Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২২ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

যুবরাজের শাপমোচনে তেইশ মাস

গৌতম ভট্টাচার্য
ঢাকা ০২ মার্চ ২০১৬ ০৩:২০

শ্রীলঙ্কা: ১৩৮-৯ (২০ ওভারে)
ভারত: ১৪২-৫ (১৯.২ ওভারে)

রানটা কোনও রানই নয়। ৩৫।

ম্যাচটাও কোনও ম্যাচই নয়। গ্রুপ লিগ খেলা।

Advertisement

তেইশ মাস আগের ওটা ছিল বিশ্বকাপ ফাইনাল। ঠাটেবাটে-গুরুত্বে-ঔজ্জ্বল্যে কোনও তুলনাই হয় না। কিন্তু প্রতিপক্ষ তো এক। মাঠ এক। পরিস্থিতি খানিকটা এক। তুলনা তো আসবেই।

তেইশ মাস আগের নৈশালোকিত মীরপুরে একাই ভারতকে ফাইনাল হারিয়ে দিয়েছিলেন যুবরাজ সিংহ। পাওয়ার হিটার হিসেবে তাঁকে ওপরে পাঠিয়েছিলেন ধোনি। কিন্তু ২১ বল খেলে সে দিন একটাও বাউন্ডারি মারতে পারেননি। না পেরেছিলেন স্ট্রাইক রোটেট করতে। ভারত করে মাত্র ১৩০। যুবি এত ডট বল খেলায় নট আউট ধোনি সুযোগ পান মাত্র ৭ বল খেলার। রায়না সে বারে এ বারের এশিয়া কাপের মতো উত্তর কলকাতার লড়ঝড়ে বাড়ি হয়ে ছিলেন না। নিয়মিত রান করছিলেন কিন্তু যুবি আগে গিয়ে ঠুকঠুক করায় ব্যাটই পাননি।

মঙ্গলবার সেই যুবরাজ চাপের মুখে পাঁচ নম্বরে যাচ্ছেন দেখে কৌতূহল হচ্ছিল। ভারত তিন উইকেটে ৭০ এবং ক্রমশ যেমন কুলশেখরা চাপ বাড়াচ্ছেন ম্যাচ না বেরিয়ে যায়। যতই পেশাদার ক্রিকেটার হন, মানুষ তো! কী করে ভুলবেন ওই ম্যাচের খারাপ ক্রিকেট যা তাঁকে বাইশ মাস আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে কয়েদ করে রেখেছিল।

অন্য দিকে বিরাট কোহলি আছেন। কিন্তু তাঁকে দলের কথা ভেবে এক দিক রাখতে হবে। স্ট্রোক প্লেয়ারদের মধ্যে ধোনি ছাড়া কেউ রিজার্ভে নেই। অগত্যা চালাতে হবে তাঁকেই। যুবরাজ এর পর তিনটে বিশাল ছক্কায় গুঁড়িয়ে দিলেন শ্রীলঙ্কাকে। সঙ্গে তিনটে বিশাল বাউন্ডারিও ছিল। ঢাকা ক্লাবে নাকি একটা দারুণ সুস্বাদু আইটেম পাওয়া যাচ্ছে— হিলশা অন টোস্ট। দু’টো টোস্টের মাঝে ইলিশের টুকরো।

যুবরাজকে দেখে মনে হল শ্রীলঙ্কা বোলিং যেন তাঁর কাছে আজ হিলশা অন টোস্ট। ৩৫ রানের মধ্যে ৩০ এল চার-ছয়ে। গোটা ম্যাচে এত কিছু ঘটল। ভারতীয় পেসারদের দারুণ বোলিং। ওপেনারদের ফের ব্যর্থ হওয়া। সেই কোহলির ওপর ব্যাটিং ঝুঁকে থাকা। ৪৭ বলে করা অপরাজিত ৫৬-তে ফের ম্যান অব দ্য ম্যাচ নিয়ে গেলেন কোহলি। আবার অসামান্য কভার ড্রাইভ মারলেন। ক্রিজের বাইরে গার্ড নিলেন মিডিয়াম পেসারদের জন্য। ক্রিকেটীয় স্কিল প্রদর্শনে বাইশ জনের মধ্যে আবার তিনিই সেরা।



কিন্তু ক্রিকেটের বাইরেও তো একটা জীবনের আকাশ থাকে। সেটা কোহলি নন। সেটা যুবরাজের কয়েদ ত্যাগ। ভারতের টানা তিন ম্যাচ জিতে এশিয়া কাপ ফাইনাল চলে যাওয়ার আ়ড়ালে অন্তর্লীন এক গভীর মুহূর্ত।

সময় এগিয়ে যেতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা হেরফর হতে পারে। কিন্তু ক্রিকেটার তার পুরনো রক্তের দাগ ভোলে না। তার শিকারিকে ক্ষমা করে না। পঙ্কজ রায় সেই ১৯৫২-র ইংল্যান্ড সিরিজে ফ্রেডি ট্রুম্যান দ্বারা বিধ্বস্ত হওয়ার পঁচিশ বছর পর সিএবি প্রবীণ বনাম এমসিসি প্রবীণ ম্যাচে ট্রুম্যানকে কয়েকটা সপাটে পুল মেরেছিলেন। করেন হাফসেঞ্চুরির সামান্য বেশি। তার পর জনান্তিকে নাকি বলেছিলেন, আজ রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোব।

যুবরাজও হয়তো মনে মনে ভাববেন এত বছর ধরে ক্যানসার-জয়ী ছিলাম। এ বার নতুনত্বর দরকার হয়ে পড়েছিল। আর সেটাও জিতলাম—কয়েদ-বিজয়! আজ লা মেরিডিয়ানের এগারো তলায় নিশ্চিন্তে ঘুমোব।

ক্রিকেটে অসম্ভব উৎসাহী ও পার বাংলার এক আইকন শুনলাম মঙ্গলবার ঢাকায় পা দিয়েছেন। বাংলাদেশ সফরের উপলক্ষ্য, কাজী নজরুলের নাতনি আয়োজিত কাজী সব্যসাচী স্মৃতি পুরস্কার নেওয়া। তাঁর ফিল্ম ‘বেলা শেষে’ এখানে চলছে বলেই নয়, এ দেশে তিনি এমন জনপ্রিয় যে মাঠে আসার সামান্য ইচ্ছে দেখালে উদ্যোক্তারা কৃতার্থ হয়ে যেতেন।

কিন্তু অনেক বিশুদ্ধ ভক্তের মতোই তাঁর, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়েরও যে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ঘোরতর অপছন্দ। ইডেনে বিশ্বকাপ দেখতে যাবেন না ঠিক করেছেন, শের-ই-বাংলা স্টেডিয়াম তাঁকে টানে কী করে! কিন্তু সৌমিত্রর মতো অনেক গোঁড়া ক্রিকেট-ভক্ত আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট একেবারেই দেখেন না বলে জানেন না, এই সব ম্যাচের মধ্যেও টেস্ট ক্রিকেটের মতোই গভীর মুহূর্ত তৈরি হয়। কোহলির ক্লাসিক্যাল কভার ড্রাইভ দেখা যায়। যুবরাজের স্বাধীনতার আকাশ খুলে যাওয়া দেখা যায়। আবার টাটকা স্কিলের ঝলকে নতুন ক্রিকেট গ্রহ নির্মাণও চোখে পড়ে!

যেমন হার্দিক পাণ্ড্য আর জসপ্রীত বুমরাহ! দু’জনেরই বয়স মাত্র বাইশ। আর দু’জনকেই দেখে মনে হচ্ছে বাইশ ক্যারাট স্বর্ণ-সম্ভাবনা নিয়ে উদয় হয়েছেন।

ভারতীয় ওপেনিং পার্টনারশিপ গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে যতই ৭ হিমোগ্লোবিনের মতো ফ্যাকাশে আর ভঙ্গুর থাক, বিপক্ষ রান করল কোথায়!

বাংলাদেশ ১২১। পাকিস্তান ৮৩। শ্রীলঙ্কা ১৩৮।

শুধু এই স্কোরগুলো দেখলেই বলে দেওয়া সম্ভব কার নৈপুণ্যে বিপক্ষের এই কম রান। কে আর, রবিচন্দ্রন অশ্বিন।

ঘটনা ঠিক উল্টো। তিন ম্যাচ মিলে অশ্বিন উইকেট পেয়েছেন মাত্র তিনটে। একটাও কোনও ভীতিপ্রদ পাওয়ার-হিটারের নয়। মীরপুর মাঠে তাঁকে মোটামুটি হাফ ডে ছুটি দিয়ে যাচ্ছেন পেসাররা।

এঁদের সাফল্যের জন্য বোলিং কোচ ছাড়াও কৃতিত্ব প্রাপ্য টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রীর। জুনিয়রদের উৎসাহ দিতে শাস্ত্রী অদ্বিতীয়। সেই হিরওয়ানির আমল থেকেই। এই দুই তরুণকে তাঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন বোলিং কোচ ভরত অরুণ। শাস্ত্রী তাঁদের বলেন, সাহস করে তাগড়াই মন নিয়ে বল করবে। ভয় পেয়ো না। সাহসী হতে গিয়ে যদি ভুল হয়, আমরা আছি।

স্লিঙ্গিং অ্যাকশন সহ বুমরাহ-র অন্যতম অস্ত্র ইয়র্কার। হার্দিকের বাউন্সার। দু’জনকেই বলা হয় অকুতোভয়ে নিজের-নিজের অস্ত্রের প্রয়োগ করে যেতে। ভুল হলেও ম্যানেজমেন্ট সঙ্গে থাকবে। বাংলাদেশ ম্যাচে ইয়র্কার দিতে গিয়ে লো ফুলটস দিয়ে ফেলেছিলেন বুমরাহ। হার্দিকের দু’টো বাউন্সার ওয়াইড হয়ে যায়। সৌরভের টিম ইন্ডিয়া বাদ দিয়ে অতীতের বেশির ভাগ ভারতীয় দলে জুনিয়রদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এর পরেই শেষ হয়ে যাবে। সে এর পর হয়ে প়ড়বে সাবধানী আর ব্যাটসম্যানদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে শুনতে পাওয়া মধ্য ফাল্গুনের কোকিলের ডাক!

বোলিং কোচ ঠিক বিপরীতমুখী পরামর্শ দেন। বুমরাহ, ইয়র্কার করে যাও। আর হার্দিয়া, তোমার বাউন্সার দু’টো ফস্কে গিয়েছে ডেলিভারির সময় ফুটহোল্ডটা শক্ত না পাওয়ায়। তুমি রানআপটা একটু আস্তে করো। এর পর পাকিস্তান ম্যাচে হার্দিক দু’টো বাউন্সারে দু’টো উইকেট নেন। মঙ্গলবারও দু’হাতের কনুইয়ে অ্যাঙ্কলেট জড়িয়ে বল করা পেসার গতি আর শর্ট বলে বিভ্রান্ত করে দিলেন শ্রীলঙ্কাকে। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজ অবধি ওই পেস ম্যানেজ করতে না পেরে প্লেড অন। বুমরাহকেও খেলতে পারলেন না দিলশানরা। অদ্ভুত ওই অ্যাকশনের জন্য তিনি একটা বাড়তি গতি পান। বলা হয়ে থাকে বিশ্ব ক্রিকেটের সৌভাগ্য যে সচিনের বটমহ্যান্ড গ্রিপ বদলাতে যাননি আচরেকর। ভারতীয় ক্রিকেটের সৌভাগ্য, এনসিএ-তে বুমরাহের অ্যাকশন বদলাতে চেয়েও কোচেরা যে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। আশিস নেহরা— তিনি তো আছেনই। টিম ইন্ডিয়া পেস বোলিংয়ের অধিনায়ক হিসেবে। কিন্তু এই দুই পেসারের জন্য আরও বেশি করে ধোনির ভারতকে এশিয়া কাপ তো বটেই, বিশ্বকাপেও গরিষ্ঠ দাবিদার মনে হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টে বুধবার লোঢা সিদ্ধান্তের বিপক্ষে বোর্ডের সওয়াল পেশ হওয়ার কথা। বিচারকেরাও মানুষ। এই মুহূর্তে টিম ইন্ডিয়া ব্যর্থতায় গড়াগড়ি খেলে তাঁদের মনোভাব যতটা কড়া হত, টানা তিন ম্যাচ জিতে ফাইনালে চলে যাওয়া টিমের বোর্ডের জন্য ততটা হবে কি?

সংক্ষিপ্ত স্কোর

শ্রীলঙ্কা ১৩৮-৯ (কাপুগেদারা ৩০, বুমরাহ ২-২৭), ভারত ১৪২-৫ (কোহলি ৫৬ ন.আ., কুলশেখর ২-২১)।

আরও পড়ুন

Advertisement