×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৪ জুন ২০২১ ই-পেপার

তাঁবু পেরিয়ে এ বার মাঠের মধ্যেও

বয়স ভাঁড়ানোর তদন্তে সিবিআই

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ০৩:২৫

সারদা কাণ্ডের জেরে সিবিআই আগেই ঢুকে পড়েছিল কলকাতার বিভিন্ন ক্লাবের তাঁবুতে।

এ বার খেলার মাঠেও ঢুকে পড়ল সিবিআই! কোনও আর্থিক কেলেঙ্কারি বা অর্থলগ্নি সংস্থা নয়, সিবিআই তদন্তের আওতায় এ বার খেলোয়াড়দের বয়স ভাঁড়ানো!

বয়স ভিত্তিক বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ক্রীড়াবিদদের বয়স ভাঁড়ানো নিয়ে ঝামেলা এবং বিতর্ক বহুদিনের। বয়সের জাল সার্টিফিকেট দিয়ে ধরা পড়ে সাসপেন্ড হওয়ার ঘটনাও ঘটে নিয়মিত। কিন্তু তার তদন্তে একেবারে সিবিআই! এবং আরও চমকপ্রদ যে, ভারতীয় খেলাধুলার ইতিহাসে নজিরবিহীন এই ঘটনায় তদন্তে প্রথম উঠে এল বাংলারই দু’টি ক্রীড়াসংস্থার নাম!

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গ টেবল টেনিস অ্যাসোসিয়েশন এবং উত্তরবঙ্গ টেবল টেনিস সংস্থাকে চিঠি পাঠিয়ে পাঁচটি বিভাগের পঞ্চাশ জন করে বয়স ভিত্তিক টিটি প্লেয়ারের যাবতীয় তথ্য জানতে চাইল সিবিআই। শুধু বয়স নিয়ে তথ্য নয়, সুতীর্থা মুখোপাধ্যায়, আহিকা মুখোপাধ্যায়, কীর্তিকা সিংহ রায়দের মতো বাংলার আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় টিটি খেলোয়াড়দের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, স্পনসর, পুরস্কার অর্থের খুঁটিনাটিও জানতে চেয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। এতেও থেমে থাকছে না সিবিআই। জানা গিয়েছে, খেলোয়াড়দের বাবা-মা কী করেন, তাঁদের আয় কত এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের যাবতীয় তথ্যও জানতে চাওয়া হয়েছে চিঠিতে। তদন্তে জড়িয়ে পড়েছেন রাজ্যের দু’টি টিটি সংস্থার কর্তারাও। কারণ, কী ভাবে বয়স ভিত্তিক টুর্নামেন্টের জন্য এ রাজ্যের টিটি প্লেয়ার বাছাই হয়, সংস্থার গঠনতন্ত্র কী, তা-ও জানতে চেয়েছে সিবিআই। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার চিঠি এসেছে অবশ্য সর্বভারতীয় টিটি সংস্থার মাধ্যমেই।

কিন্তু হঠাৎ কেন টিটি-তে বয়স ভাঁড়ানো নিয়ে সিবিআই তদন্ত? দিল্লির সরকারি মহলে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বর্তমানে একটি তেল কোম্পানিতে কর্মরত এবং প্রাক্তন ভিজিল্যান্স অফিসার উদয়শঙ্কর নামে এক ব্যাক্তি সিবিআইতে অভিযোগ করেন, টেবল টেনিসে বয়স ভাঁড়ানো নিয়ে। উদয়শঙ্করের অভিযোগ, তাঁর মেয়ে, টিটি খেলোয়াড় রীতিশঙ্কর বঞ্চিত হয়েছেন ভারতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে। বয়স ভাঁড়িয়ে রীতির জায়গায় ঢুকে পড়েছেন অন্য প্লেয়ার। এবং এ ব্যাপারে তদন্তের আর্জি জানিয়েছিলেন তিনি। শোনা যাচ্ছে, মাস ছয়েক আগে খেলার মাঠের বিভিন্ন কেলেঙ্কারি ধরার জন্য সিবিআই একটি আলাদা শাখা খুলেছে। তাঁরাই এই তদন্ত করছে।

কিন্তু অন্য সব রাজ্য ছেড়ে কেন তদন্তের গতিমুখ বাংলার দিকে। কারণ হিসাবে সামনে উঠে আসছে দু’টি ঘটনা। এক) আজমেঢ়ে সাব-জুনিয়র টিটি চ্যাম্পিয়নশিপে বয়স ভাঁড়ানোর দায়ে বাতিল হয়েছিলেন বাংলার ছয় ও উত্তরবঙ্গের এক খেলোয়াড়। দুই) গত মাসে মুম্বইতে রীতিশঙ্করকে বাদ দিয়ে বাংলার অন্য এক প্লেয়ার প্রিয়দর্শিনী দাসকে দলে নেওয়া হয় বয়সভিত্তিক এশিয়ান টিটি চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য। জানা গিয়েছে, মেয়েটি বয়সের কাগজপত্র জমা না দেওয়া সত্ত্বেও তাঁকে নাকি সরাসরি দলে নেন সর্বভারতীয় সংস্থার কর্তারা।

বাংলার টেবল টেনিসের হাল এমনিতেই বহু দিন যাবৎ খারাপ। তার উপর এ বার আবার সিবিআই! চমকে যাচ্ছেন টিটির কর্তারা। লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় বর্তমানে রাজ্য টিটি সংস্থার প্রেসিডেন্ট। তিনি বললেন, “আমি কিছুটা আশ্চর্যই হয়েছি সিবিআইয়ের চিঠি পেয়ে। কিন্তু কিছু করার নেই। যখন জানতে চেয়েছে, তখন সব তথ্য তো দিতেই হবে। বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টের প্লেয়ার নির্বাচনের জন্য আমাদের আলাদা কমিটি আছে। সিবিআই যা চেয়েছে সব পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।” কমিটি যখন আছে, তখন আজমেঢ়ে বাংলার ছয় জন খেলোয়াড় বাতিল হলেন কেন? সংস্থার সচিব দেবীপ্রসাদ বসু বললেন, “ওই সময় আমরা ক্ষমতায় ছিলাম না।” আর উত্তরবঙ্গ টিটি সংস্থার প্রেসিডেন্ট প্রাক্তন খেলোয়াড় মান্তু ঘোষ বললেন, “চুরাশি সাল থেকে টিটি-তে আছি। কিন্তু কখনও এ সব হতে পারে ভাবিনি। আশ্চর্যই হচ্ছি।” মান্তুর সংস্থার এক প্লেয়ারও বয়স ভাঁড়িয়ে ধরা পড়েছিলেন আজমেড়ে। সেই নেহাকুমারি সাসপেন্ডও হয়ে আছেন এখনও।

বয়স ভাঁড়ানো নিয়ে সিবিআই তদন্তকে কী চোখে দেখছেন অন্য খেলার লোকেরা। সিএবি-তে বয়স ভাঁড়ানো নিয়ে মাঝে বড় সমস্যা হয়েছিল। সাসপেন্ড হয়েছিলেন বেশ কিছু ক্রিকেটার। তা সত্ত্বেও মাঠে সিবিআই ঢুকবে, চান না বিশ্বরূপ দে। সিএবি কোষাধ্যক্ষ চেন্নাই থেকে ফোনে বললেন, “বয়স ভাঁড়ানো একটা রোগ। সংস্থা নিজেরাই এটা বন্ধ করতে পারে। আমার করেছি। তবে তাতে সিবিআই, সিআইডি ঢুকে পড়বে এটা কাম্য নয়।” বিশ্বরূপের সঙ্গে একমত আইএফএ সচিব উৎপল গঙ্গোপাধ্যায়ও। “মাঠে সিবিআই ঢুকুক এটা কাম্য নয়। বয়স ভাঁড়ানোর ব্যাপারটা সংস্থা নিজেরা বন্ধ করুক।”

আবার ক্রিকেট ও ফুটবলের উল্টো পথে হাঁটছেন অ্যাথলেটিক্স কর্তারা। যেখানে আকছার বয়স নিয়ে সমস্যা হয়। রাজ্য অ্যাথলেটিক্স সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট আইনজীবী দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, “সিবিআই যাদের ধরবে তাদের একেবারে গ্রেফতার করা হোক। যাতে ভবিষ্যতে বয়স ভাঁড়াতে ভয় পায় ক্রীড়াবিদরা। সিবিআই এসে ভালই হয়েছে।”

Advertisement