E-Paper

জ্যোতিঃপুঞ্জের প্রজাপতি রহস্য সন্ধানে বঙ্গসন্তান

এ বার সেই রহস্যের সন্ধানেই নতুন পা ফেলেছেন এক দল জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তাঁদের মূল লক্ষ্য, এই প্রজাপতির মতো ‘প্যাটার্ন’-এর পুঙ্খানপুঙ্খ অনুসন্ধান এবং তা থেকে ওই ‘বার’-এর দৈর্ঘ্য, শক্তি, জ্যামিতিক আকৃতি ইত্যাদি নির্ধারণ করা।

কুন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৫
সৌমাভ ঘোষ।

সৌমাভ ঘোষ। — নিজস্ব চিত্র।

অকল্পনীয় আকারের জ্যোতিঃপুঞ্জ মিল্কি ওয়ে বা আকাশগঙ্গা। তার কেন্দ্রে আছে একটি দণ্ডাকার নক্ষত্রপুঞ্জ (বার)। সেটি একটি দৃঢ় বস্তুর মতো আপন বৃত্তগতিতে পাক খেয়ে চলেছে। ধুলো, গ্যাসে ঢাকা এই কেন্দ্রীয় অঞ্চল এবং ‘বার’ সাধারণ আলোকমিতি বা ফটোমেট্রি দ্বারা স্পষ্ট দেখা যায় না। তাই আমাদের জ্যোতিঃপুঞ্জের কেন্দ্রস্থলে থাকা এই ‘বার’-এর দৈর্ঘ্য, শক্তি, জ্যামিতিক আকৃতি ইত্যাদি সরাসরি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি, ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (এসা) গাইয়া টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণে আকাশগঙ্গার কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নক্ষত্রপুঞ্জসমূহের সমষ্টিগত গতিবেগ বণ্টনে অনেকটা প্রজাপতির মতো দেখতে একটি ‘প্যাটার্ন’ দেখা গিয়েছে। বিজ্ঞানীদের আপাত ধারণা, এই প্রজাপতির মতো ‘প্যাটার্ন’ আদতে মিল্কি ওয়ের ‘বার’ দ্বারা সৃষ্ট। যদিও ‘বার’ এবং ‘প্রজাপতির’ মধ্যে কী সম্পর্ক, তাও নিশ্চিত নয় বিজ্ঞান জগতে।

এ বার সেই রহস্যের সন্ধানেই নতুন পা ফেলেছেন এক দল জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তাঁদের মূল লক্ষ্য, এই প্রজাপতির মতো ‘প্যাটার্ন’-এর পুঙ্খানপুঙ্খ অনুসন্ধান এবং তা থেকে ওই ‘বার’-এর দৈর্ঘ্য, শক্তি, জ্যামিতিক আকৃতি ইত্যাদি নির্ধারণ করা। ওই বিজ্ঞানী দলের নেতৃত্বে আছেন এক বঙ্গসন্তান, ইন্দোর আইআইটি-র অ্যাস্ট্রোনমি, অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্স অ্যান্ড স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহকারী অধ্যাপক সৌমাভ ঘোষ। দলের বাকি সদস্যেরা জার্মানি ও ফ্রান্সের বিজ্ঞানী।

সম্প্রতি আকাশগঙ্গা জ্যোতিঃপুঞ্জের কেন্দ্রস্থলের উপরে গবেষণাপত্র ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্স’ নামে একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করেছে সৌমাভ-সহ ওই পাঁচ জন বিজ্ঞানীর দল। বিজ্ঞানীরা জানান, ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে ছাড়া প্যাঁচালো আকারের (স্পাইরাল) জ্যোতিঃপুঞ্জের দুই-তৃতীয়াংশের কেন্দ্রস্থলে নক্ষত্রের সমাহারযুক্ত একটি অঞ্চল থাকে। যাকে বলা হয় ‘গ্যালাকটিক বার’। জ্যোতিঃপুঞ্জের গঠনে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ। আকাশগঙ্গার কেন্দ্রস্থলে থাকা এই ‘বার’-এর গঠন চারটি ভাগে বিভক্ত, অনেকটা প্রজাপতির মতো। বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, এই কেন্দ্রস্থল থেকে নক্ষত্রের জন্ম যেমন হয়, তেমনই জ্যোতিঃপুঞ্জের ভিতরে থাকা ব্ল্যাক হোলের সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকে। শুধু তাই নয়, সৃষ্টি মুহূর্ত থেকে জ্যোতিঃপুঞ্জের বিস্তার—এ সব তথ্যও ওই ‘বার’ থেকে পাওয়া যায়।

সৌমাভ বলছেন, সৌরজগৎ যে জ্যোতিঃপুঞ্জে অবস্থিত (মিল্কি ওয়ে বা আকাশগঙ্গা) তার ‘বার’ স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান নয়। অতীতে গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে যে বারের চারপাশে এই প্রজাপতির মতো একটি এলাকা তৈরি হয়। কিন্তু বার ও ওই প্রজাপতি আকারের অঞ্চলের বিবর্তন সংক্রান্ত গবেষণা হয়নি। তিনি বলেন, ‘‘আমরা সিমুলেশনে ওই বার ও প্রজাপতির মতো এলাকা সৃষ্টি করে পুঙ্খানপুঙ্খ অনুসন্ধান করেছি এবং দেখিয়েছি, প্রজাপতির মতো এলাকার পুঙ্খানপুঙ্খ অনুসন্ধান থেকে মিল্কি ওয়ে-এর বার-এর দৈর্ঘ্য, শক্তি, জ্যামিতিক আকৃতি ইত্যাদির নির্ভুল নির্ধারণ সম্ভব।’’

বিজ্ঞানীরা এ-ও বলছেন যে নক্ষত্রপুঞ্জ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অবস্থান থেকে একই জ্যোতিষ্ককে দেখার সময় কিছু ত্রুটি দেখা দিতে পারে। নিখুঁত এবং সতর্ক পর্যবেক্ষণ তাই জরুরি। প্রসঙ্গত, আকাশগঙ্গার পর্যবেক্ষণ ও ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (এসা) ‘গাইয়া’ নামে ওই টেলিস্কোপ আছে। সৌমাভদের কাজেও সেই টেলিস্কোপের তথ্যই ব্যবহার করা হয়েছে। সৌমাভ বলছেন, ‘‘আগামী দিনে গাইয়ার যে তথ্য প্রকাশিত হবে তাতে এই পর্যবেক্ষণ ও মডেলের বিষয়টি আরও উন্নত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে গবেষণার উন্নতিতেও তা উপযোগী হবে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Milky Way Milky Way Galaxy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy