আমেরিকার নিউ মেক্সিকো সাদা বালির মরুভূমি। প্রায় ৭০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই মরুভূমিতেই মিলল আমেরিকায় মানুষের প্রথম পদচিহ্নের হদিস। মরুভূমিতে পড়ে থাকা শিলার গায়ে পাওয়া গিয়েছে কিছু পায়ের ছাপ। মানুষের এই পায়ের ছাপ প্রায় ২০-২৩ হাজার বছরের পুরনো। অতীতে কোনও গবেষণাতেই এত আগে আমেরিকা মহাদেশে মনুষ্য অস্তিত্বের প্রমাণ মেলেনি।
এত দিন যা মনে করা হত, তার চেয়েও আগে আমেরিকায় প্রথম পা রেখেছিল মানুষ। সাম্প্রতিক গবেষণায় তেমনটাই ইঙ্গিত মিলেছে। আমেরিকা মহাদেশে কবে মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল, তা নিয়ে গত এক দশকে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। যেমন নতুন তত্ত্ব উঠে এসেছে, তেমনই সেই তত্ত্বকে খণ্ডন করেছে আরও নতুন কোনও গবেষণা। পায়ের ছাপ নিয়ে এই গবেষণা এ বার আমেরিকায় মানুষের প্রথম আবির্ভাবের সময়রেখাকে আরও কিছুটা পিছিয়ে নিয়ে গেল।
নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আজ থেকে প্রায় ২০,০০০-২৩,০০০ বছর আগে আমেরিকায় মানুষের প্রথম পদচিহ্ন পড়েছিল। পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব অবশ্য অনেক আগেই হয়ে গিয়েছিল। আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশে প্রথম আবির্ভাব হয় আধুনিক মানুষের। তবে তারা আফ্রিকার বাইরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে প্রায় ১ লক্ষ থেকে ৬০ হাজার বছর আগে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা এই সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
তবে আমেরিকায় মানুষের পা পড়ে এ সবেরও আরও বহু বছর পরে। এক দশক আগে পর্যন্তও মনে করা হত, আজ থেকে মাত্র ১৩,০০০ বছর আগে আমেরিকা মহাদেশে প্রথম পা রাখে মানুষ। যদিও সেই তত্ত্ব আগেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে। উঠে এসেছে আরও নতুন নতুন তত্ত্ব। পায়ের ছাপ নিয়ে এই গবেষণাটির সূত্রপাত হয়েছিল ২০১২ সালে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে এই গবেষণার ফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পরে দ্বিতীয় বার একই গবেষকদল এই নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে। দ্বিতীয় বারেও উঠে আসে একই তথ্য।
২০১২ সালে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ড মরুভূমিতে ভূপ্রকৃতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন আরিজ়োনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ভ্যান্স হলিডে। ওই সময়েই তিনি সেখানে কিছু পায়ের ছাপ খুঁজে পান। শিলার গায়ে তৈরি হওয়া ওই ছাপগুলির মধ্যে থেকে গাছের বীজ এবং পরাগরেণুরও কিছু নমুনা ছিল। ওই নমুনাগুলির রেডিয়োকার্বন ডেটিং (কোনও জৈব পদার্থ কত পুরনো, তা নির্ধারণ করার পদ্ধতি) করেন হলিডে। তাতেই উঠে আসে নতুন তথ্য। রেডিয়োকার্বন ডেটিং থেকে জানা যায়, ওই নমুনাগুলি প্রায় ২০-২৩ হাজার বছরের পুরনো।
আরও পড়ুন:
কিন্তু এই তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। ফলে পুনরায় গবেষণার সিদ্ধান্ত নেন হলিডে। ওই একই গবেষকদলকে নিয়ে তিনি পুনরায় হোয়াইট স্যান্ড মরুভূমির পায়ের ছাপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। এ বার আরও নিখুঁত হওয়ার জন্য বীজ এবং পরাগরেণুর পাশাপাশি শিলার নমুনাও পরীক্ষা করে দেখা হয়। কোনও বিভ্রান্তি এড়াতে তিন ধরনের নমুনা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করানো হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বারের গবেষণাতেও সেই একই তথ্য উঠে আসে। দু’বার একই তথ্য উঠে আসায় হলিডে এবং তাঁর সঙ্গীদের দাবি, তাঁদের তথ্য নির্ভুলই। আনুমানিক ২০০০০-২৩০০০ বছর আগেই আমেরিকা মহাদেশে পা রেখেছিল মানুষ।
আমেরিকা মহাদেশে কবে, কী ভাবে মানুষ প্রথম পৌঁছোয়— তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে অতীতে। বিভিন্ন মতবাদও প্রচলিত রয়েছে। বেশির ভাগের মতে, বেরিং সাগর (যা আমেরিকা এবং রাশিয়াকে পৃথক করেছে) পেরিয়ে আমেরিকায় পৌঁছেছিল মানুষ। আজ থেকে প্রায় ১১০০০-২৮০০০ বছর আগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কমে গিয়েছিল। ওই সময়ের মধ্যে বেরিং সাগরে বরফ জমে একটি প্রাকৃতিক সেতু তৈরি হয়েছিল, যা প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে টিকে ছিল। অনুমান করা হয়, সেই সেতু পেরিয়েই এশিয়া এবং ইউরেশিয়া থেকে মানুষ প্রথম আমেরিকায় পা রাখে।
কিন্তু কোন সময়ে মানুষ প্রথম পা রাখে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এক দশক আগে পর্যন্তও মনে করা হত, আজ থেকে ১৩ হাজার বছর আগে আমেরিকায় মানুষ পা রেখেছিল। তবে গত এক দশকে এই তত্ত্ব বার বার খণ্ডিত হয়েছে। ওরেগনের এক গুহায় প্রমাণ মেলে যে ১৪,৪০০ বছর আগেও আমেরিকায় মনুষ্য অস্তিত্ব ছিল। টেক্সাসে ১৫,৫০০ বছর আগে পাওয়া যায় মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ। টেক্সাসে একদল গবেষক কিছু প্রাচীন অস্ত্র খুঁজে পেয়েছিলেন, যেগুলি আনুমানিক ১৫,৫০০ বছরের পুরনো। যা ইঙ্গিত করে, ওই সময়ে আমেরিকা মহাদেশে মানুষের অস্তিত্ব ছিল। এমনকি আইডাহো প্রদেশে কুপার্স ফেরি এলাকাতেও ১৬,০০০ বছর আগে মনুষ্য অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে। এ বার জানা গেল, অন্তত ২০,০০০-২৩,০০০ বছর আগে আমেরিকা মহাদেশে মানুষের বাস ছিল।