আধুনিক মানুষ বা ‘হোমো সেপিয়েন্স’-এর আবির্ভাব হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশেই— এ বিষয়ে বিজ্ঞানীরা সকলেই প্রায় একমত। কিন্তু তারা কি নির্দিষ্ট ভাবে কোনও একটি পূর্বসূরি ধারা থেকেই আবির্ভূত হয়েছে? তা নিয়ে এত দিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল জিন গবেষণায় উঠে আসা নতুন তথ্য।
বর্তমান পৃথিবীতে একমাত্র জীবিত মানব প্রজাতি হল হোমো সেপিয়েন্স। বাকিরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে পৃথিবী থেকে। অনুমান করা হয়, আজ থেকে প্রায় তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল। হোমো সেপিয়েন্সের যত জীবাশ্ম এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীনটি ওই সময়েরই। আনুমানিক ওই সময়কাল থেকেই পৃথিবীতে আমাদের আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু আধুনিক মানুষের বিবর্তিত হওয়ার ওই শুরুর পর্বে খুব বেশি জীবাশ্ম পাওয়া যায় না। ওই সময়কালে অল্প যে ক’টি জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে, তার বেশির ভাগই ইথিয়োপিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকায়। কিন্তু গোটা আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে তারা কী ভাবে ছড়িয়ে পড়ল, তা নিয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না।
দীর্ঘ দিন ধরে বিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করতেন, আফ্রিকার পূর্ব বা দক্ষিণ ভাগের কোনও এক পূর্বসূরির ধারা থেকে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল। সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা এটিই। কিন্তু এই ধারণাকেই এ বার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছেন আমেরিকার ক্যালিফর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিস ক্যাম্পাসের গবেষকেরা। কম্পিউটার মডেলিং এবং জেনেটিক ডেটা বিশ্লেষণ করে উঠে এসেছে, আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে ছ়ড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন পূর্বসূরি গোষ্ঠীর থেকে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছে। ২০২৩ সালে ‘নেচার’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
আরও পড়ুন:
গবেষকেরা আফ্রিকায় বর্তমানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জিনের সঙ্গে হোমো সেপিয়েন্সের আদিম জনগোষ্ঠীর জীবাশ্মের নমুনা তুলনা করে দেখেন। তাতে এমন একটি মডেল উঠে আসে যা ইঙ্গিত দেয়— কোনও একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বিবর্তিত হয়ে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়নি। বরং, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর একটি ‘নেটওয়ার্ক’ ছিল, যা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেখান থেকেই আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছে বলে দাবি গবেষকদের।
ক্যালিফর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিস ক্যাম্পাসের নৃতত্ত্ব এবং জিনোম সেন্টারের অধ্যাপক ব্রেনা হেনের মতে, জীবাশ্ম এবং প্রাচীন কালের ডিএনএ-র থেকে পাওয়া তথ্যের মধ্যে কিছু ফাঁকফোকর রয়ে যায়। এই ফাঁকফোকরের জন্যই নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যায় না। তিনি বলেন, “আধুনিক ডিএনএ ব্যবহার করে তৈরি মডেলের সঙ্গে সীমিত সংখ্যক জীবাশ্ম এবং প্রাচীন ডিএনএ-র তথ্য সবসময় মেলে না। এই কারণেই নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যায় না। তবে নতুন এই গবেষণা হোমো সেপিয়ন্সের আবির্ভাব নিয়ে ধারণা বদলে দিয়েছে।”
আরও পড়ুন:
এই গবেষণায় আফ্রিকার দক্ষিণ ভাগের নামা জনগোষ্ঠীর জিন পরীক্ষা করে দেখা হয়। মূলত নামিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং বৎসোয়ানায় এদের বাস। বর্তমানে জীবিত অনেক জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিনগত বৈচিত্র অনেক বেশি মাত্রায় দেখা যায়। গবেষকেরা ২০১২-২০১৫ সালের মধ্যে নামাদের বিভিন্ন বসতি ঘুরে ঘুরে তাদের লালার নমুনা সংগ্রহ করে। গবেষণায় উঠে এসেছে, কোনও একটি বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী নয়, বরং আফ্রিকার আদিমানবদের বিভিন্ন পূর্বসূরি গোষ্ঠীর অবদান ছিল হোমো সেপিয়েন্সের আবির্ভাবে। ক্যালিফর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষকদলের দাবি, আধুনিক মানুষের বিবর্তনের অতীত সম্ভবত লুকিয়ে রয়েছে আফ্রিকার অন্তত দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে। তা-ও আনুমানিক প্রায় ১০ লক্ষ বছর আগে। গবেষকদের দাবি, অন্তত দু’টি ভিন্ন ভিন্ন মানবগোষ্ঠী লক্ষ লক্ষ বছর আগে থেকে আফ্রিকায় বাস করে আসছে।
তবে কোন দুই মানবগোষ্ঠী থেকে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। গবেষকদের দাবি, বর্তমান মানবগোষ্ঠীর মধ্যে যে জেনেটিক পার্থক্য দেখা যায়, তার মাত্র ১-৪ শতাংশ এসেছে ভিন্ন জনগোষ্ঠীর পূর্বসূরিদের কারণে। তবে যে আদিম প্রজাতিগুলির শারীরিক গড়ন অনেকটা ভিন্ন (যেমন হোমো নালেদির মস্তিষ্কের আকার আধুনিক মানুষের চেয়ে অনেক ছোট), তারা আধুনিক মানুষের এই বিবর্তন প্রক্রিয়ায় সরাসরি জড়িত ছিল না বলেই মনে করছেন গবেষকেরা।