একটা নয়, দুটো নয়, আট-আটটা গ্রহকে নিয়ে আমাদের সূর্যের ভরাট সংসার। পৃথিবীর মতো বাকিরাও সূর্যের টানে তার চারপাশে ঘুরে চলেছে অবিরাম। এটাই মহাশূন্যের নিয়ম। কিন্তু নিয়ম থাকলে তার ব্যতিক্রমও যে অবশ্যম্ভাবী, বার বার তা দেখিয়েছে বিজ্ঞান। কোনও রকম নক্ষত্রের আকর্ষণ ছাড়া মহাশূন্যে ঘুরে চলা একলা গ্রহের হদিস মিলেছে। এ বার তেমন এক গ্রহের দূরত্ব এবং ভরও মেপে দেখালেন বিজ্ঞানীরা। মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে যা এই প্রথম।
পৃথিবী থেকে নতুন আবিষ্কৃত গ্রহটির দূরত্ব প্রায় ১০ হাজার আলোকবর্ষ। ভর সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতির ভরের পাঁচ গুণ। বিচ্ছিন্ন এই গ্রহ রয়েছে আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রের কাছাকাছি। একাধিক টেলিস্কোপে তার সঙ্গহীন অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন সঙ্গহীন? গ্রহটি কোনও নির্দিষ্ট নক্ষত্রের পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হল না কেন? কী ভাবে তা এমন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল?
আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীদের অনুমান, আর পাঁচটা গ্রহ যে ভাবে তৈরি হয়েছে, বিচ্ছিন্ন এই গ্রহের উৎপত্তিও সে ভাবেই। কোনও এক নক্ষত্রের চারপাশেই তা ঘুরে বেড়াত। পরে মহাকর্ষ বলের আকর্ষণ-বিকর্ষণের খেলায় গ্রহটি কোনও একসময় খেই হারিয়ে ফেলে। বাঁধন আলগা হয়ে বেরিয়ে যায় সংশ্লিষ্ট নক্ষত্রের আকর্ষণের বৃত্ত থেকে। সেই থেকে সে একা একাই ঘুরছে। এ যেন এক মহাজাগতিক নির্বাসন।
গ্রহটি আকারে ছোট, তার নিজস্ব আলোও নেই। তাই পৃথিবী থেকে এই গ্রহকে দেখতে পাওয়া সহজ নয়। বিচ্ছিন্ন হওয়ায় কোনও নক্ষত্রের সাপেক্ষেও এই গ্রহের আবিষ্কার সম্ভব হয় না। এই ধরনের গ্রহকে খুঁজতে বিজ্ঞানীদের ভরসা তাই মহাজাগতিক আলো। ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবী এবং অন্য কোনও নক্ষত্রের মাঝামাঝি অবস্থানে চলে এলে গ্রহের মহাকর্ষীয় প্রভাব লেন্সের মতো কাজ করে। আলো সেখানে সংক্ষিপ্ত ভাবে বর্ধিত হয়। তা দেখেই গ্রহটির অবস্থান বুঝতে পারেন বিজ্ঞানীরা। বিচ্ছিন্ন গ্রহটির ক্ষেত্রেরও তা-ই হয়েছে।
আরও পড়ুন:
দূরের গ্রহের আবিষ্কার এই পদ্ধতিতে সম্ভব হলেও তার ভর এবং দূরত্ব মাপা কিন্তু কঠিন। ভর পরিমাপের জন্য আগে পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব জানা দরকার। নক্ষত্রের টান ছাড়া একা একাই মহাশূন্যে ঘুরে বেড়ানোর কারণে বিজ্ঞানীরা খুব বেশি তথ্য হাতে পান না। তবে এ ক্ষেত্রে কী ভাবে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করা গেল?
২০২৪ সালের ৩ মে চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় বসানো টেলিস্কোপের মাধ্যমে গ্রহটিকে দেখা গিয়েছিল। পৃথিবী থেকে ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরের কক্ষপথে বসানো গাইয়া স্পেস টেলিস্কোপেও তা ধরা পড়ে। ১৬ ঘণ্টায় মোট ছ’বার এই গ্রহটিকে দেখতে পেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। ভূমিতে স্থাপিত টেলিস্কোপ এবং মহাশূন্যে স্থাপিত টেলিস্কোপ থেকে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে তাকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তাতেই হয়েছে কেল্লাফতে! অনায়াসে দূরত্ব পরিমাপ করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা।
হিসাব বলছে, পৃথিবী থেকে এই গ্রহের দূরত্ব ৯,৭৮৫ আলোকবর্ষ এবং এর ভর বৃহস্পতির ভরের ২২ শতাংশ। যে পদ্ধতিতে ভর এবং দূরত্ব পরিমাপ করা হয়েছে, তা আগামী দিনের গবেষণাতেও বিশেষ কার্যকরী হবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ। ২০২৭ সালে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণ করা হবে। হাব্ল-এর চেয়েও ১০০০ গুণ দ্রুত তা মহাকাশে চক্কর খাবে। ওই টেলিস্কোপের মাধ্যমে এই ধরনের বিচ্ছিন্ন গ্রহের দূরত্ব ও ভর মাপা আরও সহজ হয়ে যাবে, দাবি বিশেষজ্ঞদের। সায়েন্স পত্রিকায় এই সংক্রান্ত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।