জুনিয়র বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সের পর এশিয়ান গেমস। হিমা দাসের পরের লক্ষ্য এটাই। যার প্রস্তুতি ‘ধিং এক্সপ্রেস’ নিচ্ছেন চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগে। অলিম্পিকের ৪০০ মিটারে ব্রোঞ্জ জয়ী গেলিনার তত্ত্বাবধানে। যিনি এখন ভারতের কোচ।
গত ১৬ জুলাই ফিনল্যান্ড থেকে প্রাগে পৌঁছেছেন হিমা দাস। দিন দু’য়েকের বিশ্রাম। শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি। তিন ইভেন্টে নামবেন তিনি। ২০০ মিটার, ৪০০ মিটার ও ৪*৪০০ মিটার মিক্সড রিলে রেসে। যা এ বারই প্রথম শুরু হচ্ছে। কেন প্রাগেই হচ্ছে প্রস্তুতি? জানা গিয়েছে, আবহাওয়াজনিত কারণেই বেছে নেওয়া হয়েছে প্রাগকে। এখন সেখানে তাপমাত্রা ১৬-১৮ ডিগ্রি। সঙ্গে অবশ্যই পরিকাঠামোগত সুবিধাও রয়েছে। অনেকটা এখানে যেমন বিয়েবাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়, প্রাগেও ব্যবস্থা রয়েছে অনুশীলনের অত্যাধুনিক পরিকাঠামো ভাড়া দেওয়ার।
প্রশ্ন হল, এশিয়ান গেমসে ৪০০ মিটারে হিমার গলায় পদক ঝুলবে কি? অ্যাথলেটিক্স মহল বলছে, পদক জিততে হলে শুরুতে গতি বাড়াতে হবে। শুধু শেষের দিকে গতি তুললে চলবে না। ফিনল্যান্ডে পিছন থেকে এসে তিন জনকে টপকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন সোনা। এশিয়ান গেমসেও একই ফরমুলা সফল না-ও হতে পারে। ফিনল্যান্ডে তাঁর সময় ছিল ৫১.৪৬ সেকেন্ড। কিন্তু, এর চেয়েও কম সময়ে ৪০০ মিটার দৌড়েছেন তিনি। গোল্ড কোস্টে কমনওয়েলথ গেমসে তাঁর সময় ছিল ৫১.৩২ সেকেন্ড। সেখানেই হিটে সময় ছিল ৫১.১৩ সেকেন্ড। জানানো যাক, এই ইভেন্টে এশিয়ান রেকর্ড ৫১.১১ সেকেন্ড। অর্থাত্, হিমার সামনে সুযোগ থাকছে।
ফিনল্যান্ডের এই ছবি এশিয়ান গেমসেও দেখা যাবে?
এ বার এশিয়ান গেমসের আসর বসছে জাকার্তা ও পালেমবাঙ্গে। মাসখানেক সময়ও হাতে নেই। ১৮ অগস্ট শুরু প্রতিযোগিতা। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্ট শুরু ২৫ তারিখ। আনন্দবাজার ডিজিটালকে মোবাইলে ছোটবেলার কোচ নিপন দাস বললেন, “শুধু পদকই জিতবে না, রেকর্ডও গড়বে। ওর সময় কমে আসবে ৫১ সেকেন্ডের কমে। ধরুন, ৫০.৯০ বা ৫০.৯৫ সেকেন্ডে শেষ করতে পারে।” কিন্তু, এই আত্মবিশ্বাসের উত্স কী? কোচ বললেন, “হিমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি এখন। মানসিক ভাবে দারুণ চাঙ্গা। প্রচণ্ড খাটছে। ওর কোনও দিকে নজর নেই। ধ্যানজ্ঞান একটাই, সময় কমাতে হবে।” বোঝাই যাচ্ছে, প্রস্তুতি নয়, হিমা আসলে করছেন সাধনা। আত্মাকেই যেন সঁপে দিয়েছেন সাধনায়।
চাষির মেয়ের বিশ্বজয়ের কাহিনি গলি থেকে রাজপথে উত্তরণের মতোই রূপকথা। গুয়াহাটি থেকে প্রায় দেড়শো কিমি দূরের কান্ধুলমারি গ্রামের এক মেয়ের বিশ্ব-মঞ্চে এই দাদাগিরি হয়তো বা তার চেয়েও বেশি রোমহর্ষক। মাঠে ফুটবল পেটাতেন। সেখান থেকে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের দুনিয়ায় নেমে পড়া। গ্রামের মহিলারা একসময় স্থানীয় মদের দোকান বন্ধ করতে নেমেছিলেন। সেই অভিযানেও যোগ দিয়েছিলেন হিমা। গ্রামের কন্যাসন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারেও নিয়েছিলেন অগ্রণী ভূমিকা। এ বার প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে সোনা জিতলেন অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্টে। গড়লেন ইতিহাস। এই ১৮ বছর বয়সেই। কবি সুকান্ত সেই কবে লিখে গিয়েছেন, ‘আঠারো বছর বয়সেই অহরহ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।’ হিমা সেটাকেই মনে করালেন!
দুঃসাহস তো বটেই। ১৮ জনের পরিবার হিমাদের। সবাই থাকেন একসঙ্গে। বাবা চাষি। আর্থিক অবস্থা আহামরি ছিল না কোনও দিনই। বাবাকে দেখে ফুটবলার হওয়ার ইচ্ছা জন্মেছিল। খেলতেন সব খেলাই, এমনকি কবাডিও। কাজ করতেন খেতে, চালাতেন ট্র্যাক্টর। মাঝে মাঝে দৌড়তেনও। আর সেই দৌড়ই কখন যেন বদলে দিল জীবনের গতিপথ। ভাবা যায়!
আরও পড়ুন: বিশ্ব রেকর্ড করল পাকিস্তানের ওয়ান ডে ওপেনিং জুটি
শুরুতে হিমা প্রধানত দৌড়তেন ১০০ ও ২০০ মিটারে। নিপন দাসই তাঁকে পাল্টাতে বলেন ইভেন্ট। নামতে বলেন ৪০০ মিটারে। পায়ের পেশি শক্ত, লম্বা দৌড়ের ক্ষেত্রে তা বেশি কার্যকরী হবে বলে মনে করেছিলেন তিনি। তাঁর কথায়: “২০০ মিটারে অনূর্ধ্ব-১৮ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নেমেছিল ব্যাঙ্কক ও নাইরোবিতে। ২০১৭-র জুলাইয়ে নাইরোবিতে ২৪.৩১ সেকেন্ডে দৌড়েছিল, হয়েছিল পঞ্চম। ১০০ মিটার ছাড়িয়ে দিই তার পর। ২০০ মিটারে ভাল দৌড়ত বলে ৪০০ মিটারেও নামতে বলি। ও যে সময়ে নাইরোবিতে ২০০ মিটার দৌড়েছিল, সেই হিসেবে ৪০০ মিটার শেষ করতে ৫৩-৫৪ সেকেন্ড লাগবে। সেটা ভেবেই বলেছিলাম। সেই শুরু। গত বছরের অগস্টে।” কে জানত, এই একটা সিদ্ধান্তই ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে যুগান্তকারী হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেবে?
এশিয়ান গেমসেও কি দেখা যাবে ফিনল্যান্ডের পুনরাবৃত্তি? দেখা যাবে ফের তেরঙা জড়িয়ে বিজয়োত্সবে মেতে ওঠার ছবি? ‘জনগণমন অধিনায়ক’ শুনে পোডিয়ামে দাঁড়ানো হিমার চোখের কোণে ফের চিকচিক করে উঠবে জল? টপটপ গড়িয়ে পড়বে গালে? নির্বাক কান্না হয়ে উঠবে দেশপ্রেমের জলজ্যান্ত প্রতীক? স্বপ্ন দেখছে ধিঙা। স্বপ্ন দেখছে নগাঁও জেলা।
বছরখানেকের প্রস্তুতিতে যিনি জুনিয়র বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সে সোনা জিততে পারেন, মাসখানেকের প্রস্তুতিতে এশিয়াডে পারবেন না? আত্মাকে শপথের কোলাহলে সঁপতে তো এই বয়সই পারে!
আরও পড়ুন: অক্টোবরে চিনের সঙ্গে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলবেন সুনীল ছেত্রীরা