Advertisement
E-Paper

ম্যামথদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো লোমশ সেই গন্ডারেরা কেন বিলুপ্ত হয়ে গেল? গবেষণায় ইঙ্গিত জলবায়ু বদলের দিকেই

লম্বা লম্বা লোমযুক্ত এই গন্ডারের প্রজাতি ম্যামথদের সময়ে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত। তাদের লোমশ চেহারা হিমশীতল পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য উপযুক্ত ছিল। মূলত উত্তর ইউরেশিয়া জুড়ে বাস করত এই প্রজাতির গন্ডার।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৫
পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া লোমশ গন্ডার ‘কোয়েলোডোন্টা অ্যান্টিকুইটাটিস’।

পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া লোমশ গন্ডার ‘কোয়েলোডোন্টা অ্যান্টিকুইটাটিস’। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

এক সময়ে ম্যামথদের সঙ্গে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত এরাও। ম্যামথদের মতো এরাও ছিল লোমশ। হাজার হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সেই গন্ডারের দেহাংশ মিলল এক মৃত নেকড়ের পেটের মধ্যে। মিলল অক্ষত ডিএনএ-ও। যা এই প্রজাতির বিলুপ্তির কারণ নিয়ে নতুন করে গবেষণার দিক প্রশস্ত করেছে।

এত দিন মনে করা হত মানুষের শিকারের ফলেই সম্ভবত এই গন্ডার-প্রজাতি পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছে। তবে এখন বিজ্ঞানীদের দাবি, মানুষের হাতে হয়তো কিছু গন্ডার শিকার হয়েছে। তবে সেটিই মূল কারণ নয়। বিলুপ্তির মূল কারণ সম্ভবত জলবায়ু পরিবর্তন। অনুমান করা হচ্ছে পৃথিবীর জলবায়ু উষ্ণ হয়ে যেতে থাকাতেই সম্ভবত হারিয়ে গিয়েছে হিমশীতল পরিবেশের এই প্রাণীরা।

লোমশ এই গন্ডারেরা পৃথিবী থেকে কবে বিলুপ্ত হয়ে যায়, তা এখনও স্পষ্ট নয় বিজ্ঞানীদের কাছে। এত দিন অনুমান করা হত প্রায় ১৮,৪০০ বছর আগে এই প্রাণীরা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, আরও বেশি সময় পৃথিবীতে টিকে ছিল এই খড়্গযুক্ত লোমশ প্রাণীরা। মিলেছে প্রায় ১৪ হাজার বছর আগে ‘লোমশ গন্ডার’-এর উপস্থিতির প্রমাণ।

সাইবেরিয়ায় ২০১১ সালে খুঁজে পাওয়া যায় একটি নেকড়েশাবকের দেহ। বহু বছর ধরে সেটি সেখানেই পড়ে ছিল। বরফে জমে গিয়েছিল দেহটি। পরে ওই নেকড়েশাবকের দেহের ময়নাতদন্ত করেন বিজ্ঞানীরা। তাতে ওই নেকড়ের পাকস্থলীতে কিছু টিস্যু পাওয়া যায়। ওই টিস্যু থেকে পাওয়া ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখেন গবেষকেরা। দেখা যায়, এই ডিএনএ সেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সেই লোমযুক্ত গন্ডার— ‘কোয়েলোডোন্টা অ্যান্টিকুইটাটিস’-এর।

প্রায় দেড় দশক ধরে গবেষণা চলছিল। গবেষকদলের নেতৃত্বে ছিলেন সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্যামিলো চাকন-ডুক। এই প্রথম বার অন্য প্রাণীর পেট থেকে পাওয়া নমুনায় কোনও প্রাণীর সম্পূর্ণ জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে দেখেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি ‘জিনোম বায়োলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’ জার্নালে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।

এত বছর ধরে কী ভাবে মৃত নেকড়েশাবকের পেটে লোমযুক্ত গন্ডারের ডিএনএ অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেল, তা-ও এক বিষ্ময়। যদিও গবেষকদলের অনুমান, গন্ডারের মাংস খাওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই মারা গিয়েছিল নেকড়েটি। সম্ভবত কোনও ভূমিধসের কারণে মাটি চাপা পড়ে মারা গিয়েছিল নেকড়েটি। ফলে নেকড়ের পেটের মধ্যে গন্ডারের মাংসটি পাচনতন্ত্রের টিস্যুতে প্রবেশ করার মতো যথেষ্ট সময় পায়নি। পরবর্তী সময়ে নেকড়ের দেহটি বরফে জমে যাওয়ার কারণে তার পেটের ভিতরে গন্ডারের মাংসও অক্ষত অবস্থায় রয়ে যায়। ধসে চাপা পড়ে মারা যাওয়ার আগে ওই গন্ডারের মাংসই ছিল নেকড়েশাবকের শেষ খাবার।

গবেষকদের দাবি, লোমশ গণ্ডারের প্রজাতি কেন পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল, তা বুঝতে আরও সাহায্য করবে এই ডিএনএ-র খোঁজ। গবেষকদলের প্রধান চাকন-ডুকের কথায়, “আমরা খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কারণ লোমযুক্ত গন্ডার যে সময়ে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, সেই সময়ের খুব কম জীবাশ্মই এখনও পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে।”

লম্বা লম্বা লোমযুক্ত এই গন্ডারের প্রজাতি ম্যামথদের সময়ে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত। তাদের লোমশ চেহারা হিমশীতল পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য উপযুক্ত ছিল। মূলত উত্তর ইউরেশিয়া জুড়ে বাস করত এই প্রজাতির গন্ডার। অনুমান করা হয়, প্রায় ৩৫ হাজার বছর আগে এদের বাসস্থানের পরিসর ক্রমশ সঙ্কুচিত হতে থাকে এবং উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়াতেই এদের বসবাস সীমিত হয়ে পড়ে। এত দিন মনে করা হত, আজ থেকে প্রায় ১৮,৪০০ বছর আগে কোনও এক কারণে বিলুপ্ত হয়ে যায় এই প্রজাতি।

লোমশ গন্ডারের জেনেটিক বিশ্লেষণে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। গবেষকদের দাবি, বিলুপ্তির দোরগোড়ায় এসেও এই প্রজাতিতে জিনগত কোনও অবনতির লক্ষ্মণ দেখা যায়নি। বরং, বিলুপ্তির আগে পর্যন্তও একটি স্থিতিশীল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জনসংখ্যাও বজায় রেখেছিল গন্ডারদের এই প্রজাতি। ফলে গবেষকেরা অনুমান করছেন, তুলনামূলক ভাবে দ্রুত পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছে এই লোমশ গন্ডার। আনুমানিক প্রায় ১১ হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়ে থাকতে পারে এই প্রজাতিটি।

প্রাথমিক ভাবে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়ায় মনুষ্যবসতি শুরু হওয়ার পর থেকে এই গন্ডারদের শিকার করা শুরু হয়। সেই কারণেই লোমশ গন্ডার পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা সেই ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, সম্ভবত শিকারের কারণে নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছে এই গন্ডারেরা। গবেষকদলের অন্যতম সদস্য লভ ডালেনের কথায়, “উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়ায় মানুষ বসবাস শুরু করার পর থেকে ১৫,০০০ বছর ধরে লোমশ গন্ডারের একটি উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা ছিল। যা ইঙ্গিত দেয়, মানুষের শিকারের চেয়ে জলবায়ু পরিবর্তনই বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

Rhinoceros Extinct Animals
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy