আকাশে ছুটে বেড়ানো ‘থ্রিআই/অ্যাটলাস’ কি ধূমকেতু নাকি ভিনগ্রহীদের মহাকাশযান, এ নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল বিজ্ঞানের জগতে। নানা মুনির নানা মত, সম্ভাব্য তত্ত্বও শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু শেষমেশ সেটি যে ধূমকেতু সেই তত্ত্বই জোরালো হয়েছে। পুণেয় অবস্থিত জায়ান্ট মিটারওয়েভ রেডিয়ো টেলিস্কোপ’ ব্যবহার করে বেতার তরঙ্গ মারফত ‘থ্রিআই/অ্যাটলাস’-এর ছবি তুলে বিশ্লেষণ করে তিন বাঙালি বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন যে অন্যান্য ধূমকেতুর মতোই প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্টি হয়েছে ‘থ্রিআই/অ্যাটলাস’। এর পিছনে কোনও ভিন্গ্রহী হাত নেই। বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য অ্যাস্ট্রোনমারস টেলিগ্রাম’ ওয়েবসাইটে।
এই বিজ্ঞানী দলের প্রধান তথা মেদিনীপুর সিটি কলেজের পদার্থবিদ্যার শিক্ষক সব্যসাচী পাল বলছেন, ‘‘যেহেতু সদ্য এই তথ্য পাওয়া গিয়েছে তাই বিষয়টি দ্রুত প্রকাশ করতে দ্য অ্যাস্ট্রোনমারস টেলিগ্রাম-কে বেছে নেওয়া হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত আবিষ্কার জরুরি ভিত্তিতে এখানেই প্রকাশিত হয়। কারণ, জার্নালে প্রকাশ করতে গেলে অন্তত ছ’মাস সময় লাগেই।’’ দলের বাকি দুই সদস্য অরিজিৎ মান্না ও তাপস বাগ সল্টলেকের এস এন বোস সেন্টার ফর বেসিক সায়েন্স-এর বিজ্ঞানী। সব্যসাচী বলছেন, “এই গবেষণা ‘থ্রিআই/অ্যাটলাস’-কে নিয়ে ভুল ধারণা ভাঙার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সৌরজগতের বাইরে থেকে আসা বস্তুগুলিকে বোঝার ক্ষেত্রে নয়া দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ধূমকেতু নিয়ে গবেষণা নিজের উৎস খোঁজা। পৃথিবী, জল এবং জীবনের শুরু কোথা থেকে, তার উত্তর লুকিয়ে এই লেজওয়ালা মহাজাগতিক অতিথিদের মধ্যে।”
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুদূর অতীত থেকেই ধূমকেতু নিয়ে রহস্য রয়ে গিয়েছে। ব্রহ্মাণ্ডের জন্মলগ্নে তৈরি হওয়া ধূমকেতুরা আজও বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিচ্ছে সৃষ্টির নানা অধ্যায়। সৌরজগতের জন্মলগ্নের তথ্য আজও ধূমকেতুর মধ্যে বিদ্যমান। মূলত বরফ (জল, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড), ধূলিকণা, এবং নানা ধরনের জৈব অণু (মিথানল, হাইড্রোজেন সায়ানাইড) দিয়ে ধূমকেতু তৈরি। মহাবিশ্বে পাক খেতে সূর্যের কাছে এসে তাপের প্রভাবে ধূমকেতুর বরফ গলে গ্যাসে পরিণত হয় এবং ধূলিকণা বেরিয়ে আসে। তার ফলে ধূমকেতুর লেজ সৃষ্টি হয়।
তবে অন্যান্য ধূমকেতুর মতো ‘থ্রিআই/অ্যাটলাস’ সৌরজগতের শরিক নয় বলেই বিজ্ঞানীদের দাবি। এটি অন্য কোনও নক্ষত্রের পাশে তৈরি হয়েছে এবং কয়েক কোটি বছর পরিভ্রমণ করে সৌরজগতে এসে হাজির হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধরনের ধূমকেতু (যাদের জন্ম সৌরজগতের বাইরে) বিশ্লেষণ করে বোঝা সম্ভব যে সৌরজগতের বাইরে বরফ ও ধুলোর চরিত্র কেমন এবং সেখানে জীবন সৃষ্টির উপযোগী জৈব অণুর উপস্থিতি আছে কি না! প্রসঙ্গত, এর আগে ‘ওউমুয়ামুয়া’ এবং ‘টুআই/বরিসভ’ নামে দু’টি ধূমকেতু সৌরজগতের বাইরে থেকে এসেছিল।
‘থ্রিআই/অ্যাটলাস’-এর গতিবিধি নজরে আসার পর থেকেই তাকে নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল। তার কারণ, এর গতিপথ, বিভিন্ন আচরণ ধূমকেতুর চেনা ব্যবহারের সঙ্গে মিলছিল না। বিজ্ঞানীদের অনেকেরই বক্তব্য ছিল যে যে ভাবে এই ধূমকেতু গতিপথ বদল এবং নিয়ন্ত্রণ করছে তাতে মনে হচ্ছে যেন কেউ এই গতিপথ বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে। গ্রহাণু বা ধূমকেতুর পিঠে চেপে দ্রুত গতিতে মহাকাশ অভিযানের ভবিষ্যৎ আছে কি না, তা নিয়েও চর্চা হচ্ছে। ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজ়িক্স-এর অধিকর্তা অধ্যাপক সন্দীপ চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘প্রথমে ভিন্গ্রহীদের যান নিয়ে আলোচনা হলেও পরে বোঝা যাচ্ছিল যে এটি ধূমকেতু। তবে এখনও কিছু অস্বাভাবিক বিষয় নজরে আসছে। যেমন, ‘থ্রিআই/অ্যাটলাস’-এর সামনে এবং পিছনে দু’টি লেজ আছে। সাধারণত, ধূমকেতুর পিছনেই লেজ হয়।’’ অধ্যাপক চক্রবর্তীর মতে, ‘থ্রিআই/অ্যাটলাস’-এর গঠনে কিছু বিরল বৈশিষ্ট্য আছে। মনে হচ্ছে, এটির কেন্দ্রে কোনও ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল (প্রাইমোরডিয়াল ব্ল্যাক হোল)থাকতে পারে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)