Advertisement
E-Paper

গোলপার্থক্যের লিগে মহমেডানই ডিভিডেন্ড দিয়েছে ইস্টবেঙ্গলকে, সাদা-কালো ব্রিগেড কি সত‍্যিই ৭ গোল খাওয়ার দল, উঠছে প্রশ্ন

গোটা মরসুম চোট-আঘাত সমস্যায় ভুগেছে ইস্টবেঙ্গল। তা-ও লড়ে গিয়েছেন ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারেরা। মানসিক ভাবে দলকে এগিয়ে রেখেছিলেন কোচ অস্কার ব্রুজ়ো। ফুটবলারদের মধ্যে হাল না-ছাড়া মানসিকতা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ মে ২০২৬ ১৫:২৭
picture of football

ইস্টবেঙ্গল-মহমেডান ম্যাচের একটি মুহূর্ত। —ফাইল চিত্র।

২০১৯ সালে ইংল্যান্ড প্রথম বার এক দিনের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এখনও ইংরেজদের টিককিরি মেরে প্রশ্ন করা হয়, ফাইনালে কত ব্যবধানে জিতেছিলেন? বলতে পরেন না ইংরেজরা। কারণ দু’বার টাই হওয়া (সুপার ওভার-সহ) সেই মাচে ইংল্যান্ড জিতেছিল বেশি চার মারার হিসাবে! ২২ বছর পর ইস্টবেঙ্গল ভারত সেরা হওয়ায় মোহনবাগানিদের একাংশও খোঁচা মেরে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘কত পয়েন্টের ব্যবধানে জিতলি তোরা?’

এই প্রশ্নের উত্তর নেই ইস্টবেঙ্গলিদের কাছে। কারণ এ বারের আইএসএলে ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগানের পয়েন্ট সমান। দু’দলেরই ১৩ ম্যাচে ২৬ পয়েন্ট। গোলপার্থক্যে (৫) এগিয়ে থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লাল-হলুদ। ইস্টবেঙ্গলের গোলপার্থক্য ১৯। আর মোহনবাগানের ১৪। এর মধ্যে মহমেডানকে ৭-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। এ বারের আইএসএলে এটাই কোনও দলের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়। আর কোনও ম্যাচে ৭ গোলও হয়নি। বৃহস্পতিবার যুবভারতীতে মোহনবাগান ম্যাচ শেষ হওয়ার পর কয়েক জন সবুজ-মেরুন সমর্থককে এমন আলোচনা করতেও দেখা গেল যে, মহমেডান ম্যাচটা ‘ম্যানেজ’ করা হয়নি তো?

রানার্স মোহনবাগানের সমর্থকদের একাংশ লাল-হলুদ শিবিরকে খোঁচা দিচ্ছেন। তাঁদের সন্দেহ কলকাতার অন্য দুই প্রধানের ম্যাচ নিয়ে। গত ২২ বছরে ইস্টবেঙ্গল ট্রফি জেতেনি এমন নয়। কিন্তু আইলিগ বা আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। যে ট্রফি না জিতলে দেশের সেরা হওয়া যায় না। ২০২০-২১ মরসুম থেকে আইএসএল খেলছেন লাল-হলুদ ব্রিগেড। প্রথম বছর নবম স্থানে শেষ করেছিল। ২০২১-২২ মরসুমে সকলের শেষে একাদশ স্থান। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫, টানা তিন মরসুম নবম স্থানে। এ বার এক লাফে চ্যাম্পিয়ন! তা-ও পড়শি ক্লাবের সমর্থকদের কটাক্ষ।

বড় ব্যবধানে জিতেছিল মোহনবাগানও

আইএসএলে মহমেডানের পারফরম্যান্স সবচেয়ে খারাপ। ১৩টি ম্যাচের একটিও জিততে পারেনি। তিনটি ম্যাচ ড্র করেছে সাদা-কালো ব্রিগেড। সকলের শেষে ১৪ নম্বরে শেষ করার শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাবটির অবনমন হয়েছে। আগামী মরসুমে আইএসএলে দেখা যাবে না মহমেডানকে। ১৩টি ম্যাচে ৩২ গোল খেয়েছে মহমেডান। ম্যাচ প্রতি ২.৪৬ গোল হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অথচ ইস্টবেঙ্গলের কাছে ৭ গোল খেয়েছে। মোহনবাগানও কিন্তু খারাপ ব্যবধানে জেতেনি। সবুজ-মেরুন ব্রিগেড মহমেডানের বিরুদ্ধে জয় পেয়েছিল ৫-১ গোলে। শুধু মহমেডান ম্যাচ ধরলে মোহনবাগানের তুলনায় ইস্টবেঙ্গলের সুবিধা ৩ গোলের। গোটা প্রতিযোগিতায় ৫ গোলের। মহমেডানের বিরুদ্ধে মোহনবাগানের মতো ইস্টবেঙ্গল ৫-১ ব্যবধানে জিতলেও গোলপার্থক্যে এগিয়ে থাকত। তবু খোঁচা খেতে হচ্ছে!

বেহাল মহমেডান

আইএসএলের আরও একটি ম্যাচ বেশ বড় ব্যবধানে হেরেছে মহমেডান। মুম্বই সিটির কাছে ০-৪ ব্যবধানে হেরেছিল কলকাতার তৃতীয় প্রধান। এ ছাড়া টানা সাতটি ম্যাচ হেরেছে মহমেডান। পয়েন্ট তালিকায় ১৩তম স্থানে শেষ করা চেন্নাইয়িন এফসির থেকেও ৬ পয়েন্ট কম পেয়ে লিগ শেষ করেছে তারা। গোটা মরসুমে মহমেডানের খেলা দেখে কখনও মনে হয়নি, তারা ভাল কিছু করতে পারে। জিততে পারে, এমনও মনে হয়নি কোনও ম্যাচে। প্রতিযোগিতার একমাত্র বিদেশি ফুটবলারহীন দল। দুর্বলতমও বটে। ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন ফুটবলার মেহেরাজউদ্দিন ওয়াডুকে লড়াই করতে হয়েছে মূলত উঠতি ফুটবলারদের নিয়ে। মরসুমের প্রথম থেকে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ক্লাব কর্তৃপক্ষের সমস্যা। কোচ, ফুটবলারেরা ঠিকমতো বেতনও পাননি। তবু শেষ দিকের কয়েকটা ম্যাচে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিলেন সাদা-কালো ফুটবলারেরা। প্রথম সাত ম্যাচ হারার পর টানা তিন ম্যাচ ড্র করেছিলেন তাঁরা। শেষ তিন ম্যাচে আবার হার।

পিছন থেকে শীর্ষে ইস্টবেঙ্গল

এই মহমেডান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের ফল নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। অথচ ১৩টি ম্যাচে ৭ গোল করা মহমেডান কিন্তু মোহনবাগানকেও ১টি গোল দিয়েছিল। প্রতিযোগিতার পঞ্চম রাউন্ড পর্যন্ত অনেকটাই এগিয়েছিল মোহনবাগান। প্রথম পাঁচ ম্যাচের পর সবুজ-মেরুনের পয়েন্ট ছিল ১৩। আর ইস্টবেঙ্গলের ৮। এই ৫ পয়েন্টের পার্থক্য পরের আট ম্যাচে মুছে দিয়েছেন অস্কার ব্রুজ়োর ফুটবলারেরা। পিছন থেকে তাড়া করে পয়েন্টে মোহনবাগানকে ১০ নম্বর ম্যাচেই ছুঁয়ে ফেলেছিল ইস্টবেঙ্গল। পয়েন্টে সমান সমান হলেও ইস্টবেঙ্গল ১৩ ম্যাচে ৩০টি গোল করেছে। ম্যাচ প্রতি ২.৩টি। মোহনবাগান সমসংখ্যক ম্যাচে গোল করেছে ২৩টি। ম্যাচপ্রতি ১.৭৬। পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট এ বার ইস্টবেঙ্গলের স্ট্রাইকারেরা বেশি সফল। দু’দলই পাঁচটি করে ম্যাচে কোনও গোল খায়নি। যদিও মোহনবাগানের তুলনায় ২টি গোল বেশি হজম করেছে ইস্টবেঙ্গল।

হাল ছাড়েননি ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারেরা।

হাল ছাড়েননি ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারেরা। — ফাইল ছবি।

কোথায় পার্থক্য হল

মোহনবাগানে জাতীয় দলের ফুটবলার অনেক। বিশাল কাইথ, অনিরুদ্ধ থাপা, সাহাল আব্দুল সামাদের মতো দু’-এক জন ছাড়া অধিকাংশ ভারতীয় ফুটবলার ফর্মে ছিলেন না। জেমি ম্যাকলারেন ছাড়া সকলে গোলের প্রচুর সুযোগ নষ্ট করেছেন। জেসন কামিংস, দিমিত্রি পেত্রাতোসের মতো ভরসাদেরও চেনা মেজাজে পাওয়া যায়নি এ মরসুমে। রবিনহো রবসনকে নিয়ে পরিকল্পনা কাজে লাগেনি। চোট-আঘাতের জন্য অধিকাংশ সময় খেলতেই পারেননি ব্রাজিলীয় স্ট্রাইকার।

গোটা মরসুম চোট আঘাত সমস্যায় ভুগেছে ইস্টবেঙ্গলও। মহেশ সিংহ, সাউল ক্রেসপোকে পাওয়া যায়নি শেষ দিকে। তা-ও লড়ে গিয়েছেন ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারেরা। মানসিক ভাবে দলকে এগিয়ে রেখেছিলেন কোচ অস্কার ব্রুজ়ো। ফুটবলারদের মধ্যে হাল না-ছাড়া মানসিকতা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। আগের থেকে ভাল দল গড়লেও এ বারও খাতায়-কলমে মোহনবাগানের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে ছিল ইস্টবেঙ্গল। সেই খামতি মাঠের লড়াইয়ে ঢেকে দিয়েছেন লাল-হলুদ ফুটবলারেরা। লিগের শুরুটা ভাল না হলেও ইস্টবেঙ্গল কোচ আশা ছাড়েননি কখনও।

প্রাক্তনদের বিশ্লেষণ

ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগান দু’ক্লাবের হয়েই জাতীয় লিগ জেতা প্রাক্তন ফুটবলার দীপেন্দু বিশ্বাস দায়ী করছেন সবুজ-মেরুন ব্রিগেডকে। দীপেন্দুর বক্তব্য, ‘‘লিগে গোলপার্থক্য সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। এটা নতুন বা অজানা বিষয় নয়। মহমেডান ম্যাচে বেশি গোল করার সুবিধা ইস্টবেঙ্গল নিশ্চয়ই পেয়েছে। তা-ও মোহনবাগান তো সুবিধাজনক জায়গাতেই ছিল। ইন্টার কাশী ম্যাচটা জিতলে ওরাই চ্যাম্পিয়ন হয়। ওই ম্যাচ মোহনবাগান ড্র করবে, কেউ ভাবেনি। ঘরের মাঠে এমন পারফরম্যান্সের মূল্য দিতেই হবে।’’ প্রাক্তন গোলরক্ষক সংগ্রাম মুখোপাধ্যায় দায়ী করছেন মোহনবাগানের মানসিকতাকে। তাঁর বক্তব্য, ‘‘মোহনবাগান খুব ভাল শুরু করেছিল। পরে খেলা ধরে রাখতে পারল না। লিগের মাঝে হঠাৎ ফুটবলারদের ছুটি দেওয়া ঠিক হয়নি। ছুটিতে সবাই এ দিক-ও দিক ঘুরতে চলে গেল। তাতে তালটা কেটে গেল। তার পর আর মোহনবাগানকে আগের মেজাজে দেখা গেল না। মহমেডান ম্যাচের গোলপার্থক্যের সুবিধা ইস্টবেঙ্গল পেয়েছে ঠিকই। লিগ ফরম্যাটে এটা গুরুত্বপূর্ণ। সুযোগ পেলে গোলপার্থক্য বাড়িয়ে নিতে হয়। তবে সবচেয়ে অবাক হয়েছি, ইন্টার কাশী ম্যাচের দল দেখে। শুভাশিস বোস, লিস্টন কোলাসোর মতো ফুটবলারদের প্রথম একাদশে রাখেননি কোচ! সের্জিয়ো লোবেরা মনে হয় সহজ ভাবে নিয়ে ছিলেন। এত আত্মতুষ্টি ঠিক নয়।’’

প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ মোহনবাগানের বিদেশিরা।

প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ মোহনবাগানের বিদেশিরা। — ফাইল চিত্র।

মহমেডানের জন্য লাভ কতটা?

শুধু মহমেডান ম্যাচের জন্য ইস্টবেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, মানতে নারাজ প্রাক্তন ফুটবলারেরা। তাঁদের বক্তব্য এ ভাবে ফুটবল হয় না। এখনকার ফুটবলারেরা ভীষণ পেশাদার। প্রতিটি ম্যাচে ফুটবলারদের পারফরম্যান্স নজরে রাখেন দল কর্তৃপক্ষ। কারণ, প্রচুর খরচ হয় দল চালাতে। এজেন্টেরাও নজর রাখেন। গত কয়েক বছর মহমেডানের সঙ্গে যুক্ত দীপেন্দু বলেছেন, ‘‘মহমেডানের এ বার প্রচুর সমস্যা ছিল। ট্রান্সফার ব্যান ছিল। এখনও রয়েছে। একটা সময় দল নামানো নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। দল ভাল হয়নি। কোনও বিদেশি ছিল না। ফুটবলারদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়নি। বেতন দেওয়া যায়নি ঠিকমতো। তা-ও ফুটবলারেরা যথেষ্ট লড়াই করেছে। কয়েক জন তো বেশ ভাল খেলেছে। আমাদের দুর্বলতার সুযোগ সকলে নিয়েছে। যারা যতটা কাজে লাগাতে পেরেছে, তারা তত লাভবান হয়েছে।’’

সুযোগ বেশি কাজে লাগিয়েই প্রথম বার আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইস্টবেঙ্গল। হার না-মানা মানসিকতা এগিয়ে দিয়েছে। গোলপার্থক্যে লিগ জয় ফুটবলের ইতিহাসে অভিনব বা বিরল নয়। যোগ্য দল হিসাবেই এ বার ভারতসেরা লাল-হলুদ। ময়দানি ঈর্ষাও নতুন নয়!

ISL 2026 East Bengal FC Mohun Bagan Mohammedan SC
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy