ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে বার বার বদলাল রং। কখনও সূর্যকুমার যাদবদের দাপট। আবার কখনও এডেন মার্করামদের। শুরুটা ছিল ভারতের। তবে দিনের শুরুটা যে সব সময় দিনের বাকিটার ইঙ্গিত দেয় না, তা প্রমাণ করে দিল রবিবারের ম্যাচ। দক্ষিণ আফ্রিকার ৭ উইকেটে ১৮৭ রানের জবাবে ভারতের ইনিংস শেষ হল ১৮.৫ ওভারে ১১১ রানে। জয় শাহের ঘরের মাঠে সূর্যেরা হারলেন ৭৬ রানে। প্রতিযোগিতার প্রথম কঠিন প্রতিপক্ষের সামনেই বেরিয়ে পড়ল ভারতীয় ব্যাটিংয়ের কঙ্কাল। ২০২৩ সালে এক দিনের বিশ্বকাপ ফাইনালের পর আবার আইসিসি প্রতিযোগিতায় কোনও ম্যাচ হারল ভারত। সেই নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামেই!
শুরুতে ২০ রানে ৩ উইকেট
তুলে নিয়ে গত বারের রানার্সদের কোণঠাসা করে দেন জসপ্রীত বুমরাহ এবং অর্শদীপ সিংহ।
মার্করাম (৪), কুইন্টন ডি কক (৬), রায়ান রিকলটন (৭) পর পর ফিরে যান। চাপের মুখে
প্রথম বার ম্যাচের রং বদলায় ডেওয়াল্ড ব্রেভিস-ডেভিড মিলার জুটি। চতুর্থ উইকেটের
জুটিতে তাঁরা তোলেন ৯৭ রান। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটাই দক্ষিণ আফ্রিকার
সবচেয়ে বেশি রানের জুটি। ব্রেভিস করেন ২৯ বলে ৪৫। ৩টি করে চার এবং ছক্কা মারেন
তিনি। মিলার করেন ৩৫ বলে ৬৩। মারেন ৭টি চার, ৩টি ছক্কা। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন
দুই প্রোটিয়া ব্যাটার। তাঁদের তৈরি করে দেওয়া ছন্দ ধরে রাখেন ট্রিস্টান স্টাবস।
১টি চার, ৩টি ছয়ের সাহায্যে ২৪ বলে ৪৪ রানের অপরাজিত ইনিংস খেললেন স্টাবস।
ব্রেভিস-মিলার ব্যাট করার সময় মনে হচ্ছিল, ২০০ পেরিয়ে যাবে দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের রাশ আবার ভারতের অনুকূলে নিয়ে আসেন বুমরাহ-অর্শদীপ। মার্কো জানসেনকে (২) অর্শদীপ এবং কর্বিন বশকে (৫) বুমরাহ আউট করে দক্ষিণ আফ্রিকার রান তোলার গতি আটকান। ১৯ ওভারের শেষে মার্করামদের রান ছিল ৭ উইকেটে ১৬৭। ২০তম ওভারে হার্দিক পাণ্ড্যর বলে ২০ রান তুলে দলকে ভাল জায়গায় পৌঁছে দেন স্টাবস।
ভারতীয়দের মধ্যে এ দিন বল হাতে সফলতম বুমরাহই। তিনি ১৫ রানে ৩ উইকেট নিলেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাঁর উইকেট সংখ্যা হল ৩৩। ভারতীয়দের মধ্যে উঠে এলেন শীর্ষে। টপকে গেলেন রবিচন্দ্রন অশ্বিনের ৩২ উইকেট। অর্শদীপ ২ উইকেট নিলেন ২৮ রানে। ব্যর্থ বরুণ চক্রবর্তী। ১ উইকেট নিতে খরচ করলেন ৪৭ রান খরচ করে। এ ছাড়া ৩২ রানে ১ উইকেট শিবম দুবের।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের শেষ ওভার থেকে আবার রং বদলায়
ম্যাচ। জয়ের জন্য ১৮৮ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নামা ভারত ৭ বলের মধ্যেই ২ উইকেট
হারিয়ে চাপে পড়ে যায়। প্রথম ওভারের চতুর্থ বলে মার্করামকে তুলে মারতে গিয়ে আউট
ঈশান কিশন (০)। দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলে তিলক বর্মাকে (১) আউট করেন জানসেন।
সূর্যেরা ৫ রানে ২ উইকেট হারানোয় অহমদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম হঠাৎ চুপ করে
যায়। এর মধ্যেই আশা তৈরি হয় অভিষেক শর্মাকে নিয়ে। টানা তিন
ম্যাচে শূন্য রানে আউট হওয়া অভিষেক বিশ্বকাপে রান করা শুরু করলেন বাউন্ডারি মেরে।
আতঙ্কিত হয়ে পড়া ভারতীয় সমর্থকদের মূল ভরসা তখন অভিষেক।
তরুণ ওপেনারের সঙ্গে চাপের মুখে জুটি তৈরির চেষ্টা করেন অধিনায়ক সূর্য। যদিও বাউন্ডারি দিয়ে শুরু করলেও ব্যাটিং দেখে বোঝা যাচ্ছিল, অভিষেক ফর্মে নেই। হারের আশঙ্কা বাড়িয়ে তিনি আউট হলেন ১১ বলে ১৫ রান করে। কেশব মহারাজের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েও ক্যাচ হাতছাড়া করেননি বশ। ভারতীয় ডাগ আউটের পরিবেশ আরও গম্ভীর করে ওয়াশিংটন সুন্দর একের পর এক ‘ডট’ বল খেললেন পাওয়ার প্লে-তে। ২৬ রানে ৩ উইকেট পড়ার পর ওয়াশিংটনকে নামানোর যুক্তি সম্ভবত শুধু ভারতীয় দলের কোচই জানেন। যে কোনও ধরনের ক্রিকেটে ওয়াশিংটনের উপর আস্থা রাখেন গম্ভীর। সেই আস্থা এতটাই যে, সহ-অধিনায়ক অক্ষর পটেলের জায়গা হচ্ছে না প্রথম একাদশে!
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে টেস্ট ম্যাচের মতো ব্যাট করলেন ওয়াশিংটন। এ দিন মাঠে ছিলেন আর এক সুন্দর। গুগ্লের সিইও সুন্দর পিচাই। খড়গপুরের কৃতী প্রাক্তনীর সামনে সুন্দর ক্রিকেট উপস্থাপিত করতে পারলেন না তিনি। বল হাতে ২ ওভারে ১৭ রান দেওয়া ওয়াশিংটন ব্যাট হাতে করলেন ১১ বলে ১১। ব্যাটিং অর্ডারে বাঁহাতি-ডান হাতি জুটিই বোধহয় একমাত্র পছন্দ গম্ভীরের। তাই ব্যাটিং অর্ডার আমূল বদলাতে দু’বার ভাবেন না। এ ক্ষেত্রে কোচ গম্ভীরের ‘প্ল্যান বি’ এখনও দেখা যায়নি।
৪৩ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর রক্ষণাত্মক হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না ভারতীয় শিবিরের। কোচের আগ্রাসী ক্রিকেট নীতি থেকে সরে এসে ধরে খেলার চেষ্টা শুরু করেন সূর্য এবং শিবম দুবে। তাতে ওভার প্রতি রান তোলার লক্ষ্য বাড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। তবু ওয়াশিংটন আউট হওয়ার পর হার্দিককে নামাননি গম্ভীর। তাঁর ‘প্ল্যান বি’ নেই। ফলত ভারতীয় ইনিংস কোনও সময়ই চাপ কাটিয়ে বেরোতে পারল না। অসহায় দেখাল। হাঁসফাঁস করল। শট নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ভারতীয়দের দুর্বলতা দেখা গিয়েছে। খুচরো রান নিয়েও স্কোরবোর্ড সচল রাখতে পারেননি ভারতীয় ব্যাটারেরা।
দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারেরা মাথা খাটিয়ে বল করে গেলেন। মন্থর পিচে বলের গতি কমিয়ে দ্বন্দ্বে ফেললেন ভারতীয় ব্যাটারদের। যে ফাঁদে প্রথম পা দেন অভিষেক। একই ভাবে ঠকলেন সূর্যও (২২ বলে ১৮)। দলের ৫১ রানে অধিনায়ক আউট হওয়ার পরই ভারতের জয়ের আশা এক রকম শেষ হয়ে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারেরা পিচকে যে ভাবে ব্যবহার করলেন, তা পারেননি বরুণ-ওয়াশিংটনেরা। যদিও অহমদাবাদের ২২ গজের সঙ্গে তাঁদের পরিচিতি অনেক বেশি।
শিবমকে নিয়ে হার্দিক চেষ্টা করলেন যতটা সম্ভব রান করার। হারের ব্যবধান কমিয়ে আনার। কারণ নেট রান রেট পরে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাতেও সাফল্য পেলেন না ভারতীয়েরা। কেশব মহারাজ একই ওভারে হার্দিক (১৭ বলে ১৮) রিঙ্কু সিংহ (শূন্য)এবং অর্শদীপকে (১) আউট করে বিশ্বজয়ীদের পরাজয় নিশ্চিত করে দেন। রামভক্ত প্রোটিয়া স্পিনারের সামনেই চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ করল ভারত। শেষ দিকে কয়েকটা ছক্কা মেরে শিবম দর্শকদের কিছুটা মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করলেন বটে। তবে ওই পর্যন্তই। ইনিংসের অষ্টম ওভারে ব্যাট করতে নেমেও দলতে জেতানোর মতো চেষ্টা দেখা যায়নি তাঁর ব্যাটিংয়ে। শেষ পর্যন্ত শিবম করলেন ৩৭ বলে ৪২। ১টি চার। ৩টি ছয় এল তাঁর ব্যাট থেকে। তাঁর পরের বলে বুমরাহ (০) আউট হতেই ভারতের আত্মসমর্পণ সম্পূর্ণ হয়।
আরও পড়ুন:
দক্ষিণ আফ্রিকার সফলতম বোলার জানসেন ২২ বলে ৪ উইকেট নিলেন। ২৪ রানে ৩ উইকেট মহারাজের। ১২ রানে ২ উইকেট বশের। ৫ রানে ১ উইকেট মার্করামে। ১ উইকেট পেলেও প্রথম ওভারে ফর্মে থাকা ঈশানকে আউট করে ভারতীয় দলের ব্যাটিংকে নাড়িয়ে দেন প্রোটিয়া অধিনায়ক। তাতেই টানা ১২ ম্যাচ অপরাজিত থাকার পর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পরাজয়ের স্বাদ পেল ভারত।
গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের বদলা নিয়ে নিলেন মার্করামেরা। এ বার সূর্যদের অপেক্ষায় জোড়া অঘটন ঘটানো জ়িম্বাবোয়। সিকন্দর রাজাদের বিরুদ্ধে আগামী বৃহস্পতিবার খেলতে হবে চেন্নাইয়ের ২২ গজে।