অনুষ্কা শর্মা নন। বিরাট কোহলির অন্য এক প্রেমকাহিনীতে মজে ক্রিকেট দুনিয়া!
প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে সাঁইত্রিশ রানে হারানোর পর মহেন্দ্র সিংহ ধোনির মুখেও সবার আগে সেই কথা। বিরাট নিজে স্বীকার করেছেন, ‘‘আমাদের মধ্যে একটা বিশেষ যোগ রয়েছে। যা ভেতরের সব ছটফটানি মুছে দিয়ে আমাকে অন্য একটা জোন-এ পৌঁছে দেয়। অসাধারণ অনুভূতি সেটা!’’
অ্যাডিলেড ওভালের সঙ্গে বিরাট কোহলির এই প্রেম মঙ্গলবার সবচেয়ে ভাল তুলে ধরেছিল মাঠের এক পোস্টা। ‘‘সাবধান! কোহলি স্ট্রাইক নিচ্ছে!’’ ৭১ বলে অপরাজিত ৯০ করে (ন’টি বাউন্ডারি, দু’টি ওভার বাউন্ডারি) কোহলি ভারতকে ১৮৮ রানে পৌঁছে দেওয়ার পর জয় নিশ্চিত করেন স্পিনাররা। ১৫১ রানে অস্ট্রেলিয়াকে গুটিয়ে দিয়ে। এর পর সাংবাদিক বৈঠকে এসে মুখে চওড়া হাসি-সহ ধোনীর প্রথম মন্তব্যই ছিল, ‘‘বিরাট এখানে যত রান করেছে, তাতে অ্যাডিলেড ওভালের একটা স্ট্যান্ডের নামকরণ ওর নামে করতেই হবে বলে মনে হচ্ছে!’’ ভারত অধিনায়কের সঙ্গে এ ক্ষেত্রে একমত নন, এমন লোক পাওয়া কঠিন। অ্যাডিলেডের বাইশ গজে আত্মপ্রকাশের মুহূর্ত থেকেই অনবদ্য বিরাট। ২০১২-য় নিজের প্রথম টেস্টে ১১৬ করেছিলেন। প্রেমকাহিনীর সেই শুরু। এর পর ২০১৪-য় অ্যাডিলেড টেস্টের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি। টেস্ট গড় ৯৮.৫০। আর ২০১৫ বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১০৭।
এই মাঠে বিরাটের সেঞ্চুরির সংখ্যা চার থেকে পাঁচটা মাত্র দশ রানের জন্য হল না মঙ্গলবার। তবে টি-টোয়েন্টির প্রথম ম্যাচে দাপটে জেতা নিশ্চিত করে নায়ক নিজে বলেছেন, ‘‘এই মাঠে যখনই নামি, ভেতরটা যেন অপনা থেকেই শান্ত হয়ে যায়। অদ্ভূত একটা আত্মবিশ্বাস পাই। পরিবেশটাই আপন করে নেয়।’’ অ্যাডিলেডের বাইশ গজে ব্যাট করা যে কোনও ব্যাটসম্যানের জন্য অসাধারণ অভিজ্ঞতা জানিয়ে যোগ করেছেন, ‘‘ভরা গ্যালারির চিৎকার আমাকে বাড়তি চাগায়। বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচে সেটাই হয়েছিল। গত গ্রীষ্মেও দারুণ একটা টেস্ট খেলে গিয়েছি। দুর্দান্ত উইকেট। এখানে ব্যাটিংটা চুটিয়ে উপভোগ করি।’’
নিজের ব্যাটিং সাফল্যের জন্য বিরাট অ্যাডিলেডের বাইশ গজকে ধন্যবাদ দিলেও তাঁর ইনিংসে এখনও বুঁদ দর্শক। গত কাল যাঁরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখেছেন বিরাটের অসামান্য টাইমিং, অনায়াস স্ট্রোক প্লে আর ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে নেওয়ার নিখুঁত দক্ষতা।
দুরন্ত ফর্মের রহস্যটা বিরাট নিজেই জানিয়েছেন এ দিন। বলেছেন, ‘‘ব্যাটিং ব্যাপারটা যতদূর সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করছি। তাতেই দারুণ কাজ হচ্ছে।’’ স্ট্র্যাটেজির আরও গভীরে ঢুকে বলেছেন, ‘‘আজকাল ব্যাট করতে নামার সময় মাথা একদম ফাঁকা রাখি। কী করব, কেমন খেলব, কোনও আগাম পরিকল্পনা নিয়ে নামি না। শুধু ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করি।’’ সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘‘যে মুহূর্ত থেকে মনের মতো ব্যাটে-বলে হওয়া শুরু হয়, বুঝে যাই আমাকে আজ ঠিক কী করতে হবে। বুঝে যাই নিজের জোন-এ পৌঁছে গিয়েছি তাই এ ভাবেই স্ট্রোক খেলা চালিয়ে যেতে হবে। সৌভাগ্য স্ট্রোক খেলাটা খুব স্বাভাবিক ভাবে আসে। চিন্তাভাবনা সহজ রাখার ক্ষমতাটাও সহজাত, যার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। বাড়তি চেষ্টা লাগে না। স্রেফ প্রতি বার নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি যাতে টিমকে জেতানো যায়।’’ তাঁর ঝরঝরে ব্যাটিংয়ের মতোই ঝরঝরে বিশ্লেষণ!
মঙ্গলবারের অপরাজিত নব্বইয়ের ইনিংসে হিসেব কষে ঝুঁকি নিয়ে বেশ কয়েকটা বড় শট খেলেছিলেন বিরাট। অফ সাইডে ফিল্ডিংয়ের ফাঁক দিয়ে বারবার মেরেছেন চোখ ধাঁধানো সব ইনসাইড-আউট শট। বলছেন, সবই সম্ভব হয়েছে পিচের চরিত্র ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারায়। ‘‘এই সিরিজে এখনও পর্যন্ত যতগুলো উইকেটে খেলেছি, তার তুলনায় অ্যাডিলেডের পিচে বাউন্স আর গতি বেশি ছিল। আমি শুধু সেই বাউন্সটার জন্য বাড়তি জায়গা তৈরি করে নিয়ে নিজের ইচ্ছে মতো শট খেলার চেষ্টা করেছি। স্ট্র্যাটেজিটা খেটে যাওয়ায় যে ক’টা ডেলিভারি পেয়েছি, হাঁকাতে পেরেছি।’’ বিরাটের কথায়, ‘‘এটাই আমার স্বাভাবিক খেলা। লেগের তুলনায় অফ-সাইডে অনেক বেশি শট খেলার বিকল্প তৈরি করে নিচ্ছিলাম নিজের জন্য।’’
বিরাটকে নিয়ে ক্রিকেট মহল মুগ্ধ হয়ে থাকলে, বিরাট নিজে মুগ্ধ সুরেশ রায়নায়। গতকাল রোহিত শর্মা ও শিখর ধবন দ্রুত ফেরায় তাঁর সঙ্গে রায়নার (৪১) পার্টনারশিপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। যা নিয়ে বিরাট বলেছেন, ‘‘সিরিজে নিজের প্রথম ম্যাচে নেমেই রায়না অসাধারণ ব্যাট করল! শুরুতেই দু’উইকেট হারানোর পর আমার সঙ্গে ও যে ভাবে ইনিংস গড়ল তার জন্য ওকেও সমান কৃতিত্ব দিতে হবে। রায়না আমাদের টিমের খুব গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার। ও যে ভাবে খেলল তাতে আমি দারুণ খুশি।’’
শুক্রবার মেলবোর্নে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে নামার আগে হাতে কিছুটা সময় রয়েছে। কোহলি জানিয়েছেন, অ্যাডিলেডের জেতার মেজাজটা মেলবোর্নেও ধরে রাখতে চান। তবে তার আগে হাতে দু’দিন সময়। ‘‘সময়টা ক্রিকেট নয়, একদম স্বাভাবিক কিছু করে উপভোগ করব। যেমন পায়ে হেঁটে অস্ট্রেলিয়ায় সৌন্দর্য দেখা। মাথাটা তাতে রিল্যাক্সড থাকবে।’’
মাথা চাপমুক্ত থাকলেই যে তাঁর ব্যাটে ঝড় ওঠে, সে তো আগেই বলেছেন!