Advertisement
E-Paper

পদক জয়ই পাখির চোখ, কৌশল বদলাচ্ছেন দীপা

রিও থেকে পদক তাঁর চাই-ই চাই! জন্মদিনে এটাই শপথ দীপা কর্মকারের। তাই কোনও উদ্‌যাপন নয়, মঙ্গলবার গেমস ভিলেজে নিজের ঘরে বসে কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দীর সঙ্গে ফাইনালের স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আলোচনা করেই জন্মদিন কাটিয়েছেন দীপা।

রতন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১২ অগস্ট ২০১৬ ০৩:২৫

রিও থেকে পদক তাঁর চাই-ই চাই! জন্মদিনে এটাই শপথ দীপা কর্মকারের।

তাই কোনও উদ্‌যাপন নয়, মঙ্গলবার গেমস ভিলেজে নিজের ঘরে বসে কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দীর সঙ্গে ফাইনালের স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আলোচনা করেই জন্মদিন কাটিয়েছেন দীপা। যে আলোচনায় ঠিক হয়েছে, পদকের লক্ষ্যে এ বার হাঁটবেন উল্টো পথে। মানে এত দিন যে স্ট্র্যাটেজিতে ভল্ট করে এসেছেন, অলিম্পিক্স ফাইনালে বাকিদের ধোঁকা দিতে সেটাই আমূল বদলে ফেলছেন তিনি।

সেটা কী রকম?

বৃহস্পতিবার অনুশীলনে যাওয়ার আগে রবিবার রাতের নতুন স্ট্র্যাটে়জি ফাঁস করলেন দীপার কোচ বিশ্বেশ্বর। বললেন, ‘‘ফাইনালে ও দু’টো ভল্টের সুযোগ পাবে। প্রোদুনোভা ভল্টটা যে হেতু ওর খুব ভাল হচ্ছে আর পয়েন্টও বেশি পাচ্ছে, তাই ঠিক করেছি ওটাকে দু’নম্বরে নিয়ে আসব।’’ দীপা অলিম্পিক্সে অন্য যে ভল্টটা করছেন সেটার নাম সুকাহারা ৭২০ ডিগ্রি টার্ন। যোগ্যতা পর্বে এটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় ভল্ট। কিন্তু বিশ্বেশ্বর জানালেন, ফাইনালে এই ভল্ট দিয়েই লড়াই শুরু করবেন ত্রিপুরার বাঙালি জিমন্যাস্ট। কোচের ব্যাখ্যা, ‘‘ওটা শুরুতে করলে আমার বিশ্বাস পয়েন্ট বাড়বে। আর যত পয়েন্ট পেয়ে ও ফাইনালে উঠেছে, পদকের জন্য চাই তার থেকে আরও আধ পয়েন্ট বেশি। আশা করছি হয়ে যাবে। কারণ যে আট জন ভল্টিং ইভেন্টে উঠেছে, ওই দিন তারা যে কেউ পদক পেতে পারে।’’ কোচ কথাগুলো বলার সময় পাশে দাঁড়ানো দীপা নিঃশব্দ সমর্থনে ঘাড় নাড়লেন।

দীপার ফাইনাল

১৪ অগস্ট, রাত ১১.১৭

জীবনে এই প্রথম প্রোদুনোভা ভল্ট পরে করবেন দীপা। অলিম্পিক্স ফাইনালের মতো বিশাল মঞ্চে কোচের নতুন স্ট্র্যাটেজি তাঁর কতটা মনে ধরেছে জানতে চাইলে ছাত্রী বললেন, ‘‘কোচ এ পর্যন্ত যা বলেছেন, অক্ষরে অক্ষরে মেনেছি। এই পরিবর্তনটাও আমার পছন্দ হয়েছে।’’ বোঝাই যায় কোচ এবং ছাত্রীর মানসিক রসায়ন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। জিমন্যাস্টিক্সের দুনিয়ায় প্রোদুনোভা ভল্টকে বলা হয় ‘‘মৃত্যুর ভল্ট।’’ আজ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র পাঁচ জন জিমন্যাস্ট প্রতিযোগিতার মঞ্চে এই ভল্ট করে দেখাতে পেরেছেন। তাঁদের এক জন রুশ জিমন্যাস্ট ইয়েলেনা প্রোদুনোভা নিজে, ভল্টের নামকরণ যার নামে। আর এক জন আমাদের দীপা, সারা দেশ আজ স্বপ্ন দেখছে যাঁকে নিয়ে।

ভল্টটা দীপার এমন রপ্ত যে আগেই বলেছেন, ‘‘আমার কাছে প্রোদুনোভা এখন সব চেয়ে সহজ ভল্ট।’’ এ দিনও বলছিলেন, ‘‘প্রোদুনোভার চেয়ে অন্য ভল্টটায় আমি একটু পিছিয়ে। আর যেটায় পিছিয়ে সেটা শুরুতে করলে সাধারণত পয়েন্ট বেশি আসে।’’ ফাইনালে সিমোন বাইলস-সহ বিশ্বের সেরাদের আর যাঁরা উঠেছেন, তাঁদের মধ্যে দীপা বাদে প্রোদুনোভায় পারদর্শী আর মাত্র এক জন। উজবেকিস্তানের একচল্লিশ বছরের জিমন্যাস্ট ওকসানা চুসোভিতিনা। নিজের সপ্তম অলিম্পিক্সে নেমে ভল্টের যোগ্যতা পর্বে তিনিও কিন্তু প্রোদুনোভা চেষ্টা করেননি।

সুকাহারাকেও কিন্তু কঠিনতম ভল্টের একটা বলেই ধরা হয়। ভল্টে নম্বর দেওয়া হয় ঝুঁকির মাত্রা এবং নৈপুন্য দেখে। প্রোদুনোভায় ঝুঁকির মাত্রা সর্বোচ্চ ৭.০০০ হলে সুকাহারা ৭২০ ডিগ্রি টার্নে ঝুঁকির মাত্রা ৬.০০০। দীপা বলছিলেন, ‘‘এই ভল্টটা রপ্ত করেছি অলিম্পিক্সের কিছু আগেই।’’ আর বিশ্বেশ্বর বলছিলেন, ‘‘সে দিন ও যখন দ্বিতীয় ভল্টে এটা করতে উঠল, মনে মনে একটু ভয়ই করছিল।’’ কেন? বিশ্বেশ্বরের কথায়, ‘‘সুকাহারা ভল্টটা আমরা প্র্যাকটিস শুরু করেছি কিছু দিন হল। প্রোদুনোভার পরে আরও একটা কঠিন ভল্টের চাপ নেওয়ার জন্য দীপার শরীর পুরোপুরি তৈরি, সেটা বোঝার পরেই। তাই অনুশীলনে এখনও ও এই ভল্টটা তত বার করেনি, যত বার করা থাকলে আমি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতাম।’’ তবে পর মুহূর্তেই ছাত্রীর উপর একশো ভাগ আস্থাটা বেরিয়ে এল। বললেন, ‘‘আমার নার্ভাসনেস থাকবেই। কিন্তু দীপা আসাধারণ জিমন্যাস্ট। এখানে প্রতিযোগিতায় প্রথম বার ভল্টটা দিল। কী দুর্দান্ত দিল দেখুন তো!’’

সুকাহারা ৭২০ ডিগ্রি টার্নের জন্য নির্দিষ্ট কিছু পেশির বাড়তি শক্তি লাগে। যে কারণে দীপার ফিজিও সাজাদ হোসনকে রিও-য় চেয়েছিলেন বিশ্বেশ্বর। প্রাথমিক ভাবে সেই আর্জি বাতিল করেছিল সাই। যা নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সাই শুধু দীপার জন্য ফিজিও সাজাদকে ব্রাজিলে পাঠিয়েছে। যা স্বস্তি দিচ্ছে বাঙালি জিমন্যাস্টকে। বলছিলেন, ‘‘আজ থেকে ওঁর কাছে ফিজিক্যাল ট্রেনিংটা নেব। খুবই উপকার হবে আমার।’’

বেশির ভাগ খেলোয়াড় যেখানে যোগ-ব্যায়াম, ধ্যান বা এই জাতীয় কোনও পদ্ধতিতে মানসিক স্থৈর্য বজায় রাখেন, সেখানে দীপা কিন্তু ব্যতিক্রম। বললেন, ‘‘যখন মানসিক ভাবে ক্লান্ত থাকি, তখন কোচের আনা কিছু জোক শুনি। সেগুলো মনটাকে ভাল করে দেয়।’’

অলিম্পিক্সে ভল্টের ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়ার ২৪ ঘণ্টা পর নিজের জন্মদিনটা শুধুই পদক জেতার কৌশল বাছতে কেটেছে।
বলছিলেন, ‘‘আগের দিন কম্পিটিশন করে ক্লান্ত ছিলাম। তাই ঘর ছেড়ে বেরোইনি। তা ছাড়া ফাইনালের আগে আর অন্য কিছুতে মন দিতে চাই না।’’ এর পরেই পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘শুনলাম কলকাতায় নাকি বেরিয়েছে আমি চোট পেয়েছি। কে যে এ সব রটাচ্ছে বলুন তো?’’ স্পষ্ট ঘোষণা দীপার— ‘‘আমি পুরো সুস্থ এবং পদক জেতার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছি।’’

এখানকার ১৪ অগস্ট রাতে, অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতা দিবসের সকালে পদক-যুদ্ধে নামবেন ত্রিপুরা কন্যা। তার আগে তাঁর মানসিক দৃঢ়তা দেখলে অবাক হতে হয়। সকালে তিন ঘণ্টা এবং বিকেলে তিন ঘণ্টা অনুশীলন করছেন অলিম্পিক্স পার্কের ভেলোড্রোমে। প্রস্তুতিতে কোথাও কোনও খামতি নেই। ফাইনালের বাকি সাত প্রতিদ্বন্দ্বীর ভিডিও দেখছেন ইউটিউবে। নিজের কোথায় কোথায় ভুল হয়েছে, দেখছেন সেটাও। বললেন, ‘‘নিজের ভুলগুলো শুধরে নিতে পারলে আর প্রথম ভল্টে বাড়তি কিছু পয়েন্ট আনতে পারলে আমার পদক বাঁধা। এখন পদক ছাড়া আমি অন্য কিছু ভাবছি না। এত দূর যখন এসেছি, খালি হাতে ফিরতে
চাই না।’’

দীপা এখন আত্মবিশ্বাসের আর এক নাম।

Dipa Karmakar Rio Olympics Medal
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy