সঞ্জয় ঘোষাল নিজেই নিজেকে দায়ী করছেন। গত ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতীতে লিয়োনেল মেসিকে দেখতে যে শয়ে শয়ে মানুষ মাঠে ঢুকে পড়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। রাগে, বিরক্তিতে মেসি মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। আক্ষেপ নিয়েই আনন্দবাজার ডট কম-কে যা বললেন সঞ্জয়, তা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল, সে দিন কতটা নিরাপত্তাহীন ছিল যুবভারতী এবং কতটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছিলেন মেসি।
ভিভিআইপি গ্যালারির টিকিট পেয়েছিলেন বৌবাজারের সঞ্জয়। সেখান থেকেই ভাল ছেলের মতো ছবি, ভিডিয়ো তুলছিলেন। হঠাৎ একটি ঘটনা দেখে অবাক হয়ে যান তিনি। সঞ্জয় বললেন, “তখনও মেসি মাঠে ঢেকেননি। দেখলাম, ভিভিআইপি স্ট্যান্ডের নীচের গেটটা খোলা। ঠিক মিক্সড জ়োনের সামনের অংশটা। কখন, কে সেই গেট খুলেছিল জানি না। সেখান দিয়ে প্রথমে ৭০-৮০ জন হুড়হুড় করে মাঠে ঢুকে গেল। তাদের কারও গলায় অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড নেই। কার্ড গলায় ঝোলানো থাকলে গ্যালারি থেকেও ঠিকই দেখতে পেতাম। কিন্তু কারও গলায় কার্ড দেখতে পাইনি। কিছু ক্ষণের মধ্যেই দেখলাম, আরও ৩০-৪০ জন ঢুকে গেল।”
এর পর আর লোভ সামলাতে পারেননি। ‘অপরাধ’ করা থেকে নিজেকে সংযত রাখতে পারেননি। চকিতে ঠিক করে ফেলেন, তিনিও মাঠে ঢুকবেন। কিন্তু জানতেন, ওই ভিভিআইপি টিকিট নিয়ে কিছুতেই মিক্সড জ়োনে যেতে পারবেন না। ধরা পড়লে সমস্যা। তাই গ্যালারিতে বসেই টিকিট ছিঁড়ে ফেলেন তিনি। তার পর নীচে নেমে চলে যান মিক্সড জ়োনে। সেখানে গিয়ে প্রথমে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন সঞ্জয়। তখন মাঠে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছিল। বাচ্চা মেয়েদের প্রত্যেকের গলায় কার্ড ছিল।
সেখানে দাঁড়িয়েই সঞ্জয় শুনতে পান, মেসির মাঠে ঢোকার ঘোষণা হচ্ছে। ঢাক বাজছে। তখনই সুযোগ বুঝে মাঠে ঢুকে পড়েন সঞ্জয়। সুযোগ অবশ্য খুব একটা বুঝতে হয়নি। কারণ, কেউ তাঁকে আটকাননি। সঞ্জয় দাবি করলেন, “মেসি যখন ঢুকছেন, তখন ওই মিক্সড জ়োনের সামনের গেটে একজনও পুলিশকর্মী ছিলেন না। মাঠে ঢুকে শুনতে পাচ্ছিলাম, কেউ একজন বলছেন অরূপ বিশ্বাসের (রাজ্যের প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী, মেসিকাণ্ডের পর পদত্যাগ করেছিলেন) লোকেরা ঢুকে পড়েছে। অনেকে পুলিশের কার্ড দেখিয়ে পরিবারের লোক ঢুকিয়েছে। প্রায় ২০০ জন ছিল মেসিকে ঘিরে। এমনকি, আমার মনে হয়, মেসির গাড়ি যখন মাঠে ঢুকছে, তখন মেন গেট দিয়ে তার পিছন পিছন অনেকে ঢুকেছে।”
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় যুবভারতীতে কী হয়েছিল, তা টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছে গোটা বিশ্ব। মাঠ জুড়ে বিশৃঙ্খলা। ছবিশিকারিদের ভিড়। সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন মেসির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এনএসজি কমান্ডোরা। শতদ্রু মাইক্রোফোনে বার বার সকলকে মাঠ খালি করতে বলছিলেন। কিন্তু কে কার কথা শোনে। অরূপকে দেখা যাচ্ছিল, সারা ক্ষণ মেসির গায়ে গায়ে লেপ্টে রয়েছেন। লুই সুয়ারেস, রদ্রিগো ডি’পলও পিছিয়ে পড়ছিলেন। একটা সময় পর আর ভিড় সামলানো যায়নি। মেসি, সুয়ারেসদের নিয়ে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত। তার পরেই গেট ভেঙে, রেলিং টপকে মাঠে ঢুকে পড়েন আরও দর্শক। চলে ভাঙচুর। গ্যালারি থেকে চেয়ার ভেঙে মাঠে ছুড়ে ফেলা হয়। গোটা যুবভারতী লন্ডভন্ড হয়ে যায়। সে সবের সাক্ষী সঞ্জয়।
সঞ্জয়ের দাবি, বাকিদের মতো অবশ্য তিনি প্রথমেই মেসির পাশে চলে যাননি। আবারও ভাল ছেলের মতো সাইডলাইনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু একটা সময় পর বুঝতে পারেন, মেসির কাছে না গেলে হবে না। সঞ্জয় বললেন, ‘‘বার বার ঘোষণা করা হচ্ছিল, মাঠ খালি করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কে কার কথা শোনে! মেসি যখন সেন্টার সার্কেল থেকে বাইরের দিকে যাচ্ছেন, তখন মাঠে ঢুকে একটা ছবি তুলে চলে আসি। এত কষ্ট করে গিয়েছি। মেসিকে তো দেখার ইচ্ছা হবেই।’’
সঞ্জয় প্রথমে বললেন, ‘‘এতে তো অপরাধের কিছু নেই। বাকিরাও মেসিকে দেখতে গিয়েছিল। কিন্তু দেখতে পেল না।” মেসির সঙ্গে নিজস্বী তুলেছিলেন সঞ্জয়। কিন্তু তাঁদের জন্য যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, সেটিই ছিল মেসির যুবভারতী ছাড়ার বড় কারণ। মেসির সতীর্থ ডি’পলের হাতে আঁচড় লাগে। তখনই ‘নিরপরাধ’ সঞ্জয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আর থাকবেন না। জানালেন, আবেগের বশে মাঠে ঢুকে পড়েছিলেন। এখন আক্ষেপ রয়েছে সঞ্জয়ের। বললেন, “অবশ্যই আক্ষেপ আছে। পরে খারাপ লেগেছিল। ক্ষমা চেয়ে একটা পোস্টও দিয়েছিলাম। আমি হয়তো দেখতে পেলাম। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ পেল না। আমি ঠিক করেছি, আগামী দিনে মেসি কলকাতা এলে আমি আর দেখতেই যাব না। সে দিন ওঁর মাঠ ছাড়ার জন্য হয়তো আমিও কিছুটা দায়ী। কিন্তু যা করেছি, আবেগের বশে করেছি। আগে থেকে কিছু ঠিক ছিল না। ওই মুহূর্তে মেসিকে দেখতে ছুটে গিয়েছিলাম।”
প্রশাসনের উপরেই দায় চাপালেন সঞ্জয়। বললেন, “পুলিশ ছিল না। পুরোটাই প্রশাসনের গাফিলতি। আগে থেকে কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। এনএসজি ছাড়া মেসির আশপাশে কোনও পুলিশ আমার চোখে পড়েনি। পুলিশ হয়তো মাঠে ছিল। কিন্তু ওই সময়ে কাউকে আটকায়নি। তাতেই বিশৃঙ্খলা হয়েছে।” এই প্রসঙ্গে নিজেরই উদাহরণ দিয়েছেন সঞ্জয়। বলেছেন, “আমার তো কোনও যোগাযোগ নেই। কাউকে ধরেও ঢুকিনি। তা হলে ঢুকলাম কী ভাবে? পুলিশ থাকলে তো আটকাত। আমার গলাতেও কোনও কার্ড ছিল না। তা-ও ঢুকতে অসুবিধা হল না।”
বৌবাজারের সঞ্জয় কিশোর বয়সে কলকাতার প্রিমিয়ার ডিভিশন ফুটবল লিগে খেলেছেন। মাঠে বহু দিনের যাতায়াত। যে দিন শুনেছিলেন, মেসি কলকাতায় আসছেন, ঠিক করে ফেলেছিলেন, দেখতে যাবেন। মেসিকে নিজের চোখে দেখার এত বড় সুযোগ হারাতে চাননি তিনি।
আরও পড়ুন:
মেসিকে দেখার জন্য টিকিটের দাম ছিল চড়া। অনলাইনে টিকিট কাটতে সমস্যা হচ্ছিল। তাতেও আটকানো যায়নি সঞ্জয়কে। বললেন, “খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ময়দানে প্রায় সকলেই আমাকে চেনেন। তাই কোনও ম্যাচের টিকিট পেতে সমস্যা হয় না। ভেবেছিলাম, এ বারও টিকিট পেয়ে যাব। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু পাইনি। তখন ঠিক করি, যুবভারতীর সামনে গিয়ে টিকিট কাটার চেষ্টা করব।”
সঞ্জয় পেয়েও যান এক জনকে। চড়া দামে টিকিট বিক্রি করছিলেন তিনি। এক কথায় টিকিটের কালোবাজারি। সঞ্জয়ের দাবি, “উনি প্রথমে টিকিটের দাম বললেন ৩০ হাজার টাকা। রাজি হইনি। কমিয়ে ১৫ হাজার বললেন। তাতেও রাজি হইনি। তার পর কমে হল ১০ হাজার। তাতেও রাজি না হয়ে যখন হাঁটা লাগিয়েছি, আমাকে ডেকে বললেন ৫ হাজার টাকার কমে হবে না। সেই টাকাতেই টিকিট কিনেছিলাম।”
এ রকম কত মানুষ যুবভারতীতে ঢুকেছিলেন, তার হিসাব সঞ্জয়ের কাছে নেই। মেসিকাণ্ডের জেরে পদত্যাগ করতে হয়েছিল তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে, জেলে যেতে হয়েছিল মেসিকে যিনি কলকাতায় এনেছিলেন, সেই শতদ্রু দত্তকে। এই ঘটনার পর গ্রেফতার হন শতদ্রু। পরে জামিনে ছাড়া পান তিনি। রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পর পালাবদল হতেই মুখ খুলেছেন শতদ্রু। সোমবার অরূপ বিশ্বাস, জুঁই বিশ্বাস, আইএএস আধিকারিক শান্তনু বসু, রাজ্য পুলিশের তৎকালীন ডিজি রাজীব কুমার-সহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, অরূপ-সহ কয়েক জন ব্যক্তির ভুলের জন্য পুরো বিষয়টি ‘পণ্ড’ হয়েছে। অনেকেই অনুমতি ছাড়াই মাঠে প্রবেশ করেছিলেন। যার জেরে তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা।
থানা থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি শতদ্রু দত্ত। (বাঁ দিকে) সঞ্জয় ঘোষাল। ছবি: ফেসবুক।
শতদ্রুর পাশে রয়েছেন সঞ্জয়। শতদ্রুর সঙ্গে সোমবার থানায় গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। সঞ্জয়ের কথায়, “দাদাকে (শতদ্রু) বলির পাঁঠা করা হচ্ছে।’’ বললেন, তিনি নিজেই শতদ্রুর কাছে গিয়েছিলেন। পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। সঞ্জয় বললেন, “অন্য রাজ্যগুলোতে কত সুন্দর সবাই মেসিকে দেখল। আনন্দ করল। কী সুন্দর ব্যবস্থা। এখানেই গন্ডগোল হল। তার জন্য দাদাকে দায়ী করা হল। তাই নিজে থেকে গিয়ে দাদাকে বলেছিলাম, আমি তোমার পাশে আছি। দাদার সঙ্গে থানায় গিয়েছি। আইনজীবীকে আমার কথা জানিয়েছি। শেষ পর্যন্ত থাকব।”