সত্তরোর্ধ্ব হলেও স্মৃতিশক্তি প্রখর রামলাল নাগপালের। ১৫ বছর আগের ঘটনা এখনও দিব্য মনে আছে।
ভদ্রলোক বাড়ির বারান্দায় নিজের প্রিয় ইজিচেয়ারে বসে বলছিলেন, ‘‘কলোনির মাঠেই তো ক্রিকেট খেলত ছেলেটা। আমি বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে দেখতাম। কী বল পেটাত! কত বল মেরে হারিয়েই দিত। তখন কী আর জানতাম এই ছেলেই বড় হয়ে বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান হয়ে উঠবে? ইন্ডিয়া ক্যাপ্টেন হবে? এখন ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়।’’
রামলালের অফিস ফেরত দেখা সেই ছেলেটাই আজকের বিরাট কোহালি।
পশ্চিম বিহারের মীরা বাগের দোতলা বাড়িটা ছেড়ে গত বছর জুনে বিরাট তাঁর মা, দাদা-বৌদিকে নিয়ে চলে গিয়েছেন সেখান থেকে বেশ দূরে গুরগাঁওয়ের ডিএলএফ ফেজ ১সি-তে বিলাসবহুল বাংলোয়। কিন্তু বিরাট-স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে বসে আছেন এখানকার বাসিন্দারা। আর বিরাট কোহালির জন্যই পুরো এলাকাটার নাম লোকমুখে পশ্চিম বিহার থেকে বদলে ‘বিরাট বিহার’ হয়ে গিয়েছে।
বুধবার দুপুরে সেই বিরাট বিহার ভ্রমণে গিয়ে অবশ্য বিরাটের ছোটবেলার বন্ধুদের কাউকে পাওয়া গেল না। সপ্তাহের মাঝে ভরা উইক ডে। সবাই যে যাঁর কাজে ব্যস্ত। পাওয়া গেল শর্মাজিকে, যাঁর ছেলে এক সময় নিয়মিত কলোনির মাঠে ক্রিকেট খেলত বিরাটের সঙ্গে।
শর্মাজি বললেন, ‘‘কলোনিতে খুব হইচই করে থাকত। কিন্তু যখন থেকে ও সিরিয়াস ক্রিকেটে ঢুকে পড়ল তখন থেকে কলোনির বাচ্চাদের সঙ্গে ওর মেলামেশাও অনেক কমে গেল। কলোনির মাঠেও খেলত না। আসলে তখন ওই রাজকুমার শর্মার অ্যাকাডেমিতেই পড়ে থাকত সব সময়। এই নিয়ে কম বদনাম শুনতে হয়নি ওকে। অনেকে নানা কথা বলেছে। ব্যঙ্গ করে বলত, ছেলে যেন সচিন তেন্ডুলকর হবে! অথচ দেখুন, ছেলেটা কিন্তু এখন সচিনের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।’’
এখানকার বাড়িতেই নাকি এক বার এসেছিলেন অনুষ্কা শর্মা। বিরাটের মা সরোজ কোহালির সঙ্গে দেখা করতে। সে দিন পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ হয়ে গিয়েছিল কোহালিদের বাড়ি। অনুষ্কার সঙ্গে প্রতিবেশিদের কাউকে দেখাই করতে দেওয়া হয়নি। কয়েক মাস পরে তাঁদের কিচ্ছুটি না জানিয়ে কলোনি ছেড়ে চলেও যান বিরাটরা। ফলে তাঁদের মনে ‘চিকু ভাইয়া’-র উপর প্রচুর অভিমান জমা হয়েছিল। এই বিশ্বকাপ সেই অভিমানের বরফে উত্তাপ দিল যেন। যে উত্তাপে অভিমানের বরফ গলে জল। এ দিন উল্টে শোনা গেল, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মীরা বাগের বাসিন্দারা ঘরে ঘরে বিরাটের জন্য প্রার্থনা করে তার পর টিভির সামনে বসবেন।
আর ও দিকে গুরগাঁওয়ের বিশাল বাংলোয়?
সপরিবারে টিভির সামনে বসবেন বিকাশ কোহালি। বিরাটের দাদা। যিনি এ দিন বলছিলেন, ‘‘কাজে আটকে পড়েছি বলে আর মুম্বই যাওয়া হচ্ছে না। টিভিতেই দেখব ম্যাচটা। তবে মা বিরাটের খেলা থাকলে বেশিক্ষণ টিভির সামনে বসে থাকতে পারেন না। ওঁর খুব টেনশন হয়। মোহালি ম্যাচের দিনও নিজের ঘরে গিয়ে চুপচাপ বসেছিলেন। টিভি না দেখে। কালও বোধহয় সে রকমই হবে।’’
ভারতের ম্যাচ শেষের পর প্রায়ই রত্নগর্ভা মা-কে ফোন করেন বিরাট। মোহালির রাতেও করেছিলেন। বিকাশ বলছিলেন, ‘‘ভাই ফোনে কী বলেছিল জানি না, এ দিকে তো দেখি মা সমানে কেঁদে চলেছেন। তার পর আমি ফোনটা নিয়ে ওকে অভিনন্দন জানাই। আসলে বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে মায়ের কাছে ভাই-ই সব। সে জন্যই ভাইয়ের সাফল্যে মা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। আর সে দিন মোহালির সাফল্যটা তো ছিল সেরা।’’
এক দিকে বিরাট বিহার। অন্য দিকে ডিএলএফ ফেজ-১সি। কোথাকার প্রার্থনার জোর ওয়াংখেড়েতে বিরাটের ব্যাটে ফের ঝড় তুলবে, ঈশ্বরই জানেন।