প্রায় ৪০ কোটি বছর আগের কথা। পৃথিবীতে তখন মানুষ তো দূর, ডাইনোসরদেরও আবির্ভাব হয়নি। সেই সময়ে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিল এক রহস্যময় জীব। যাঁরা উদ্ভিদও নয়, আবার প্রাণীও নয়। এমনকি ছত্রাকও নয়। এরা ছিল এমন এক বহুকোষী জীব, যাদের বিষয়ে সম্ভবত এখনও বিশেষ কিছুই জানা নেই। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমনটাই আভাস মিলেছে।
আজ থেকে প্রায় ২৪-২৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ডাইনোসরদের আবির্ভাব হয়েছিল। তাদেরও বহু কোটি বছর আগে থেকে পৃথিবীতে ছিল এই অদ্ভুতদর্শন জীবেরা। আনুমানিক ৪২-৪৩ কোটি বছর আগে এদের আবির্ভাব হয়েছিল পৃথিবীতে। হাত-পা কিছুই নেই। দেখতে অনেকটা লম্বাটে পাইপের মতো। এদের গমন (চলাফেরা করা)-এর ক্ষমতা ছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মাটির উপর খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত এই বিশালদেহী প্রাণীরা। লম্বায় ছিল প্রায় ৩০ ফুট। অর্থাৎ, মানুষের চেয়ে প্রায় চার-পাঁচ গুণ বেশি লম্বা ছিল এই জীবেরা। চওড়ায় ছিল প্রায় ৬ ফুট।
রহস্যে ঘেরা এই জীবেরা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে বহু আগেই। তবে এদের জীবাশ্ম রয়ে গিয়েছে। আজ থেকে প্রায় ১৬০ বছর আগে প্রথম এদের জীবাশ্মের সন্ধান মেলে। নাম দেওয়া হয় প্রোটোট্যাক্সাইট। অদ্ভুত দেখতে এই বিশালদেহী জীবেদের নিয়ে রহস্য তখন থেকেই। বিগত বছরগুলিতে এদের নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। কিন্তু এরা যে কোন গোত্রের প্রাণী, তা এখনও নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব হয়নি।
পৃথিবীর জীবকূলকে মূলত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়— প্রাণী, উদ্ভিদ, ছত্রাক এবং দুই আনুবীক্ষণিক গোত্রের জীব মোনেরা ও প্রোটিস্টা। কিন্তু কোনওটির সঙ্গে প্রোটোট্যাক্সাইটকে মিলিয়ে ওঠা যায়নি। উনিশ শতকে এদের নিয়ে গবেষণার প্রাথমিক পর্বে মনে করা হয়েছিল, এগুলি আসলে কনিফার (পাইন জাতীয় গাছের) কাণ্ড। কিন্তু জীবাশ্ম গবেষণার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়, এগুলির মধ্যে উদ্ভিদ টিস্যু তৈরি করার মতো কোনও কোষ ছিল না। পরিবর্তে এর মধ্যে ছিল পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত কিছু টিউবের মতো গঠন।
আবার কোনও গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল, এটি লাইকেনের মতো কোনও জীবন ব্যবস্থা। বস্তুত, লাইকেন কোনও একক জীব নয়। ছত্রাক এবং শৈবাল একসঙ্গে মিশে লাইকেন তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে জীবের শারীরিক গঠন হয় ছত্রাকের মতো। আবার শৈবাল থাকায় তা সালোকসংশ্লেষও করতে পারে। দীর্ঘ দিন ধরে প্রোটোট্যাক্সাইটদেরও লাইকেন জাতীয় জীব বলেই মনে করা হত। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়, লাইকেন নয়। বরং ছত্রাকের সঙ্গেই তুলনা করা যায় এদের। কারণ, এটি সালোকসংশ্লেষ করতে পারে না (যা লাইকেনের অন্যতম বৈশিষ্ট)।
আরও পড়ুন:
গত কয়েক দশকে প্রোটোট্যাক্সাইটদের নিয়ে এমন বিস্তর গবেষণা হয়েছে। কিন্তু এরা কোন গোত্রের জীব, তা নিয়ে ধাঁধা কাটেনি। বরং, আরও বৃদ্ধি পেয়েছে রহস্য। যেমন গত মাসেই ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে এই সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হচ্ছে, এরা কোনও উদ্ভিদও নয়, প্রাণীও নয়, আবার ছত্রাকও নয়। এরা সম্ভবত সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনও গোত্রের এক বহুকোষী জীব, যে গোত্রের কথা আমাদের কাছে এখনও অজানা।
স্কটল্যান্ডের এডেনবার্গ থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উত্তরে রেইনি এলাকা থেকে অতীতে তিনটি প্রোটোট্যাক্সাইট জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে। সেইগুলি নিয়েই গবেষণা করেন এডেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ কোরেন্টিন লোরেন এবং তাঁর সঙ্গীরা। গবেষণার পরে তিনি বলেন, “নতুন তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা বলতে পারি, এগুলি যে কোনও আধুনিক গোত্রের চেয়ে অনেকটা আলাদা।”
স্কটল্যান্ডের রেইনি এলাকাটি জীবাশ্মবিদদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই এলাকা থেকে অতীতেও বিভিন্ন আদিম উদ্ভিদ, ছত্রাক এবং প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে। সেগুলির সবই প্রায় ৪০ কোটি বছরের পুরানো। ফলে সমসাময়িক অন্য ছত্রাকের সঙ্গে প্রোটোট্যাক্সাইটের বৈশিষ্টের কতটা সাদৃশ্য রয়েছে, তা বোঝার সুবিধা হয় জীবাশ্মবিদদের। তাতে দেখা যাচ্ছে, সমসাময়িক ছত্রাকগুলির থেকে এর অনেক ফারাক। ওই এলাকা থেকে পাওয়া ছত্রাকের জীবাশ্মগুলিতে কাইটিন এবং গ্লুকান ভেঙে তৈরি হওয়া যৌগের সন্ধান মিলেছে। কিন্তু প্রোটোট্যাক্সাইটের জীবাশ্মে তেমন কিছু মেলেনি। লোরেনের কথায়, “যদি প্রোটোট্যাক্সাইটগুলি ছত্রাকই হত, তা হলে অন্য ছত্রাকের মতো এ ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যেত।”
তবে এটিও নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না। কারণ ওই সময়ে পৃথিবীতে অন্তত ২৫টি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির প্রোটোট্যাক্সাইট ছিল। জীবাশ্ম গবেষণায় এখনও পর্যন্ত তেমনটাই জানা গিয়েছে। তার মধ্যে এডেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা মাত্র একটি প্রজাতির উপরেই গবেষণা চালিয়েছেন। ফলে একটি মাত্র প্রজাতির উপরে চলা গবেষণা কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। যেমন প্যারিসের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের অধ্যাপক মার্ক-আন্দ্রে সেলোসের কথায়, “প্রোটোট্যাক্সাইটের বিভিন্ন প্রজাতির নমুনা এ ক্ষেত্রে সংগ্রহ করা হয়নি। তাই এই গবেষণা কোনও পূর্ণাঙ্গ কাহিনি বর্ণনা করে বলে আমার মনে হয় না।”
ফলে নতুন গবেষণাতেও ধোঁয়াশা পুরোপুরি কাটল না। বরং, বিশালদেহী এই জীবদের নিয়ে রহস্য আরও বৃদ্ধি পেল। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেল, এরা যে ঠিক কোন গোত্রের জীব, তা উদ্ধার করার জন্য জীবাশ্মবিদদের কৌতূহল।