×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ জুন ২০২১ ই-পেপার

স্বরূপ

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়
০৬ জুন ২০২১ ০৭:১০
ছবি: বৈশালী সরকার

ছবি: বৈশালী সরকার

সন্ধে। অফিসফেরত সজল বাড়ির ঠিক এক মিনিট দূরত্বে। একটা দৃশ্য দেখে থমকে গেল পা। উঠে যাচ্ছে নাকি তাদের বাড়ির পাশের ভাড়াটে দত্তরা? তেমনটাই তো মনে হচ্ছে। দুটো বাড়িই একতলা। মাঝে এক লাফে বেড়াল-পার-হওয়া গলি। গলির শেষে বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ম্যাটাডোর। দত্তদের জিনিসপত্র সেখানে তুলছে দুটো লোক। সুটকেস, কম্পিউটার টেবিল, আরও সব ছোটখাটো মালপত্র তোলা হচ্ছে গাড়িতে। অরণি দত্ত আর তার গিন্নি তদারকি করছে। ওদের বাচ্চা মেয়েটা উত্তেজিত হয়ে ছুটোছুটি করছে... দৃশ্যটা পরম স্বস্তি দিচ্ছে সজলকে। মনে হচ্ছে গা বেয়ে ফ্রিজের জল নামছে।

সজল এখনই বাড়ি ঢুকবে না। সে দুটো বাড়ির মাঝে সেঁধিয়ে যায়। এখান থেকে দত্তদের চলে যাওয়াটা চোখ ভরে দেখবে।

দত্তরা চলে যাওয়ার পর বাড়ি ঢুকল সজল। যা ভেবেছিল তাই, কুন্তলার চোখমুখ থমথমে। হাঁটাচলা শ্লথ। বিকেলের প্রসাধন সারেনি, শাড়িটাও পাল্টায়নি। আচ্ছা, কুন্তলা কি আজই জানল দত্তরা চলে যাচ্ছে? আগে জেনে থাকলে ক’দিন ধরেই মুড অফ থাকত ওর। কালও তো দিব্যি ছিল মেজাজ। রোজকার মতোই ফল্‌স কাশছিল। ওটা আসলে সিগন্যাল। কাশির উত্তর কাশি দিয়েই দিচ্ছিল অরণি দত্ত। তা হলে কি অরণি দত্ত কুন্তলাকে অন্ধকারে রেখে কেটে পড়ল? ভয় পাচ্ছিল, যদি কুন্তলা আগেভাগে কোনও বাগড়া দেয়! যাওয়ার সময় তো পথ আগলে দাঁড়াতে পারবে না। পাড়ার মধ্যে তা হলে একটা বড় নাটক তৈরি হবে।

Advertisement

বাথরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসে ছেলের কাছে বসল সজল। এটা সজলের বাবার ঘর। বাবা মারা যাওয়ার পর ছেলে অংশুর পড়ার ঘর হয়েছে। খাটে বসে পড়ছে অংশু। ক্লাস ফোর। অফিস থেকে ফিরে সজল রোজ অংশুকে পড়ায়। মুড়িমাখা নিয়ে এল কুন্তলা। মুখটা এখনও থমথমে। সজল মুড়ির বাটি হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “দত্তরা কোথায় গেল?”

“আমি কী করে জানব!” বিরক্তির গলায় জবাব দিল কুন্তলা।

এক মুঠো মুড়ি মুখে তুলে সজল নরম গলায় বলে, “অরণি দত্তর বৌ তোমায় কিছু বলেনি! পাশাপাশি বাড়ি আমাদের।”

“পাশাপাশি বাড়ি মানেই যে আমরা সমকক্ষ, তা তো নয়। ওদের স্টেটাস অনেক উঁচুতে।”

অংশু বলে ওঠে, “মেঘারা কোথায় যাবে আমি জানি। আমাকে বলেছে মেঘা।”

মেঘা দত্তদের মেয়ে। সজল ছেলের কাছে জানতে চায়, “কোথায় গেছে ওরা?”

“সল্টলেক। ওদের নতুন বাড়ি। বলেছে আর কোনও দিন আসবে না এখানে।”

ঘর ছেড়ে চলে গেল কুন্তলা। এখন রান্নাঘরে সজলের জন্য চা, রাতের রুটি-তরকারি করবে। মুড়ি খেতে খেতে সজল ছেলেকে বলে, “দেখি, কী অঙ্ক করছিস?”

অংশু খাতা দেখায়। সংখ্যাগুলো ফোন নম্বরের মতো লাগে। অরণি দত্তর ফোন নম্বর কি কুন্তলার কাছে আছে? তা হলে তো যোগাযোগ থেকেই যাবে। অর্থাৎ ওরা উঠে গেলেও স্বস্তির কিছু নেই।

গোপনে এক বার ফোন নাম্বার দিতে চেয়েছিলেন অরণিবাবু। কুন্তলা নেয়নি। সে দিন মেঘার জন্মদিন ছিল। ডিনারে নেমন্তন্ন ছিল কুন্তলাদের। গল্পগুজব, কেক কাটার ফাঁকে অরণিবাবু লুকিয়ে একটা চিরকুট এগিয়ে ধরছিলেন, কুন্তলা বুঝতেই পারছিল ওটা ফোন নম্বর। না নিয়ে হেসে সরে গিয়েছিল। সম্পর্কটায় একটা সীমানা টেনেছিল কুন্তলা। তার একটা স্থিতিশীল সংসার আছে। অরণিবাবুরও তাই। দুই দাম্পত্যেই একটি করে সন্তান। এই বয়সে বেখেয়ালি প্রেম মানায় না। তা ছাড়া বাড়াবাড়ি করলে অরণিবাবুর বউ সোমা ভীষণ রিঅ্যাক্ট করবে। ডাকাবুকো মেয়ে। এত দিন অরণিবাবুর সঙ্গে যে ইঙ্গিতে যোগাযোগ রাখছিল কুন্তলা, সোমা সম্ভবত টের পায়নি। ও থাকত ওদের বাড়ির পিছনের দিকে, যেখানে কিচেন, বেডরুম। অরণিবাবু থাকতেন সামনের ড্রইংরুমে এবং বারান্দায়। উনি পেশায় চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। অফিস থেকে ফেরেন সজল আসার আগেই। ড্রইংরুমে বসে পার্সোনাল কাজগুলো করেন। ওঁকে অন্যমনস্ক করার জন্য কুন্তলা গলা খাঁকারি দেয়। উনিও ওই ভাবেই জবাব দেন। তবে ফোন নাম্বারের চিরকুট যে দিন নেয়নি কুন্তলা, তার পর দু’দিন টানা কেশেও উত্তর পায়নি অরণির। কুন্তলার নাছোড় কাশি শুনে এক সময় উত্তর দিয়েছিলেন। এ দিকে কুন্তলাকে অত কাশতে দেখে সজল কাশির ওষুধ নিয়ে এসে হাজির। অরণির সাড়া না পেয়ে কুন্তলার মাথা তখন গরম। সজলকে বলেছিল, “কে বলল তোমাকে কাশির ওষুধ আনতে?”

“ক’দিন খুব কাশছ, তাই নিয়ে এলাম!” বলেছিল সজল।

কুন্তলা তখন বলে, “তুমি তো জানো গলা খাঁকারি দেওয়া আমার মুদ্রাদোষ। সেটা না হয় একটু বেড়েছে। তার জন্য ওষুধ নিয়ে আসতে হবে! আমার কাশির শব্দে এত অসুবিধে হচ্ছে তোমার!”

সজল মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। একেবারেই নিরীহ মানুষ। ও জানে কার জন্য কাশে কুন্তলা। বাড়িতে বসেই কাশির আদানপ্রদান শোনে অসহায় ভাবে। এক দিন শুধু দত্তদের বাড়ির দিকের জানলা দুটো বন্ধ করে দিয়েছিল। কুন্তলা বলেছিল, “জানলা বন্ধ করলে কেন?”

সজল বলল, “জোলো হাওয়া আসছে। কাশি হচ্ছে তোমার।”

“সংসার করতে করতে দমবন্ধ হয়ে কাশি আসছে। তোমার বাড়িতে কি স্বাধীন ভাবে কাশাও যাবে না?” কুন্তলার ঝাঁঝালো মন্তব্য শুনে সেই যে জানলা খুলে দিয়েছিল সজল, আর কোনও দিন জানলা কিংবা কাশি, কোনওটাই বন্ধ করতে যায়নি। কোনও স্বামী যে এত ভয়েসলেস হয়, জানা ছিল না কুন্তলার। বিয়ের পর থেকে সজলকে এ রকমই দেখে আসছে। এ ব্যাপারে মাকে প্রথম দিকে এক বার অনুযোগ করেছিল কুন্তলা। বলেছিল, “সরকারি চাকরি দেখে যার গলায় আমায় ঝুলিয়ে দিলে, সে একটা ম্যাদামারা মানুষ। এ সব লোককে বর ভাবতে অসুবিধে হয়। এতটুকু স্মার্টনেস নেই। মল-মাল্টিপ্লেক্স কিংবা কোনও উৎসব-অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ারও যোগ্য নয়। আমার কপালটা পুড়ল।”

মায়ের উত্তর ছিল, “সজল আসলে নিখাদ ভালমানুষ। ওর এই ভাল স্বভাবটাই তোর কাছে দোষের হয়ে গেল। তোরা আজকালকার মেয়েরা ঠিক কী চাস, বোঝা ভার!”

কুন্তলা কিন্তু সজলের ভালত্বটা অস্বীকার করে না। তার মনে হয়েছে, বেচারা সজল অনেক অভাবের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছে। শ্বশুরমশাই ছিলেন প্রাইভেট কোম্পানির পিওন। লেখাপড়ায় ভাল সজল সরকারি চাকরি পেয়ে দিদির বিয়ে দেয়, টালির চালের বাড়ি পাকা করে। দারিদ্রপীড়িত অতীত ও ভুলতে পারে না। তাই সঙ্কুচিত হয়ে থাকে। এ দিকে কুন্তলাকে এ সব সমস্যায় পড়তে হয়নি। তাদের সংসারে প্রাচুর্য না থাকলেও, অভাব ছিল না। বাড়ি সেন্ট্রাল ক্যালকাটায়। দৌড়ে বাস-ট্রাম ধরে স্কুল-কলেজ গেছে। আড্ডা মেরেছে পার্কে, কফি হাউসে। শপিং করেছে নিউ মার্কেটে, গড়িয়াহাটে। কলেজ বাঙ্ক করে সিনেমা। জীবনযাত্রায় চোরাগোপ্তা উৎসব মিশে থাকত। বিয়ে হল কলকাতা থেকে চল্লিশ মিনিট দূরের মফস্‌সলে। রাজনগর। এখানে সময় চলে গড়িয়ে গড়িয়ে। মানুষের মধ্যেও ঢিলেঢালা আলসেমি। খুব বোরিং কাটছিল। বছরদুয়েক হল অরণিবাবুরা এল পাশের বাড়িতে। মানুষটার অভিজাত চেহারা দেখেই স্থির হয়ে থাকা মনে ঢেউ উঠেছিল কুন্তলার। নজর পড়ে থাকত ও বাড়ির দিকে। বারান্দায় পায়চারি করত অরণিবাবু। তখন থেকেই শুরু ইঙ্গিতময় দৃষ্টি বিনিময়। কাশি নিয়ে খেলাটা যে কবে শুরু হল, এখন আর খেয়াল নেই কুন্তলার। অরণিবাবুর গাড়ি আছে। খাওয়াদাওয়ায় ওদের সাহেবি মেনু। ঘরে সব সময় রুম ফ্রেশনার দেওয়া থাকে। এমন কারও সঙ্গে তো বিয়ে হতে পারত কুন্তলার, তা না হয়ে এক ছাপোষার সঙ্গে ঘর করতে হচ্ছে। তবু সজল ছাপোষা বর, মাতাল অত্যাচারী নয় বলে মোটামুটি মেনেই নিয়েছে কুন্তলা। অরণিবাবু তার কাছে ছিল শ্বাস নেওয়ার বারান্দা। কোনও এক বিখ্যাত লেখক, নাকি দার্শনিক বলেছেন না, প্রত্যেক বিবাহিতের খুব সামান্য হলেও একটা অন্য সম্পর্ক থাকা দরকার, তাতে দাম্পত্যও ভাল থাকে। অরণিবাবুও বুঝে গিয়েছিলেন কুন্তলার চাহিদা বেশি কিছু নেই। তবু কেন এমন না জানিয়ে চলে গেলেন? উনি কি এর চেয়ে বেশি কিছু চেয়েছিলেন? তাই অপমান দিয়ে অভিমানের বদলা নিলেন?

“কী হল, তোমার কি শরীর খারাপ?” সজলের ডাকে চমকে উঠে পিছন ফেরে কুন্তলা। ফের সজল বলে, “সেই কখন রান্নাঘরে এসেছ, কোনও সাড়াশব্দ নেই। এখনও চা দিলে না!”

মুহূর্তে মুখচোখে রাগ জমা হয় কুন্তলার। বলে, “শরীর খারাপ বলছ কেন? আসলে তো জানতে চাইছ মনখারাপ কি না?”

ছায়া নামে সজলের মুখে। সরে যায় রান্নাঘরের দরজা থেকে।

*****

অরণিবাবুরা চলে গেছে পাঁচ দিন হল। অধ্যায়টা ভুলতে চেয়েছিল কুন্তলা। একটা অদ্ভুত ঘটনায় ভোলা সম্ভব হচ্ছে না। কাউকে বলাও যাচ্ছে না সেটা। সম্পর্কটাই তো গোপন। লোকের চোখে অন্যায়। ওরা চলে যাওয়ার পর দু’দিন সোমার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং অ্যাকাউন্টের স্টেটাস চেক করেছিল কুন্তলা। কেমন বাড়িতে গেছে? বাড়ি না ফ্ল্যাট? কোনও হদিসই পাওয়া গেল না। কোনও আপডেট দেয়নি। অরণিবাবু সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এ নেই। ওদের তাই ভুলতেই হচ্ছিল। কেন জানি মনে হচ্ছিল, এ ভাবে না বুঝতে দিয়ে চলে যাওয়াটা অসলে সোমার প্ল্যান। বোধহয় টের পেয়েছিল অরণিবাবুর সঙ্গে কুন্তলার সমঝোতাটা। তৃতীয় দিন ঘটল আশ্চর্য ঘটনাটা। কুন্তলা শুনতে পেল অরণিবাবুর কাশির শব্দ। প্রথমে তো চমকে উঠেছিল। দৌড়ে দেখতে গিয়েছিল ওরা ফিরে এল কি না! জানলা দিয়ে দেখল বাড়িটায় তালা দেওয়াই আছে। কিন্তু সময়, পরিবেশ সব একই! ওদের বাড়ির ছাদে ফুরিয়ে আসা বিকেলের আকাশ। পাখির ঝাঁক ফিরে যাচ্ছে বাসায়। কী মনে হতে কুন্তলা এক বার গলা খাঁকারি দিয়েছিল। ও মা, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল কাশির উত্তর! হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল কুন্তলার। আর কাশার সাহস দেখায়নি। পরের দিন আবার কাশির শব্দ পাওয়া গেল। বার বার। একটু যেন অধৈর্য। উত্তর চাইছে। আজ আবার কাশির শব্দ পেয়েছে কুন্তলা। দেখে এসেছে ওদের বাড়ি আগের মতোই বন্ধ। বারান্দার গ্রিলে তালা ঝুলছে। ভাল করে বোঝার জন্য আজ এক বার কাশল কুন্তলা। ফের উত্তর। আগেকার দিনগুলোর মতোই। কুন্তলার কোথাও কী কোনও ভুল হচ্ছে? সন্ধে নেমে গেছে। অংশু পড়া মুখস্থ করছে ভিতর ঘরে। সজল এখনও ফেরেনি অফিস থেকে। সময় হয়ে গেল। ওকে সমস্যার কথাটা বলতে হবে। তবে একটু ঘুরিয়ে। আর কাকেই বা বলবে এখানে! সজলই তো সব চেয়ে কাছের লোক। আজ এখনও ঘরে সন্ধে দেওয়া হয়নি, চুল আঁচড়ানো, কাপড় পাল্টানো কিছুই হয়নি। অরণিবাবু চলে যাওয়ার পর থেকে বিকেলবেলাটায় সাজতে-গুজতে আর ইচ্ছে হয় না।

সজল অফিস থেকে ফিরেছে। মুড়ি-চা খেতে খেতে ছেলের পড়া দেখছে। ঘরটার দরজায় দাঁড়িয়ে কুন্তলা সজলকে বলে, “এক বার এ ঘরে এস। কথা আছে।”

চায়ের কাপ হাতে নিয়েই উঠে আসে সজল। ঘরে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চায়, “কী হয়েছে?”

কুন্তলা বসে পড়ে বিছানায়। খানিক বিধ্বস্ত গলায় বলে, “আমার ক’দিন ধরে একটা প্রবলেম হচ্ছে।”

“কী প্রবলেম?”

“আমি না অতীতের কিছু কথা, শব্দ মাঝে মাঝে শুনতে পাচ্ছি।”

“ভয়ের কিছু? খারাপ স্মৃতি?”

“না, ভাল। আনন্দের অভিজ্ঞতা।”

একটু চুপ থেকে সজল কী যেন ভাবে। তার পর মাথা নেড়ে বলে, “বুঝেছি। তোমার সমস্যাটা অনেকটা আমাদের অফিসের বসাকদার মতো। বসাকদা মাঝে মাঝেই পকেট থেকে মোবাইল বার করে দেখে কে ফোন করেছে, অথচ ফোনটা বাজেইনি। আমার পাশের সিটেই বসে বসাকদা। আমি বলি ডাক্তার দেখান, মনের ডাক্তার। আপনার রোগটা কিন্তু দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে... বসাকদা কিছুতেই ডাক্তার দেখাবে না। বলে, ‘তুমি শুনতে পাচ্ছ না ফোনের আওয়াজ। আমি পাই...’ হয়তো বসাকদা কারও ফোনের অপেক্ষায় আছে, যাকে এক সময় ভালবাসত। তুমি বসাকদার মতো দেরি কোরো না। আমি ভাল কোনও সাইকায়াট্রিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিচ্ছি। শুরুতেই চিকিৎসা করালে রোগটা তাড়াতাড়ি সেরে যাবে। অবশ্য এটাকে ঠিক রোগ বলা যায় না। একটা বিভ্রম বলতে পারো।”

*****

কলকাতার মানসিক ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে সজল। দু’দিন পরে ডেট। ডাক্তার দেখানোর সময় সজলকে বাইরে থাকতে বলতে হবে। কাশির ব্যাপারটা তো ডাক্তারকে লুকনো যাবে না। আসল কারণ না বললে সারবে না রোগ। অরণিবাবুর ব্যাপারে সজল সব জেনেও না জানার ভান করে বসে আছে। কাশি শুনতে পাওয়াটা ওর সামনে বলে দিলে করুণা দেখানোর সুযোগ পেয়ে যাবে। এত ভাল মানুষ, হয়তো বৌ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে সান্ত্বনাও দিয়ে ফেলবে। এ দিকে পলা বলছে, “আমার মনে হয় তুই ঠিক শুনছিস। তোর কেসটা সাইকায়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়ার মতো নয়। ডাক্তার ভাল না হলে এমন সব ওষুধ দেবে, সারা দিন ড্রাউজ়ি হয়ে থাকবি। জড়ভরত হয়ে যাবি।”

পলা ছোটবেলার বন্ধু। ওকে সব কিছু বলাই যায়। শ্রীরামপুর কলেজে পড়ায় পলা। রোজই যেতে হয় রাজনগরের উপর দিয়ে। কাল গাড়ি নিয়ে কুন্তলাকে দেখতে এসেছিল। ওর যুক্তি হচ্ছে, “তোর মধ্যে সামান্যতম অসংলগ্নতা নেই। প্রম্পট রিঅ্যাক্ট করছিস সমস্ত কথায়, কাজে। তুই কেন ভুল শুনতে যাবি! মাথার একটা স্ক্রু ঢিলে হলে অনেক কিছুই নড়বড়ে হয়ে যায়।”

কুন্তলা বলেছিল, “কিন্তু অরণিরা যে চলে গেছে, এটা তো সত্যি। তবু আমি কেন...”

কথা কেড়ে নিয়ে পলা বলেছিল, “আমার মনে হচ্ছে উনি সশরীরে ফিরে আসছেন, তোকে উতলা করতে।”

পলার কথা মাথায় বসে গেছে কুন্তলার। আজ সে অপেক্ষা করছে কাশির শব্দটার জন্য। আকাশে ফুরিয়ে গেছে বিকেল। পাখিরা সব ফিরে গেছে ঘরে। আজ এখনও কেন আসছে না আওয়াজটা।

এই তো এল। কুন্তলা স্পষ্ট শুনল অরণিবাবুর কাশির আওয়াজ। খেলাটা জারি রাখতে কুন্তলাও কাশে। ফিরে আসে উত্তর। এ বার কুন্তলা যায় বাড়ির পিছন দিকে। যেখান থেকে অরণিবাবুদের ড্রইংরুম পরিষ্কার দেখা যায়। ওখান থেকেই আসছে আওয়াজটা।

বাড়ির পিছনে পাঁচিল। টিনের বালতি উল্টো করে তাতে উঠে পড়েছে কুন্তলা। সরু গলির একমাত্র ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়েছে... কিন্তু এ কী দেখছে সে! অরণিবাবুদের ড্রইংরুমের বন্ধ জানলা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সজল। নিজের বাড়ির দিকে তাকিয়ে কাশছে। মুখে প্রতিহিংসার হাসি। সজলকে চেনা যাচ্ছে না। এমন এক অচেনা মানুষও ওর মধ্যে লুকিয়ে ছিল!

ছবি: বৈশালী সরকার

সন্ধে। অফিসফেরত সজল বাড়ির ঠিক এক মিনিট দূরত্বে। একটা দৃশ্য দেখে থমকে গেল পা। উঠে যাচ্ছে নাকি তাদের বাড়ির পাশের ভাড়াটে দত্তরা? তেমনটাই তো মনে হচ্ছে। দুটো বাড়িই একতলা। মাঝে এক লাফে বেড়াল-পার-হওয়া গলি। গলির শেষে বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ম্যাটাডোর। দত্তদের জিনিসপত্র সেখানে তুলছে দুটো লোক। সুটকেস, কম্পিউটার টেবিল, আরও সব ছোটখাটো মালপত্র তোলা হচ্ছে গাড়িতে। অরণি দত্ত আর তার গিন্নি তদারকি করছে। ওদের বাচ্চা মেয়েটা উত্তেজিত হয়ে ছুটোছুটি করছে... দৃশ্যটা পরম স্বস্তি দিচ্ছে সজলকে। মনে হচ্ছে গা বেয়ে ফ্রিজের জল নামছে।

সজল এখনই বাড়ি ঢুকবে না। সে দুটো বাড়ির মাঝে সেঁধিয়ে যায়। এখান থেকে দত্তদের চলে যাওয়াটা চোখ ভরে দেখবে।

দত্তরা চলে যাওয়ার পর বাড়ি ঢুকল সজল। যা ভেবেছিল তাই, কুন্তলার চোখমুখ থমথমে। হাঁটাচলা শ্লথ। বিকেলের প্রসাধন সারেনি, শাড়িটাও পাল্টায়নি। আচ্ছা, কুন্তলা কি আজই জানল দত্তরা চলে যাচ্ছে? আগে জেনে থাকলে ক’দিন ধরেই মুড অফ থাকত ওর। কালও তো দিব্যি ছিল মেজাজ। রোজকার মতোই ফল্‌স কাশছিল। ওটা আসলে সিগন্যাল। কাশির উত্তর কাশি দিয়েই দিচ্ছিল অরণি দত্ত। তা হলে কি অরণি দত্ত কুন্তলাকে অন্ধকারে রেখে কেটে পড়ল? ভয় পাচ্ছিল, যদি কুন্তলা আগেভাগে কোনও বাগড়া দেয়! যাওয়ার সময় তো পথ আগলে দাঁড়াতে পারবে না। পাড়ার মধ্যে তা হলে একটা বড় নাটক তৈরি হবে।

বাথরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসে ছেলের কাছে বসল সজল। এটা সজলের বাবার ঘর। বাবা মারা যাওয়ার পর ছেলে অংশুর পড়ার ঘর হয়েছে। খাটে বসে পড়ছে অংশু। ক্লাস ফোর। অফিস থেকে ফিরে সজল রোজ অংশুকে পড়ায়। মুড়িমাখা নিয়ে এল কুন্তলা। মুখটা এখনও থমথমে। সজল মুড়ির বাটি হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “দত্তরা কোথায় গেল?”

“আমি কী করে জানব!” বিরক্তির গলায় জবাব দিল কুন্তলা।

এক মুঠো মুড়ি মুখে তুলে সজল নরম গলায় বলে, “অরণি দত্তর বৌ তোমায় কিছু বলেনি! পাশাপাশি বাড়ি আমাদের।”

“পাশাপাশি বাড়ি মানেই যে আমরা সমকক্ষ, তা তো নয়। ওদের স্টেটাস অনেক উঁচুতে।”

অংশু বলে ওঠে, “মেঘারা কোথায় যাবে আমি জানি। আমাকে বলেছে মেঘা।”

মেঘা দত্তদের মেয়ে। সজল ছেলের কাছে জানতে চায়, “কোথায় গেছে ওরা?”

“সল্টলেক। ওদের নতুন বাড়ি। বলেছে আর কোনও দিন আসবে না এখানে।”

ঘর ছেড়ে চলে গেল কুন্তলা। এখন রান্নাঘরে সজলের জন্য চা, রাতের রুটি-তরকারি করবে। মুড়ি খেতে খেতে সজল ছেলেকে বলে, “দেখি, কী অঙ্ক করছিস?”

অংশু খাতা দেখায়। সংখ্যাগুলো ফোন নম্বরের মতো লাগে। অরণি দত্তর ফোন নম্বর কি কুন্তলার কাছে আছে? তা হলে তো যোগাযোগ থেকেই যাবে। অর্থাৎ ওরা উঠে গেলেও স্বস্তির কিছু নেই।

গোপনে এক বার ফোন নাম্বার দিতে চেয়েছিলেন অরণিবাবু। কুন্তলা নেয়নি। সে দিন মেঘার জন্মদিন ছিল। ডিনারে নেমন্তন্ন ছিল কুন্তলাদের। গল্পগুজব, কেক কাটার ফাঁকে অরণিবাবু লুকিয়ে একটা চিরকুট এগিয়ে ধরছিলেন, কুন্তলা বুঝতেই পারছিল ওটা ফোন নম্বর। না নিয়ে হেসে সরে গিয়েছিল। সম্পর্কটায় একটা সীমানা টেনেছিল কুন্তলা। তার একটা স্থিতিশীল সংসার আছে। অরণিবাবুরও তাই। দুই দাম্পত্যেই একটি করে সন্তান। এই বয়সে বেখেয়ালি প্রেম মানায় না। তা ছাড়া বাড়াবাড়ি করলে অরণিবাবুর বউ সোমা ভীষণ রিঅ্যাক্ট করবে। ডাকাবুকো মেয়ে। এত দিন অরণিবাবুর সঙ্গে যে ইঙ্গিতে যোগাযোগ রাখছিল কুন্তলা, সোমা সম্ভবত টের পায়নি। ও থাকত ওদের বাড়ির পিছনের দিকে, যেখানে কিচেন, বেডরুম। অরণিবাবু থাকতেন সামনের ড্রইংরুমে এবং বারান্দায়। উনি পেশায় চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। অফিস থেকে ফেরেন সজল আসার আগেই। ড্রইংরুমে বসে পার্সোনাল কাজগুলো করেন। ওঁকে অন্যমনস্ক করার জন্য কুন্তলা গলা খাঁকারি দেয়। উনিও ওই ভাবেই জবাব দেন। তবে ফোন নাম্বারের চিরকুট যে দিন নেয়নি কুন্তলা, তার পর দু’দিন টানা কেশেও উত্তর পায়নি অরণির। কুন্তলার নাছোড় কাশি শুনে এক সময় উত্তর দিয়েছিলেন। এ দিকে কুন্তলাকে অত কাশতে দেখে সজল কাশির ওষুধ নিয়ে এসে হাজির। অরণির সাড়া না পেয়ে কুন্তলার মাথা তখন গরম। সজলকে বলেছিল, “কে বলল তোমাকে কাশির ওষুধ আনতে?”

“ক’দিন খুব কাশছ, তাই নিয়ে এলাম!” বলেছিল সজল।

কুন্তলা তখন বলে, “তুমি তো জানো গলা খাঁকারি দেওয়া আমার মুদ্রাদোষ। সেটা না হয় একটু বেড়েছে। তার জন্য ওষুধ নিয়ে আসতে হবে! আমার কাশির শব্দে এত অসুবিধে হচ্ছে তোমার!”

সজল মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। একেবারেই নিরীহ মানুষ। ও জানে কার জন্য কাশে কুন্তলা। বাড়িতে বসেই কাশির আদানপ্রদান শোনে অসহায় ভাবে। এক দিন শুধু দত্তদের বাড়ির দিকের জানলা দুটো বন্ধ করে দিয়েছিল। কুন্তলা বলেছিল, “জানলা বন্ধ করলে কেন?”

সজল বলল, “জোলো হাওয়া আসছে। কাশি হচ্ছে তোমার।”

“সংসার করতে করতে দমবন্ধ হয়ে কাশি আসছে। তোমার বাড়িতে কি স্বাধীন ভাবে কাশাও যাবে না?” কুন্তলার ঝাঁঝালো মন্তব্য শুনে সেই যে জানলা খুলে দিয়েছিল সজল, আর কোনও দিন জানলা কিংবা কাশি, কোনওটাই বন্ধ করতে যায়নি। কোনও স্বামী যে এত ভয়েসলেস হয়, জানা ছিল না কুন্তলার। বিয়ের পর থেকে সজলকে এ রকমই দেখে আসছে। এ ব্যাপারে মাকে প্রথম দিকে এক বার অনুযোগ করেছিল কুন্তলা। বলেছিল, “সরকারি চাকরি দেখে যার গলায় আমায় ঝুলিয়ে দিলে, সে একটা ম্যাদামারা মানুষ। এ সব লোককে বর ভাবতে অসুবিধে হয়। এতটুকু স্মার্টনেস নেই। মল-মাল্টিপ্লেক্স কিংবা কোনও উৎসব-অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ারও যোগ্য নয়। আমার কপালটা পুড়ল।”

মায়ের উত্তর ছিল, “সজল আসলে নিখাদ ভালমানুষ। ওর এই ভাল স্বভাবটাই তোর কাছে দোষের হয়ে গেল। তোরা আজকালকার মেয়েরা ঠিক কী চাস, বোঝা ভার!”

কুন্তলা কিন্তু সজলের ভালত্বটা অস্বীকার করে না। তার মনে হয়েছে, বেচারা সজল অনেক অভাবের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছে। শ্বশুরমশাই ছিলেন প্রাইভেট কোম্পানির পিওন। লেখাপড়ায় ভাল সজল সরকারি চাকরি পেয়ে দিদির বিয়ে দেয়, টালির চালের বাড়ি পাকা করে। দারিদ্রপীড়িত অতীত ও ভুলতে পারে না। তাই সঙ্কুচিত হয়ে থাকে। এ দিকে কুন্তলাকে এ সব সমস্যায় পড়তে হয়নি। তাদের সংসারে প্রাচুর্য না থাকলেও, অভাব ছিল না। বাড়ি সেন্ট্রাল ক্যালকাটায়। দৌড়ে বাস-ট্রাম ধরে স্কুল-কলেজ গেছে। আড্ডা মেরেছে পার্কে, কফি হাউসে। শপিং করেছে নিউ মার্কেটে, গড়িয়াহাটে। কলেজ বাঙ্ক করে সিনেমা। জীবনযাত্রায় চোরাগোপ্তা উৎসব মিশে থাকত। বিয়ে হল কলকাতা থেকে চল্লিশ মিনিট দূরের মফস্‌সলে। রাজনগর। এখানে সময় চলে গড়িয়ে গড়িয়ে। মানুষের মধ্যেও ঢিলেঢালা আলসেমি। খুব বোরিং কাটছিল। বছরদুয়েক হল অরণিবাবুরা এল পাশের বাড়িতে। মানুষটার অভিজাত চেহারা দেখেই স্থির হয়ে থাকা মনে ঢেউ উঠেছিল কুন্তলার। নজর পড়ে থাকত ও বাড়ির দিকে। বারান্দায় পায়চারি করত অরণিবাবু। তখন থেকেই শুরু ইঙ্গিতময় দৃষ্টি বিনিময়। কাশি নিয়ে খেলাটা যে কবে শুরু হল, এখন আর খেয়াল নেই কুন্তলার। অরণিবাবুর গাড়ি আছে। খাওয়াদাওয়ায় ওদের সাহেবি মেনু। ঘরে সব সময় রুম ফ্রেশনার দেওয়া থাকে। এমন কারও সঙ্গে তো বিয়ে হতে পারত কুন্তলার, তা না হয়ে এক ছাপোষার সঙ্গে ঘর করতে হচ্ছে। তবু সজল ছাপোষা বর, মাতাল অত্যাচারী নয় বলে মোটামুটি মেনেই নিয়েছে কুন্তলা। অরণিবাবু তার কাছে ছিল শ্বাস নেওয়ার বারান্দা। কোনও এক বিখ্যাত লেখক, নাকি দার্শনিক বলেছেন না, প্রত্যেক বিবাহিতের খুব সামান্য হলেও একটা অন্য সম্পর্ক থাকা দরকার, তাতে দাম্পত্যও ভাল থাকে। অরণিবাবুও বুঝে গিয়েছিলেন কুন্তলার চাহিদা বেশি কিছু নেই। তবু কেন এমন না জানিয়ে চলে গেলেন? উনি কি এর চেয়ে বেশি কিছু চেয়েছিলেন? তাই অপমান দিয়ে অভিমানের বদলা নিলেন?

“কী হল, তোমার কি শরীর খারাপ?” সজলের ডাকে চমকে উঠে পিছন ফেরে কুন্তলা। ফের সজল বলে, “সেই কখন রান্নাঘরে এসেছ, কোনও সাড়াশব্দ নেই। এখনও চা দিলে না!”

মুহূর্তে মুখচোখে রাগ জমা হয় কুন্তলার। বলে, “শরীর খারাপ বলছ কেন? আসলে তো জানতে চাইছ মনখারাপ কি না?”

ছায়া নামে সজলের মুখে। সরে যায় রান্নাঘরের দরজা থেকে।

অরণিবাবুরা চলে গেছে পাঁচ দিন হল। অধ্যায়টা ভুলতে চেয়েছিল কুন্তলা। একটা অদ্ভুত ঘটনায় ভোলা সম্ভব হচ্ছে না। কাউকে বলাও যাচ্ছে না সেটা। সম্পর্কটাই তো গোপন। লোকের চোখে অন্যায়। ওরা চলে যাওয়ার পর দু’দিন সোমার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং অ্যাকাউন্টের স্টেটাস চেক করেছিল কুন্তলা। কেমন বাড়িতে গেছে? বাড়ি না ফ্ল্যাট? কোনও হদিসই পাওয়া গেল না। কোনও আপডেট দেয়নি। অরণিবাবু সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এ নেই। ওদের তাই ভুলতেই হচ্ছিল। কেন জানি মনে হচ্ছিল, এ ভাবে না বুঝতে দিয়ে চলে যাওয়াটা অসলে সোমার প্ল্যান। বোধহয় টের পেয়েছিল অরণিবাবুর সঙ্গে কুন্তলার সমঝোতাটা। তৃতীয় দিন ঘটল আশ্চর্য ঘটনাটা। কুন্তলা শুনতে পেল অরণিবাবুর কাশির শব্দ। প্রথমে তো চমকে উঠেছিল। দৌড়ে দেখতে গিয়েছিল ওরা ফিরে এল কি না! জানলা দিয়ে দেখল বাড়িটায় তালা দেওয়াই আছে। কিন্তু সময়, পরিবেশ সব একই! ওদের বাড়ির ছাদে ফুরিয়ে আসা বিকেলের আকাশ। পাখির ঝাঁক ফিরে যাচ্ছে বাসায়। কী মনে হতে কুন্তলা এক বার গলা খাঁকারি দিয়েছিল। ও মা, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল কাশির উত্তর! হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল কুন্তলার। আর কাশার সাহস দেখায়নি। পরের দিন আবার কাশির শব্দ পাওয়া গেল। বার বার। একটু যেন অধৈর্য। উত্তর চাইছে। আজ আবার কাশির শব্দ পেয়েছে কুন্তলা। দেখে এসেছে ওদের বাড়ি আগের মতোই বন্ধ। বারান্দার গ্রিলে তালা ঝুলছে। ভাল করে বোঝার জন্য আজ এক বার কাশল কুন্তলা। ফের উত্তর। আগেকার দিনগুলোর মতোই। কুন্তলার কোথাও কী কোনও ভুল হচ্ছে? সন্ধে নেমে গেছে। অংশু পড়া মুখস্থ করছে ভিতর ঘরে। সজল এখনও ফেরেনি অফিস থেকে। সময় হয়ে গেল। ওকে সমস্যার কথাটা বলতে হবে। তবে একটু ঘুরিয়ে। আর কাকেই বা বলবে এখানে! সজলই তো সব চেয়ে কাছের লোক। আজ এখনও ঘরে সন্ধে দেওয়া হয়নি, চুল আঁচড়ানো, কাপড় পাল্টানো কিছুই হয়নি। অরণিবাবু চলে যাওয়ার পর থেকে বিকেলবেলাটায় সাজতে-গুজতে আর ইচ্ছে হয় না।

সজল অফিস থেকে ফিরেছে। মুড়ি-চা খেতে খেতে ছেলের পড়া দেখছে। ঘরটার দরজায় দাঁড়িয়ে কুন্তলা সজলকে বলে, “এক বার এ ঘরে এস। কথা আছে।”

চায়ের কাপ হাতে নিয়েই উঠে আসে সজল। ঘরে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চায়, “কী হয়েছে?”

কুন্তলা বসে পড়ে বিছানায়। খানিক বিধ্বস্ত গলায় বলে, “আমার ক’দিন ধরে একটা প্রবলেম হচ্ছে।”

“কী প্রবলেম?”

“আমি না অতীতের কিছু কথা, শব্দ মাঝে মাঝে শুনতে পাচ্ছি।”

“ভয়ের কিছু? খারাপ স্মৃতি?”

“না, ভাল। আনন্দের অভিজ্ঞতা।”

একটু চুপ থেকে সজল কী যেন ভাবে। তার পর মাথা নেড়ে বলে, “বুঝেছি। তোমার সমস্যাটা অনেকটা আমাদের অফিসের বসাকদার মতো। বসাকদা মাঝে মাঝেই পকেট থেকে মোবাইল বার করে দেখে কে ফোন করেছে, অথচ ফোনটা বাজেইনি। আমার পাশের সিটেই বসে বসাকদা। আমি বলি ডাক্তার দেখান, মনের ডাক্তার। আপনার রোগটা কিন্তু দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে... বসাকদা কিছুতেই ডাক্তার দেখাবে না। বলে, ‘তুমি শুনতে পাচ্ছ না ফোনের আওয়াজ। আমি পাই...’ হয়তো বসাকদা কারও ফোনের অপেক্ষায় আছে, যাকে এক সময় ভালবাসত। তুমি বসাকদার মতো দেরি কোরো না। আমি ভাল কোনও সাইকায়াট্রিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিচ্ছি। শুরুতেই চিকিৎসা করালে রোগটা তাড়াতাড়ি সেরে যাবে। অবশ্য এটাকে ঠিক রোগ বলা যায় না। একটা বিভ্রম বলতে পারো।”

কলকাতার মানসিক ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে সজল। দু’দিন পরে ডেট। ডাক্তার দেখানোর সময় সজলকে বাইরে থাকতে বলতে হবে। কাশির ব্যাপারটা তো ডাক্তারকে লুকনো যাবে না। আসল কারণ না বললে সারবে না রোগ। অরণিবাবুর ব্যাপারে সজল সব জেনেও না জানার ভান করে বসে আছে। কাশি শুনতে পাওয়াটা ওর সামনে বলে দিলে করুণা দেখানোর সুযোগ পেয়ে যাবে। এত ভাল মানুষ, হয়তো বৌ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে সান্ত্বনাও দিয়ে ফেলবে। এ দিকে পলা বলছে, “আমার মনে হয় তুই ঠিক শুনছিস। তোর কেসটা সাইকায়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়ার মতো নয়। ডাক্তার ভাল না হলে এমন সব ওষুধ দেবে, সারা দিন ড্রাউজ়ি হয়ে থাকবি। জড়ভরত হয়ে যাবি।”

পলা ছোটবেলার বন্ধু। ওকে সব কিছু বলাই যায়। শ্রীরামপুর কলেজে পড়ায় পলা। রোজই যেতে হয় রাজনগরের উপর দিয়ে। কাল গাড়ি নিয়ে কুন্তলাকে দেখতে এসেছিল। ওর যুক্তি হচ্ছে, “তোর মধ্যে সামান্যতম অসংলগ্নতা নেই। প্রম্পট রিঅ্যাক্ট করছিস সমস্ত কথায়, কাজে। তুই কেন ভুল শুনতে যাবি! মাথার একটা স্ক্রু ঢিলে হলে অনেক কিছুই নড়বড়ে হয়ে যায়।”

কুন্তলা বলেছিল, “কিন্তু অরণিরা যে চলে গেছে, এটা তো সত্যি। তবু আমি কেন...”

কথা কেড়ে নিয়ে পলা বলেছিল, “আমার মনে হচ্ছে উনি সশরীরে ফিরে আসছেন, তোকে উতলা করতে।”

পলার কথা মাথায় বসে গেছে কুন্তলার। আজ সে অপেক্ষা করছে কাশির শব্দটার জন্য। আকাশে ফুরিয়ে গেছে বিকেল। পাখিরা সব ফিরে গেছে ঘরে। আজ এখনও কেন আসছে না আওয়াজটা।

এই তো এল। কুন্তলা স্পষ্ট শুনল অরণিবাবুর কাশির আওয়াজ। খেলাটা জারি রাখতে কুন্তলাও কাশে। ফিরে আসে উত্তর। এ বার কুন্তলা যায় বাড়ির পিছন দিকে। যেখান থেকে অরণিবাবুদের ড্রইংরুম পরিষ্কার দেখা যায়। ওখান থেকেই আসছে আওয়াজটা।

বাড়ির পিছনে পাঁচিল। টিনের বালতি উল্টো করে তাতে উঠে পড়েছে কুন্তলা। সরু গলির একমাত্র ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়েছে... কিন্তু এ কী দেখছে সে! অরণিবাবুদের ড্রইংরুমের বন্ধ জানলা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সজল। নিজের বাড়ির দিকে তাকিয়ে কাশছে। মুখে প্রতিহিংসার হাসি। সজলকে চেনা যাচ্ছে না। এমন এক অচেনা মানুষও ওর মধ্যে লুকিয়ে ছিল!

Advertisement