Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৭ জুলাই ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

আধুনিক ট্রেনিং করে শক্তিশালী হওয়াই পাল্টে দিয়েছে ইতিহাস

অদম্য জেদ পারেনি স্বপ্নের পথে কাঁটা বিছিয়ে দিতে। উপেক্ষা আর লাঞ্ছনার পথ পেরিয়ে সে দিনের কিশোর হয়ে উঠেছিল কপিল দেব। কে জানত, এক দিন এমন যুগও

সুমিত ঘোষ 
লন্ডন ২৫ অগস্ট ২০১৮ ০৪:১৮
Save
Something isn't right! Please refresh.
ত্রয়ী: ট্রেন্ট ব্রিজে জয়ের অন্যতম তিন নায়ক ইশান্ত, শামি ও বুমরা। টুইটার

ত্রয়ী: ট্রেন্ট ব্রিজে জয়ের অন্যতম তিন নায়ক ইশান্ত, শামি ও বুমরা। টুইটার

Popup Close

উত্তর ভারতের এক ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্প। সারা দিনের হাড় ভাঙা খাটুনির পরে এক কিশোর দেখল, তার জন্য বরাদ্দ মাত্র দু’টি রুটি। প্রতিবাদ করে সে বলে ওঠে, ‘‘আমি ফাস্ট বোলার হতে এসেছি। দু’টো রুটিতে আমার কী হবে? চারটে দাও।’’ জবাবে তীব্র ভর্ৎসনাই জুটল— ‘‘ভারতে কোনও ফাস্ট বোলার হয় না!’’

অদম্য জেদ পারেনি স্বপ্নের পথে কাঁটা বিছিয়ে দিতে। উপেক্ষা আর লাঞ্ছনার পথ পেরিয়ে সে দিনের কিশোর হয়ে উঠেছিল কপিল দেব। কে জানত, এক দিন এমন যুগও আসবে যখন স্পিনের দেশ ভারত তাদের পেস বোলারদের জন্য ক্রিকেট বিশ্বে বন্দিত হবে! ডেভিড গাওয়ার থেকে শুরু মাইকেল আথারটন— প্রাক্তন অধিনায়ক এবং বর্তমান টিভি ধারাভাষ্যকারেরা মনে করছেন, ট্রেন্ট ব্রিজে দু’জনের কাছে হেরেছে ইংল্যান্ড। এক) ব্যাটসম্যান বিরাট কোহালি, দুই) তাঁর সুপারফাস্ট পেস বোলিং বিভাগ।

কপিল ছিলেন সুইং এবং সিম বোলার। গতি তাঁর অস্ত্র ছিল না। জাভাগাল শ্রীনাথ ছাড়া কোনও ভারতীয় পেসারকে কখনও দেখে মনে হয়নি যে, তাঁর গতিকে প্রতিপক্ষ সমীহ করছে। এমনকি, সচিন, দ্রাবিড়, সৌরভ, লক্ষ্মণ, সহবাগদের যে সোনালি প্রজন্মের দল ভারতীয় ক্রিকেটকে এক দশক ধরে আলোকিত করেছিল, তাদেরও কোনও প্রকৃত ফাস্ট বোলার ছিল না। হরভজন সিংহ ট্রেন্ট ব্রিজ টেস্টের পরে বলছিলেন, ‘‘আমাদের পেস বিভাগ বলতে ছিল জাহির খান। তার আগে শ্রীনাথ, বেঙ্কটেশ প্রসাদ। দারুণ বোলার ছিল জাহির কিন্তু সুপারফাস্ট ছিল না। বছরের পর বছর ধরে আমাদের ব্যাটসম্যানেরা শুধু ফাস্ট বোলিং খেলেই গিয়েছে। এখন আমরা ফেরত দিতে পারছি।’’ অধিনায়ক জীবনে রাহুল, সৌরভদের মুখে বার বার একই আক্ষেপ শোনা গিয়েছে, ‘‘মুখের পাশ দিয়ে, নাকের পাশ দিয়ে ঘণ্টায় ১৪৫ কিলোমিটার গতিবেগে বলগুলো উড়ে যায়। আমাদেরও যদি ও রকম এক্সপ্রেস বোলার থাকত!’’

Advertisement

সেই আক্ষেপ করতে শোনা যাবে না বিরাট কোহালিকে। ট্রেন্ট ব্রিজ টেস্টে ভারতের জয়ের মধ্যে সব চেয়ে জনপ্রিয় হয়েছে একটি তুলনা। দেখা গিয়েছে, ভারতীয় পেসারদের প্রত্যেকে ইংল্যান্ডের জোরে বোলারদের চেয়ে গতিতে এগিয়ে। এমনকি, অলরাউন্ডার হার্দিক পাণ্ড্যও। তাঁরও গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের উপরে। ইংল্যান্ডের চার পেসারের প্রত্যেকের গতি হার্দিকের চেয়েও কম।

টেস্ট ক্রিকেটে গত ১৩টি ইনিংসের মধ্যে ১২টিতে প্রতিপক্ষ দলকে অলআউট করেছে ভারত। ১৯৭১-এ ওভালে যখন অজিত ওয়াড়েকরের দল ঐতিহাসিক টেস্ট জেতে, চন্দ্রশেখর দ্বিতীয় ইনিংসে নিয়েছিলেন ছয় উইকেট। ট্রেন্ট ব্রিজে অশ্বিন নিয়েছেন মাত্র একটি উইকেট। সেটাও শেষ দিনে অ্যান্ডারসনের। দুই ইনিংস মিলিয়ে বাকি ১৯ উইকেট পেসারদের।

আরও পড়ুন: বেশি ভাবিই না, বল দেখি আর খেলি, বলছেন ঋষভ

এ বছরের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকায় তিন টেস্টের ছয় ইনিংসে মোট ৫৭টি উইকেট তুলেছিল ভারতীয় বোলাররা। তার মধ্যে ৫০টি পেসারদের নেওয়া। ওয়ান্ডারার্সের পেস-সহায়ক পিচে প্রথম একাদশে জায়গাই হয়নি দেশের এক নম্বর স্পিনার অশ্বিনের। ইংল্যান্ডে এখনও পর্যন্ত পাঁচ ইনিংসে ভারতীয় বোলাররা তুলেছেন ৪৬ উইকেট। তার মধ্যে ৩৮ শিকার পেসারদের।

ভারতীয় দলে ট্রেনার শঙ্কর বাসুর আগমন ফাস্ট বোলারের কারখানা তৈরি করতে আরও সাহায্য করেছে। এই বাসুর কাছে ট্রেনিং শুরু করেই গত চার-পাঁচ বছরে কোহালির ক্রিকেটে অস্বাভাবিক উন্নতি। ফাস্ট বোলারদেরও ওয়েট ট্রেনিং করিয়ে শক্তিশালী করে তুলেছেন বাসু। টিম ম্যানেজমেন্টের সমর্থন শামি, বুমরাদের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াসিম আক্রম মনে করেন, ‘‘ধোনি অধিনায়ক থাকার সময়ে ম্যাচ চলাকালীন খুব একটা বোলারদের সঙ্গে কথা বলত না। কোনও বোলার মার খেলে দেখিনি ধোনি তার কাঁধে হাত রেখে বোঝাচ্ছে। জাহির যত দিন ছিল, সেটা ও করে গিয়েছে। কোহালিকে দেখছি এটা করছে।’’

হেড কোচ রবি শাস্ত্রী জানেন, ফাস্ট বোলিং কী ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে। অ্যান্টিগা এবং বার্বেডোজ, ওয়েস্ট ইন্ডিজে দু’টো টেস্ট সেঞ্চুরি আছে। প্রথমটায় বোলিং আক্রমণ— মার্শাল, রবার্টস, হো্ল্ডিং, উইনস্টন ডেভিস। দ্বিতীয়টায় মার্শাল, অ্যামব্রোজ, বিশপ, ওয়ালশ। কোচ হয়ে আসার পর থেকেই শাস্ত্রী তাঁর বোলিং কোচ বি অরুণকে বলে দিয়েছিলেন, আমাদের ফাস্ট বোলিং ইউনিট গড়ে তুলতে হবে। যেখানে অন্তত পাঁচ জন প্রথম দলের এবং আরও পাঁচ জন রিজার্ভ বোলার তৈরি রাখা যায়।

ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা অরুণকে এই গতির অভিযানে সাহায্য করেছে। ক্রিকেট জীবনে তাঁর স্বপ্ন ছিল ফাস্ট বোলার হবেন। নিজে ক্রিকেটার হিসেবে সফল হতে পারেননি। কিন্তু ভারতের কোন প্রান্তে কোন উঠতি ক্রিকেটার কী করছে, সব নখদর্পণে চার্লি চ্যাপলিনের জীবন দর্শনে বিশ্বাসী অরুণের। অশ্বিনের সঙ্গেও সারাক্ষণ কথা বলে যাচ্ছেন তিনি। অশ্বিন লেগস্পিন করাবেন কি করাবেন না, কত রকম বৈচিত্র ব্যবহার করা উচিত সব ব্যাপারে খোলামেলা কথা হয় তাঁদের। ‘‘কখনও কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না। সেই কারণেই আলোচনা করি বোলারদের সঙ্গে। ওরা কোনটাতে স্বস্তি পাবে, সেটাও তো খুব গুরুত্বপূর্ণ,’’ এই অরুণের দর্শন।

যশপ্রীত বুমরাকে টেস্টে খেলানোর সিদ্ধান্ত শাস্ত্রী-অরুণ জুটির মাস্টারস্ট্রোক হয়ে থাকবে। বুমরাকে দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্টে নিয়ে যাওয়া হবে ঠিক করা মাত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল জাতীয় অ্যাকাডেমিতে। সেখানে গিয়ে আগে শক্তি বাড়াতে বলা হয় তাঁকে। প্র্যাক্টিসে কোন বোলার কতটা বল করবে, সেটাও বিজ্ঞানসম্মত ভাবে ঠিক করা হয় ভারতীয় দলে। নতুন শব্দের আগমন হয়েছে কোহালিদের দলে— ‘ওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট’। ট্রেনার এবং ফিজিয়ো হিসেব রাখেন, গত এক সপ্তাহ ধরে কে কতটা ‘ওয়ার্কলোড’ নিয়েছে। তাঁদের রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত হবে সাউদাম্পটনে গিয়ে প্র্যাক্টিস সেশনে বুমরা বল করবেন না বিশ্রাম নেবেন!

আগের সেই দিন আর নেই যে, পেসার মানে দুয়োরানির ছেলের মতো প্র্যাক্টিসে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাবে। সারা দিন ধরে গোটা মাঠ চক্কর খাবে আর দশ জন ব্যাটসম্যানকে বল করবে। এখন ব্যাটসম্যানের জন্য যতটা আরামের চেয়ার, ফাস্ট বোলারদের জন্যও তাই। দু’টো রুটি বেশি চাইলেও কেউ কটাক্ষ ফিরিয়ে দেবে না, বরং খুশি মনে এগিয়ে দেবে। কে বলার সাহস দেখায় ‘‘ভারতে ফাস্ট বোলার হয় না!’’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement