কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের আশেপাশে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, একটু বেশি দাম দিলেই মিলতে পারে টিকিট। সেটা কেমন! ফিসফিস করে শোনা যায়, ‘১০০ টাকারটা দিতে হবে ২০০, ২০০ টাকারটা ৪০০…।
ওই স্টেডিয়ামেই আবার ভিন্ন ছবি চোখে পড়ে। যেমন কমিটির আজীবন সদস্য হয়েও ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ডার্বির একটা টিকিট কিনতে গিয়ে না পেয়ে হতাশায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বর্ষীয়ান প্রদীপ কুমার দত্ত। শিলিগুড়ির হাকিমপাড়া এলাকার বাসিন্দা প্রদীপবাবু স্টেডিয়াম কমিটির সচিব তথা শিলিগুড়ির মহকুমাশাসককে এসএমএস মারফত অভিযোগ জানিয়ে কোনও উত্তর পাননি।
এমনও দৃশ্য দেখা ঐগেল, শাসক দলের একাধিক মাঝারি মাপের নেতার পকেটে টিকিটের গোছা নিয়ে ঘুরছেন। ভোটের মরসুমে দলের ও ভিনদলের লোকজনকে কাছে টানতেও ‘ডার্বি’র টিকিট যেন হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যা দেখেশুনে ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, নর্থ বেঙ্গল (ফোসিন)-এর সদস্যদের অনেকেই বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। ওই স্টেডিয়ামে ফোসিনের নামে একটি গেট রয়েছে। কারণ, স্টেডিয়াম তৈরির সময়ে ফোসিন অর্থ সাহায্য করেছিল। কিন্তু, ফোসিনের সদস্যরাও কোনও টিকিট পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। খালপাড়া, সেবক রোডের একাধিক ব্যবসায়ী সংগঠনের কর্তারাও টিকিট পাননি। অথচ, কালোবাজারে টিকিট বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ।
খেলার এখনও দুদিন বাকি। তার আগেই শিলিগুড়িতে টিকিটের দাম কালোবাজারে দ্বিগুণ-তিনগুণ চড়ে যাওয়ার অভিযোগ শোনা যাচ্ছে নানা এলাকায়। বৃহস্পতিবার সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের দু’টি কাউন্টারের কোনটিই খোলেনি। আয়োজকরা জানিয়েছেন, বিক্রি করার মতো আর টিকিট নেই। যদিও, স্টেডিয়ামের আশেপাশে, বিধান মার্কেটের বেশ কিছু দোকান থেকে এ দিন দিনভর একশো টাকা এমনকী তিনশো টাকারও টিকিট মিলেছে, তবে তার জন্য ফুটবলপ্রেমীদের দাম গুণতে হয়েছে কয়েক গুণ। শিলিগুড়ি মহকুমা ক্রীড়া পরিষদ থেকে জানানো হয়েছে, গত বুধবারই সব টিকিট শেষ হয়ে গিয়েছে। তবে কালোবাজারে এত টিকিট আসছে কোথা থেকে সে প্রশ্ন তুলেছেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। কালোবাজারি রুখতে ক্রীড়া পরিষদ থেকে নিয়ম করা হয়েছিল একজনকে সর্বোচ্চ চারটি করে টিকিট দেওয়া হবে, যদিও, পরে টিকিটের চাহিদা দেখে জনপ্রতি দু’টি করে টিকিট দেওয়া হয়েছে। ফুটবলপ্রেমীদের অভিযোগ, আয়োজকদের একাংশের সঙ্গে যোগসাজশ না থাকলে কালোবাজারে এত টিকিটের জোগান সম্ভব নয়।
কালোবাজারির অভিযোগ পৌঁছছে জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের কাছেও। দার্জিলিঙের জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তবও কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের পরিচালন কমিটির শীর্ষে রয়েছেন। জেলাশাসক বলেন, ‘‘টিকিট নিয়ে কালোবাজারি অভিযোগ ওঠাই দুর্ভাগ্যজনক। অভিযোগ যখন উঠেছে, তখন কোথাও অনিয়মের আশঙ্কা থাকে। বিষয়টি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি।’’
তাতে অবশ্য আশ্বস্ত হতে পারছেন না ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেই। অনেকেরই প্রশ্ন, শহরের নানা এলাকায় নেতাদের একাংশের কাছে গেলেই টিকিট মিলছে কী ভাবে সেটা স্পষ্ট হওয়া দরকার। সেই টিকিট নানা হাত ঘুরে কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে কি না তা নিয়ে পুলিশ তদন্ত করবে না কেন সেই প্রশ্নও উঠেছে শহরে। শিলিগুড়ির নাগরিক সংগঠনের অন্যতম কর্তা দূর্গা সাহা বলেন, ‘‘টিকিট যাতে কালোবাজারে বিক্রি না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে পুলিশ-প্রশাসনকে। এটা শহরের সুনামের প্রশ্ন।’’ শিলিগুড়ি আদালতের আইনজীবী অখিল বিশ্বাসও মনে করেন, আয়োজকদের টিকিট বিক্রির ব্যাপারে আরও আরও সতর্ক হতে হবে। তিনি বলেন, ‘‘সত্যিকারের ক্রীড়ামোদীরা যদি টিকিট না পায়, খেলার টিকিট নিয়ে যদি ভোটের রাজনীতি হয় তা হলে তার চেয়ে দুঃখের কিছু হয় না। আশা করব এমন হবে না।’’ টিকিট নিয়ে কালোবাজারির করার অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্তারাও। শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার মনোজ বার্মা বলেন, ‘‘কালোবাজারি রুখতে কড়া পদক্ষেপ হবে। শহরজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।’’
শিলিগুড়ি মহকুমা ক্রীড়া পরিষদের সচিব অরূপরতন ঘোষ দাবি করেন, টিকিট চাহিদার তুলনায় কম মিলেছে বলে নানা অভিযোগ উঠছে। তাঁর বক্তব্য, ‘‘আমরা ফের মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের কাছে টিকিট চেয়েছি। যদি কিছু পাওয়া যায়। তবে খেলার দিন সকালে তাঁরা ফের কাউন্টার খুলে তা বিক্রি করা হবে।’’