মুল্লানপুরে বৈভব সূর্যবংশী নামের এক ঝড়ে উড়ে গেল সানরাইজ়ার্স হায়দরাবাদ। আট ওভারেই খেলার ফয়সালা করে দিল বৈভব। তার ২৯ বলে ৯৭ রানের ইনিংসে ভর করে ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৪৩ রান করে রাজস্থান। চাপের মধ্যে রান তাড়া করতে নেমে খেই হারাল হায়দরাবাদ। শেষ পর্যন্ত ৪৭ রানে হারল তারা।
গ্রুপ পর্বে সানরাইজ়ার্স হায়দরাবাদের কাছে দু’টি ম্যাচেই হেরেছিল রাজস্থান রয়্যালস। কিন্তু প্লে-অফের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হায়দরাবাদকে হারাল রাজস্থান। ফাইনাল থেকে এক কদম দূরে বৈভবেরা। শুক্রবার এই মাঠেই শুভমন গিলের গুজরাত টাইটান্সের মুখোমুখি হবে রাজস্থান। সেই ম্যাচ যে দল জিতবে তারা রবিবার ফাইনালে বিরাট কোহলি, রজত পাটীদারের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে নামবে।
গ্রুপ পর্বে সানরাইজ়ার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে শূন্য রানে আউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ম্যাচে শতরান করেছিল বৈভব। তাই এলিমিনেটরে নামার আগে হায়দরাবাদের অধিনায়ক প্যাট কামিন্স জানিয়েছিলেন, বৈভবের বিরুদ্ধে এ, বি, সি— সব পরিকল্পনা করে রেখেছেন তাঁরা। সেই সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিল বৈভব। বৈভবের বিরুদ্ধে হায়দরাবাদের তিনটি পরিকল্পনাই দেখা গিয়েছে। শুরুতে কামিন্স নিজে বৈভবের বিরুদ্ধে ইয়র্কারের পরিকল্পনা করেন। তা কাজে লাগেনি। সামনের পা সরিয়ে মিড অফ ও সামনে কয়েকটি বড় শট খেলে বৈভব। রাউন্ড দ্য উইকেটে এসে বৈভবের অফ স্টাম্প লক্ষ্য করে লেংথে বল করা শুরু করেন তিনি। তা-ও কাজে আসেনি। কভার ও মিড অফে ছক্কা খান কামিন্স।
সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যান বি অনুযায়ী বল কর শুরু করে হায়দরাবাদ। কামিন্স-সহ সাকিব হুসেন, প্রফুল্ল হিঙ্গে, ঈশান মালিঙ্গারা বৈভবকে দ্রুত গতিতে বাউন্সার করা শুরু করেন। কিন্তু তাতেও বৈভবকে আটকানো যায়নি। একের পর এক পুল শট মারতে শুরু করে সে। স্কয়্যার লেগ, মিড উইকেট ও লং লেগে কয়েকটি ছক্কা মারে সে। বাধ্য হয়ে তৃতীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী বল করা শুরু করেন কামিন্সেরা। বলের গতি কমিয়ে কাটার দেওয়া শুরু করেন তাঁরা। সেই বলও বৈভব দেখে বড় শট মারা শুরু করে। কোনও ভাবেই তাকে আটকানো যায়নি।
এলিমিনেটরে নামার আগে ক্রিস গেলের ছক্কার রেকর্ড ভাঙতে বৈভবের দরকার ছিল সাতটি ছক্কা। সেটি ভাঙতে বেশি সময় নেয়নি সে। প্রথম ওভারের শেষ বলে প্যাট কামিন্সকে ছক্কা মারে বৈভব। সেই শুরু। পরের ওভারে ঈশান মালিঙ্গাকে আরও একটি ছক্কা মারে সে। তৃতীয় ওভারে কামিন্সের বলে তিনটি ছক্কা মারে বৈভব। চতুর্থ ওভারে সাকিব হুসেনের বলে আরও তিনটি ছক্কা মারে বৈভব। তৃতীয় ছক্কায় অর্ধশতরান পূর্ণ করে সে। সেই সঙ্গে ভেঙে ফেলে গেলের রেকর্ড।
আইপিএলে এক মরসুমে সবচেয়ে বেশি ছক্কা মারার রেকর্ড গড়ল বৈভব। ২০১২ সালে গেল মেরেছিলেন ৫৯ ছক্কা। সেটিই ছিল এত দিন রেকর্ড। ১৪ বছর পর সেই রেকর্ড ভাঙল। এই মরসুমে বৈভবের ছক্কার সংখ্যা ৬৫। পরের ম্যাচে সেই সংখ্যা আরও বাড়ানোর সুযোগ পাবে রাজস্থানের ১৫ বছরের ক্রিকেটার। পাশাপাশি আইপিএলের নকআউটে দ্রুততম অর্ধশতরানও করল বৈভব। ২০১৪ সালে ওয়ানখেডেতে ১৬ বলে অর্ধশতরান করেছিলেন সুরেশ রায়না। সেই নজির ছুঁয়ে ফেলল বৈভব। অর্থাৎ, মাত্র ১৬ বলে জোড়া রেকর্ড গড়ে ফেলল বিহারের ছেলে।
আইপিএলে ইতিহাসে দ্রুততম শতরান করে গেলের রেকর্ড ভাঙার সুযোগ ছিল বৈভবের সামনে। ২০১৩ সালে রয়্যাল চ্যালেঞ্জর্স বেঙ্গালুরুর হয়ে রাইজ়িং পুণে সুপারজায়ান্টসের বিরুদ্ধে ৩০ বলে শতরান করেছিলেন তিনি। কিন্তু তা হল না। রেকর্ড ভাঙতে গিয়েই আউট হল বৈভব। যে বলে সে আউট হল, সেটি আর একটু হলেই ছক্কা হয়ে যেত। কিন্তু হল না। ফলে রক্ষা পেল গেলের রেকর্ড। কিন্তু ২৯ বলে ৫ চার ও ১২ ছক্কার ইনিংসে বৈভব যে ঝড় তুলল, তার প্রশংসা করল গোটা স্টেডিয়াম। মুগ্ধ ক্রিকেটপ্রেমীরা।
বৈভব আউট হওয়ার পর ডাগআউটে হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছিলেন রিয়ান পরাগ। নিজের আসনে বসে হাততালি দিচ্ছিলেন রাজস্থান রয়্যালসের কোচ কুমার সঙ্গকারা। দলের মালিক লক্ষ্মী মিত্তল উচ্ছ্বসিত। এমনকি, প্রতিপক্ষ দলের মালকিন কাব্য মারানও হাততালি না দিয়ে থাকতে পারলেন না। মাঠে তখন বৈভবের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষ দলের ঈশান কিশন, অভিষেক শর্মারা। কিন্তু বৈভব নিজে হতাশ। ডাগআউটে ফিরতে ইচ্ছা করছিল না তার। পা চলছিল না। কিন্তু কিছু করার নেই। অল্পের জন্য আইপিএলে রেকর্ড করতে পারেনি সে। কিন্তু তার মধ্যেই ঝড় তুলেছে বৈভব।
বৈভব আউট হওয়ার পরে বেশি ক্ষণ খেলতে পারেননি অপর ওপেনার যশস্বী জয়সওয়াল। ২৯ বলে ২৯ রান করে আউট হন তিনি। ধ্রুব জুরেল অবশ্য রান তোলার গতি বাড়িয়ে রাখেন। তিনিও শুরু থেকে বড় শট খেলছিলেন। মাত্র ২০ বলে অর্ধশতরান করেন তিনি। কিন্তু পরের বলেই ৫০ রানের মাথায় আউট হন জুরেল। ১২ বলে ২৬ রান করেন অধিনায়ক রিয়ান পরাগ।
পর পর কয়েকটি উইকেট পড়ায় রাজস্থানের রান তোলার গতি কমে যায়। দাসুন শনাকা, রবীন্দ্র জাডেজারা রান পাননি। ফলে একটা সময় যেখানে মনে হচ্ছিল ২৬০-২৬৫ রান হবে, সেখানে ২৪৩ রান করে রাজস্থান। বিরতিতে বৈভবও স্বীকার করে নেয়, রান কিছুটা কম হয়েছে।
আরও পড়ুন:
চলতি আইপিএলে দু’বার ২৪০ রানের বেশি তাড়া করে জিতেছিল হায়দরাবাদ। তা-ও আরাম করে। কিন্তু এলিমিনেটরের চাপ আলাদা। সেটা বোঝা গেল অভিষেককে দেখে। দ্বিতীয় বলেই জফ্রা আর্চারের বাউন্সার সামলাতে না পেরে শূন্য রানে আউট হলেন তিনি। আরও এক বার প্রথম ওভারে উইকেট নিলেন আর্চার।
তিন নম্বরে নেমে ঝোড়ো ব্যাটিং শুরু করেন ঈশান। হায়দরাবাদের রান তোলার গতি বাড়িয়ে দেন তিনি। আর্চারকেও রেয়াত করছিলেন না তিনি। কিন্তু ২৪৪ রান তাড়া করতে হলে প্রতিটি বলে মারতে হবে। সেটা করতে গিয়েই ১১ বলে ৩৩ রান করে আর্চারের বলে আউট হলেন ঈশান। ট্রেভিস হেড রান পেলেন না। ১৭ রান করে তিনিও আর্চারের স্বীকার হলেন। বল হাতে হায়দরাবাদের কোমর ভেঙে দিলেন আর্চার। সেখান থেকে ফিরতে পারল না হায়দরাবাদ।
স্মরণ রবিচন্দ্রন ও ফর্মে থাকা হাইনরিখ ক্লাসেনও রান পাননি। সাত ওভারে ৮৩ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় হায়দরাবাদ। সেখান থেকে ফিরতে হলে দু’জনকে অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলতে হত। চেষ্টা করেন নীতীশ কুমার রেড্ডি ও সলিল অরোরা। বেশ কয়েকটি বড় শট খেলেন তাঁরা। অর্ধশতরানের জুটি গড়েন। কিন্তু জাডেজার বলের গতি বুঝতে না পেরে ৩৮ রানে আউট হলেন নীতীশ। রান পেলেন না অধিনায়ক কামিন্স। বল হাতে নজর কাড়ার পর বাউন্ডারিতে ভাল ক্যাচ ধরলেন আর্চার। ১৩৯ রানের মাথায় কামিন্স ফিরতেই হায়দরাবাদের সব আশা শেষ হয়ে যায়।
সলিল ছাড়া আর কোনও ব্যাটার ক্রিজ়ে ছিলেন না। ফলে রাজস্থানের জয় ছিল সময়ের অপেক্ষা। শেষ পর্যন্ত সেটাই হল। ৩৫ রানে জাডেজার বলে আউট হলেন সলিল। ফলে পুরো ২০ ওভার ব্যাট করতে পারল না হায়দরাবাদ। ১৯.২ ওভারে ১৯৬ রানে অল আউট হয়ে গেল তারা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- ২৮ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা। গত বছর প্রয়াত ১১ সমর্থকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ বার হয়নি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
- এখনও পর্যন্ত আইপিএলের গ্রুপ পর্বের ৭০টি ম্যাচের সূচি ঘোষণা হয়েছে। প্রথমে ২০টি ম্যাচের সূচি জানিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। পরে বাকি ৫০টি ম্যাচেরও সূচি ঘোষণা করেছে তারা। তবে প্লে-অফের সূচি এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
- আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি, পাঁচ বার করে ট্রফি জিতেছে চেন্নাই সুপার কিংস এবং মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। কলকাতা নাইট রাইডার্স জিতেছে তিন বার। গত বছর প্রথম বার ট্রফি জিতেছিল বেঙ্গালুরু।
-
২১:৫১
বৈভবের জন্য তিন পরিকল্পনা ছিল হায়দরাবাদের, সব ভেস্তে দিয়ে সূর্যবংশী শুধু বলল, ‘শতরানের কথা ভেবে খেলিনি’ -
২০:৫৫
ধোনির জন্য দরজা খোলা, জোড়া প্রস্তাব চেন্নাইয়ের, সিদ্ধান্ত মাহির হাতেই, জানিয়ে দিলেন সিএসকে কর্তা -
২০:৩৮
২৯ বলে ৯৭ রানে আউট বৈভব, অল্পের জন্য ভাঙা হল না গেলের দ্রুততম শতরানের রেকর্ড! ১২ ছক্কার ইনিংসে ঝড় সূর্যবংশীর -
২০:০৬
হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ১৬ বলে ৮ ছক্কা! গেলের নজির ভেঙে আইপিএলে জোড়া রেকর্ড বৈভবের -
১৭:২১
দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও বাড়ছে বৈভবের জনপ্রিয়তা, কিশোর ব্যাটারে মজেছেন পেশাদার স্কটিশ কুস্তিগির ম্যাকিনটায়ার