Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৯ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

গতকালই ছিল তাঁর আড়াইশো বছরে পদার্পণ

তাঁর বেদান্ত চর্চার জন্যই কাশিমবাজারে মহামারি

তর্কে হারাতে না পেরে রাজা রামমোহনের সম্বন্ধে এমনই বলত গোঁড়া সমাজ। হিন্দু কুপ্রথার সমালোচনা যেমন করেছেন, বিরোধিতা করেছেন হিন্দুধর্মের অপব্যা

অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়
২৩ মে ২০২১ ০৭:৪৬
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

উনিশ শতকের শহর। কলকাতার আকাশে শারদ-মেঘ। বড় বাড়ির পুজোর দালানে ব্যস্ততা। ওই বাড়ির এক বালক নিমন্ত্রণ করতে এসেছেন তাঁকে। শুনে বললেন, ‘বেরাদার (ভাই), আমায় কেন, রাধাপ্রসাদকে বলো।’ বক্তা, রাজা রামমোহন রায়। বালকটি, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে কি রামমোহন প্রচলিত ধর্ম-দ্রোহী? আদতে তাঁর দ্রোহ ধর্মের নামে চলে আসা নানা সংস্কার, পৌত্তলিকতা ও সামাজিক নানা কুপ্রথার বিরুদ্ধে। এই দ্রোহের জন্য গনগনে আগুনের আঁচ অবশ্য পরিবার, সমাজ, ধর্ম থেকে কম পাননি রামমোহন।

তখন বাংলায় বিলিতি বণিকদের সঙ্গে রফতানি-ব্যবসায় গজিয়ে ওঠা বাবু সম্প্রদায়ের হাতে কাঁচা টাকা। ঘরে-ঘরে দুর্গাপুজো। খানাপিনা আর বাইনাচ। ধীরে ধীরে শ্রীবৃদ্ধি মধ্যবিত্তের ‘বারএয়ারি’ পুজোরও। এই পরিবেশে দাঁড়িয়েই ধর্মের নামে জাতপাতের বিরুদ্ধে সরব হন তিনি। আর তাই ব্রাহ্মসমাজ-গৃহ যখন তৈরি করলেন, সেটির ন্যাস-পত্রে লিখলেন, ‘যে কোন প্রকার লোক হউক না কেন, যাহারা ভদ্রতাকে রক্ষা করিয়া পবিত্র ও নম্রভাবে বিশ্বস্রষ্টা বিশ্বপিতা অকৃত অমৃত অগম্য পুরুষের উপাসনার অভিলাষ করে, তাহারদের সমাগমের জন্য এই সমাজ-গৃহ সংস্থাপিত হইল।’ বাবু-কলকাতায় বাঙালির নম্রতা ও ভদ্রতা যেন এই প্রথম গুরুত্ব পেল।

মানুষটির জন্ম ২২ মে, ১৭৭২ (মতান্তরে ১৭৭৪)। সাবেক বর্ধমানের খানাকুল-কৃষ্ণনগরে। বাবা রামকান্ত রায়। মা তারিণীদেবী। সাবেক পদবি বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রপিতামহ কৃষ্ণচন্দ্র বাংলার স্বাধীন নবাবের দরবারে কাজ করে ‘রায়’ উপাধি পান। ছোটবেলা থেকেই নানা ঘটনায় দ্রোহী রামমোহনকে নিয়ে পরিবারে ঘোর দুর্বিপাক।

Advertisement

একটি জনশ্রুতি: বাপের বাড়ি এসেছেন তারিণীদেবী। সঙ্গে শিশু রামমোহন। পুজোর পরে দাদু শ্যাম ভট্টাচার্য শিশু রামমোহনকে পুজোর নৈবেদ্য বেলপাতা দিয়েছেন। খানিক বাদে দেখা গেল, রামমোহন তা চিবোচ্ছেন। ক্রোধে অধীর তারিণীদেবী রামমোহনকে থাপ্পড় মেরে বেলপাতা মাটিতে ফেলে বাবাকে তিরস্কার করলেন। রেগে গিয়ে মেয়েকে অভিশাপ বাবার: ‘তুই আমার বেলপাতা ফেলে দিলি? তুই এই ছেলেকে নিয়ে সুখী হবি না। এ ছেলে বিধর্মী হবে।’ সঙ্গে আশীর্বাদও: ‘এ পুত্র রাজপূজ্য এবং অসাধারণ লোক হবে।’

‘অসাধারণ’ এ ছেলে হল। কিন্তু মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কটিও ‘অ-সাধারণ’ই হয়ে দাঁড়াল কালে-কালে। পৌত্তলিকতার বিরোধিতা করছে ছেলে, সুতরাং মা ছেলেকে ত্যাগ করলেন। ভিটে ছেড়ে রামমোহন রঘুনাথপুরে শ্মশানভূমির উপরে বাড়ি তৈরি করলেন। সঙ্গে একটি মঞ্চও। তার চার পাশে লেখা: ‘ওঁ তৎসৎ’, ‘একমেবাদ্বিতীয়ং’। কিছু দিনের মধ্যেই দেখা গেল, রামনগর গ্রামের জনৈক সমাজপতি রামজয় বটব্যাল চার-পাঁচ হাজার লোক এনে ক্রমাগত মুরগির ডাক ডাকছেন বাড়ির চার পাশে। কখনও বা বাড়ির মধ্যে উড়ে আসে গরুর হাড়। কিন্তু রামমোহনের ধৈর্যে হার মানে সমাজপতির দল।

কিন্তু তারিণীদেবী হার মানার মতো মহিলা নন। তাই, তাঁর ‘ইন্ধনে’ জগন্মোহন রায়ের পুত্র গোবিন্দপ্রসাদ, সম্পর্কে রামমোহনের দাদার ছেলে, কাকার বিরুদ্ধে সম্পত্তি-সংক্রান্ত মামলা করে বসলেন সুপ্রিম কোর্টে। পরে অবশ্য রামমোহনের কাছে এ জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন গোবিন্দপ্রসাদ।

শুধু কি মামলা, বাপ-ছেলের সম্পর্কেও যেন দেওয়াল তোলেন তারিণীদেবী। এক বার খাজনা বাকির দায়ে রামমোহনের বাবা রামকান্ত হুগলি দেওয়ানি জেলে আটক হলেন। দাদা, জগন্মোহনও একই অভিযোগে মেদিনীপুর জেলে। রামমোহন তখন ঢাকায়। আচমকা, শুনলেন বাবার মৃত্যু সংবাদ। কিন্তু শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হল তিনটি। জেলেই শ্রাদ্ধ করেন জগন্মোহন। রামমোহনও আলাদা ভাবে তা করেন। আবার গয়না বন্ধক রেখে স্বামীর শ্রাদ্ধ করলেন তারিণীদেবীও! কারণ, ম্লেচ্ছ ছেলে রামমোহনের টাকা নেওয়া যাবে না। যদিও পরে মা-ছেলের সম্মিলনও ঘটে। ছেলেকে মা বলেন, ‘রামমোহন! তোমার মতই ঠিক্।’

কিন্তু রামমোহনের এই ম্লেচ্ছপনা অতি অল্প বয়স থেকেই শুরু। প্রথম দিকে বাড়ির রাধাগোবিন্দর মূর্তির প্রতি বেশ নিষ্ঠা দেখা গেল। এমনকি, কৈশোরে সন্ন্যাসী হতে মনস্থ করলেন। পরে গ্রামে এবং কাশীতে গিয়ে সংস্কৃত ও শাস্ত্র শিক্ষা, পটনায় থেকে আরবি শিক্ষা। পড়া হল ‘কোরান’।
সুফি-আদর্শ আর হাফেজ, রুমির কবিতাগুলি বড় ভাল লেগেছিল রামমোহনের। আবার সংস্কৃত শিক্ষার অনেকটাই পেয়েছিলেন নন্দকুমার বিদ্যালঙ্কারের কাছে, যিনি পরে হরিহরানন্দ অবধূত নামে পরিচিত হন।

রামমোহনের এ সব কর্মকাণ্ড ভাল চোখে দেখেননি বাবা রামকান্তও। ছেলের পৌত্তলিকতা বিরোধী, ‘হিন্দুদিগের পৌত্তলিক ধর্ম্মপ্রণালী’ বই প্রকাশের পরে সমস্যা আরও বাড়ে। ও সব সমস্যাকে বিশেষ আমল না দিয়ে সত্যের সন্ধানে ‘ভারতপথিক’ অবশ্য বেরিয়ে পড়েন দেশ ভ্রমণে। পরে যান তিব্বতেও। মূল উদ্দেশ্য ছিল, বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে জানা।

পালকি চলে

জানার প্রস্তুতি-পর্ব শেষ হলে, জানানোটাও জরুরি হয়ে উঠল রামমোহনের কাছে। ১৮১৪-য় কলকাতার মানিকতলায় লোয়ার সার্কুলার রোডের বাড়ি থেকে শুরু করলেন পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচার। অনুগামী ও শিষ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ল শত্রুসংখ্যাও। রামমোহন তাঁর নিজস্ব ধর্মভাবনা প্রচারের জন্য চারটি পথ নিলেন: কথোপকথন ও বিতর্ক, স্কুল প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষাদান, পুস্তক রচনা এবং সভা-সমিতির সংগঠন।

তবে এর আগেই ১৮০৩-এ আরবি শিরোনাম ও মুখবন্ধ-সহ ফার্সিতে বই লিখলেন ‘তুহ্ ফাৎ-উল-মুয়াহ্-হিদীন’। এই বইয়ের মূল প্রভাব, আরবীয় মোতাজল সম্প্রদায়ের যুক্তিবোধ ও ইউরোপীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর দার্শনিকদের একাংশের মতবাদ। এ দিকে, তিনি বেদান্তের নানা তত্ত্ব বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করতে থাকলেন। কিন্তু, তখন গোঁড়া সমাজ প্রশ্ন তুলল, ও শুনলে শূদ্র পাতক হবে যে! রামমোহনের উত্তর, ‘শ্রুতি, স্মৃতি, জৈমিনীসূত্র, গীতা, পুরাণ ইত্যাদি যখন পড়ুয়াদের পড়ান পণ্ডিতেরা, তখন বাংলায় তার ব্যাখ্যা করেন না? পঞ্চম বেদ এবং বেদার্থ নামে খ্যাত মহাভারতের শ্লোকগুলি শূদ্রের নিকট পাঠ করা হয় না?’ একে একে উপনিষদগুলির বঙ্গানুবাদ করতে থাকলেন তিনি। ঘটনাচক্রে, পরবর্তী সময়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিত্বেরাও উপনিষদের চর্চা করে বাংলা তথা দেশকে সমৃদ্ধ করেছেন।

১৮১৫-য় মানিকতলার বাড়িতে বাংলার ‘প্রথম বৌদ্ধিক-ক্লাব বা সমিতি’ ‘আত্মীয় সভা’র প্রতিষ্ঠা। পরে, সিমলা ষষ্ঠীতলার বাড়ি ঘুরে ফের সেই বাড়িতে। সেখানে বেদপাঠ করেন শিবপ্রসাদ মিশ্র। আর গোবিন্দ মাল পরিবেশন করেন ব্রহ্মসঙ্গীত। এ সব তথাকথিত অনাচারে দেশ খেপে উঠল। রামমোহন-সংসর্গ ত্যাগ করলেন জয়কৃষ্ণ সিংহ। কিন্তু সঙ্গেই রইলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, হলধর বসু, রাজনারায়ণ সেন প্রমুখ।

রামমোহনের ওই সভার এ সব কাজকর্ম ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ খানিক অতিরঞ্জিত হয়েই প্রকাশ পেল। তা উদ্ধৃত করে মাদ্রাজ গভর্নমেন্ট স্কুলের শিক্ষক শঙ্করশাস্ত্রী বললেন, রামমোহনের ‘আত্মীয় সভায় সঙ্গীত, বাদ্য ও নৃত্য হয়। চিত্তশুদ্ধির জন্য সভা করে এ সব করা শাস্ত্রানুযায়ী কাজ নয়। এটি নিকৃষ্ট আমোদ মাত্র।’ পাল্টা রামমোহন বললেন, ‘নৃত্য-সংবাদ অমূলক। কিন্তু পরমেশ্বরের উপাসনায় সঙ্গীত আবশ্যক। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য উপাসনার সময়ে সঙ্গীতের ব্যবস্থা করেছেন।’ স্মরণীয়, যাজ্ঞবল্ক্য জানিয়েছেন, ‘ঋক্‌সংজ্ঞক, গাথাসংজ্ঞক, পাণিকা ও দক্ষবিহিত গান, ব্রহ্মবিষয়ক এই চারি প্রকার গান অনুষ্ঠেয়। এই সকল মোক্ষসাধন সঙ্গীত অভ্যাস করিলে মোক্ষপ্রাপ্তি হয়।’ ঘটনাচক্রে, বাংলা ভাষায় ব্রহ্মসঙ্গীতের সৃষ্টিকর্তা রামমোহন। পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্ন লিখেছিলেন, “তাঁহার ব্রহ্মসঙ্গীত বোধহয়, পাষাণকেও আর্দ্র, পাষণ্ডকেও ঈশ্বরানুরক্ত ও বিষয়-নিমগ্ন মনকেও উদাসীন করিয়া তুলিতে পারে।”

কিন্তু উদাসীন হওয়া দূরঅস্ত্, বরং রামমোহনের ব্রহ্মের ধারণাকে নস্যাৎ করতে বাছা-বাছা ‘দুর্ব্বাক্য’-সহ এগিয়ে এলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। লিখলেন, ‘বেদান্তচন্দ্রিকা’। দাবি করলেন, পরমাত্মার দেহ আছে। রামমোহন নানা সূত্র দেখিয়ে প্রমাণ করলেন, ‘এ কথা বলা মানে, সব বেদকে তুচ্ছ করা’ এবং ফের বললেন পরমেশ্বর নিরাকার ও চৈতন্যস্বরূপ।

আর এক পণ্ডিতকেও যুক্তি-তর্কে পরাস্ত করেন রামমোহন। বিহারীলাল চৌবের বাড়িতে এক মহাসভা। প্রধান সমাজপতি রাজা রাধাকান্ত দেবের উদ্যোগে উপস্থিত দেশের বড়-বড় সব পণ্ডিত। সবারই উদ্দেশ্য, ব্রহ্মজ্ঞানী রামমোহনকে ঠেকাতে হবে। রামমোহনের প্রধান প্রতিপক্ষ, সুব্রহ্মণ্য শাস্ত্রী। তিনি শুরুতেই বাঙালির কৌলীন্য নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিলেন, ‘বঙ্গদেশে সদ্‌ব্রাহ্মণই নেই। তাই, এখানে বেদপাঠই উচিত নয়।’ কিছু ক্ষণের জন্য সভা স্তব্ধ। কিন্তু এ বার রামমোহন উঠে তাঁর যুক্তিজালে পরাস্ত করলেন শাস্ত্রী মহাশয়কে।

কিন্তু বার বার পরাস্ত হয়েও গোঁড়া পণ্ডিতসমাজ ছেড়ে দেয়নি রামমোহনকে। এমনকি, এ-ও শুনতে হল, রামমোহনের এ সব বেদান্ত-সংক্রান্ত লেখালিখির কারণেই না কি যশোরে ওলাউঠা হয়েছে। কাশিমবাজারে মহামারির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। যদিও, এর প্রকৃত কারণ ছিল, ভাগীরথীর গতিপথ বদলানো।

এ সব দ্রোহের কারণে মনে হতে পারে, রামমোহন হিন্দু শাস্ত্রের বিরোধী। কিন্তু, পাদ্রিদের হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতি বিষয়ে নানা ‘অপব্যাখ্যা’ সম্বলিত পত্রপত্রিকার বিরুদ্ধে ‘সম্বাদ কৌমুদী’-তে সরব হন এই রামমোহনই। আবার শ্রীরামপুরের এক পাদ্রি ‘সমাচার চন্দ্রিকা’য় হিন্দুশাস্ত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে চিঠি লিখলে, তারও পাল্টা দেন রামমোহন। পাশাপাশি, খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধেও কিছু কথা যুক্তি সহকারে পেশ করলেন ‘ব্রাহ্মণসেবধি’-তে। তাঁর বক্তব্য, হিন্দুশাস্ত্রের বিষয়ে খারাপ কথায় ভরা পুস্তিকা প্রচার, প্রকাশ্যে নিজ ধর্মের মাহাত্ম্য বর্ণন ও অন্য ধর্মের বিষয়ে নেতিবাচক কথাবার্তা বলা এবং গরিব মানুষকে প্রলোভিত করা— ‘যুক্তি ও বিচারসঙ্গত নহে।’ পাশাপাশি, মহামানব জিশুখ্রিস্ট ও খ্রিস্ট ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে পাঁচটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন পাদ্রিসাহেবদের দিকে। স্মরণীয়, বাইবেল পাঠ করার জন্য গ্রিক ভাষা ও ছ’মাস ধরে ইহুদি শিক্ষক রেখে হিব্রু-শিক্ষা করা ছিল রামমোহনের।

ঘটনাচক্রে, একটি অনুবাদকার্য নিয়ে পাদ্রি অ্যাডামসাহেব এবং রামমোহনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হল। কিন্তু, এর পরিণাম, ‘খ্রিস্টিয় ত্রিত্ববাদ’ (ক্রিশ্চিয়ান ট্রিনিটি) সম্পর্কে আর নিষ্ঠাবান থাকতে পারলেন না অ্যাডাম। হলেন ইউনিটারিয়ান। খ্রিস্টান মহলে তাঁর নতুন নাম
হল, ‘সেকেন্ড ফলেন অ্যাডাম’।

বাইবেল থেকে খ্রিস্ট-উপদেশ সংগ্রহ করে ‘প্রিসেপ্টস, অব জেসাস, গাইড ট্যু পিস অ্যান্ড হ্যাপিনেস’ নামে একটি বই প্রচার করেন রামমোহন। কিন্তু এর বিরোধিতা করে মার্শম্যানসাহেব জানালেন, এতে খ্রিস্টের ঈশ্বরত্ব, অলৌকিক বিষয়গুলি নেই। মার্শম্যানের বক্তব্যের অসারতা তুলে ধরে এর পাল্টা হিসেবে তিনটি ‘অ্যাপিল’ পুস্তিকা বার করেন তিনি। এর পরে মার্শম্যান পরাজিত হন। ‘ইন্ডিয়া গেজেট’ এই ঘটনা সম্পর্কে লিখল, ‘‘এই বিচারে দেখা গেল, রামমোহন রায় এ দেশে এখনও তাঁহার সমতুল্য লোক খুঁজে পাননি।’’

এমন ‘সমতুল্য’ লোক বোধহয় দেখেননি উইলিয়াম ডিগবিও। এক বার তাঁর কাছে চাকরি চেয়ে আবেদন জানালেন রামমোহন। কিন্তু শর্ত রাখলেন, কর্মসূত্রে ডিগবির সঙ্গে দেখা করতে এলে, তাঁকে উপযুক্ত আসন দিতে হবে। অন্যদের প্রতি যে সব হুকুম জারি করা হয়, তা তাঁর ক্ষেত্রে চলবে না। সাহেব খানিক অবাক। কিন্তু তাঁর জহুরির চোখ। ওই শর্ত অনুযায়ী আইনি-লেখাপড়া হল! পরে এই দু’জনের সখ্য গভীর হয়। চাকরিসূত্রে রামগড়, ভাগলপুর ও রংপুরে ছিলেন রামমোহন। ভাগলপুরে একটি ঘটনা ঘটে। রামমোহনের পালকি চলেছে। পথের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কালেক্টর স্যর ফ্রেডারিক হ্যামিলটনের দৃশ্যটা সহ্য হল না। পালকি থামাতে বললেন। শেষে ঘোড়া ছুটিয়ে রামমোহনের পথ আটকালেন। রামমোহন বললেন, ‘আমি আসলে আপনাকে দেখতে পাইনি।’ কিন্তু তাতেও অপমানের মাত্রা কমল না। শেষে রামমোহন পালকি নিয়ে চলে গেলেন। গোটা ঘটনা বড়লাট লর্ড মিন্টোকে চিঠিতে জানালেন। বড়লাট খুব এক চোট বকাবকি করলেন কালেক্টরকে।

সতীদাহের বিরুদ্ধে

ধর্ম-আন্দোলনের পাশাপাশি, রামমোহনের জীবনের অন্যতম সামাজিক কাজ সতীদাহ নিবারণ। কিন্তু এ বিষয়ে কথা বলার আগে একটু পিছন ফিরে তাকাতে হয়। নারীর প্রতি রামমোহনের মমত্ববোধের
কারণগুলি কী?

ঘটনা এক: রামমোহন তখন তিব্বতে। এখানে বেশির ভাগ বাসিন্দা লামা উপাধিধারী মানুষকেই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা ভাবেন। তিনি এর বিরোধিতা করে জনতার রোষানলে পড়লেন। কিন্তু এখানকার নারীদের স্নেহে তিনি বেঁচে ফেরেন। এই ঘটনা জীবনভর রামমোহন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে
স্মরণ করেছেন।

ঘটনা দুই: ধু-ধু করে জ্বলছে আগুন। নিথর স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীকে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাঁর আর্তনাদ ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বাজছে কাড়া-নাকাড়া, ঢাক-ঢোল। স্ত্রী যাতে পালাতে না পারে, সে জন্য তাঁর বুকে দু’দিক বাঁশ চেপে রেখেছে যমদূতের ন্যায় দু’জন। এ সব বর্ণনা সংবাদপত্রে আকছার। রামমোহন ঠিক করলেন, এ তিনি বন্ধ করবেনই।

ঘটনা তিন: রামমোহনের বাড়িতেই ঘটল একটি সহমরণের ঘটনা। তাঁর বড় ভাই জগন্মোহনের দ্বিতীয়া স্ত্রী অলকমণি দেবী ১৮১০-এর ৮ এপ্রিল সহমরণে যান। এই বিষয়টি আরও দৃঢ়সঙ্কল্প করে তোলে রামমোহনকে।

এই সমস্ত ঘটনাপ্রবাহেরই বোধহয় ফলশ্রুতি, ১৮১৮-য় প্রথম আবেদনপত্র। রামমোহনের মনে হল সতীদাহ আদতে ‘জ্ঞানপূর্ব্বক স্ত্রীহত্যা।’ লিখলেন ‘সহমরণ বিষয় প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের সম্বাদ।’ পরের বছর ওই নামেই ‘দ্বিতীয় সম্বাদ’। বেশ কয়েক বছর পরে তৃতীয় বই, ‘সহমরণ বিষয়’-এ তৃতীয় প্রস্তাব। সতীদাহ বন্ধে রামমোহনের তিনটি প্রধান যুক্তি ছিল: ১. শাস্ত্রানুযায়ী পতির অনুগমন অবশ্য-কর্তব্য নয়। ২. শাস্ত্রে কিছুর জন্য কাজকে অর্থাৎ ‘কাম্যকর্ম্ম’ নিন্দা করা হয়েছে। এ অপেক্ষা ব্রহ্মচর্য শ্রেয়। ৩. শাস্ত্রের বিধানে স্বাধীন ভাবে সহমৃতা হওয়া আবশ্যক। কিন্তু তা হচ্ছে না, বলপ্রয়োগ হচ্ছে। তাই এ প্রথা অবশ্যই তুলে দেওয়া দরকার। ১৮১৯-এর অগস্টে সরকারের কাছে ফের আবেদনপত্র পাঠালেন রামমোহন।

সতীদাহের ঘটনায় বলপ্রয়োগের নিদর্শনগুলি পাওয়া যায় জেমস পেগ্‌সের ‘দ্য সতীস ক্রাই টু ব্রিটেন’, ফ্যানি পার্কসের বইগুলিতে। ১৮২৩-এ পুলিশের প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে ৫৭৫টি সতীদাহের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ৩২ জনের বয়স ২০ বছরেরও নীচে, ২০৮ জনের ২০ থেকে ৪০ বছর বয়স।

পাশাপাশি, রামমোহন স্বয়ং নানা ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে এই কুপ্রথা রোধের চেষ্টা করেন। এক বার শুনলেন বীরনৃসিংহ মল্লিকের পরিবারের কেউ সহমৃতা হওয়ার জন্য গঙ্গাতীরে এসেছেন। রামমোহন ছুটে গিয়ে এর অসারতা বোঝাতে লাগলেন। শুনলেন, ‘হিন্দুর কার্যে মুসলমান কেন?’ এক বার কালীঘাটেও ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু সফল হননি। এ দিকে, সতীদাহের সমর্থনে একশো পাতার বই পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। এই সব বাদ-বিবাদের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯-এর ৪ ডিসেম্বর এই কুরীতি তুলে দিলেন।

কিন্তু এর ফলে ‘ধর্মসভা’র ক্রোধে ধর্মচ্যুত ও কার্যত একঘরে হলেন রামমোহন। তবে, তার পরেও বার বার হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহ নিবারণ, কন্যাপণের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন। ঘটনাচক্রে, রামমোহনের নিজের কিন্তু তিন স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী
মারা যান। এর পরে, কুড়মুন-পলাশির শ্রীমতীদেবী ও পরে ভবানীপুরের উমাদেবীর সঙ্গে বিয়ে। অনেকের মতে, বিধবাবিবাহের সপক্ষে ছিলেন না রামমোহন। কিন্তু তা ঠিক নয়। এক জায়গায় স্পষ্টত লিখছেন, “...তন্ত্রবচনানুসারে... বিধবার পুনর্ব্বার বিবাহ উচিত...।”

এক পেগ এক কড়ি

রামমোহন এমন ধারারই। প্রচলিত মতের উল্টো কথা বলেন। বাবু ও বিলিতি, উভয় সম্প্রদায় সুরাপানে অভ্যস্ত হলেও তা সম্পর্কে জনমানসে নেতির ধারণা ছিল। কিন্তু রামমোহন ‘কায়স্থের সহিত মদ্যপানবিষয়ক বিচার’-এ মদ্যপানকে সমর্থনই করেছেন। তবে বাবুদের সঙ্গে রামমোহনের পার্থক্য তাঁর মাত্রাবোধে। শোনা যায়, সুরাপানের সময়ে এক-একটি পেগ পিছু একটি করে কড়ি রাখতেন। নির্দিষ্ট সংখ্যক কড়ি হলেই আর তিনি তা ছুঁতেন না। এক বার এক বন্ধু কয়েকটি কড়ি সরিয়ে রাখলেন মজা করতেই। ফলে, একটু মাত্রা বেড়ে গেলে পানের। কিন্তু, তা টের পেলেন রামমোহন। বলে উঠলেন, ‘বরং পণ্ডিত শত্রু ভাল। মূর্খ বন্ধু
ভাল নয়।’

একটা সময় ইংরেজিতে শিক্ষার বদলে সংস্কৃত ও ফার্সি শিক্ষার বিষয়ে সমাজপতিরা উঠেপড়ে লাগলে, সেটাও যেন ‘মূর্খামি’ হিসেবেই দেখেন রামমোহন। বড়লাট লর্ড আমহার্স্টকে তিনি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ-ও জানান, এর অর্থ, সরকার দেশবাসীকে ‘অজ্ঞতার অন্ধকারে’ রাখতে চাইছে। আসলে তিনি জানতেন ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বুদ্ধির প্রবেশ ঘটবে বাঙালির ঘরে। তাই আলেকজান্ডার ডাফ সাহেবের ইংরেজি স্কুলের জন্য নিজের ব্রাহ্মসমাজের ঘর দেন রামমোহন। ১৮২২-এ নিজেই ইংরেজি শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি, সাধারণপাঠ্য বাংলা গদ্যগ্রন্থের অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। একটি অমর কীর্তি, ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’। পাশাপাশি, বাংলায় কমা, সেমিকোলন, জিজ্ঞাসাবোধক চিহ্ন ব্যবহারে বাংলা গদ্যকে কৈশোরে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। লিখেছেন ‘জ্যাগ্রাফি’ (ভূগোল), ‘খগোল’ (জ্যোতির্বিদ্যার বই), জ্যামিতি সংক্রান্ত বইপত্রও।

কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার সমর্থক মানেই কিন্তু ইংরেজ সরকারের সব কাজকেও সমর্থন করেননি দ্রোহী রামমোহন। ১৮২৩-এর ৩১ মার্চ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণে আইন করল সরকার। বিরোধিতায় রামমোহন-সহ অন্যেরা ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জর্জের কাছে আবেদনপত্র পাঠালেন। তাতেও লাভ না হওয়ায় তাঁর ফার্সি পত্রিকা ‘মিরাৎ-উল্-আখ্‌বার’ পত্রিকার প্রকাশই বন্ধ করে দেন।

বিলেতে এক রাজা

ইংরেজ সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রোহ ঘোষণা করলেও, তাঁদের দেশটি দেখার বড় সাধ হয় রামমোহনের। ১৮৩০-এর ১৫ নভেম্বর, সোমবার পালিত পুত্র রাজারাম, রামরত্ন মুখোপাধ্যায়, রামহরি দাস আর দু’টি গাভীকে নিয়ে উঠলেন ‘আলবিয়ান’ জাহাজে। জাহাজের দিনগুলি বেশ কঠিন। কিন্তু ঝড় উঠলেই জাহাজের ডকে চলে আসেন রামমোহন, সমুদ্রের রুদ্ররূপ দেখতে। এক দিন জাহাজ উত্তমাশা অন্তরীপে নোঙর ফেলল। তীরে যেতে গিয়ে, পড়ে গিয়ে পা ভাঙল রামমোহনের। কিন্তু ওই অবস্থাতেও শুনলেন দু’টি ফরাসি জাহাজ এসেছে। সে দু’টির মাথায় পতপত করছে উপপ্লবের পতাকা। ঘটনাচক্রে, এর কিছু দিন আগেই ফ্রান্সে ঘটে গিয়েছে ‘জুলাই বিপ্লব’। দেখতে গেলেন রামমোহন। সে জাহাজ ছাড়ার সময়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘গ্লোরি, গ্লোরি, গ্লোরি টু ফ্রান্স’। পরে ফ্রান্সে গিয়ে সম্রাট লুই ফিলিপের ভোজসভায় যোগদান, কবি টমাস মুরের সঙ্গে সখ্য রামমোহনের ফরাসি-মুগ্ধতারই সাক্ষ্য দেয়।

চার মাস তেইশ দিন পরে লিভারপুলে পৌঁছে হোটেলে উঠলেন রামমোহন। আলাপ হল পণ্ডিত উইলিয়াম রস্কোর সঙ্গে। লন্ডন যাওয়ার পথে ম্যাঞ্চেস্টারে রামমোহন দেখলেন কারখানা, শিল্প-বিপ্লবের যন্ত্র। ইংল্যান্ডে জেরেমি বেনথামের সঙ্গে, ইংল্যান্ডের অধীশ্বরের সঙ্গে দেখা, রাজা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভোজসভায় যোগদান, নানা ঘটনায় দিনগুলি কাটতে থাকে। ইউনিটারিয়ান খ্রিস্টানরাও রামমোহনের সম্মানে সভার আয়োজন করলেন। সেখানে ‘দ্য ওয়েস্টমিনস্টার রিভিউ’-এর সম্পাদক স্যর জন বউরিং তাঁর বক্তৃতায় বললেন, ‘প্লেটো, সক্রেটিস, মিলটন বা নিউটন হঠাৎ এসে উপস্থিত হলে যেমন মনের ভাব হবে, আজ রামমোহন রায়ের অভ্যর্থনায় হাত বাড়িয়ে সেই অনুভব করছি।’ এই পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ‘ইউটোপিয়ান সোশ্যালিজ়ম’-এর অন্যতম প্রবক্তা রবার্ট ওয়েনের সঙ্গে রামমোহনের তত্ত্বগত বিতর্ক।

তবে এ সব ঘটনায় কোথাও মনে করার অবকাশ নেই, রামমোহন ইংল্যান্ড-আপ্লুত হয়ে যান। বরং ইংল্যান্ডে এসে ভারতবাসীদের সরকারি কাজে পদোন্নতি, এক জন ইউরোপীয় বিচারকের সঙ্গে দেশীয় বিচারক নিয়োগের প্রস্তাব দেন পার্লামেন্টারি কমিটির কাছে। ঘটনাচক্রে, ইংল্যান্ডের রাজসভায় রামমোহন যান দিল্লির বাদশার দূত হিসেবে। বাদশার কাছ থেকেই ‘রাজা’ উপাধি প্রাপ্তি।

যদিও, সাধারণ ইংরেজ জীবনের সঙ্গে রামমোহনের সখ্য গড়ে উঠতে সময় লাগল না। এখানেই এক অন্য ‘রামমোহন রায়’-এর জন্ম হয়। গল্পটা এ রকম: রেভারেন্ড ডি ডেভিসনের বাড়িতে গিয়েছেন এক দিন রামমোহন। সেখানে এক শিশুর নামকরণ অনুষ্ঠান চলছে। বাড়ির লোকের আবদার, নাম দিন রামমোহন। শিশুটিকে কোলে নিয়ে রামমোহন তার নাম দিলেন, ‘রামমোহন রায়’! আবার অভিনেত্রী ফ্যানি কেম্বলের মনে পড়ে, তাঁদের ‘ইজাবেলা’ নাটক দেখতে-দেখতে রামমোহনের চোখে জল আসার কথা।

ব্রিস্টলে থাকলে রামমোহন থাকতেন মিস কিডেল এবং মিস কাসেলের অতিথি হিসেবে, স্টেপলটন গ্রোভ-এর বাড়িতে। ১৮৩৩-এর ১৯ সেপ্টেম্বর সেখানেই জ্বর এল। ক্রমে তা বিকারে পরিণত হল। চিকিৎসক এলিসন সাহেবের দিনলিপি জানাচ্ছে, ২৬ তারিখ দেখা গেল, রামমোহন ধনুষ্টঙ্কারে আক্রান্ত। মুখ বেঁকে যাচ্ছে। ২৭ তারিখ রাত ২টো ২৫-এ তিনি মারা গেলেন। পূর্ণিমা রাতে।

রামমোহনকে শায়িত করা হল বাড়ি লাগোয়া এক জায়গায়। পরে, বন্ধু দ্বারকানাথ ঠাকুর আর্নোজ ভেল-এ রামমোহনের সমাধিক্ষেত্র স্থানান্তরিত করান। আর বহু দিন পরে তাঁর নাতি রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘হে রামমোহন, আজি শতেক বৎসর করি পার/ মিলিল তোমার নামে দেশের সকল নমস্কার।’

ঋণ: ১) ‘রামমোহন গ্রন্থাবলী’, ২) ‘মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়’, নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়,
৩) ‘রামমোহন ও তৎকালীন সমাজ ও সাহিত্য’: প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, ৪) ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড লেটারস অব রামমোহন রায়’, সঙ্কলন ও সম্পাদনা: সোফিয়া ডবসন কোলেট

উনিশ শতকের শহর। কলকাতার আকাশে শারদ-মেঘ। বড় বাড়ির পুজোর দালানে ব্যস্ততা। ওই বাড়ির এক বালক নিমন্ত্রণ করতে এসেছেন তাঁকে। শুনে বললেন, ‘বেরাদার (ভাই), আমায় কেন, রাধাপ্রসাদকে বলো।’ বক্তা, রাজা রামমোহন রায়। বালকটি, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে কি রামমোহন প্রচলিত ধর্ম-দ্রোহী? আদতে তাঁর দ্রোহ ধর্মের নামে চলে আসা নানা সংস্কার, পৌত্তলিকতা ও সামাজিক নানা কুপ্রথার বিরুদ্ধে। এই দ্রোহের জন্য গনগনে আগুনের আঁচ অবশ্য পরিবার, সমাজ, ধর্ম থেকে কম পাননি রামমোহন।

তখন বাংলায় বিলিতি বণিকদের সঙ্গে রফতানি-ব্যবসায় গজিয়ে ওঠা বাবু সম্প্রদায়ের হাতে কাঁচা টাকা। ঘরে-ঘরে দুর্গাপুজো। খানাপিনা আর বাইনাচ। ধীরে ধীরে শ্রীবৃদ্ধি মধ্যবিত্তের ‘বারএয়ারি’ পুজোরও। এই পরিবেশে দাঁড়িয়েই ধর্মের নামে জাতপাতের বিরুদ্ধে সরব হন তিনি। আর তাই ব্রাহ্মসমাজ-গৃহ যখন তৈরি করলেন, সেটির ন্যাস-পত্রে লিখলেন, ‘যে কোন প্রকার লোক হউক না কেন, যাহারা ভদ্রতাকে রক্ষা করিয়া পবিত্র ও নম্রভাবে বিশ্বস্রষ্টা বিশ্বপিতা অকৃত অমৃত অগম্য পুরুষের উপাসনার অভিলাষ করে, তাহারদের সমাগমের জন্য এই সমাজ-গৃহ সংস্থাপিত হইল।’ বাবু-কলকাতায় বাঙালির নম্রতা ও ভদ্রতা যেন এই প্রথম গুরুত্ব পেল।

মানুষটির জন্ম ২২ মে, ১৭৭২ (মতান্তরে ১৭৭৪)। সাবেক বর্ধমানের খানাকুল-কৃষ্ণনগরে। বাবা রামকান্ত রায়। মা তারিণীদেবী। সাবেক পদবি বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রপিতামহ কৃষ্ণচন্দ্র বাংলার স্বাধীন নবাবের দরবারে কাজ করে ‘রায়’ উপাধি পান। ছোটবেলা থেকেই নানা ঘটনায় দ্রোহী রামমোহনকে নিয়ে পরিবারে ঘোর দুর্বিপাক।

একটি জনশ্রুতি: বাপের বাড়ি এসেছেন তারিণীদেবী। সঙ্গে শিশু রামমোহন। পুজোর পরে দাদু শ্যাম ভট্টাচার্য শিশু রামমোহনকে পুজোর নৈবেদ্য বেলপাতা দিয়েছেন। খানিক বাদে দেখা গেল, রামমোহন তা চিবোচ্ছেন। ক্রোধে অধীর তারিণীদেবী রামমোহনকে থাপ্পড় মেরে বেলপাতা মাটিতে ফেলে বাবাকে তিরস্কার করলেন। রেগে গিয়ে মেয়েকে অভিশাপ বাবার: ‘তুই আমার বেলপাতা ফেলে দিলি? তুই এই ছেলেকে নিয়ে সুখী হবি না। এ ছেলে বিধর্মী হবে।’ সঙ্গে আশীর্বাদও: ‘এ পুত্র রাজপূজ্য এবং অসাধারণ লোক হবে।’

‘অসাধারণ’ এ ছেলে হল। কিন্তু মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কটিও ‘অ-সাধারণ’ই হয়ে দাঁড়াল কালে-কালে। পৌত্তলিকতার বিরোধিতা করছে ছেলে, সুতরাং মা ছেলেকে ত্যাগ করলেন। ভিটে ছেড়ে রামমোহন রঘুনাথপুরে শ্মশানভূমির উপরে বাড়ি তৈরি করলেন। সঙ্গে একটি মঞ্চও। তার চার পাশে লেখা: ‘ওঁ তৎসৎ’, ‘একমেবাদ্বিতীয়ং’। কিছু দিনের মধ্যেই দেখা গেল, রামনগর গ্রামের জনৈক সমাজপতি রামজয় বটব্যাল চার-পাঁচ হাজার লোক এনে ক্রমাগত মুরগির ডাক ডাকছেন বাড়ির চার পাশে। কখনও বা বাড়ির মধ্যে উড়ে আসে গরুর হাড়। কিন্তু রামমোহনের ধৈর্যে হার মানে সমাজপতির দল।

কিন্তু তারিণীদেবী হার মানার মতো মহিলা নন। তাই, তাঁর ‘ইন্ধনে’ জগন্মোহন রায়ের পুত্র গোবিন্দপ্রসাদ, সম্পর্কে রামমোহনের দাদার ছেলে, কাকার বিরুদ্ধে সম্পত্তি-সংক্রান্ত মামলা করে বসলেন সুপ্রিম কোর্টে। পরে অবশ্য রামমোহনের কাছে এ জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন গোবিন্দপ্রসাদ।

শুধু কি মামলা, বাপ-ছেলের সম্পর্কেও যেন দেওয়াল তোলেন তারিণীদেবী। এক বার খাজনা বাকির দায়ে রামমোহনের বাবা রামকান্ত হুগলি দেওয়ানি জেলে আটক হলেন। দাদা, জগন্মোহনও একই অভিযোগে মেদিনীপুর জেলে। রামমোহন তখন ঢাকায়। আচমকা, শুনলেন বাবার মৃত্যু সংবাদ। কিন্তু শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হল তিনটি। জেলেই শ্রাদ্ধ করেন জগন্মোহন। রামমোহনও আলাদা ভাবে তা করেন। আবার গয়না বন্ধক রেখে স্বামীর শ্রাদ্ধ করলেন তারিণীদেবীও! কারণ, ম্লেচ্ছ ছেলে রামমোহনের টাকা নেওয়া যাবে না। যদিও পরে মা-ছেলের সম্মিলনও ঘটে। ছেলেকে মা বলেন, ‘রামমোহন! তোমার মতই ঠিক্।’

কিন্তু রামমোহনের এই ম্লেচ্ছপনা অতি অল্প বয়স থেকেই শুরু। প্রথম দিকে বাড়ির রাধাগোবিন্দর মূর্তির প্রতি বেশ নিষ্ঠা দেখা গেল। এমনকি, কৈশোরে সন্ন্যাসী হতে মনস্থ করলেন। পরে গ্রামে এবং কাশীতে গিয়ে সংস্কৃত ও শাস্ত্র শিক্ষা, পটনায় থেকে আরবি শিক্ষা। পড়া হল ‘কোরান’।
সুফি-আদর্শ আর হাফেজ, রুমির কবিতাগুলি বড় ভাল লেগেছিল রামমোহনের। আবার সংস্কৃত শিক্ষার অনেকটাই পেয়েছিলেন নন্দকুমার বিদ্যালঙ্কারের কাছে, যিনি পরে হরিহরানন্দ অবধূত নামে পরিচিত হন।

রামমোহনের এ সব কর্মকাণ্ড ভাল চোখে দেখেননি বাবা রামকান্তও। ছেলের পৌত্তলিকতা বিরোধী, ‘হিন্দুদিগের পৌত্তলিক ধর্ম্মপ্রণালী’ বই প্রকাশের পরে সমস্যা আরও বাড়ে। ও সব সমস্যাকে বিশেষ আমল না দিয়ে সত্যের সন্ধানে ‘ভারতপথিক’ অবশ্য বেরিয়ে পড়েন দেশ ভ্রমণে। পরে যান তিব্বতেও। মূল উদ্দেশ্য ছিল, বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে জানা।

পালকি চলে

জানার প্রস্তুতি-পর্ব শেষ হলে, জানানোটাও জরুরি হয়ে উঠল রামমোহনের কাছে। ১৮১৪-য় কলকাতার মানিকতলায় লোয়ার সার্কুলার রোডের বাড়ি থেকে শুরু করলেন পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচার। অনুগামী ও শিষ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ল শত্রুসংখ্যাও। রামমোহন তাঁর নিজস্ব ধর্মভাবনা প্রচারের জন্য চারটি পথ নিলেন: কথোপকথন ও বিতর্ক, স্কুল প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষাদান, পুস্তক রচনা এবং সভা-সমিতির সংগঠন।

তবে এর আগেই ১৮০৩-এ আরবি শিরোনাম ও মুখবন্ধ-সহ ফার্সিতে বই লিখলেন ‘তুহ্ ফাৎ-উল-মুয়াহ্-হিদীন’। এই বইয়ের মূল প্রভাব, আরবীয় মোতাজল সম্প্রদায়ের যুক্তিবোধ ও ইউরোপীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর দার্শনিকদের একাংশের মতবাদ। এ দিকে, তিনি বেদান্তের নানা তত্ত্ব বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করতে থাকলেন। কিন্তু, তখন গোঁড়া সমাজ প্রশ্ন তুলল, ও শুনলে শূদ্র পাতক হবে যে! রামমোহনের উত্তর, ‘শ্রুতি, স্মৃতি, জৈমিনীসূত্র, গীতা, পুরাণ ইত্যাদি যখন পড়ুয়াদের পড়ান পণ্ডিতেরা, তখন বাংলায় তার ব্যাখ্যা করেন না? পঞ্চম বেদ এবং বেদার্থ নামে খ্যাত মহাভারতের শ্লোকগুলি শূদ্রের নিকট পাঠ করা হয় না?’ একে একে উপনিষদগুলির বঙ্গানুবাদ করতে থাকলেন তিনি। ঘটনাচক্রে, পরবর্তী সময়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিত্বেরাও উপনিষদের চর্চা করে বাংলা তথা দেশকে সমৃদ্ধ করেছেন।

১৮১৫-য় মানিকতলার বাড়িতে বাংলার ‘প্রথম বৌদ্ধিক-ক্লাব বা সমিতি’ ‘আত্মীয় সভা’র প্রতিষ্ঠা। পরে, সিমলা ষষ্ঠীতলার বাড়ি ঘুরে ফের সেই বাড়িতে। সেখানে বেদপাঠ করেন শিবপ্রসাদ মিশ্র। আর গোবিন্দ মাল পরিবেশন করেন ব্রহ্মসঙ্গীত। এ সব তথাকথিত অনাচারে দেশ খেপে উঠল। রামমোহন-সংসর্গ ত্যাগ করলেন জয়কৃষ্ণ সিংহ। কিন্তু সঙ্গেই রইলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, হলধর বসু, রাজনারায়ণ সেন প্রমুখ।

রামমোহনের ওই সভার এ সব কাজকর্ম ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ খানিক অতিরঞ্জিত হয়েই প্রকাশ পেল। তা উদ্ধৃত করে মাদ্রাজ গভর্নমেন্ট স্কুলের শিক্ষক শঙ্করশাস্ত্রী বললেন, রামমোহনের ‘আত্মীয় সভায় সঙ্গীত, বাদ্য ও নৃত্য হয়। চিত্তশুদ্ধির জন্য সভা করে এ সব করা শাস্ত্রানুযায়ী কাজ নয়। এটি নিকৃষ্ট আমোদ মাত্র।’ পাল্টা রামমোহন বললেন, ‘নৃত্য-সংবাদ অমূলক। কিন্তু পরমেশ্বরের উপাসনায় সঙ্গীত আবশ্যক। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য উপাসনার সময়ে সঙ্গীতের ব্যবস্থা করেছেন।’ স্মরণীয়, যাজ্ঞবল্ক্য জানিয়েছেন, ‘ঋক্‌সংজ্ঞক, গাথাসংজ্ঞক, পাণিকা ও দক্ষবিহিত গান, ব্রহ্মবিষয়ক এই চারি প্রকার গান অনুষ্ঠেয়। এই সকল মোক্ষসাধন সঙ্গীত অভ্যাস করিলে মোক্ষপ্রাপ্তি হয়।’ ঘটনাচক্রে, বাংলা ভাষায় ব্রহ্মসঙ্গীতের সৃষ্টিকর্তা রামমোহন। পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্ন লিখেছিলেন, “তাঁহার ব্রহ্মসঙ্গীত বোধহয়, পাষাণকেও আর্দ্র, পাষণ্ডকেও ঈশ্বরানুরক্ত ও বিষয়-নিমগ্ন মনকেও উদাসীন করিয়া তুলিতে পারে।”

কিন্তু উদাসীন হওয়া দূরঅস্ত্, বরং রামমোহনের ব্রহ্মের ধারণাকে নস্যাৎ করতে বাছা-বাছা ‘দুর্ব্বাক্য’-সহ এগিয়ে এলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। লিখলেন, ‘বেদান্তচন্দ্রিকা’। দাবি করলেন, পরমাত্মার দেহ আছে। রামমোহন নানা সূত্র দেখিয়ে প্রমাণ করলেন, ‘এ কথা বলা মানে, সব বেদকে তুচ্ছ করা’ এবং ফের বললেন পরমেশ্বর নিরাকার ও চৈতন্যস্বরূপ।

আর এক পণ্ডিতকেও যুক্তি-তর্কে পরাস্ত করেন রামমোহন। বিহারীলাল চৌবের বাড়িতে এক মহাসভা। প্রধান সমাজপতি রাজা রাধাকান্ত দেবের উদ্যোগে উপস্থিত দেশের বড়-বড় সব পণ্ডিত। সবারই উদ্দেশ্য, ব্রহ্মজ্ঞানী রামমোহনকে ঠেকাতে হবে। রামমোহনের প্রধান প্রতিপক্ষ, সুব্রহ্মণ্য শাস্ত্রী। তিনি শুরুতেই বাঙালির কৌলীন্য নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিলেন, ‘বঙ্গদেশে সদ্‌ব্রাহ্মণই নেই। তাই, এখানে বেদপাঠই উচিত নয়।’ কিছু ক্ষণের জন্য সভা স্তব্ধ। কিন্তু এ বার রামমোহন উঠে তাঁর যুক্তিজালে পরাস্ত করলেন শাস্ত্রী মহাশয়কে।

কিন্তু বার বার পরাস্ত হয়েও গোঁড়া পণ্ডিতসমাজ ছেড়ে দেয়নি রামমোহনকে। এমনকি, এ-ও শুনতে হল, রামমোহনের এ সব বেদান্ত-সংক্রান্ত লেখালিখির কারণেই না কি যশোরে ওলাউঠা হয়েছে। কাশিমবাজারে মহামারির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। যদিও, এর প্রকৃত কারণ ছিল, ভাগীরথীর গতিপথ বদলানো।

এ সব দ্রোহের কারণে মনে হতে পারে, রামমোহন হিন্দু শাস্ত্রের বিরোধী। কিন্তু, পাদ্রিদের হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতি বিষয়ে নানা ‘অপব্যাখ্যা’ সম্বলিত পত্রপত্রিকার বিরুদ্ধে ‘সম্বাদ কৌমুদী’-তে সরব হন এই রামমোহনই। আবার শ্রীরামপুরের এক পাদ্রি ‘সমাচার চন্দ্রিকা’য় হিন্দুশাস্ত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে চিঠি লিখলে, তারও পাল্টা দেন রামমোহন। পাশাপাশি, খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধেও কিছু কথা যুক্তি সহকারে পেশ করলেন ‘ব্রাহ্মণসেবধি’-তে। তাঁর বক্তব্য, হিন্দুশাস্ত্রের বিষয়ে খারাপ কথায় ভরা পুস্তিকা প্রচার, প্রকাশ্যে নিজ ধর্মের মাহাত্ম্য বর্ণন ও অন্য ধর্মের বিষয়ে নেতিবাচক কথাবার্তা বলা এবং গরিব মানুষকে প্রলোভিত করা— ‘যুক্তি ও বিচারসঙ্গত নহে।’ পাশাপাশি, মহামানব জিশুখ্রিস্ট ও খ্রিস্ট ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে পাঁচটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন পাদ্রিসাহেবদের দিকে। স্মরণীয়, বাইবেল পাঠ করার জন্য গ্রিক ভাষা ও ছ’মাস ধরে ইহুদি শিক্ষক রেখে হিব্রু-শিক্ষা করা ছিল রামমোহনের।

ঘটনাচক্রে, একটি অনুবাদকার্য নিয়ে পাদ্রি অ্যাডামসাহেব এবং রামমোহনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হল। কিন্তু, এর পরিণাম, ‘খ্রিস্টিয় ত্রিত্ববাদ’ (ক্রিশ্চিয়ান ট্রিনিটি) সম্পর্কে আর নিষ্ঠাবান থাকতে পারলেন না অ্যাডাম। হলেন ইউনিটারিয়ান। খ্রিস্টান মহলে তাঁর নতুন নাম
হল, ‘সেকেন্ড ফলেন অ্যাডাম’।

বাইবেল থেকে খ্রিস্ট-উপদেশ সংগ্রহ করে ‘প্রিসেপ্টস, অব জেসাস, গাইড ট্যু পিস অ্যান্ড হ্যাপিনেস’ নামে একটি বই প্রচার করেন রামমোহন। কিন্তু এর বিরোধিতা করে মার্শম্যানসাহেব জানালেন, এতে খ্রিস্টের ঈশ্বরত্ব, অলৌকিক বিষয়গুলি নেই। মার্শম্যানের বক্তব্যের অসারতা তুলে ধরে এর পাল্টা হিসেবে তিনটি ‘অ্যাপিল’ পুস্তিকা বার করেন তিনি। এর পরে মার্শম্যান পরাজিত হন। ‘ইন্ডিয়া গেজেট’ এই ঘটনা সম্পর্কে লিখল, ‘‘এই বিচারে দেখা গেল, রামমোহন রায় এ দেশে এখনও তাঁহার সমতুল্য লোক খুঁজে পাননি।’’

এমন ‘সমতুল্য’ লোক বোধহয় দেখেননি উইলিয়াম ডিগবিও। এক বার তাঁর কাছে চাকরি চেয়ে আবেদন জানালেন রামমোহন। কিন্তু শর্ত রাখলেন, কর্মসূত্রে ডিগবির সঙ্গে দেখা করতে এলে, তাঁকে উপযুক্ত আসন দিতে হবে। অন্যদের প্রতি যে সব হুকুম জারি করা হয়, তা তাঁর ক্ষেত্রে চলবে না। সাহেব খানিক অবাক। কিন্তু তাঁর জহুরির চোখ। ওই শর্ত অনুযায়ী আইনি-লেখাপড়া হল! পরে এই দু’জনের সখ্য গভীর হয়। চাকরিসূত্রে রামগড়, ভাগলপুর ও রংপুরে ছিলেন রামমোহন। ভাগলপুরে একটি ঘটনা ঘটে। রামমোহনের পালকি চলেছে। পথের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কালেক্টর স্যর ফ্রেডারিক হ্যামিলটনের দৃশ্যটা সহ্য হল না। পালকি থামাতে বললেন। শেষে ঘোড়া ছুটিয়ে রামমোহনের পথ আটকালেন। রামমোহন বললেন, ‘আমি আসলে আপনাকে দেখতে পাইনি।’ কিন্তু তাতেও অপমানের মাত্রা কমল না। শেষে রামমোহন পালকি নিয়ে চলে গেলেন। গোটা ঘটনা বড়লাট লর্ড মিন্টোকে চিঠিতে জানালেন। বড়লাট খুব এক চোট বকাবকি করলেন কালেক্টরকে।

সতীদাহের বিরুদ্ধে

ধর্ম-আন্দোলনের পাশাপাশি, রামমোহনের জীবনের অন্যতম সামাজিক কাজ সতীদাহ নিবারণ। কিন্তু এ বিষয়ে কথা বলার আগে একটু পিছন ফিরে তাকাতে হয়। নারীর প্রতি রামমোহনের মমত্ববোধের
কারণগুলি কী?

ঘটনা এক: রামমোহন তখন তিব্বতে। এখানে বেশির ভাগ বাসিন্দা লামা উপাধিধারী মানুষকেই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা ভাবেন। তিনি এর বিরোধিতা করে জনতার রোষানলে পড়লেন। কিন্তু এখানকার নারীদের স্নেহে তিনি বেঁচে ফেরেন। এই ঘটনা জীবনভর রামমোহন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে
স্মরণ করেছেন।

ঘটনা দুই: ধু-ধু করে জ্বলছে আগুন। নিথর স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীকে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাঁর আর্তনাদ ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বাজছে কাড়া-নাকাড়া, ঢাক-ঢোল। স্ত্রী যাতে পালাতে না পারে, সে জন্য তাঁর বুকে দু’দিক বাঁশ চেপে রেখেছে যমদূতের ন্যায় দু’জন। এ সব বর্ণনা সংবাদপত্রে আকছার। রামমোহন ঠিক করলেন, এ তিনি বন্ধ করবেনই।

ঘটনা তিন: রামমোহনের বাড়িতেই ঘটল একটি সহমরণের ঘটনা। তাঁর বড় ভাই জগন্মোহনের দ্বিতীয়া স্ত্রী অলকমণি দেবী ১৮১০-এর ৮ এপ্রিল সহমরণে যান। এই বিষয়টি আরও দৃঢ়সঙ্কল্প করে তোলে রামমোহনকে।

এই সমস্ত ঘটনাপ্রবাহেরই বোধহয় ফলশ্রুতি, ১৮১৮-য় প্রথম আবেদনপত্র। রামমোহনের মনে হল সতীদাহ আদতে ‘জ্ঞানপূর্ব্বক স্ত্রীহত্যা।’ লিখলেন ‘সহমরণ বিষয় প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের সম্বাদ।’ পরের বছর ওই নামেই ‘দ্বিতীয় সম্বাদ’। বেশ কয়েক বছর পরে তৃতীয় বই, ‘সহমরণ বিষয়’-এ তৃতীয় প্রস্তাব। সতীদাহ বন্ধে রামমোহনের তিনটি প্রধান যুক্তি ছিল: ১. শাস্ত্রানুযায়ী পতির অনুগমন অবশ্য-কর্তব্য নয়। ২. শাস্ত্রে কিছুর জন্য কাজকে অর্থাৎ ‘কাম্যকর্ম্ম’ নিন্দা করা হয়েছে। এ অপেক্ষা ব্রহ্মচর্য শ্রেয়। ৩. শাস্ত্রের বিধানে স্বাধীন ভাবে সহমৃতা হওয়া আবশ্যক। কিন্তু তা হচ্ছে না, বলপ্রয়োগ হচ্ছে। তাই এ প্রথা অবশ্যই তুলে দেওয়া দরকার। ১৮১৯-এর অগস্টে সরকারের কাছে ফের আবেদনপত্র পাঠালেন রামমোহন।

সতীদাহের ঘটনায় বলপ্রয়োগের নিদর্শনগুলি পাওয়া যায় জেমস পেগ্‌সের ‘দ্য সতীস ক্রাই টু ব্রিটেন’, ফ্যানি পার্কসের বইগুলিতে। ১৮২৩-এ পুলিশের প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে ৫৭৫টি সতীদাহের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ৩২ জনের বয়স ২০ বছরেরও নীচে, ২০৮ জনের ২০ থেকে ৪০ বছর বয়স।

পাশাপাশি, রামমোহন স্বয়ং নানা ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে এই কুপ্রথা রোধের চেষ্টা করেন। এক বার শুনলেন বীরনৃসিংহ মল্লিকের পরিবারের কেউ সহমৃতা হওয়ার জন্য গঙ্গাতীরে এসেছেন। রামমোহন ছুটে গিয়ে এর অসারতা বোঝাতে লাগলেন। শুনলেন, ‘হিন্দুর কার্যে মুসলমান কেন?’ এক বার কালীঘাটেও ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু সফল হননি। এ দিকে, সতীদাহের সমর্থনে একশো পাতার বই পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। এই সব বাদ-বিবাদের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯-এর ৪ ডিসেম্বর এই কুরীতি তুলে দিলেন।

কিন্তু এর ফলে ‘ধর্মসভা’র ক্রোধে ধর্মচ্যুত ও কার্যত একঘরে হলেন রামমোহন। তবে, তার পরেও বার বার হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহ নিবারণ, কন্যাপণের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন। ঘটনাচক্রে, রামমোহনের নিজের কিন্তু তিন স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী
মারা যান। এর পরে, কুড়মুন-পলাশির শ্রীমতীদেবী ও পরে ভবানীপুরের উমাদেবীর সঙ্গে বিয়ে। অনেকের মতে, বিধবাবিবাহের সপক্ষে ছিলেন না রামমোহন। কিন্তু তা ঠিক নয়। এক জায়গায় স্পষ্টত লিখছেন, “...তন্ত্রবচনানুসারে... বিধবার পুনর্ব্বার বিবাহ উচিত...।”

এক পেগ এক কড়ি

রামমোহন এমন ধারারই। প্রচলিত মতের উল্টো কথা বলেন। বাবু ও বিলিতি, উভয় সম্প্রদায় সুরাপানে অভ্যস্ত হলেও তা সম্পর্কে জনমানসে নেতির ধারণা ছিল। কিন্তু রামমোহন ‘কায়স্থের সহিত মদ্যপানবিষয়ক বিচার’-এ মদ্যপানকে সমর্থনই করেছেন। তবে বাবুদের সঙ্গে রামমোহনের পার্থক্য তাঁর মাত্রাবোধে। শোনা যায়, সুরাপানের সময়ে এক-একটি পেগ পিছু একটি করে কড়ি রাখতেন। নির্দিষ্ট সংখ্যক কড়ি হলেই আর তিনি তা ছুঁতেন না। এক বার এক বন্ধু কয়েকটি কড়ি সরিয়ে রাখলেন মজা করতেই। ফলে, একটু মাত্রা বেড়ে গেলে পানের। কিন্তু, তা টের পেলেন রামমোহন। বলে উঠলেন, ‘বরং পণ্ডিত শত্রু ভাল। মূর্খ বন্ধু
ভাল নয়।’

একটা সময় ইংরেজিতে শিক্ষার বদলে সংস্কৃত ও ফার্সি শিক্ষার বিষয়ে সমাজপতিরা উঠেপড়ে লাগলে, সেটাও যেন ‘মূর্খামি’ হিসেবেই দেখেন রামমোহন। বড়লাট লর্ড আমহার্স্টকে তিনি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ-ও জানান, এর অর্থ, সরকার দেশবাসীকে ‘অজ্ঞতার অন্ধকারে’ রাখতে চাইছে। আসলে তিনি জানতেন ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বুদ্ধির প্রবেশ ঘটবে বাঙালির ঘরে। তাই আলেকজান্ডার ডাফ সাহেবের ইংরেজি স্কুলের জন্য নিজের ব্রাহ্মসমাজের ঘর দেন রামমোহন। ১৮২২-এ নিজেই ইংরেজি শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি, সাধারণপাঠ্য বাংলা গদ্যগ্রন্থের অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। একটি অমর কীর্তি, ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’। পাশাপাশি, বাংলায় কমা, সেমিকোলন, জিজ্ঞাসাবোধক চিহ্ন ব্যবহারে বাংলা গদ্যকে কৈশোরে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। লিখেছেন ‘জ্যাগ্রাফি’ (ভূগোল), ‘খগোল’ (জ্যোতির্বিদ্যার বই), জ্যামিতি সংক্রান্ত বইপত্রও।

কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার সমর্থক মানেই কিন্তু ইংরেজ সরকারের সব কাজকেও সমর্থন করেননি দ্রোহী রামমোহন। ১৮২৩-এর ৩১ মার্চ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণে আইন করল সরকার। বিরোধিতায় রামমোহন-সহ অন্যেরা ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জর্জের কাছে আবেদনপত্র পাঠালেন। তাতেও লাভ না হওয়ায় তাঁর ফার্সি পত্রিকা ‘মিরাৎ-উল্-আখ্‌বার’ পত্রিকার প্রকাশই বন্ধ করে দেন।

বিলেতে এক রাজা

ইংরেজ সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রোহ ঘোষণা করলেও, তাঁদের দেশটি দেখার বড় সাধ হয় রামমোহনের। ১৮৩০-এর ১৫ নভেম্বর, সোমবার পালিত পুত্র রাজারাম, রামরত্ন মুখোপাধ্যায়, রামহরি দাস আর দু’টি গাভীকে নিয়ে উঠলেন ‘আলবিয়ান’ জাহাজে। জাহাজের দিনগুলি বেশ কঠিন। কিন্তু ঝড় উঠলেই জাহাজের ডকে চলে আসেন রামমোহন, সমুদ্রের রুদ্ররূপ দেখতে। এক দিন জাহাজ উত্তমাশা অন্তরীপে নোঙর ফেলল। তীরে যেতে গিয়ে, পড়ে গিয়ে পা ভাঙল রামমোহনের। কিন্তু ওই অবস্থাতেও শুনলেন দু’টি ফরাসি জাহাজ এসেছে। সে দু’টির মাথায় পতপত করছে উপপ্লবের পতাকা। ঘটনাচক্রে, এর কিছু দিন আগেই ফ্রান্সে ঘটে গিয়েছে ‘জুলাই বিপ্লব’। দেখতে গেলেন রামমোহন। সে জাহাজ ছাড়ার সময়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘গ্লোরি, গ্লোরি, গ্লোরি টু ফ্রান্স’। পরে ফ্রান্সে গিয়ে সম্রাট লুই ফিলিপের ভোজসভায় যোগদান, কবি টমাস মুরের সঙ্গে সখ্য রামমোহনের ফরাসি-মুগ্ধতারই সাক্ষ্য দেয়।

চার মাস তেইশ দিন পরে লিভারপুলে পৌঁছে হোটেলে উঠলেন রামমোহন। আলাপ হল পণ্ডিত উইলিয়াম রস্কোর সঙ্গে। লন্ডন যাওয়ার পথে ম্যাঞ্চেস্টারে রামমোহন দেখলেন কারখানা, শিল্প-বিপ্লবের যন্ত্র। ইংল্যান্ডে জেরেমি বেনথামের সঙ্গে, ইংল্যান্ডের অধীশ্বরের সঙ্গে দেখা, রাজা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভোজসভায় যোগদান, নানা ঘটনায় দিনগুলি কাটতে থাকে। ইউনিটারিয়ান খ্রিস্টানরাও রামমোহনের সম্মানে সভার আয়োজন করলেন। সেখানে ‘দ্য ওয়েস্টমিনস্টার রিভিউ’-এর সম্পাদক স্যর জন বউরিং তাঁর বক্তৃতায় বললেন, ‘প্লেটো, সক্রেটিস, মিলটন বা নিউটন হঠাৎ এসে উপস্থিত হলে যেমন মনের ভাব হবে, আজ রামমোহন রায়ের অভ্যর্থনায় হাত বাড়িয়ে সেই অনুভব করছি।’ এই পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ‘ইউটোপিয়ান সোশ্যালিজ়ম’-এর অন্যতম প্রবক্তা রবার্ট ওয়েনের সঙ্গে রামমোহনের তত্ত্বগত বিতর্ক।

তবে এ সব ঘটনায় কোথাও মনে করার অবকাশ নেই, রামমোহন ইংল্যান্ড-আপ্লুত হয়ে যান। বরং ইংল্যান্ডে এসে ভারতবাসীদের সরকারি কাজে পদোন্নতি, এক জন ইউরোপীয় বিচারকের সঙ্গে দেশীয় বিচারক নিয়োগের প্রস্তাব দেন পার্লামেন্টারি কমিটির কাছে। ঘটনাচক্রে, ইংল্যান্ডের রাজসভায় রামমোহন যান দিল্লির বাদশার দূত হিসেবে। বাদশার কাছ থেকেই ‘রাজা’ উপাধি প্রাপ্তি।

যদিও, সাধারণ ইংরেজ জীবনের সঙ্গে রামমোহনের সখ্য গড়ে উঠতে সময় লাগল না। এখানেই এক অন্য ‘রামমোহন রায়’-এর জন্ম হয়। গল্পটা এ রকম: রেভারেন্ড ডি ডেভিসনের বাড়িতে গিয়েছেন এক দিন রামমোহন। সেখানে এক শিশুর নামকরণ অনুষ্ঠান চলছে। বাড়ির লোকের আবদার, নাম দিন রামমোহন। শিশুটিকে কোলে নিয়ে রামমোহন তার নাম দিলেন, ‘রামমোহন রায়’! আবার অভিনেত্রী ফ্যানি কেম্বলের মনে পড়ে, তাঁদের ‘ইজাবেলা’ নাটক দেখতে-দেখতে রামমোহনের চোখে জল আসার কথা।

ব্রিস্টলে থাকলে রামমোহন থাকতেন মিস কিডেল এবং মিস কাসেলের অতিথি হিসেবে, স্টেপলটন গ্রোভ-এর বাড়িতে। ১৮৩৩-এর ১৯ সেপ্টেম্বর সেখানেই জ্বর এল। ক্রমে তা বিকারে পরিণত হল। চিকিৎসক এলিসন সাহেবের দিনলিপি জানাচ্ছে, ২৬ তারিখ দেখা গেল, রামমোহন ধনুষ্টঙ্কারে আক্রান্ত। মুখ বেঁকে যাচ্ছে। ২৭ তারিখ রাত ২টো ২৫-এ তিনি মারা গেলেন। পূর্ণিমা রাতে।

রামমোহনকে শায়িত করা হল বাড়ি লাগোয়া এক জায়গায়। পরে, বন্ধু দ্বারকানাথ ঠাকুর আর্নোজ ভেল-এ রামমোহনের সমাধিক্ষেত্র স্থানান্তরিত করান। আর বহু দিন পরে তাঁর নাতি রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘হে রামমোহন, আজি শতেক বৎসর করি পার/ মিলিল তোমার নামে দেশের সকল নমস্কার।’

ঋণ: ১) ‘রামমোহন গ্রন্থাবলী’, ২) ‘মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়’, নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়,
৩) ‘রামমোহন ও তৎকালীন সমাজ ও সাহিত্য’: প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, ৪) ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড লেটারস অব রামমোহন রায়’, সঙ্কলন ও সম্পাদনা: সোফিয়া ডবসন কোলেট

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement