পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা-সহ উপকূলবর্তী রাজ্যগুলির উদ্বেগ বাড়িয়ে ‘মারাত্মক প্রবল ঘূর্ণিঝড়’-এর চেহারা নিয়ে ফণী। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ক্রমশ সে এগিয়ে আসছে ওড়িশার দিকে। কাল, শুক্রবার বিকেলে ওড়িশায় আছড়ে পড়তে পারে ওই ঘূর্ণিঝড়। মৌসম ভবনের বিজ্ঞানীদের হিসেব অনুযায়ী, স্থলভূমিতে আছড়ে পড়ার সময় ঘণ্টায় সর্বাধিক ২০০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বইতে পারে। 

আলিপুর আবহাওয়া দফতরের অধিকর্তা গণেশকুমার দাস জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতেই মারাত্মক হয়ে উঠেছে ফণী। বুধবার সন্ধ্যায় কলকাতা থেকে এক হাজার এবং দিঘা থেকে ৮০০ কিলোমিটার দূরে ছিল সে। পুরী থেকে তার দূরত্ব ছিল ৬১০ কিলোমিটার। ফণীর দাপটে শুক্রবার থেকেই কলকাতা-সহ গাঙ্গেয় বঙ্গে বৃষ্টি ও ঝড় শুরু হয়ে যাবে। তার দাপট বাড়তে পারে শনিবার।

‘এক্সট্রিমিলি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ ফণীর ছোবলের মোকাবিলায় পশ্চিমবঙ্গ-সহ সংশ্লিষ্ট সব রাজ্যেই প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। সতর্কতা হিসেবে ওড়িশা ও দক্ষিণ ভারতের প্রচুর ট্রেন বাতিল হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব রেল জানিয়েছে, বৃহস্পতি ও শুক্রবার হাওড়া থেকে করমণ্ডল, যশোবন্তপুর এক্সপ্রেস, যশোবন্তপুর দুরন্ত, চেন্নাই মেল, ইস্ট-কোস্ট, ফলকনুমা-সহ ১৭টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। প্রচুর ট্রেন বাতিল করেছে ইস্ট-কোস্ট রেল। সব মিলিয়ে বাতিল ট্রেনের সংখ্যা আশিরও বেশি। সাগরে নজরদারি বাড়িয়েছে উপকূলরক্ষী বাহিনী।

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ওড়িশা থেকে ফণী মুখ ঘুরিয়ে এ রাজ্যের দিকে আসবে। শক্তি কমলেও তার দাপটে কলকাতা-সহ রাজ্যের উপকূলীয় জেলাগুলিতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সে-কথা মাথায় রেখে আট ঘাট বেঁধে তৈরি হচ্ছে রাজ্য প্রশাসন। 

আয়লার পরে ফের আসন্ন ঘূর্ণিঝড় নিয়ে চিন্তায় কলকাতায় পুরকর্তারা। তাঁদের অনেকে বলছেন, কালবৈশাখী ঝড়েই তো দেদার গাছ পড়ে। জোরালো ঝড় হলে কী হবে, সেটাই ভাবনার। চিন্তা পুরনো ও লজ্‌ঝড়ে বাড়ি নিয়েও। পাম্পিং স্টেশনগুলি ঠিকঠাক আছে কি না, তা সরেজমিনে দেখে নিতে বলেছেন মেয়র। মজুত করা হয়েছে ত্রাণসামগ্রী। পুর কমিশনার খলিল আহমেদ জানান, ঝড়বৃষ্টির সময় ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। সতর্কতা জারি হয়েছে দিঘা, মন্দারমণির মতো উপকূলীয় পর্যটন কেন্দ্রে। সাগরে নামার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

বুধবার, ছুটির দিনেও পুরসভায় কর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন খলিল। পুরসভা সূত্রের খবর, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, নিকাশি, জল সরবরাহ, জঞ্জাল অপসারণ, আলো এবং পার্ক ও উদ্যান দফতরের কর্মীদের যন্ত্রপাতি, সাজসরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানান, এ দিন থেকেই সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে পুরভবনের কন্ট্রোল রুমকে।

ওড়িশা প্রশাসনের খবর, বিপদ আঁচ করে পুরী-সহ ওড়িশার বিভিন্ন পর্যটনস্থলে সতর্কতা জারি হয়েছে। এ দিনই পুরীর সমুদ্রে বিরাট বিরাট ঢেউ উঠতে শুরু করেছে। বিপর্যয় মোকাবিলায় নেমেছেন প্রশাসনের পদস্থ কর্তারা। ২০১৩ সালের অক্টোবরে গোপালপুরে আছড়ে পড়েছিল এমনই মারাত্মক প্রবল ঘূর্ণিঝড় পাইলিন। তবে সে-বার প্রাণহানি বেশি হয়নি। এ বারেও প্রাণহানি রুখতে বদ্ধপরিকর ওড়িশা প্রশাসন। ১৯৯৯ সালের সুপার সাইক্লোনের বিপর্যয়ের পর থেকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উন্নত পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে তারা।

পুরীর জেলাশাসক জ্যোতিপ্রকাশ দাস জানান, ফণীর দাপটে পুরীতে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। পুরীর সঙ্গে যোগাযোগও ব্যাহত হতে পারে সাময়িক ভাবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওড়িশার অতিরিক্ত মুখ্যসচিব সুরেশ মহাপাত্রের নেতৃত্বে ১১ জন আইএএস অফিসারকে পুরীতে পাঠানো হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের খবর, পূর্ব উপকূলে বায়ুসেনা ও নৌসেনাকেও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। উপকূলরক্ষী বাহিনী জানায়, জাহাজ ও বিমানে টহলদারির পাশাপাশি ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রাখছে তারা।

আজ, বৃহস্পতিবারের মধ্যে পুরীর সব হোটেল খালি করতে বলেছে প্রশাসন। পুরীর একটি হোটেলের কর্মচারী প্রহ্লাদ পণ্ডা জানান, শুক্রবার থেকে সব বুকিং বাতিল করা হয়েছে।

তবে শঙ্কায় ভুগতে রাজি নন পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের ম্যানেজিং ট্রাস্টির সদস্য রামচন্দ্র দয়িতাপতি। ‘‘পুরীতে জগন্নাথ আছেন। আমাদের বিশ্বাস, শেষ মুহূর্তে ঝড়ের মুখ ঘুরিয়ে তিনিই পুরীকে রক্ষা করবেন,’’ বলেন তিনি।