‘আগুনের একটি রমণীয় ফুল্‌কি/ আমাকে ফুলের সমস্ত ব্যথা/ ভুলিয়ে দিক।’

pankajsaha.kolkata@gmail.com

লিখছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
ছবি: তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়



আরও পড়ুন

Advertisement