Advertisement
E-Paper

শহর আজ ‘অসুস্থ’, নিশিজীবন শুরু দুপুরেই

সালটা ছিল ১৮৬২। জোসেফ ওয়েলস নামে এক ইংরেজ ক্রিকেটার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম চার বলে চার উইকেট নিয়ে তোলপাড় ফেলেছিলেন। তাঁরই ছোট ছেলে, এইচ জি ওয়েলসের টাইম মেশিনটা আজ ধার নিয়েছে কলকাতা! যাতে চড়ে সিডনির ‘ফাইনালে’ মহেন্দ্র সিংহ ধোনিদের জন্য গলা ফাটাতে গোটা শহর যেন পশ্চাদগামী প্রায় আড়াই দশক!

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০১৫ ০৫:১৪

সালটা ছিল ১৮৬২। জোসেফ ওয়েলস নামে এক ইংরেজ ক্রিকেটার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম চার বলে চার উইকেট নিয়ে তোলপাড় ফেলেছিলেন। তাঁরই ছোট ছেলে, এইচ জি ওয়েলসের টাইম মেশিনটা আজ ধার নিয়েছে কলকাতা!

যাতে চড়ে সিডনির ‘ফাইনালে’ মহেন্দ্র সিংহ ধোনিদের জন্য গলা ফাটাতে গোটা শহর যেন পশ্চাদগামী প্রায় আড়াই দশক! ১৯৯৩-এর হিরো কাপে ইডেনে আলো বসার সেই আগের যুগটায়, যখন সক্কাল সক্কাল কাজকর্ম সেরে ওয়ান ডে-তে নিমজ্জিত হতে ন’টার আগেই গুছিয়ে বসে পড়া হত টিভির সামনে। অফিস-কলেজ কেটে ভরিয়ে ফেলা হত ইডেন।

সিডনির মহাম্যাচের হাত ধরে আরও একটা ক্রিকেট-রূপকথার প্রত্যাশায় বহুদিন বাদে তিলোত্তমা ফিরছে সেই টাইমটেবলে! টাইম ট্র্যাভেল না বলে উপায় কি?

Advertisement

রাজ্য সরকারের হেড কোয়ার্টার নবান্ন হোক বা তথ্যপ্রযুক্তির তীর্থ সেক্টর ফাইভ, অন্দর কি বাত, সর্বত্র আচমকা রোগের প্রকোপ নাকি মারাত্মক! যাঁরা নিতান্তই ‘অসুস্থ’ হতে ব্যর্থ, তাঁরা টেলিভিশনের সামনে সিট বাগানো নিয়ে নিজেদের মধ্যে বুধবার মিটিং করেছেন দফায় দফায়।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও স্কোরের খবরটা রাখতে চান। ভারতীয় টিমের জন্য তাঁর টুইট, “গুড লাক। কাল দারুণ খেলো। বিশ্বকাপ জিততে আর মাত্র দু’টো ম্যাচ বাকি!”

নবান্নর পুলিশ কর্মীদের দুশ্চিন্তা, কন্ট্রোল রুম আর প্রেস কর্নার ভরে গেলে খেলাটা দেখবেন কোথায়? এই দুই জায়গায় টিভি আছে। বাকি মোবাইল-ভরসা।

এক দিনের জন্য কর্মসংস্কৃতিতে নব্বান্ন আর সেক্টর ফাইভ এক উঠোন! আইটি কর্মী সুমনন ভট্টাচার্য যেমন বলছিলেন, “দেদার সিক লিভ পড়ছে। অফিসে যারা আসবে, তারাও ন’টার মধ্যে কাফেটেরিয়ার টিভির সামনে জমে যাব। ম্যানেজাররা এক রকম ছেড়েই দিয়েছেন। মেনে নিয়েছেন, এ দিন প্রোডাক্টিভিটির মাথায় ডান্ডা!”

শুটিং আছে। তাই কাজের মাথায় ডান্ডাটা মারতে পারবেন না পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। টেলিফোনের ওপ্রান্তে এ দিন বিমর্ষ তিনি। বললেন, “আমার দুর্ভাগ্য! তবে ভাগ্গিশ আই প্যাড আছে! ওটাই গোটা ইউনিটের টেলিভিশন হয়ে যাবে!” পরমব্রত ম্যাচ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীতে নারাজ। তবু বললেন, “নিজেদের মাঠে অস্ট্রেলিয়া কঠিন প্রতিপক্ষ। তবে ম্যাচটা জমবে বলেই মনে হয়।” আর জমে গেলে? পরমব্রতের সাফ কথা, “প্রোডিউসার আর ডিরেক্টরের জন্য খারাপ লাগবে। শুটিং শিকেয় উঠবে। কাজকর্ম বন্ধ করে খেলাতেই মেতে যাব সবাই!”

মঞ্চাভিনেতা দেবশঙ্কর হালদার আবার ভারতের ম্যাচ থাকলে একটা নির্দিষ্ট রংচটা ট্র্যাক প্যান্ট আর টি-শার্ট ছাড়া পরেন না। ভারতকে বহু ম্যাচ ‘জিতিয়েছে’ ওই বেশ। সেটা ব্যাগে পুরে নাট্যকর্মী গৌতম হালদারের সঙ্গে মাসকাট রওনা দিলেন এ দিন। শো আছে। মুম্বই বিমানবন্দর থেকে মোবাইলে বললেন, “সংগঠকদের বলেছি, এমন হোটেল দেবেন যেখানে বসে চিৎকার করে ধোনিদের সাপোর্ট করতে করতে খেলা দেখতে পারব।”

এই মুহূর্তে প্রবাসে শিল্পপতি সঞ্জয় বুধিয়াও। আছেন চিনের কুনমিংয়ে। কিন্তু টেলিফোনে দারুণ উত্তেজিত, “আরে টাইম জোন আলাদা তো কী? কাজ আছে। তা বলে ম্যাচ দেখব না, তা কি হয়!” ব্যস্ত শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েন্কা বলছিলেন, “অন্য সময় হলে সিডনি চলে যেতাম। কিন্তু সিনিয়র পর্যায়ের এক্সিকিউটিভদের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং পড়ে গেল।” তবে মিটিংয়ের জায়গায় থাকছে জায়ান্ট স্ক্রিন। সঞ্জীব বললেন, “প্রতি ঘণ্টায় ব্রেক নিয়ে খেলার খবর রাখব আমরা।”

জায়ান্ট স্ক্রিন বসছে টলি ক্লাবেও। ক্লাব-সদস্য গৌরব ভূপালের কথায়, “সাধারণত এটা বিগ ফাইনালেই বসানো হয়। কিন্তু এই ম্যাচটা ফাইনালের চেয়ে কোনও অংশে কম কিসে?”

সুরকার জয় সরকারের আবার, “অনেক দিন পর টেনশন হচ্ছে!” সকালে নিয়ম করে শরীরচর্চা করেন। ম্যাচের জন্য বাদ দিচ্ছেন সেটা। বললেন, “রেকর্ডিং সন্ধ্যেয়। সেটাই যা রক্ষে। কারণ শুরু থেকে খেলাটা দেখতে হবে। আমার আবার কয়েকটা তুকতাক আছে। তবে ২০০৩-এর ফাইনালটার মতো ওরা মেরে দিলে যে কী হবে!”

টাইম মেশিনে সওয়ার কি ২০০৩-ও? না হলে সেই ফাইনালটা কেন বারবার কপালে ভাঁজ ফেলছে স্কুল-কলেজ-পাড়ার রকের আড্ডায়?

দিব্যেন্দু বড়ুয়ার প্রার্থনা, “ধোনি যেন টস জিতে আগে ব্যাট নেয়।” চ্যাম্পিয়ন দাবাড়ু ভারতীয় ব্যাটিংয়ের ভক্ত। এ দিকে দুপুরে পর কাজ পড়েছে। তাই আগেই কোহলিদের ব্যাটিংটা দেখে যেতে চাইছেন। ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পালের অবশ্য এমন কোনও বালাই নেই। তাঁর আপাতত মাতৃত্বের ছুটি। আটই মার্চ তাঁর কোলে এসেছে দ্বিতীয় সন্তান। ক্রিকেট পাগল অগ্নিমিত্রা বলছিলেন, “সুবিধে হল, বড় ছেলেরও ছুটি চলছে। আর কাজের দিন হলেও বন্ধুবান্ধবরাও ঠিক এক এক করে এসে যাবে। সবাই মিলে জমিয়ে বসে খেলা দেখব। আর ভারত যা ফর্মে, আমরা ফাইনালে যাচ্ছিই!”

সিডনির ছায়া চিরন্তন মোহন-ইস্টেও। শনিবার ডার্বি। বৃহস্পতিবার সকালে পড়েছে মোহনবাগানের প্র্যাক্টিস। কোচ সঞ্জয় সেন বলছিলেন, “ফাঁকি দেওয়া তো যাবে না। নেটে স্কোর দেখে অগত্যা দুধের স্বাদ ঘোলেই মেটাব। ভারতের ফর্মটা প্লাস পয়েন্ট। তবে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা হলেও এগিয়ে।” মোহন অধিনায়ক শিল্টন পাল প্র্যাক্টিস সেরে ফিরেই বসে পড়বেন টিভি খুলে। বললেন, “আমার বাজি ধোনিরা। ভারতের জেতার সম্বাবনা ৬০ শতাংশ।” লাল-হলুদের প্র্যাক্টিস বিকেলে থাকায় স্বস্তিতে ম্যানেজার অ্যালভিটো ডি’কুনহা। বলছিলেন, “ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে আমার উন্মাদনা একটু বেশিই। কপাল ভাল, কাল বিকেলে প্র্যাকটিস ডেকেছেন কোচ। পুরো ম্যাচটা দেখতে পাব। আমার বন্ধুরাও সব অফিস ছুটি নিচ্ছে।” মেহতাব হোসেনকে ভাবাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত স্লেজিং। প্র্যাক্টিসে আসার আগে সপরিবার ম্যাচ দেখবেন জানিয়ে বললেন, “নিজেদের মাঠ। তায় ওরা যা স্লেজিং করে! তবে আমাদের ব্যাটিং তো বেশ ভাল। কেউ না কেউ ঠিক হাল ধরে নেবে।”

টাইম মেশিনে চড়ে কলকাতার নৈশ জীবনও এগিয়ে এসেছে দুপুরে। পার্ক স্ট্রিটের এক গান ও পানশালা দুপুরেই খুলে দিচ্ছে দরজা। সঙ্গে একটা কিনলে একটা ফ্রি অফার। পার্ক সার্কাসের এক মলে পাবগুলো আগে খুলে যাচ্ছে ক্রিকেট-বাণিজ্য গুছিয়ে নিতে। বিভিন্ন রেস্তোরাঁও আগাম দরজা খুলছে ম্যাচের সময় মাথায় রেখে। আর ছুটির দিনের মতো ভিড় হবে ধরে নিয়ে। তারপর ধোনিরা জিতলে তো কথাই নেই!

হোক না উইক ডে। সিডনিমুখী কলকাতায় বৃহস্পতিবারই উইক এন্ড।

হাতে টাইম মেশিন তো আছেই!

world cup 2015 WC2015
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy