হরবোলা পাখি হত্যা করা পাপ’— সম্ভবত এটাই হার্পার লি-র ক্লাসিক বই ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’-এর মূল সুর। এটি অবশ্যএকটি রূপক, যা গল্পে অ্যাটিকাস ফিঞ্চ চরিত্রটি বলেছিল তার সন্তানদের উদ্দেশে। নিরীহ প্রাণী বা ব্যক্তিদের ক্ষতি করার মতোই অবিচারের প্রতীক সেটা। গল্পে ফিঞ্চদের প্রতিবেশী মিস মডি অ্যাটকিনসন সমর্থন করেছেন তা; তিনি বলছেন, হরবোলা পাখি বা মকিংবার্ডরা নির্দোষ, কারণ তারা বাগান ধ্বংস করে না কিংবা বাসা বাঁধে না ভুট্টার গোলার মধ্যে; তারা কেবল ‘আমাদের জন্য গান করে হৃদয় উজাড় করে’।
এ বছর হার্পার লি-র জন্মশতবর্ষ। তাঁর মৃত্যুরও দশ বছর পূর্তি। তাই ফিরে তাকাতেই হবে তাঁর অমর সৃষ্টি— ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’-এর দিকে। বইটি নিঃসন্দেহে একটি কালের গল্পরূপ বা পিরিয়ড পিস। কিন্তু তা থেমে থাকেনি সেখানেই। ২০২১ সালে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বইটিকে মনোনীত করেছে পূর্ববর্তী ১২৫ বছরের সেরা বই হিসেবে।
১৯৬০-এর গ্রীষ্মে যখন প্রকাশিত হয় হার্পার লি-র ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’, যেন আবির্ভূত হলেন অ্যালাবামীয় অ্যাথেনা। এক নবীনা দক্ষিণী আমেরিকান লেখকের একটি নিখুঁত উপন্যাস এটি, যার ছিল না কোনও স্পষ্ট নজির, ছিল না কোনও পূর্বসূরি। কিন্তু সে সময়ের আমেরিকান সমাজের পটভূমিতে বইটির আবির্ভাব ছিল জরুরি। বইটি হয়ে ওঠে কালজয়ী। সে যুগের সবচেয়ে অস্থির বিষয়গুলিতে— নাগরিক অধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে যৌন-বিপ্লব পর্যন্ত— সুস্পষ্ট আলোকপাত করেছে বইটি। সেই সঙ্গে নজর দিয়েছে চিরায়ত বিষয়গুলিতেও, যেমন, শিশুদের নৈতিক জাগরণ, চিরন্তন প্রেম, এমনকি নিজের এবং সমাজের মধ্যবর্তী সংঘাতেও।
গল্পটির সময়কাল ১৯৩০-এর দশকের দুনিয়া-কাঁপানো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অস্থিরতা, ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ পর্ব। গল্পের কথক একটি ছোট্ট মেয়ে, তার নাম স্কাউট। ঘটনাকালের পরিধিতে তার বয়স ছয় থেকে নয় বছর। এটি একটি মর্মস্পর্শী, হৃদয়বিদারক এবং তীব্র কুসংস্কারে বিষাক্ত হয়ে ওঠার অসাধারণ আখ্যান। এক বাচ্চা মেয়ের চোখ দিয়ে যুগপৎ দুর্দান্ত সৌন্দর্য এবং বর্বর বৈষম্যের বৈপরীত্যময় এক জগৎকে দেখানো। তার বাবা এক স্থানীয় আইনজীবী, কিন্তু যেন এক জন ক্রুসেডর। তিনি অন্যায় ভাবে একটি ভয়াবহ অপরাধে অভিযুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ টম রবিনসনকে রক্ষার জন্য ঝুঁকির মুখে ফেলেন নিজের সব কিছু। রবিনসনের বিরুদ্ধে এক জন শ্বেতাঙ্গ মহিলাকে হত্যার অভিযোগ। তাই গল্পের বিষয়বস্তু অবশ্যই একটু স্পর্শকাতর। গল্পের মধ্য দিয়ে অ্যাটিকাস ফিঞ্চ চরিত্রটি পরিণত হয়েছেন আইনি পেশার পক্ষে এক সততার মডেলে। অ্যালিস পেট্রি-র মতো স্কলার বলেছেন, “আইনি মহলে অ্যাটিকাস হয়ে উঠেছেন একজন লোকনায়ক এবং তাকে দেখা হয় প্রায় একজন বাস্তবেরমানুষের মতোই।”
অ্যালাবামার মনরো কাউন্টির মনরোভিলের বাসিন্দা নেল হার্পার লি-র লেখা এই উপন্যাসটির গল্প অ্যালাবামারই সে সময়কার দু’টি মামলার সমসাময়িক, কিন্তু সরাসরি সেগুলির উপর ভিত্তি করে নয়। এর একটি ১৯৩১ সালের স্কটসবোরো বয়েজ় ট্রায়াল, যেখানে উত্তর অ্যালাবামায় ট্রেনে দুই শ্বেতাঙ্গ মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগে বিচার হয় ন’জন কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের। দ্বিতীয়টি ১৯৩৩-এর নভেম্বরের মনরোভিলেরই ঘটনা, যেখানে নাওমি লোরি নামে এক দরিদ্র শ্বেতাঙ্গ মহিলা অভিযোগ করেন, এক জন কৃষ্ণাঙ্গ প্রাক্তন অপরাধী ওয়াল্টার লেট যৌন নির্যাতন করেছে তাঁকে। এই দু’টি মামলার প্রভাব নিঃসন্দেহে পড়েছে উপন্যাসটির গঠনে।
মাত্র একখানা উপন্যাস লিখে এমন প্রগাঢ় প্রভাব ফেলার উদাহরণ কিন্তু বড় একটা নেই আধুনিক সাহিত্যে। ‘ইনভিজ়িবল ম্যান’ অবশ্য রালফ এলিসনের লেখা একমাত্র উপন্যাস। এবং এটি নিঃসন্দেহে একটি ক্লাসিক। তবে এলিসন কিছু প্রবন্ধের বইও লিখেছেন। সাত খণ্ডে লেখা প্রুস্তের একমাত্র উপন্যাস ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইম’ও রয়েছে বইকি। তবে প্রুস্ত তো ছাপ রেখেছেন প্রাবন্ধিক এবং সাহিত্য-সমালোচক হিসেবেও।
অবশ্য ‘মকিংবার্ড’ কালজয়ী হয়ে ওঠার অনেক পরে হার্পার লি-র আর একটি উপন্যাস, ‘গো সেট আ ওয়াচম্যান’ বিতর্কিত ভাবে প্রকাশিত হয় ২০১৫-তে, তাঁর মৃত্যুর আগের বছর। এটি আসলে ছিল ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’-এর পূর্ববর্তী খসড়া, যা লেখা হয় ১৯৫৭ সালে। ১৯৫৬ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে থাকাকালীন উপন্যাসটির কাজ শুরু করেছিলেন লি। স্কাউট ফিঞ্চ সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক, নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে এসেছে অ্যালাবামার মেকম্বে-তে, বাবা অ্যাটিকাসের সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে সে তার সম্প্রদায়ের অসহিষ্ণুতার সম্মুখীন হয়। লিপিনকট পাবলিশার্সে হার্পার লি-র সম্পাদক টে হোহফ তাঁকে রাজি করান স্কাউটের শৈশবের দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাসটি নতুন করে লিখতে। ভাগ্যিস! সেই উপন্যাস, ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০-এ, আর ১৯৬১ সালে কথাসাহিত্যের জন্য পুলিৎজ়ার পুরস্কার জিতে নেন লি। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৫। ১৯৬২-তে বইটির চলচ্চিত্র রূপায়ণ করে ইউনিভার্সাল পিকচার্স। অ্যাটিকাস ফিঞ্চের ভূমিকায় গ্রেগরি পেক, আর টম রবিনসন হয়েছেন ব্রক পিটার্স। সেরা অভিনেতার জন্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার জিতে নেয় ছবিটি।
মকিংবার্ডের গল্পটি বর্ণিত একটি শিশুর নিষ্পাপ দৃষ্টিভঙ্গিতে, অন্য দিকে ‘ওয়াচম্যান’ আমেরিকান দক্ষিণের এক প্রাপ্তবয়স্ক, রূঢ়তর দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থাপক। ‘ওয়াচম্যান’ যদিও বর্ণবাদের উপর আরও বাস্তববাদী, আরও পরিপক্ব দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক, তাতে নেই অ্যাটিকাস ফিঞ্চকে নিয়ে শৈশবের আদর্শায়ন।
‘মকিংবার্ড’ উপন্যাসটির প্রকাশকাল আমেরিকান সমাজের দিনবদলের নিরিখে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেটা সিভিল রাইটস আন্দোলনের উত্তাল দিন। ১৯৬০-এর দশকের সেই নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবেও উল্লেখ দেখেছি উপন্যাসটির। নাগরিক অধিকার নেতা অ্যান্ড্রু ইয়ং মন্তব্য করেছেন, বইটির কার্যকারিতার একটি অংশ হল যে, এটি আশা জাগিয়ে তোলে ‘বিশৃঙ্খলা এবং বিভ্রান্তির মাঝে’। ইয়ং উপন্যাসটিকে দেখেছেন ‘মানবতার সপক্ষে কাজ’ হিসেবে, যাতে মানুষ কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে ওঠার সম্ভাবনা দেখতে পায়। অ্যালাবামার লেখক মার্ক চাইল্ড্রেস আবার এ-বইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন ‘আঙ্কল টম’স কেবিন’-এর মতো বইয়ের, যার প্রভাব খুঁজে পাওয়া যাবে আমেরিকার গৃহযুদ্ধশুরুর সময়ে।
উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর জীবনের বাকি সময়টা লি কিন্তু সরে থাকেন প্রচারের আলো থেকে দূরে, জনসাধারণের দৃষ্টির বাইরে। ১৯৬৪ সালে নিউ ইয়র্কের এক রেডিয়ো স্টেশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি অবশ্য বলেছিলেন, “আমি কেবল দক্ষিণ অ্যালাবামার জেন অস্টেন হতে চাই।” বাস্তবিকই লি-র সাহিত্যিক প্রভাব এবং বিষয়ের ক্ষেত্রে অস্টেনের সামাজিক শ্রেণি, নৈতিকতা এবং মানবপ্রকৃতির বিষয়বস্তুর বিস্তর মিল। যদিও লি লিখেছেন নিম্নমধ্যবিত্তদের নিয়ে, আর অস্টেনের কাজের বিস্তার মধ্যবিত্ত থেকে ছোটখাটো অভিজাত শ্রেণি পর্যন্ত, খানিকটা ‘এমা’ ব্যতিরেকে নিম্নশ্রেণি তার ক্যানভাসের বাইরে। আবার লি-র বর্ণবাদী বিষয়ের কোনও প্রতিরূপ নেই অস্টেনের লেখায়।
হার্পার লি-র মৃত্যুর প্রায় এক দশক পরে ২০২৫-এর অক্টোবরে প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য ল্যান্ড অব সুইট ফরএভার’— তাঁর আটটি নতুন আবিষ্কৃত ছোটগল্প এবং আটটি পূর্বপ্রকাশিত প্রবন্ধ এবং ম্যাগাজ়িনের টুকরোর সঙ্কলন। এর উল্লেখও প্রাসঙ্গিক। আসলে যে কোনও লেখকের তৈরি হওয়ার— অ্যালাবামীয় অ্যাথেনা-র উদ্ভূত হওয়ারও— তো একটা পটভূমি থাকে। মহাভারতের যেমন উদ্যোগপর্ব। লি-র প্রথম দিকের কিছু ছোটগল্পের এই সংগ্রহটি বোঝায়, কী ভাবে দক্ষিণ অ্যালাবামা অ্যাভিনিউয়ের ছোট্ট মেয়েটি হয়ে উঠেছিল এক জন ‘বেস্টসেলিং’ লেখক। ১৯৪৯ সালে প্রথম নিউ ইয়র্ক সিটিতে আসার পর ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ লেখার আগের দশকে লি-র লেখা এই গল্পগুলিতে তুলে ধরা হয়েছে কিছু চরিত্র আর পরিস্থিতি, যা তিনি বিখ্যাত করে তুলবেন শিগগিরই, প্রকাশ করবেন খানিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, এবং যা সমাধানের চেষ্টায় তিনি অতিবাহিত করবেন তাঁর জীবন।
অন্তত চল্লিশটি ভাষায় অনূদিত হয়ে বইটির চার কোটির বেশি কপি বিক্রি হয়েছে ইতিমধ্যে। এখনও প্রতি বছর আমেরিকাতেই সাড়ে সাত থেকে দশ লক্ষ কপি বিক্রি হয় বইটির। সেই সঙ্গে এটাও ঠিক, ছয় দশকের বেশি সময় ধরে বইটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হয়েছে উত্তর আমেরিকায়। বইটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে বার বার, মূলত ইস্কুলের পাঠ্য তালিকায় বা পাবলিক লাইব্রেরিতে। এই তো ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরেই সেন্ট্রাল টেক্সাসের লিয়েন্ডার ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ক্লাসরুম এবং লাইব্রেরি থেকে বাদ দেয় বইটি। ২০০৯-এ কানাডার অন্টারিয়োর ব্রাম্পটনের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে; ২০১২ সালে টেক্সাসের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে; ২০১৬ সালে ভার্জিনিয়ায়; ২০১৭-তে মিসিসিপির বিলোক্সিতে; ২০১৮-তে মিনেসোটার ডুলুথে; ২০২০-২০২১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার বারব্যাঙ্ক ইউনিফাইড স্কুল ডিস্ট্রিক্টে এবং আরও অন্যান্য জায়গায় বিতর্কের সম্মুখীন হয় বইটি, কখনও বইটি বাদ দেওয়া হয় পড়ার তালিকা বা শ্রেণিকক্ষ থেকে।
বইটি নিয়ে আপত্তির কারণ বহুবিধ। এর বিষয়বস্তু এবং বর্ণনার মধ্যে রয়েছে বর্ণগত অপবাদ, অশ্লীলতা, ধর্ষণের মতো বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা। এ ছাড়াও কৃষ্ণাঙ্গদের ‘শ্বেতাঙ্গ ত্রাণকর্তা’— গল্পের এমত রূপায়ণের কারণেও কিছু মানুষ গ্রন্থাগার এবং শ্রেণিকক্ষে বইটির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবু, এ-সব নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বইটি হয়ে দাঁড়িয়েছে আমেরিকান সাহিত্যের একটি প্রধান ভিত্তি। এবং একে প্রায়শই দেখা হয় বর্ণগত অবিচার এবং পক্ষপাত সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণের হাতিয়ার।
বইটিতে ‘ধর্ষণ’ শব্দটির উল্লেখ রয়েছে ১৭ বার। আমাদের সমাজ অষ্টম কিংবা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কি স্কুলের পাঠ্যক্রমে এই ধরনের বই পড়তে দেবে? পরিচিত বেশ কিছু মানুষকে জিজ্ঞেস করেছি, এবং বেশির ভাগের উত্তরই নেতিবাচক। কিন্তু আমেরিকার ক্ষেত্রে সেটাই মূল সমস্যা নয়। সেখানে প্রাথমিক আপত্তি ছিল ‘নিগার’ শব্দটি নিয়ে, যা বইটিতে ব্যবহৃত হয়েছে ৪৮ বার। তাই, হ্যাঁ, সমাজ দুটো অবশ্যই ভিন্ন।
আসলে সেই ১৯৬৩ সাল থেকেই ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিতর্কের একটি উল্লেখযোগ্য উৎস। বইটি ক্লাসরুমের উপযুক্ত কি না, তা নির্ধারণের জন্য স্কুল প্রশাসকরা শুনানি করছেন জানতে পেরে, ‘দ্য রিচমন্ড নিউজ় লিডার’-কে একটি সম্পাদকীয় চিঠি পাঠান হার্পার লি। সঙ্গে পাঠান ১০ ডলার। চিঠিতে লেখেন, তিনি মনে করেন সমস্যাটি নিরক্ষরতার। পরামর্শ দেন, তাঁর পাঠানো অর্থ হ্যানোভার কাউন্টি স্কুল বোর্ডের সদস্যদের পছন্দের যে কোনও প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ব্যবহার করা হোক।
‘এন’ দিয়ে শুরু এই শব্দটি নিঃসন্দেহে পশ্চিমা বিশ্বের অনেকের কাছেই অস্বস্তির। সাদা-কালোর মৈত্রীবিহীন দ্বন্দ্ব সে দেশের শোণিতপ্রবাহে। এই শব্দের উচ্চারণেই সম্ভবত তারা আয়নায় দেখতে পায় নিজেদের ইতিহাস। এর মুখোমুখি তারা হতে চায় না।
তবু মকিংবার্ডের জনপ্রিয়তা আর আকর্ষণে টান ধরেনি। বরং বেড়েছে। ২০০৬ সালে ব্রিটেনের জাদুঘর, গ্রন্থাগার এবং আর্কাইভ কাউন্সিল পরিচালিত একটি সমীক্ষায় এই বইটিকে ‘মৃত্যুর আগে প্রত্যেকের পড়া উচিত’ এমন বইয়ের তালিকায় সেরা বই হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল— এমনকি একে স্থান দেওয়া হয় বাইবেলের উপরেও। সত্যি বলতে কী, বর্ণবাদ, লিঙ্গবৈষম্য এবং ধর্মকে এড়িয়ে আমেরিকান সমাজের উপর কোনও অর্থপূর্ণ বই হয়তো সম্ভবই নয়। সাহিত্য অবশ্যই সমাজকে প্রতিবিম্বিত করে। শতাব্দীপ্রাচীন সমাজ এবং তার উপভাষার রূপায়ণকে অস্বীকার করা হয়তো সামাজিক পরিপক্বতার লক্ষণ নয়।
১৯৫৩ সালে ডার্টমাউথ কলেজের সমাবর্তন ভাষণে ঐতিহাসিক উক্তি করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজ়েনহাওয়ার, “বই পোড়ানোর দলে যোগ দেবেন না।” সে সময়কার আমেরিকার সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে তিনি বিশেষত ম্যাকার্থির কমিউনিস্ট-বিরোধী উচ্ছ্বাস এবং সেন্সরশিপের প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আমেরিকানদের বৌদ্ধিক স্বাধীনতা গ্রহণ করা, বিস্তৃত পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং বিবিধ মতবাদকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান। “লাইব্রেরিতে যেতে এবং প্রতিটি বই পড়তে ভয় পাবেন না, যতক্ষণ না তা আমাদের নিজস্ব শালীনতার ধারণাকে আঘাত করে। সেটাই হওয়া উচিত একমাত্র সেন্সরশিপ,” বলেছিলেন আইজ়েনহাওয়ার।
কেউ যুক্তি দিতেই পারেন, অন্তত এই বোধ আসার জন্যও যথেষ্ট পরিণত হওয়া প্রয়োজন। ইস্কুলের ছাত্রদের সেই পরিণতি থাকবে কি না সে নিয়ে বিতর্কের অবকাশও তাই থাকবেই।
নিঃসন্দেহে, হরবোলা পাখি বা মকিংবার্ডকে নিষিদ্ধ করা বা চুপ করানো তাকে হত্যা করার সমতুল। কিন্তু ইন্টারনেটের এই যুগে কি আদৌ সম্ভব তার সঙ্গীত রুদ্ধ করা? হার্পার লি-র শতবর্ষে মকিংবার্ড তাই গাইতেই থাকে হৃদয় উজাড় করে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)