Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৬ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

অতিমারিতে অখণ্ডানন্দ

তিনি কখনও হিমালয় পেরিয়ে তিব্বতে চলে যান, কখনও বা গুরুভাই স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে কলকাতায় প্লেগের প্রকোপ কমাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দুর্ভিক্ষের প

২৬ এপ্রিল ২০২০ ০০:০১
Save
Something isn't right! Please refresh.
অখণ্ডানন্দ

অখণ্ডানন্দ

Popup Close

মহাবিদ্রোহের পর এ দেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান হল, রানি ভিক্টোরিয়া প্রজাদের দায়িত্ব নিলেন। ঈশ্বর গুপ্তর মতো কবি ইংল্যান্ডের রানিকে মা-মা বলে ডেকে পদ্য লিখলেন। অনেকে দু’হাত তুলে নাচলেন। তবে মা-কুইনের আমলে করাল মহামারির অন্ত নেই। তিনি ইংল্যান্ড থেকে বরাভয় দিতেই পারেন না। বর্ধমান ফিভার, কলেরা, প্লেগ লেগেই আছে। তার সঙ্গে বন্যা-দুর্ভিক্ষ তাল মেলায়। গরিব নেটিভদের প্রাণ যেন পদ্মপাতায় জল। এই আছে এই নেই। এর মাঝে কালীর ছেলেরা কাজে নামে। বিবেকানন্দ কালীকে বলেন ‘মৃত্যুরূপা মাতা’। জীবন তুচ্ছ করে প্লেগে-বন্যায়-দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েন বিবেকানন্দের প্রিয় গুরুভাই ‘গ্যাঞ্জেস’। পিতৃদত্ত নাম গঙ্গাধর, সন্ন্যাস নাম স্বামী অখণ্ডানন্দ। ১৮৯৮ সালে কলকাতায় যখন প্লেগের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল, তখন বিবেকানন্দ ভেবেছিলেন প্রয়োজনে মঠ নির্মাণের জন্য যে অর্থ সংগ্রহ করেছেন তা বিলিয়ে দেবেন। প্রমদাদাস মিত্রকে ১৮৯৮ সালে চিঠিতে লিখেছিলেন অখণ্ডানন্দ, ‘মরণাপন্ন কঙ্কালসার ভারতবাসীর দৈহিক সংস্কার না করিয়া আধ্যাত্মিক চেষ্টা বাতুলতা মাত্র।’

এ শুধু কথার কথা নয়। এ কথা লেখা তাঁর সাজে। প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের মনে নানা রকম ভয়। প্লেগের টিকা নিতে না-চাওয়ার অন্ধ কুসংস্কার তাদের জীবনকে আরও বিপন্ন করছে। সরকারের ইংরেজি প্রচারপত্র জনসাধারণ পড়তেও পারছে না, বুঝতেও পারছে না। বেলুড় মঠের সন্ন্যাসীরা অস্থায়ী ক্যাম্প খুলেছেন। অখণ্ডানন্দ অন্যতম সেবাব্রতী। প্লেগের টিকা নিলে ধর্মও যাবে না, প্রাণও যাবে না— এ কথা জনসাধারণকে বোঝানোর জন্য বাংলা-হিন্দিতে হ্যান্ডবিল ছাপানো হল। মুহূর্তের মধ্যে বাংলা বয়ানকে হিন্দি করে দিলেন তিনি। তবু জনগণের অবিশ্বাস, হ্যান্ডবিল বিলোনোর সময় কালীঘাট অঞ্চলের বাসিন্দারা ব্যঙ্গ করে। প্লেগের টিকার পক্ষে প্রচারের জন্য সরকার কত টাকা দিয়েছে? তারা বুঝতেও পারে না, এ সন্ন্যাসী আসলে তাদেরই লোক। কলকাতার বাইরে পল্লি-অঞ্চলে বাগদি বুড়ির কলেরা হয়েছে। ডাক্তার রাধাসুন্দর যেতে নারাজ। অখণ্ডানন্দ ওষুধ নিয়ে রাত্রিবেলা হাজির। অনেক চেষ্টা করলেন, বাঁচাতে পারলেন না।

১৯০৭। বাংলা আর ওড়িশায় ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ। মানুষের আহার জোটে না। প্রথমে কিছু দিন অনশন করলেন, রিলিফের কাজ করছেন কিন্তু খাচ্ছেন না। দেশের অনেক মানুষ যে অনাহারে! শেষে খাওয়া শুরু করলেন— হিঞ্চে, কলমি, শুষনি, সজনে পাতা, শাক সেদ্ধ, পাকা পটল পোড়া। এর থেকে বেশি কিছু কি দুর্ভিক্ষপীড়িতরা পায়! দূর থেকে নয়— মারিগ্রস্ত মানুষের এক জন হয়েই তাদের ভালবাসতে হবে, বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। এই তাঁর ধর্ম। সে ধর্মে কোনও ভেদ নেই— হিন্দু-মুসলমান, ব্রাহ্মণ-বাগদি, সবাই এক।

Advertisement



প্রায় তথ্যনিষ্ঠ গবেষকের মতো একটা তালিকা তৈরি করেছিলেন সেই সন্ন্যাসী। ইংরেজি তালিকার ওপরে লেখা ‘দি অরফানেজ। লিস্ট অব ইনমেটস সিন্‌স ইটস এস্টাবলিশমেন্ট।’ ১৮৯৭ থেকে ১৯১১, এই ক’বছরের সেই তালিকায় মোট পঞ্চাশ জন অনাথের নাম, তাদের ঠিকানা আর বয়সের উল্লেখ করতে ভোলেননি। কোন বছরে তারা এসেছে অনাথাশ্রমে তাও নির্দেশ করেছেন। পঞ্চাশ জনের মধ্যে তেরো জন ব্রাহ্মণ, চার জন নেপালি, চার জন অনাথ মুসলমান পরিবারের, বাকিরা কায়স্থ ও অন্য বর্ণের। ইমাম শ, বাবর শেখ, আজুবিবি, মৌলা শেখ, রামপদ মুখার্জি, বাহাদুর, রণবীর সিংহ, রঘুবীর— সবাই একই সঙ্গে থাকত সেখানে। একই ছাদের তলায় স্বধর্ম পালন করত তারা। হিন্দু বালকেরা এক দিকে বেদগান গাইত, আর এক দিকে মুসলমান বালকেরা নামাজ পড়ত। আজুবিবিকে পরে আশ্রমের তৃতীয় শিক্ষক তোয়াজি শেখের বাড়িতে রাখা হয়। রামকৃষ্ণদেবের শিষ্য স্বামী অখণ্ডানন্দের প্রতিষ্ঠিত মুর্শিদাবাদের অনাথাশ্রমে তো এমনই হওয়ার কথা— ‘যত মত তত পথ’ স্বীকার করতেন পরমহংস। তাঁরই শিষ্য স্বামী অখণ্ডানন্দ পরবর্তী কালে তাঁর অনাথাশ্রমের স্থায়ী জমি পেয়েছিলেন জমিদার হাজি মহরম আলির কাছ থেকে। বেলুড় মঠে কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন তিনি, ‘‘স্বামীজী ইসলামের সামাজিক উদারতা পছন্দ করতেন।’’ এক বার স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্বামীজি বলিষ্ঠ মুসলমান ফকিরের বেশে। পরনে আলখাল্লা, হাতে একটা লোহার ডান্ডা। এই দুই ধর্মের মিলমিশ ছাড়া ভারতীয় সমাজ শক্তিশালী হবে না। এই সমন্বয় সাধনের দায়িত্বই ধর্মের সামাজিকতা, দেশের দরিদ্র মানুষের অবস্থার উন্নতি না ঘটালে সেই সামাজিকতা গড়ে ওঠার নয়। রামকৃষ্ণের ধর্ম মেনে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের লেখায় নানা ভাবে উঠে আসছিল ধর্মের সামাজিক দায়িত্বের কথা।

১৮৯৭। স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকা-ইংল্যান্ডে ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক স্বরূপের কথা প্রচার করে দেশে ফিরেছেন। শরীর তেমন ভাল নয়। তাঁর এক আউন্স প্রস্রাবে কুড়ি গ্রেন সুগার পাওয়া গেল। সকলে পরামর্শ করে তাঁকে বিশ্রামের জন্য দার্জিলিং পাঠিয়ে দিলেন। আলমবাজার মঠ প্রায় শূন্য, নিস্তব্ধ। দার্জিলিং যাওয়ার আগে স্বামীজি রামকৃষ্ণানন্দকে তৎকালীন মাদ্রাজে যেতে বললেন, বিবেকানন্দ-শিষ্য সদানন্দ সঙ্গী হলেন তাঁর। মাদ্রাজে রামকৃষ্ণের নামে সেবাকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। মাদ্রাজ যাওয়ার আগের দিন তাঁরা নাট্যকার গিরিশচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। রাস্তায় একটা কুকুর সদানন্দকে কামড়ে দিল। কুকুর কামড়ালেও যাত্রা বন্ধ করার তো উপায় নেই। তবে কুকুর যদি পাগলা হয় তা হলে বিপদ। গোঁদলপাড়ায় কুকুর কামড়ানোর ওষুধ পাওয়া যায়। সে ওষুধ মাদ্রাজে পাঠানো চাই। ওষুধ আনতে বেরোলেন স্বামী অখণ্ডানন্দ। দু’টাকা সঙ্গে নিয়েছেন। বেরিয়েছেন একবস্ত্রে। ওষুধ নিয়ে ফিরবেন এমনই স্থির করেছেন। ওষুধ মিলল। ছোট বড়ি। ফরাসডাঙা পোস্ট অফিস থেকে মাদ্রাজের ঠিকানায় ওষুধ পোস্ট করলেন। তবে মঠে ফেরা আর হল কই! পথ টানল সন্ন্যাসীকে।



রমতা সন্ন্যাসী হুগলি, নবদ্বীপ, কাটোয়া হয়ে হাজির হলেন মুর্শিদাবাদে। এই যাত্রাপথে ভক্ত ও সাধুসঙ্গ বেশ হল, ভাল-মন্দ নানা অভিজ্ঞতা। সাধু-সন্ন্যাসী, ভক্তদের মধ্যে সঙ্কীর্ণ মানুষ যে অনেক আছেন, টের পেলেন। তবে দাদপুরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল অন্য অভিজ্ঞতা। চোদ্দো বছরের এক মুসলমান মেয়ে হাপুস নয়নে কাঁদছে। তার মাটির কলসির তলা খসে পড়েছে। বাড়িতে বাসন বলতে একটা মাটির কলসি আর দু’টো হাঁড়ি। একে আকাল, খাবার জোটে না। তার ওপরে জল তোলার পাত্রটিও গেল। মা মারবে। তাই কান্না। অখণ্ডানন্দ দু’পয়সার মাটির কলসি কিনে দিলেন, দিলেন দু’পয়সার চিঁড়ে-মুড়কিও। দেখতে দেখতে মরাদীঘি গ্রামের দশ-বারো জন ছোট-বড় ছেলেমেয়ে ঘিরে ধরল তাঁকে। আকাল। আকাল। কেউ খেতে পায় না। দাদপুর থেকে বহরমপুর যাওয়ার পথে নপুকুর, বেলডাঙা— সব গ্রামেই এক অবস্থা। খাবার নেই, জল নেই। অখণ্ডানন্দ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘উঠিতে বসিতে, পথে চলিতে চলিতে ভগবানকে দয়াময় বলিতে কুণ্ঠা বোধ করিতে লাগিলাম। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা কি পাপে যে অনাহারে দয়াময় ভগবানের রাজ্যে মারা যায়, তাহা আমার বোধগম্য হইল না।’ কী উপায়? কী ভাবে সাহায্য করা যায় অনাহারী দরিদ্র মানুষকে? বিবেকানন্দ উৎসাহ দিলেন। চিঠিতে লিখলেন দরিদ্রকে দেবতা ভেবে কাজে নেমে পড়তে। অখণ্ডানন্দ কাজে নামলেন। ১৮৯৭ সালের ১৫ মে কেদারমাটি-মহুলায় মৃত্যুঞ্জয় ভট্টাচার্যের পাকা চণ্ডীমণ্ডপে রামকৃষ্ণ মিশনের সেবাধর্মের সূত্রপাত হল। দার্জিলিং থেকে আলমবাজার মঠে ফিরে স্বামীজি অখণ্ডানন্দের কাজে সাহায্য করার জন্য স্বামী নিত্যানন্দ আর সুরেশ্বরানন্দকে পাঠালেন, সঙ্গে দিলেন দেড়শো টাকা।

এই যে সেবার কাজ শুরু করলেন অখণ্ডানন্দ, তা কিন্তু মুহূর্তের আধ্যাত্মিক আবেগ মাত্র ছিল না। বাস্তব বোধ ও সুপরিকল্পনা তাঁর সমাজসেবার অঙ্গ। এক দিকে যেমন তিনি অন্নপূর্ণার কাছে দরিদ্রদের জন্য অন্ন প্রার্থনা করছেন, অন্য দিকে তেমনই অন্নকষ্ট দূর করার জন্য জনসাধারণের কাছে অর্থের আবেদন করছেন। তিনি সন্ন্যাসী মানুষ, টাকা পাবেন কোথায়! বৌদ্ধ ভারতের নানা কাহিনি রবীন্দ্রনাথের ‘কথা ও কাহিনী’-র কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছিল। ‘নগরলক্ষ্মী’ কবিতায় শ্রাবস্তীনগরে যখন দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল তখন বুদ্ধ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ক্ষুধিতেরে অন্নদান সেবা/ তোমরা লইবে বল কেবা?’ সবাই নিরুত্তর। শেষে দায়িত্ব নিলেন ভিক্ষুণী সুপ্রিয়া। তার ভিক্ষাপাত্র আছে। তাই বলেছিল সে, ‘আমার ভাণ্ডার আছে ভরে/ তোমা-সবাকার ঘরে ঘরে।’ দুর্ভিক্ষ নিবারণের জন্য ‘পাব্‌লিক ফান্ড’ই ভরসা।

সন্ন্যাসী অখণ্ডানন্দও এই পন্থাই গ্রহণ করলেন। ভারতের বৌদ্ধ-অতীত সম্বন্ধে তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল। দেশীয় রাজার কাছে তাঁর আবেদন, ‘আপনার প্রজাগণকে পালন করিয়া যদি কিছু উদ্বৃত্ত থাকে তো তৎক্ষণাৎ তাহা দরিদ্রের সেবায় অর্পণ করুন।’ শুধু রাজারা দায়িত্বের ভাগিদার নন, অখণ্ডানন্দ মনে করতেন বিভিন্ন মঠের মোহন্তদেরও এই দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত। তীব্র ভাষায় ধর্মধ্বজীদের আক্রমণ করেছিলেন তিনি। ১৯২০-২১ সাল নাগাদ ভগবানদাস বাবাজী মহারাজকে লিখছেন, ‘দেশে দুর্ভিক্ষ প্রভৃতির ন্যায় মহামারী উপস্থিত হইলে ঐ সকল মঠবাসী মোহন্তগণ স্ব ২ ত্যাগী শিষ্য প্রশিষ্যে পরিবেষ্টিত হইয়া মঠের ভাণ্ডার নিঃশেষিত করিয়া ধনে প্রাণে তাঁহারা দেশ সেবায় জীবনপণ করিবেন।’ কালের গতিতে অবশ্য অবস্থার বদল হয়েছে। ‘বসুমতী’-র সম্পাদককে জানাচ্ছেন, ‘কেবল অর্থসঞ্চয়ই জীবনব্রত করিয়া মোহন্তগণ অর্থগৃধ্নু বণিক মহাজনকেও পরাস্ত করিয়াছেন।’ এ কালের মোহন্তরা কেবল ‘লেনেকা বই দেনেকা নহী।’ এমন সমালোচনা করা তাঁর সাজে। পরে ১৯৩৪ সালে দ্বিজেন মহারাজকে চিঠিতে লিখছেন, মন্দির নির্মাণের ব্যয় কমিয়ে পাঁচ লক্ষ টাকা যদি রিলিফ ওয়ার্কের জন্য স্থায়ী আমানত করে দেওয়া হয় তা হলে সমস্যা খানিক মেটে।

দেশীয় রাজা ও ধর্মপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অর্থসাহায্যও তিনি গ্রহণ করছেন। এ কথাও ভাবছেন, বড়লোকের টাকা নিলে নানা কথা শুনতে হয়, সাধারণের সাহায্যে সে বালাই নেই। প্রতিটি পাইপয়সার হিসেব দাখিল করছেন। ‘উদ্বোধন’ পত্রিকায় স্বামী অখণ্ডানন্দের অনাথাশ্রমের আয়-ব্যয়ের হিসেব নিয়মিত প্রকাশিত হত। এমনকি যাঁরা মুষ্টিভিক্ষা দিতেন, তাঁদের কথাও ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। অর্থ তো তাঁর নয়, সকলের— তাই হিসেব দেওয়া চাই। তবে রিলিফ ওয়ার্ক যথেষ্ট নয়, মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা কর্তব্য। সে ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রত। ইংরেজি, বাংলার পাশাপাশি বেশ হিন্দি জানতেন। ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। লালা বদ্রীদাসকে ১৮৯৪ সালে হিন্দিতে লেখা চিঠিতে দুঃখ করে লিখলেন, ‘ভারতে ২৫ কোটি মানুষ আছে যার মধ্যে ৮৩% মানুষ কৃষক… ভারতীয় কৃষকেরা কৃষি সম্বন্ধে এতটাই অনভিজ্ঞ যে ক্ষেতে যথোপযুক্ত সার দেওয়ার বিষয়টিও জানে না। ... সেজন্য আপনি কৃষি গেজেট আনিয়ে তার থেকে সেখানকার উপযোগী, সেখানকার জমির উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধির সহায়ক কোনও উপায় উদ্ভাবন করতে পারলে আপনারও আর্থিক লাভ হবে এবং কৃষকেরা সে সকল উপায় শিখে গেলে সমগ্র ভারতের মহা লাভ হবে।’ ১৮৯৪ সালে শ্রেণিগত ভাবে কৃষকদের ক’জন ভারতীয় এতটা গুরুত্ব দিতেন?

বিবেকানন্দের ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত তিরুমল আচার্যের কাছে একটি গল্প শুনেছিলেন। ১৯১৯-এ কয়েকজন ভারতীয় দেশপ্রেমিক লেনিনের সঙ্গে দেখা করেন। লেনিন সকলকে ছেড়ে কথা বলেন চাষির ঘরের ছেলে ইব্রাহিমের সঙ্গে। ভূপেন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন কাজ কোথা থেকে শুরু করতে হবে। ১৯১৬-১৭ সাল নাগাদ অখণ্ডানন্দের অনুগামী এক যুবক দিনাজপুর জেলায় তাঁর জমিদারিতে শ্রমজীবী ও কৃষকদের মঙ্গলের জন্য গড়ে তোলেন ‘শ্রীরামকৃষ্ণ সেবক-সঙ্ঘ’। সাধে কি রবীন্দ্রনাথ তাঁর পুত্র রথীকে কৃষিবিদ্যার বৈজ্ঞানিক শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন! পল্লির কথা সে সময় নানা জন নানা ভাবে ভাবছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আগেই পল্লিসংগঠনের কাজে হাত দিয়েছিলেন অখণ্ডানন্দ। শিবনগর গ্রাম থেকে কলেরা কী ভাবে নির্মূল করেছিলেন তাঁর বিবরণবাহী ১৯১৮-১৯ সালের একটি খসড়া লেখা পাওয়া যাচ্ছে। ধুনো, গন্ধক, কর্পূরের ব্যবহার শেখাচ্ছেন গ্রামবাসীদের। শেখাচ্ছেন পুকুরের জল পরিষ্কার রাখার পদ্ধতি। পাট চাষের সঙ্গে যে ম্যালেরিয়ার যোগ আছে, গ্রামবাসীদের তা খেয়াল করিয়ে দিচ্ছেন। মুর্শিদাবাদে রেললাইন হওয়ার পর চাষারা অনেকেই পাটের আবাদ তুলে দেয়, পটলের আবাদ আরম্ভ করে। রেলপথে তা কলকাতায় পাঠানোর ফলে বেশ লাভ হয়। পাট-পচা ও পাট-কাচা বদ্ধ জলে মশা জন্মাত। সে বালাই এতে কমে। পল্লিসংগঠনের কাজে প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় মানুষদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অখণ্ডানন্দ ভাটিয়াদের সঙ্গে বাঙালিদের তুলনা করেছিলেন। তখনকার বোম্বাইয়ের ধনকুবের ঠাকুরদাস দেয়া গ্রামের জন্য অনেক কিছু করেছিলেন। বাঙালিদের মধ্যে এমন উদাহরণ নেই বললেই চলে। অখণ্ডানন্দের সিদ্ধান্ত, ‘শিক্ষিত জনসাধারণ যদি ক্রমে ক্রমে আবার পল্লীতে বসবাস আরম্ভ করেন তাহা হইলে অচিরেই আবার পল্লীস্বাস্থ্য ফিরিয়া আসিবে।’ সম্পদের সামাজিক দায়িত্ব, পল্লিকেন্দ্রিক ভারতবর্ষ, এই ভাবনাগুলি হাতে-কলমে কাজ করতে করতেই এই সন্ন্যাসীর মাথায় এসেছিল সন্দেহ নেই। অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সুপরিকল্পনা। রবীন্দ্রনাথের একাধিক লেখায় সম্পদের সামাজিক দায়িত্বের কথা এসেছে। ধনীর সম্পদ জোর করে হরণ করা সমাধান নয়, ধনীর সম্পদ যাতে সমাজের কাজে লাগে, সেই বোধ গড়ে তোলা চাই। জোরের সাম্যের থেকে বোধের সাম্য অনেক বেশি কার্যকরী।

অনাথ আশ্রমে যাদের আশ্রয় দিতেন, তাদের খুবই আদরে হাতে-কলমে কাজ শেখাতেন। ১৮৯৯ সালে লেখা চিঠি থেকে জানা যাচ্ছে, ‘অনাথ বালকদিগকে দরজীর কাজ শিখাইতেছি; এবং একটি দেশী তাঁত বসাইয়া কাপড় বোনার কাজ আরম্ভ করিবারও আয়োজন হইতেছে।’ এ ছাড়া বাংলা ইংরেজি বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা হয়। ছুতোরের কাজও শেখানো হত। অনাথ আশ্রমের সন্তানেরা তাঁর প্রত্যক্ষ সাহচর্য পাচ্ছে, আর গ্রামের অন্য মানুষদের সচেতন করার জন্য ম্যাজিক লণ্ঠনের ছায়াবাজি। সারগাছি আশ্রমে পুরনো দিনের স্লাইড এখনও সংরক্ষিত। সেই স্লাইডের বিষয়গত তালিকা মনে রাখার মতো। গ্রামের পাশে শিশু ও যুবক-যুবতীদের খেলার জন্য মুক্ত জায়গা রাখার প্রয়োজনীয়তা। গ্রামে গ্রামে সংক্রামক রোগ দূরীকরণে সমবায় সমিতি গঠন। স্বল্প আয়াসে জমিতে সারের ব্যবস্থা। বাড়ির পাশে শাকসব্জি ফলমূলের চাষ। বয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থা। ম্যাজিক লণ্ঠনের মাধ্যমে এই বিষয়গুলি সম্বন্ধে জনগণকে সচেতন করতে চেয়েছিলেন।

সরকার, দেশীয় রাজা, জননেতা যা করার করুন বা না করুন, সন্ন্যাসী অখণ্ডানন্দ তাঁর কাজে লেগে ছিলেন নীরবে। স্মৃতিকথায় এক আশ্চর্য স্বপ্নের কথা লিখেছিলেন তিনি। রামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলছেন, ‘‘তুই আমাকে চাস, না পাবলিককে চাস? আমাকে তোর কাজের কথা তো আর খবরের কাগজে লিখে জানাতে হবে না, কিন্তু পাবলিককে জানাতে হবে। এখন দেখ একদিকে পাবলিক, একদিকে আমি।’’ এই টানাপড়েনের ফল কী হল? অখণ্ডানন্দ জানাচ্ছেন, ‘ঠাকুরের এইসকল কথা প্রাণে প্রাণে শুনিয়া আমি কাঁদিতে কাঁদিতে বিহ্বল হইয়া পড়ি।’ বিহ্বলতা স্বাভাবিক। ভগবানের জন্যই তাঁর সংসার ত্যাগ, তার পর মানুষই হয়ে উঠলেন তাঁর ভগবান। বিবেকানন্দ লিখেছিলেন তাঁকে, ‘দরিদ্র, মূর্খ, অজ্ঞানী, কাতর ইহারাই তোমার দেবতা হউক, ইহাদের সেবাই পরমধর্ম জানিবে।’ পাবলিককে ধর্মের নামে এ কালে কেউ কেউ খেপিয়ে তুলতে চান, কেউ কেউ দেশের নামে অন্য দেশের ওপর যুদ্ধং দেহি ভঙ্গিতে মাতিয়ে তুলতে চান। এই সন্ন্যাসী শুধু জানেন— দরিদ্র, মূর্খ, অজ্ঞানী, কাতর ভারতবাসী জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে তাঁর দেবতা। এই কাজে অন্য দেশের মানুষও যোগ দিতে পারেন। ১৮৯৯ সালে ভগিনী নিবেদিতাকে লিখেছেন, ‘আমাদের কাছে আপনার সেবা অমূল্য।’ রবীন্দ্রনাথের পল্লিসংগঠনের কাজে যোগ দিয়েছিলেন এল্‌মহার্স্ট, পিয়ার্সন।

ধর্মবিবিক্ত মানবতা যেমন সত্য, তেমনই এ দেশে সত্য ধর্মের মানবতা। মাঝে মাঝে যেমন মার্ক্সের কথা আবার মনে করিয়ে দিতে হয় মার্ক্সবাদীদের, তেমনই ধর্মধ্বজীদের মনে করিয়ে দিতে হয় ধর্মীয় মানবতার কথা। কলকাতা শহর থেকে দূরে অখণ্ডানন্দ তাঁর ধর্মীয় মানবতার সাধনক্ষেত্রটি বড় মমতায় গড়ে তুলেছিলেন। পাবলিককে রাজনৈতিক ভাবে সচেতন করার আগে, ধর্মপথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলার আগে তাঁদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অন্নবস্ত্র বিষয়ে সমর্থ করা জরুরি।

১৯৩৬। রামকৃষ্ণদেবের জন্মের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান। সারগাছির অনাথাশ্রমে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে জনসাধারণের আহারের আয়োজন হল। পরের বছর ফেব্রুয়ারি মাসে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন অখণ্ডানন্দ। তিব্বতের মঠে ধনের অসাম্য দেখে প্রতিবাদ করায় এক সময় প্রাণসংশয় হয়েছিল যে গঙ্গাধরের, সেই গঙ্গাধর তাঁর অখণ্ডানন্দ-জীবনে ধর্মসম্পদের সাম্য প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছিলেন, ধর্মীয় মানবতার সাহায্যে গড়ে তুলেছিলেন সমন্বয়ী সামাজিকতা। সে-কথা এ দেশে এ কালে এই অতিমারির সময় যেন ভুলে না যাই।

গ্রন্থ ঋণ: ‘স্বামী অখণ্ডানন্দের রচনা সংকলন’, রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম, সারগাছি; ‘স্বামী অখণ্ডানন্দ’, স্বামী অন্নদানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement