এমন ডাইনোসরের সন্ধান আগে কখনও পাওয়া যায়নি। গা ভর্তি কাঁটা। সজারুর মতো। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াত তারা।
পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া এই প্রাণীদের একটি জীবাশ্ম সদ্য খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। তাঁরা এই নতুন আবিষ্কৃত বিলুপ্ত প্রজাতির নাম দিয়েছেন ‘হাওলং ডঙ্গি’। চিনের মান্দারিন ভাষায় এর অর্থ ‘কাঁটাযুক্ত ড্রাগন’ বা ‘কাঁটাযুক্ত ডাইনোসর’। নতুন এই প্রজাতির সন্ধান ডাইনোসর যুগের ওই পর্বের বিষয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে গবেষকদের।
তখন পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেড়াত বিভিন্ন প্রজাতির ডাইনোসর। কেউ শিকার, কেউ বা শিকারি। ছিল বিভিন্ন গোত্রের ডাইনোসর। যেমন ছিল থেরোপড গোত্রের ডাইনোসরেরা, তেমনই ছিল অর্নিথোপডেরাও। থেরোপডেরা ছিল হিংস্র শিকারি, যাদের মধ্যে অন্যতম টির্যাইনোসরাস-রেক্স বা টি-রেক্স। নিজেদের সময়ের সবচেয়ে হিংস্র এক শিকারি প্রজাতি। অন্য দিকে, অর্নিথোপডেরা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের। এরা ছিল তৃণভোজী।
এই অর্নিথোপডদের মধ্যে একটি বিশেষ শ্রেণি ছিল ইগুয়ানোডন্টিয়ান। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি বছর আগে এদের আবির্ভাব হয়েছিল। এবং পৃথিবীতে টিকে ছিল প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে পর্যন্ত। এদের দাঁতের গড়ন ছিল অনেকেটা ইগুয়ানার মতো। নামকরণও সেই থেকেই। এই শ্রেণির ডাইনোসরেরা মূলত ছিল চারপেয়ে। তবে দুই পায়েও দাঁড়াতে পারত এরা।
আরও পড়ুন:
সম্প্রতি চিনে এই ইগুয়ানোডন্টিয়ান শ্রেণির এমন এক ডাইনোসরের জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, যা অতীতে কখনও মেলেনি। ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের গবেষকেরা উত্তর-পূর্ব চিনে এই জীবাশ্মের সন্ধান পান। এই নতুন প্রজাতির ডাইনোসর-জীবাশ্ম আবিষ্কারের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন জার্নালে।
গবেষকেরা চিনের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে ওই কিশোর ডাইনোসরের জীবাশ্ম খুঁজে পান। প্রায় অক্ষত অবস্থা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে জীবাশ্মটি। এই ডাইনোসরটি লম্বায় ছিল প্রায় আড়াই মিটার। তার জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করেই উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। জীবাশ্মটির সঙ্গে ইগুয়ানোডন্টিয়ান শ্রেণির ডাইনোসরের যথেষ্ট মিল রয়েছে। শুধু ত্বকের গড়ন ছাড়া। এই শ্রেণির ডাইনোসরদের অন্য যে জীবাশ্ম মিলেছে, তাতে এই ধরনের ত্বকের গড়ন আগে দেখা যায়নি। ইগুয়ানোডন্টিয়ান শ্রেণির ডাইনোসরদের ত্বকে সাধারণত পালক থাকত। তবে চিনের এই জীবাশ্ম থেকে স্পষ্ট, এদের ত্বক ছিল সজারুর মতো কাঁটাবিশিষ্ট।
জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, এই ডাইনোসরদের পিঠের দিকে এবং শরীরের দু’পাশের ত্বক জুড়ে কাঁটা ছিল। কাঁটাগুলির অভিমুখ ছিল সামনের থেকে পিছনের দিকে। বিভিন্ন মাপের কাঁটা ছিল এদের শরীরে। ছোট কাঁটাগুলির দৈর্ঘ্য গড়ে ২-৩ মিলিমিটার। এর পরে ছিল মাঝারি মাপের কিছু কাঁটা। সেগুলির দৈর্ঘ্য ৫-৭ মিলিমিটার। এ ছাড়া ৪৪ মিলিমিটার বা তার বেশি দৈর্ঘ্যেরও কিছু কাঁটা ছিল ত্বকে। তবে এটি ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক ডাইনোসরের জীবাশ্ম। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক ডাইনোসরের ত্বকেও কি এই কাঁটাগুলি থাকত, না কি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এগুলি খসে যেত— তা প্রাথমিক গবেষণায় জানা যায়নি। কী কারণে এই কাঁটাগুলি ছিল, তা-ও এখনও স্পষ্ট নয়। প্রাথমিক ভাবে গবেষকেরা অনুমান করছেন, আত্মরক্ষার জন্য এই কাঁটাগুলি ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। হিংস্র, মাংসাশী ডাইনোসরদের কবল থেকে বাঁচার জন্যই এগুলি সম্ভবত ব্যবহার হত বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য এখনও মেলেনি।