Advertisement
E-Paper

বাংলাদেশের ক্রিকেটকর্তারা কেন ভারতে না খেলতে অনড়? ক্ষতি কার? বাংলাদেশের না ভারতের?

ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে আসার ব্যাপারে রাজি করানোই যাচ্ছে না বাংলাদেশকে। কোনও কিছুতেই দমছে না। ক্রিকেটবিশ্বে ক্ষমতাশালী দেশ বলে পরিচিত ভারতের বিরুদ্ধে কী ভাবে এই জেদ দেখাচ্ছে বাংলাদেশ? নেপথ্যে কোন কারণ?

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৬
cricket

(বাঁ দিক থেকে) আসিফ নজরুল, মুস্তাফিজুর রহমান, জয় শাহ এবং আমিনুল ইসলাম। গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

এক বার, দু’-বার নয়, তিন-তিন বার! ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না আসার ব্যাপারে যে গোঁ ধরেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকর্তারা, তা থেকে সরার কোনও আগ্রহ বা ইচ্ছা দেখা যাচ্ছে না তাঁদের। আইসিসি-র প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি, ভারতের আশ্বাস, প্রাক্তন ক্রিকেটার তামিম ইকবালের পরামর্শ— কিছুই নড়াতে পারছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কর্তাদের। কিন্তু ক্রিকেটবিশ্বের ‘দাদা’ ভারতকে কী ভাবে উপেক্ষা করছে তুলনায় ক্ষীয়মান ক্রিকেটশক্তি বাংলাদেশ? কেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকর্তারা ভারতে খেলতে না যাওয়ার ব্যাপারে অনড় অদম্য মনোভাব নিয়েছেন?

বাংলাদেশের কি আর্থিক ক্ষতি হবে?

না, হবে না। কারণ, এটি আইসিসি-র প্রতিযোগিতা হওয়ায় অংশগ্রহণের অর্থ এবং পুরস্কারমূল্য বাংলাদেশ বোর্ড পাবেই। সে তারা ভারতেই খেলুক বা শ্রীলঙ্কায়। ক্ষতি হবে ভারতের। কারণ, ম্যাচ সরে যাওয়ায় স্টেডিয়াম থেকে টিকিট বিক্রি বাবদ যে অর্থ আসত তা আসবে না। বেঁকে বসতে পারে স্থানীয় কিছু স্পনসরও। চাপে পড়বে আইসিসি-ও। শ্রীলঙ্কায় গিয়ে বাংলাদেশের খেলা মানে তাদের প্রতিপক্ষ চারটি দেশকেও (শুধু গ্রুপ পর্বের হিসাব অনুযায়ী) দ্বীপরাষ্ট্রে নিয়ে যেতে হবে। যাতায়াত বাবদে যে বরাদ্দ রয়েছে, তা বেড়ে যাবে অনেক। হোটেল, সম্প্রচার ইত্যাদি বাবদে খরচ তো আছেই।

বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দল।

বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দল। ছবি: সংগৃহীত।

বাংলাদেশ বোর্ডের জেদ কেন?

আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টা ক্রিকেট হলেও কারণ অবশ্যই রাজনৈতিক। এখন এমনিতেই ক্রিকেট এবং রাজনীতি হাত ধরাধরি করে চলে। আর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন বিশেষ ‘মসৃণ’ নয়। বাংলাদেশের টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত বছর অগস্টে সে দেশে সফর স্থগিত করে দিয়েছিল ভারত। এ বছর যে দিন বাংলাদেশ ঘোষণা করল ভারতীয় ক্রিকেটদলের তাদের দেশে সফরের কথা, তার পর দিনই বিসিসিআই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দিল বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলের দল থেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কলকাতা সেই নির্দেশ অনতিবিলম্বে পালনও করল। এবং অতঃপর বাংলাদেশ বোর্ড জানিয়ে দিল তারা ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে আসবে না। বলা বাহুল্য, মুস্তাফিজুর কাণ্ডের পাল্টা হিসাবেই। তার পর থেকেই দু’দেশের সম্পর্ক ঠান্ডা-গরমে চলছে। বিপাকে পড়েছে বিশ্বকাপের আয়োজক আইসিসি।

অনেকে বলছেন, বাংলাদেশ সামগ্রিক ভাবে ভারতকে চাপে রাখারও চেষ্টা করছে। ২০২৪-এ বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের পর থেকেই সে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন। তখন থেকে রাজনৈতিক জটিলতার সূত্রপাত। বাংলাদেশের একাংশের মধ্যে ভারত-বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছিল। যত দিন গিয়েছে, সেই মনোভাব বেড়েছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তবর্তী সরকার বাংলাদেশের দায়িত্বে, বিভিন্ন ঘটনায় তাদের মধ্যেও সেই মনোভাবের ইঙ্গিত স্পষ্ট। অনেকের মতে, ক্রিকেটমাঠে ভারতের সঙ্গে টক্করে বেশির ভাগ সময়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে থেকেছে। কিন্তু মাঠের বাইরের এই লড়াইয়ে তারা ভারতের সঙ্গে পাল্লা দিতে চায়। কারণ, তারা মনে করে, মুস্তাফিজুরকে অন্যায় ভাবে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে ক্রিকেটের সে অর্থে যোগাযোগ নেই। কিন্তু রাজনীতির স্বার্থে ক্রিকেটকে ব্যবহার করেছে ভারত।

বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। ছবি: সংগৃহীত।

অনেকের মতে, বাংলাদেশ বোর্ডের এই আচরণ ক্রিকেটবিশ্বকে দেখানোর একটা চেষ্টা যে, তারাও ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। বাংলাদেশের ম্যাচ শেষ পর্যন্ত এ দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে তাতে মুখ পুড়বে ভারতেরই। কারণ, এখন আইসিসি-র চেয়ারম্যান জয় শাহ। যিনি একাধারে বিসিসিআইয়ের প্রাক্তন সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুত্র। দেশভক্তি দূরে সরিয়ে রেখে পড়শি দেশের চাপে (যাদের সঙ্গে কূটনৈতিক বৈরিতা বছরখানেক আগেও সে ভাবে ছিল না) ভারত থেকে ম্যাচ সরিয়ে নিলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের দাপট কমতে পারে। পাশাপাশিই ভারতের সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠে যাবে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনে ছোটখাটো কিছু ঘটলেও অংশগ্রহণকারী দেশগুলি এ দেশে আসতে দ্বিধা করবে। বিশেষত, যখন ভারত ভবিষ্যতে অলিম্পিক্স আয়োজনের তথা ভাবছে।

লক্ষ্য কি ভারতকে ‘কমজোরি’ করা?

এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কা। প্রতিযোগিতার গ্রুপ পর্বে যে ৪০টি ম্যাচ রয়েছে, তার মধ্যে ১৪টি হবে শ্রীলঙ্কায়। যদি বাংলাদেশের অনুরোধ মেনে নিয়ে আইসিসি তাদের ম্যাচগুলি শ্রীলঙ্কায় ফেলে, তা হলে আরও চারটি ম্যাচ পাবে ভারতের পড়শি দেশ। সে ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা আয়োজন করবে ১৮টি ম্যাচের, ভারত ২২টি। অর্থাৎ, প্রায় ৫০ শতাংশ ম্যাচ আয়োজনের দায়িত্ব পাবে শ্রীলঙ্কা। এমনিতেই সে দেশে সুপার এইটে ১২টির মধ্যে ছ’টি ম্যাচ রয়েছে। বাংলাদেশ সুপার এইটে উঠলে শ্রীলঙ্কা আরও তিনটি ম্যাচ পাবে। সে ক্ষেত্রে ভারতে সুপার এইটের মাত্র তিনটি ম্যাচ হবে। গ্রুপ পর্বে খুব ‘ভাল ম্যাচ’ ভারতে হচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান গ্রুপে নিজেদের সব ম্যাচই খেলবে শ্রীলঙ্কায়। ভারতের মাটিতে ইংল্যান্ড বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ়, নিউ জ়িল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়া বলার মতো ম্যাচ নেই। ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রুপে প্রায় সবই দুর্বল দেশ। তার জন্য মাঠভর্তি দর্শক হবে, এমন আশা করা যায় না। আয়োজনের দিক থেকে ভারতের ক্ষতি এবং জনপ্রিয়তা দু’টিই কমবে বাংলাদেশ সরে গেলে।

ইডেন কী পাবে?

ভারত সুপার এইটে উঠলে একটি ম্যাচ ইডেন গার্ডেন্স পেতে পারে। তা না হলে গ্রুপ পর্বে বলার মতো ম্যাচ নেই। তবু ওয়েস্ট ইন্ডিজ়-বাংলাদেশ বা ইংল্যান্ড-বাংলাদেশ ম্যাচ ঘিরে একটু হলেও স্থানীয় সমর্থকদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছিল। কলকাতা-ঢাকার মানুষের হৃদ্যতার কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশের তিনটি ম্যাচ ইডেনে রেখেছে আইসিসি। সেই ম্যাচগুলি শ্রীলঙ্কায় চলে গেলে ইডেন হারাবে তিনটি ম্যাচ। আদ্যন্ত ক্রিকেটপ্রেমী ছাড়া কে আর নগদ টাকা দিয়ে টিকিট কিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়-ইটালির ম্যাচ দেখতে যাবেন!

কলকাতার ইডেন গার্ডেন্স।

কলকাতার ইডেন গার্ডেন্স। ছবি: সংগৃহীত।

রক্ষাকর্তা আইসিসি

এই পরিস্থিতিতে একমাত্র রক্ষাকর্তার ভূমিকা নিতে পারে আইসিসি। অতীতে একাধিক প্রতিযোগিতা সফল ভাবে আয়োজন করেছে ভারত। বছর আড়াই আগে এক দিনের বিশ্বকাপে পাকিস্তানও এ দেশে নিরাপদে খেলে গিয়েছে। কোনও ক্রিকেটারের গায়ে আঁচ লাগেনি। উল্টে দেশে ফিরে ভারতের আপ্যায়নের প্রশংসা করেছেন একাধিক ক্রিকেটার। পাকিস্তানের ম্যাচগুলি নিয়েও আগ্রহ ছিল যথেষ্ট। ফলে আতিথেয়তা এবং সুরক্ষা নিয়ে যে কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না, তা আইসিসি বুঝিয়ে দিয়েছে। আইসিসির যুক্তি হতে পারে, রাজনৈতিক টানাপড়েনের মাঝে পাকিস্তান ভারতে খেলে যেতে পারলে বাংলাদেশ পারবে না কেন? ফলে বিসিসিআই বা বিসিবি নয়, বল এখন জয় শাহের কোর্টে।

Bangladesh Cricket ICC T20 World Cup 2026 BCCI
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy