আফ্রিকা মহাদেশ। মানব বিবর্তনের একটি গোটা অধ্যায় ছড়িয়ে রয়েছে এই মহাদেশেই। কিন্তু সেই বিবর্তনের ইতিহাসের একটি পর্ব বহু বছর ধরে অজানাই রয়ে গিয়েছে। এ বার সেই অজানা পর্বের রহস্য উদ্ঘাটনের সুযোগ তৈরি করে দিল সাড়ে সাত লক্ষ বছরের পুরানো কিছু জীবাশ্ম।
অতীতে আফ্রিকা মহাদেশে আদিম কালের জীবাশ্মের প্রচুর নিদর্শন মিলেছে। তাতে আধুনিক মানুষ (হোমো সেপিয়েন্স)-সহ বিভিন্ন মানব প্রজাতির জীবাশ্ম যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে শিম্পাঞ্জির মতো বিভিন্ন বানর প্রজাতির জীবাশ্মও। তার পরেও জীবাশ্মের অভাব এক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল গবেষকদের কাছে। কারণ, যে জীবাশ্মগুলি এত দিন পাওয়া গিয়েছে তা হয় ১০ লক্ষ বছর বা তার বেশি পুরানো, কিংবা পাঁচ লক্ষ বছর বা তার চেয়ে কম পুরানো। মাঝের পাঁচ লক্ষ বছরের কোনও গবেষণাযোগ্য জীবাশ্ম এত দিন মেলেনি। এ বার সেই শূন্যতা পূরণ হল আফ্রিকায়।
আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে মরক্কো। সেখানে আতলান্টিক মহাসাগরের উপকূলে কাসাব্লাঙ্কা থেকে মিলেছে জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া কিছু হাড়গোড়। রেডিয়োকার্বন ডেটিং করে দেখা গিয়েছে, সেগুলির বয়স ৭,৭৩,০০০ বছর। এর মধ্যে রয়েছে এক প্রায় সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্কের চোয়ালের হাড়, এক মাঝবয়সির চোয়ালের হাড় এবং একট শিশুর চোয়ালের হাড়। এ ছাড়া কিছু দাঁত এবং কিছু মেরুদণ্ডের হাড়ও পাওয়া যায় কাসাব্লাঙ্কার ওই ‘গ্রোটে এ হোমিনিডস’ বা হোমিনিডদের গুহা (বিভিন্ন মানব প্রজাতি এবং শিম্পাঞ্জি জাতীয় প্রাণীর প্রজাতিকে একত্রে হোমিনিড বলে) থেকে।
প্যারিসের কলেজ ডি ফ্রান্স এবং জার্মানির লিপজ়িগের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভোলিউশনারি অ্যানথ্রোপলজি-র জীবাশ্মবিদ জিন-জ্যাক হাবলিনের নেতৃত্বে এই গবেষণাটি চলে। সম্প্রতি ‘নেচার’ জার্নালে সেই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। হাবলিনের কথায়, “এই ব্যবধানের (পাঁচ লক্ষ বছরের) ঠিক মাঝামাঝি পর্বে একটি জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া সত্যিই খুব রোমাঞ্চকর।”
শিম্পাঞ্জি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দু’পায়ে সোজা হয়ে হাঁটা মানব প্রজাতির আবির্ভাবের প্রাথমিক পর্ব নিয়ে গবেষণার জন্যও এই জীবাশ্মগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, আনুমানিক এই সময়েই কোনও এক ইউরেশীয় হোমিনিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের আফ্রিকান বংশধরেরা আধুনিক মানুষ (হোমো সেপিয়েন্স) হওয়ার দিকে এগোতে শুরু করেছিল। তাদের থেকেই দুই মানবপ্রজাতি নিয়ানডারথাল এবং ডেনিসোভানদের আবির্ভাব হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
মরক্কোয় খুঁজে পাওয়া এই জীবাশ্মগুলির সঙ্গে তিন মানব প্রজাতি (হোমো ইরেক্টাস, হোমো সেপিয়েন্স এবং নিয়ানডারথাল)-র কিছু কিছু মিল রয়েছে। বেশি মিল রয়েছে হোমো ইরেক্টাসের সঙ্গে। এ ছা়ড়া এই আদিম প্রজাতির দাঁতের সঙ্গে আধুনিক মানুষ এবং নিয়ানডারথালেদের দাঁতের কিছু ক্ষেত্রে সাদৃশ্য রয়েছে। তবে চোয়ালের গড়ন আলাদা। এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে, তা হলে কি হোমো ইরেক্টাসদের থেকেই সরাসরি নিয়ানডারথাল, ডেনিসোভান বা আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছে? নাকি এটি অন্য কোনও আদিম পূর্বসূরির জীবাশ্ম? নতুন খুঁজে পাওয়া জীবাশ্ম থেকে এমন বেশ কিছু প্রশ্ন উঁকি মারতে শুরু করেছে।
আরও পড়ুন:
গবেষক দলের মতে, মরোক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় পাওয়া ওই জীবাশ্মগুলি আধুনিক মানুষ, নিয়ানডারথাল এবং ডেনিসোভানদের শেষ সাধারণ পূর্বসূরি (লাস্ট কমন অ্যানসেস্টর) না-ও হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত যে এই জীবাশ্মগুলি অবশ্যই কোনও আদিমানবের ঘনিষ্ঠ পূর্বসূরির। হোমিনিন গুহায় কাছাকাছি মরোক্কোর জেবেল ইরহুদ এলাকা থেকে আরও কিছু জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছিল অতীতে। সেগুলি ছিল একমাত্র জীবিত মানব প্রজাতি হোমো সেপিয়েন্সের জীবাশ্ম। তবে কাসাব্লাঙ্কার এই জীবাশ্মগুলি সেগুলির তুলনায় অনেকটাই আলাদা।
তবে এই জীবাশ্মগুলিকে আরও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। তাই এখনই এগুলির কোনও বৈজ্ঞানিক নাম দিতে চাননি গবেষকেরা। এগুলি হোমো ইরেক্টাসের না কি অন্য কোনও ঘনিষ্ঠ পূর্বসূরির তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।