বিশ্বকাপ শুরুর চার দিন আগেও জার্সি ছিল না দলের। ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান জানিয়েছিলেন, জার্সি তৈরি করতে না পারলে পুরনো জার্সি পরেই খেলবেন। সেই জার্সি না থাকা স্কটল্যান্ড পড়ে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে। শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপে সুযোগ পেলেও হালকা ভাবে নিচ্ছে না তারা। শনিবার ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে অঘটন ঘটিয়ে বিশ্বকাপের শুরুটা করতে চাইছে তারা।
বিশ্বকাপে গ্রুপ সি-তে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়, ইটালি, ইংল্যান্ড ও নেপালের সঙ্গে আগে ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু পেসার মুস্তাফিজ়ুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া ও তার জেরে বাংলাদেশ ভারতে খেলতে না আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাদের বাদ দিয়ে দেয় আইসিসি। প্রতিযোগিতা শুরুর ১৪ দিন আগে ক্রিকেট স্কটল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার (আইসিসি) চিফ এগ্জ়িকিউটিভ সঞ্জয় গুপ্ত। ফলে বাংলাদেশের পরিবর্ত হিসাবে তারা খেলতে আসছে একরকম প্রস্তুতি ছাড়াই। না ছিল স্পনসর, না ছিল বিশ্বকাপের জার্সি। সব ব্যবস্থা করতে ঘুম উড়েছিল কর্তাদের। কোনও রকমে জার্সির ব্যবস্থা তাঁরা করতে পেরেছেন। শেষ মুহূর্তে জার্সি প্রকাশ করলেও স্কটল্যান্ডের সেই জার্সি বেশ নজরকাড়া। ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে ধরেছে নীল রঙের মধ্যে কাজ করা সেই জার্সি।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অবশ্য স্কটল্যান্ড নতুন নয়। এই নিয়ে সাত বার ছোট ফরম্যাটের বিশ্বকাপ খেলবে তারা। আগের ছ’বারে অবশ্য গ্রুপ পর্ব টপকাতে পারেননি স্কটিশেরা। এখনও পর্যন্ত ২২ ম্যাচ খেলে সাতটি জিতেছে স্কটল্যান্ড। ১৩টি ম্যাচ হেরেছে। দু’টি খেলার ফল হয়নি। এক দিনের বিশ্বকাপেও তিন বার খেলেছে স্কটল্যান্ড। কিন্তু সেখানে ফল আরও খারাপ। ১৪টি ম্যাচ খেলে সবগুলিই হেরেছে তারা। ফলে এ বারও বিশ্বকাপে তারা বিশেষ কিছু করতে পারবে না বলেই ধারণা বিশেষজ্ঞদের। সেই ধারণা বদলে ফেলতে চাইছে স্কটল্যান্ড।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে স্কটল্যান্ডের থেকে বাংলাদেশ বড় দল। অন্তত, শেষ কয়েক বছর বেশ কিছু বড় দলকে সমস্যায় ফেলেছে তারা। কিন্তু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সও আহামরি নয়। এ বার না খেললেও এর আগে প্রত্যেকটি বিশ্বকাপ খেলেছে তারা। ন’টি বিশ্বকাপে মোট ৪৫টি ম্যাচের মধ্যে ১২টি জিতেছে তারা। হেরেছে ৩২টি ম্যাচ। একটি ম্যাচের ফল হয়নি।
বাংলাদেশ তুলনায় বড় দল হলেও পরিসংখ্যান কিন্তু স্কটল্যান্ডের পক্ষে। তারা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ৩১ শতাংশ ম্যাচ জিতেছে। সেখানে বাংলাদেশ জিতেছে ২৬ শতাংশ ম্যাচ। ফলে সকলে যদি স্কটল্যান্ডকে খুব হালকা ভাবে নেয়, তা হলে কিন্তু ফল ভুগতে হতে পারে। বিশেষ করে কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে কয়েকটি ওভার খেলার ছবি বদলে দিতে পারে। বিশ্বকাপে অঘটন এর আগে হয়নি তা তো নয়। সেই অঘটনই আরও এক বার ঘটাতে চায় স্কটল্যান্ড।
তবে ইডেনে শনিবার স্কটল্যান্ডের ম্যাচ ঘিরে তেমন আগ্রহ নেই। বাংলাদেশ থাকলে তা-ও ভিড় হত। বুধবার পর্যন্ত স্কটল্যান্ড বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ম্যাচের ২৯১৭ টিকিট বিক্রি হয়েছে। ৬৫ হাজার দর্শকাসনের ইডেনে সংখ্যাটা কিছুই নয়। সকলেই হয়তো ভেবে নিয়েছেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের সামনে দাঁড়াতে পারবে না স্কটল্যান্ড। কিন্তু তারা যদি অঘটন ঘটিয়ে দেয়, তা হলে তাদের পরের খেলায় ভিড় বাড়তেই পারে। সেই লক্ষ্যই রয়েছে স্কটল্যান্ডের।
তবে শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ায় কিছুটা হলেও অপ্রস্তুত স্কটল্যান্ড। দেশের ক্রিকেট বোর্ডের চিফ এগ্জ়িকিউটিভ ট্রুডি লিন্ডব্লেডের বক্তব্যে সেই অস্বস্তি ধরা পড়েছে। কারণ, বিশ্বকাপ খেলার কথাই যে ছিল না। কয়েক দিন আগে লিন্ডব্লেড বলেছিলেন, ‘‘এত কম সময়ের মধ্যে বিশ্বকাপের জার্সি হাতে পেলে সেটা বাড়তি পাওনা হবে। না হলে সারা বছর যে জার্সি পরে খেলে, সেটা পরেই বিশ্বকাপ খেলবে ক্রিকেটারেরা। স্পনসর পাওয়া যাবে কি না জানি না। হাতে দিন সাতেক সময় রয়েছে। দেখা যাক কতটা কী করা যায়।’’ শেষপর্যন্ত অবশ্য জার্সির সমস্যা মেটাতে পেরেছেন তাঁরা।
শেষ মুহূর্তে এ ভাবে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগও অস্বস্তিতে রেখেছে স্কটল্যান্ডের ক্রিকেট কর্তাদের। লিন্ডব্লেড বলেছেন, ‘‘আমরা কখনও এ ভাবে বিশ্বকাপ খেলতে চাইনি। বিশ্বকাপের একটি নির্দিষ্ট বাছাই পদ্ধতি রয়েছে। কেউ এ ভাবে বিশ্বকাপ খেলার আমন্ত্রণ পেতে চায় না। আমাদের এ বারের অংশগ্রহণ ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির ফল। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য আমাদের খারাপ লাগছে। বাংলাদেশ দলের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমবেদনা রয়েছে।’’
ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) সঙ্গে ১৯৯২ সালে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর ১৯৯৪ সালে আইসিসির অ্যাসোসিয়েট সদস্য হয় স্কটল্যান্ড। তার পর তিন দশক কেটে গেলেও স্কটল্যান্ডের ক্রিকেট এখনও বহরে সীমিত। হাতেগোনা কয়েক জন মিলে একটা দেশের ক্রিকেট চালান। কোচ, কর্তা, কর্মী সব মিলিয়ে ৩০ জনের কিছু বেশি! লিন্ডব্লেড বলেছেন, ‘‘ক্রিকেট স্কটল্যান্ডের দলটা বড় নয়। ৩০ জনের কিছু বেশি। কোচ, ক্রিকেট উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত লোক, সংস্থার কর্মী— সব মিলিয়ে এই সংখ্যাটা। একসঙ্গে দুটো দল বিদেশ সফরে গেলে আমাদের কাজের চাপ খুব বেড়ে যায়। এই মূহূর্তে আমাদের একটা দল অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলছে। আমাদের মহিলা দল নেপাল সফরে গিয়েছে। ওদের দিকেও লক্ষ রাখতে হচ্ছে। মেয়েরাও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করছে। এখন আমরা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও খেলব।’’
আরও পড়ুন:
আইসিসির আমন্ত্রণ পাওয়ার পর থেকে দম ফেলার সময় পাননি লিন্ডব্লেড। তিনটি দলের সব দায়িত্ব সামলাতে দিনরাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে তাঁদের। এ ভাবে কি বিশ্বকাপ খেলা সম্ভব? রিচি বেরিংটনের নেতৃত্বাধীন দলের উপর আস্থা রাখছেন লিন্ডব্লেড। তিনি বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের জন্য খারাপ লাগলেও আমরা সুযোগ কাজে লাগাতে চাই। ক্রমতালিকায় আমরা ১৪ নম্বরে। আমাদের দল যথেষ্ট শক্তিশালী। তা ছাড়া ক্রিকেটারেরা সারা বছর খেলার মধ্যেই থাকে।’’ তাঁর কথা থেকে স্পষ্ট, সুযোগ পেয়ে তাকে কাজে লাগানোই এখন স্কটল্যান্ডের প্রধান লক্ষ্য।
বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের দল— রিচি বেরিংটন (অধিনায়ক), টম ব্রুস, ম্যাথু ক্রস, ব্র্যাডলি কুরি, অলিভার ডেভিডসন, ক্রিস গ্রিভস, জইনুল্লা ইহসান, মাইকেল জোন্স, মাইকেল লেয়াস্ক, ফিনলি ম্যাক্রিথ, ব্রেনডন ম্যাকুলেন, জর্জ মুনসে, সাফিয়ান শরিফ, মার্ক ওয়াট ও ব্যাডলি হুইল।