Advertisement
E-Paper

রবিবাসরীয় ম্যাগাজিন

আমি পড়তাম নদিয়ার বর্ণবেড়িয়া গ্রামের স্কুলে। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাসই আমাদের ইংরাজি পড়াতেন। ক্লাস নাইন পাশ করে সেই স্কুল ছেড়ে চলে আসতে খুব কষ্ট হয়েছিল। তার পর দুর্গাপুরের একটি স্কুলে আবার নাইনে ভর্তি হই, বিজ্ঞান নিয়ে পড়ব বলে।

শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০১৬ ০০:১৯

নিজে লিখেছ, তাই ২ পেলে!

আমি পড়তাম নদিয়ার বর্ণবেড়িয়া গ্রামের স্কুলে। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাসই আমাদের ইংরাজি পড়াতেন। ক্লাস নাইন পাশ করে সেই স্কুল ছেড়ে চলে আসতে খুব কষ্ট হয়েছিল। তার পর দুর্গাপুরের একটি স্কুলে আবার নাইনে ভর্তি হই, বিজ্ঞান নিয়ে পড়ব বলে। বিজ্ঞান নিলেও আমার স্বাচ্ছন্দ্য ছিল ইংরাজিতেই। স্কুলে ভর্তির কিছু দিনের মধ্যেই সারা স্কুলে ছড়িয়ে পড়ল— দারুণ ইংরাজি-জানা ছেলে এসেছে। ছাত্রদের মতো কোনও কোনও শিক্ষকও আমার দিকে বিশেষ চোখে তাকাতেন। লজ্জা পেতাম। উঁচু ক্লাস থেকে ডাক আসত ট্রান্সলেশন করে দেওয়ার জন্য।

স্কুলে এক জন নতুন দিদিমণি এসেছিলেন। আমি তখন ইলেভেন। তিনি আমাদের ইংরাজির ক্লাস নিতেন। পরীক্ষা হল। একটি প্যারাগ্রাফ-এ আমাকে তিনি ১০-এ ২ দিলেন। ক্লাসে খাতা দেখালেন। কোথাও লাল কালির দাগ নেই। আমি কাঁদো-কাঁদো হয়ে জানতে চাইলাম, ‘ম্যাডাম, এত কম নম্বর পেলাম!’ তিনি সরাসরি উত্তর দিলেন, ‘কারণ তুমি নিজে লিখেছ।’ আমি অবাক! বললাম, ‘সব স্যরই তো বলেন নিজে লিখতে, বাজারের নোটবই থেকে না লিখতে।’ তিনি ঝাঁজিয়ে উত্তর দিলেন, ‘যাঁরা নোটবই লেখেন, তুমি কি তাঁদের চেয়ে বেশি পণ্ডিত?’ আমি আরও অবাক হলাম।

বললাম, ‘ম্যাডাম, আমি নিজে না লিখলে নিজে লেখা শিখব কী করে? আমি পড়েছি— কিরণ মিত্র নামে প্রেমেন্দ্র মিত্রের এক জন বাংলা শিক্ষক ছিলেন, যিনি ছাত্রদের ছুটি দিয়েছিলেন গঙ্গায় বান দেখার জন্য। বলেছিলেন, নিজের চোখে বন্যা না দেখলে বন্যার রচনা নিজেরা লিখবে কী করে?’ তিনি চোখ পাকালেন, ‘তোমার জ্যাঠামো শুনতে এখানে আসিনি। যা বললাম তা-ই করবে।’ ‘তার মানে আপনি নোটবই মুখস্থ করে উত্তর লিখতে বলছেন?’ ‘হ্যাঁ, বলছি।’ কী দুর্বুদ্ধি মাথায় চাপল, লঘু-গুরু ভুলে বলে ফেললাম, ‘আপনার শিক্ষকতা করার কোনও যোগ্যতা নেই।’ প্রচণ্ড রেগে গিয়ে তিনি ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আমি ও সারা ক্লাস ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে স্টাফরুম থেকে তলব। আমি খুব একটা ঘাবড়াইনি, কারণ প্রধান শিক্ষকমশাই আমাকে খুব স্নেহ করতেন। ভাবলাম, শিক্ষকের সঙ্গে এ ভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি। ক্ষমা চেয়ে নেব। কিন্তু স্টাফরুমের সামনে যেতেই সহকারী প্রধান শিক্ষক রুদ্রমূর্তি ধরে একখানা ছড়ি হাতে বেরিয়ে এসেই আমার হাত ধরে ফেললেন, তার পর কিছু ক্ষণ শুধু বেতের এলোপাথাড়ি সপাং-সপাং আওয়াজ শোনা গেল। মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে যখন থামলেন, আমার কান কেটে রক্ত পড়ছে।

দেখলাম, হেডস্যর ও অন্যান্য সব শিক্ষক থম মেরে বসে। সেই ঘটনার পর স্কুলে আমার কী দুঃসহ অবস্থা! স্কুলের সব ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে যেন বলত— বেশ হয়েছে। ক্লাসের ছেলেরাও আমার সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলত। তার কিছু দিন পরেই হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা আসায় বেঁচে গেলাম। যাই হোক, এক সময় এমএ বিএড করে দুর্গাপুরেরই স্টিল প্ল্যান্টের একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে ইংরাজির শিক্ষক হয়ে ঢুকলাম। এর বছর কয়েক পরে শিক্ষা বিভাগের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। অন্যান্য স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও এসেছিলেন। সেখানে অনেক অপরিচিত মুখের ভিড়ে সেই শিক্ষিকাকে দেখলাম। আমি যেমন ওঁকে দেখে চমকে উঠেছিলাম, উনিও তেমনই একদৃষ্টে কিছু ক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। আমাদের কোনও কথা হয়নি। যেটুকু হয়েছিল— ওই দৃষ্টিতেই।

সতীশ বিশ্বাসƒ ডিরোজিয়ো পথ, দুর্গাপুর

স্কুলের শিক্ষক/শিক্ষিকা কি নিষ্ঠুর বা উদ্ভট ছিলেন? বিবরণ লিখে পাঠান ৪০০ শব্দে এই ঠিকানায়: গাঁট্টা, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা,
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০১।

আমি কাঁদছি, শাশুড়িও

বিয়ের পর প্রথম বার আমার বাবা শ্বশুরবাড়ি এলেন, জামাইষষ্ঠীর তত্ত্ব নিয়ে। বেশ গরম ছিল বাইরে। বাবার দু’হাত ভর্তি জিনিস। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন। কপালে ঘাম, জামা ভিজে গেছে। আমার শ্বশুর, শাশুড়ি বাবাকে বসার ঘরে বসালেন। বাবাকে দেখে তো আমি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললাম। বাবার কত আদরের আমি! বাবা কত কষ্ট করে এত জিনিস নিয়ে এসেছেন এত গরমে। আমার কান্না আর থামছিলই না।

আমার কান্না দেখে আমার শাশুড়ি মা-ও কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘দাদা, আমারও বাবা আসতেন। তখন আমিও কাঁদতাম। বিয়ের পর বাবাকে দেখলে যে মেয়েদের কী আনন্দ হয়, তা আমি জানি। আপনি এত জিনিসপত্র নিয়ে এত দূর এই রোদে এসেছেন, মেয়ের তো কষ্ট হবেই।’ শুনে আমার বাবাও কেঁদে ফেলেছিলেন সে দিন।

২০১২ সালে আমার শ্বশুরমশাইয়ের সেপ্টিসেমিয়া হয়েছিল। প্রায় এক মাস তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। অনেক যুদ্ধ করে ফিরে এসেছিলেন আমাদের কাছে। এক দিন দুপুরে ওঁর অফিসের দুজন কলিগ আমাদের বাড়িতে আসেন। আমি ওঁদের আগে কখনও দেখিনি। প্রণাম করতেই এক জন বলে ওঠেন, ‘এই যে মা, এ দিকে এসো। তোমাকে দেখতেই তো এসেছি। তোমার এত প্রশংসা শুনেছি দেব-বাবুর কাছে যে, তোমাকে দেখতেই আসা।’ আমার শ্বশুরমশাই বলে ওঠেন, ‘মা লক্ষ্মীর মুখটা দেখেছেন চুনিদা, একদম লালবাজার! একটু এ দিক-ও দিক করার উপায় নেই। ওর জন্যই বেঁচে ফিরেছি।’ সে দিনও আমার চোখ ভিজে গিয়েছিল।

প্রথম প্রথম রান্না করতে আমি কী ভয়টাই না পেতাম! জীবনে রান্না করিনি আমি! কিছু রাঁধলেই শাশুড়ি মা’কে দশ বার জিজ্ঞেস করতাম, ‘মা, বাবা খেতে পারবেন তো?’ মা চেখেই বলতেন, ‘দারুণ হয়েছে!’ হয়তো নুনটা কম, চিনিটা বেশি। তাও সেই রান্নাই আমার শ্বশুরমশাই, শাশুড়িমা হাসিমুখে খেয়েছেন।

রাজশ্রী চট্টোপাধ্যায়ƒ কসবা, বালিগঞ্জ

আপনার শ্বশুরবাড়ি ভাল? খারাপ? ভাল-খারাপ মিশিয়ে? শ্বশুরবাড়ির টকঝালমিষ্টি ঘটনা লিখে পাঠান ৪০০ শব্দে। ঠিকানা: শ্বশুরবাড়ি, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০১।

টাইম মেশিন

আজ নজিরবিহীন ঘটনা ঘটতে চলেছে কলকাতা হাইকোর্ট চত্বরে। বাগবাজারের সৌম্য চৌধুরী আদালতে কয়েক সপ্তাহ আগে মামলা ঠুকেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। মামলার বিষয়, কমিশন থেকে পাঠানো তাঁর ছেলের ভোটার কার্ড। আজ সেই মামলার রায় বেরনোর কথা। সৌম্য বলেন, ‘আমাদের পরিবারে কখনও কেউ প্রথম বারেই নির্ভুল ভোটার কার্ড পায়নি। এটাই আমাদের ঐতিহ্য। অথচ আমাদের ছেলের যে ভোটার কার্ড এসেছে, তাতে কোনও ভুল নেই! এমনকী ছবিতেও তাকে স্পষ্ট করে চেনা যাচ্ছে! এ কী অনাসৃষ্টি কাণ্ড? তাই এর বিরুদ্ধে মামলা করেছি। কারণ আমাদের পরিবারের কাছে এ এক অমঙ্গলবার্তা।’ তদন্ত করে জানা গিয়েছে, কথাটা পুরো ঠিক নয়, স্বাধীনতার পর থেকে তাঁদের পরিবারের মাত্র এক জনেরই প্রথম বারেই নির্ভুল ভোটার কার্ড এসেছিল, কিন্তু তিনি নাকি ভোট দেওয়ার আগেই প্রবল জ্বরে মারা যান। সেই থেকেই এই পরিবারে এই জিনিসকে অপয়া বলে ভাবার চল। যদিও ‘যুক্তিবাদী সমিতি’ এই ধরনের কুসংস্কারকে পাত্তা দেওয়া যাতে না হয় সেই মর্মে জাঠা বের করেছে গত সপ্তাহে পাঁচ বার, কিন্তু বহু মনোবিদ বলেছেন, এই ঘটনায় এক জন পিতার মনই প্রাধান্য পাচ্ছে, তাকে তাচ্ছিল্য করা অনুচিত। অনেক সমাজবিদ বলছেন, সাধারণ মানুষ সব সময়ই ‘অন্য রকম’ মানুষের দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকায়। যেখানে রাজ্যের অধিকাংশ মানুষই ভুল ও অস্পষ্ট ভোটার কার্ড পার্সে নিয়েই জীবন কাটাচ্ছেন, সেখানে এক জন যদি হঠাৎ ঝলমলে পরিষ্কার নির্ভুল ভোটার কার্ড পায়, তবে তো তাকে লোকে ব্যঙ্গ করতেই পারে। বাবা হিসেবে চিন্তা হওয়াই কথা! নির্বাচন কমিশনার প্রশ্ন করেছেন, একটা ‘কেয়ারলেস মিসটেক’-কে এত বড় করে দেখা হচ্ছে কেন? এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, এ বার থেকে ভোটার কার্ডে নামের বানান ভুল করে এবং ছবিটি যথেষ্ট বিকৃত করেই পাঠানো হচ্ছে কি না, দেখার জন্য কমিটি থাকবে।

প্রিয়ম মজুমদারƒ শ্রীরামপুর, হুগলি

লিখে পাঠাতে চান ভবিষ্যতের রিপোর্ট? ঠিকানা:
টাইম মেশিন, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা,
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০১। অথবা pdf করে পাঠান এই মেল-ঠিকানায়: robi@abp.in

১৯৬১-র ফেব্রুয়ারি, আমার বয়স তখন সবে চোদ্দো পেরিয়েছে। কলকাতায় এলেন ইংল্যান্ডের রানি, কুইন এলিজাবেথ। পোশাকি নাম দ্বিতীয় এলিজাবেথ। সঙ্গে স্বামী ‘ডিউক অব এডিনবরা’। সৌজন্য সফরে রানির এ দেশে আসা নিয়ে সারা শহরে একটা সাজো সাজো রব। ক’দিন থাকছেন, কখন কোথায় যাচ্ছেন, খবরকাগজের দৌলতে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে সব।

সে সময়টা এখনকার মতো উগ্রপন্থার, সন্ত্রাসী হানার ভয়ে আক্রান্ত ছিল না। তাই মাছি-না-গলার মতো কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপও মানুষকে বিব্রত করেনি। তবু, ইংল্যান্ডেশ্বরী তো! অতিরিক্ত নজরদারি একটু ছিলই। শহরের মধ্যে রানির যাতায়াতের পথে সাধারণ মানুষের চলাফেরায় সাময়িক কিছু বিধিনিষেধ জারি থাকত। মাত্রাছাড়া বাড়াবাড়ি না থাকলেও, সম্মাননীয় অতিথিদের নিয়ে প্রশাসনের ব্যস্ততা ছিল তুঙ্গে। এই সব কিছুরই মধ্যে, রানিকে দেখার জন্যে কৌতূহলী মানুষ পথে ভিড় জমিয়েছে, রাস্তার ধারে অপেক্ষা করে থেকেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

এক দিন বাবা বাড়ি ফিরে বললেন, ‘রানিকে দেখতে যাবি? চল, দেখে আসি।’ মনে আছে, সে দিন সন্ধেয় হাওড়া থেকে বাসে চড়ে, ডালহৌসিতে নেমে, হাঁটতে হাঁটতে গভর্নর হাউস, মানে রাজভবনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বিশাল গভর্নর হাউসের সামনে আর পাশের রাস্তার ধারে মোটা বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষজন কোনও ভাবে রাজপথের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে না পারে।

আমরা তখন কার্জন পার্কের একটু দক্ষিণে, বেড়ায় ঘেরা ফুটপাতের ওপর দাঁড়িয়ে। দু’দিকে দীর্ঘ রাজপথ, সামনে রাজভবনের দক্ষিণ প্রান্তের মসৃণ, প্রশস্ত রাস্তা। একেবারে জনশূন্য। মাঝে মাঝে এক-একটা পুলিশের গাড়ির আনাগোনা। সামনেই ইডেন গার্ডেন, কিন্তু খেলা দেখার জন্য আজকের মতো কোনও পাকা দর্শকাসন ছিল না, ছিল না রাস্তার ওপর উঁচু উঁচু আলোকস্তম্ভ। নেতাজির মূর্তিটাও তখন ওই জায়গায় বসেনি। সামনে যত দূর চোখ যায়, শুধুই ফাঁকা রাস্তা।

সব মানুষ অপেক্ষা করছে রানিকে দেখার জন্য। হইচই, উৎসব-উৎসব ভাব। এত দিন যারা আমাদের শাসন করে এসেছে, সেই ইংরেজদের রানি নিজে ‘আমাদের শহরে’ এসেছেন, সে জন্যেই বোধহয় লোকের উৎসাহটা বেশি ছিল। রাস্তায় কিছু আলোও লাগানো হয়েছিল, মনে আছে।

আমাদের চোখ রাজভবনের দক্ষিণ প্রান্তের রাস্তার দিকে। পথের দু’পাশে, বেড়ার ভেতর মানুষের থিকথিকে ভিড়। একটাই গুঞ্জন চারদিকে, ‘কখন আসবে, কখন আসবে।’ দূর থেকে কোনও গাড়িকে আসতে দেখলেই ভিড়ের মধ্যে থেকে একটা চিৎকার উঠছে, গাড়ি চলে যেতেই ফের মিলিয়ে যাচ্ছে।

বেশ কিছুটা সময় এ ভাবেই গেল। হঠাৎ দেখি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের গাড়িগুলোর মধ্যে কেমন একটা চাঞ্চল্য, ব্যস্ততা। যে যার পজিশন নিয়ে নিল মুহূর্তে। তার পরেই, দূরে দেখা গেল, এক ঝাঁক গাড়ি আসছে। তখন তো আর ‘কনভয়’ শব্দটা জানতাম না। দেখলাম, প্রথমে বেশ কয়েকটা পুলিশের গাড়ি। তার পর আরও ক’টা গাড়ি এল, সেগুলো বেশ লম্বাটে ধরনের। গাড়িগুলো আমাদের সামনে দিয়ে এসে ডান দিকের রাস্তায় বেঁকে গেল। তার পর দেখি, খুব লম্বা একটা গা়ড়ি আসছে, আস্তে আস্তে। কী রঙের, এখন আর মনে নেই, তবে ও রকম গাড়ি আগে কখনও দেখিনি। গাড়িটার হুড পুরো খোলা। আর সামনের সিটের পিছনে, কিছুটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন ধবধবে সাদা পোশাক পরা এক মহিলা। গলার নীচ থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীর সাদা গাউনে ঢাকা। দু’হাতে সাদা দস্তানা। ইনিই রানি এলিজাবেথ! অবাক হয়ে, হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম। পাশে আর এক সাহেব, কালো স্যুট পরনে। বাবা কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে দিলেন, ইনিই রানির স্বামী। তবে রাজা নন। ‘ডিউক অব এডিনবরা’— এটাই ওঁর পরিচয়।

গাড়ির ওপর থেকে রানি ওঁর সাদা দস্তানা পরা হাত নাড়ছিলেন, আর দু’পাশের মানুষের দিকে হাসিমুখে তাকাচ্ছিলেন। বাবা আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন: ‘মুঘল সম্রাট শাহজাহানের বিখ্যাত কোহিনুর মণিটা এখন এই রানির মাথার মুকুটেই থাকে। এই রানির মা ছিলেন কুইন ভিক্টোরিয়া। তাঁর নামেই কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।’ এমন অনেক কথা।

সেই সন্ধ্যায় রানির যাত্রাসঙ্গী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল শ্রীমতী পদ্মজা নাইডু। ছিলেন ধুতি-সাদা শার্ট পরা, দীর্ঘকায় লোকটি, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়। আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তার বাঁকের মুখে, তাই অত গাড়ির সারির সবটাই ভাল ভাবে দেখতে পেয়েছিলাম। আস্তে আস্তে গাড়িগুলো ডান দিকে, গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের দিকে মিলিয়ে যেতে থাকল। আরও একটু পরে রাস্তা খুলে গেল সাধারণের চলাচলের জন্য। জনতার ভিড়ে মিশে আমরাও বাড়ির পথ ধরলাম।

পর দিন আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছিল: ‘শুক্রবার রানি এলিজাবেথকে দেখিতে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের নিকট হইতে রাজভবনের উত্তর প্রবেশপথ পর্যন্ত জনতার চাপ এত অধিক হয় যে, তাহা নিয়ন্ত্রণ করিয়া রাজভবনের প্রবেশপথ উন্মুক্ত রাখিতে পুলিশকে বেগ পাইতে হয়।’ এই কিছু দিন আগেই খবরকাগজে দেখলাম, এলিজাবেথের নাতি-নাতবউ, উইলিয়াম আর কেট মিডলটন ভারতে এসেছেন, দিল্লিতে। দেখেই আমার মনে অর্ধশতাব্দী আগেকার কলকাতায় সেই রানি-দর্শনের স্মৃতি উছলে উঠল।

অমলকুমার মজুমদার, চ্যাটার্জীহাট, শিবপুর

ayan.majumder@bata.com

ষাটের দশকের কোনও ঘটনার সঙ্গে নাড়ির যোগ আছে?
লিখুন এই ঠিকানায়: হ্যালো 60’s, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা,
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০১। বা, লেখা pdf করে পাঠান
এই মেল-ঠিকানায়: robi@abp.in

rabibasariya magazine magazine
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy