দুপুর থেকেই আকাশের আয়োজন গোলমেলে ঠেকছিল। বিকেল গড়ানোর আগেই শুরু হয়ে গেল ঘ্যানঘেনে বৃষ্টি, ঝিম ধরানো ছন্দে একটানা পড়েই চলেছে। মির্জা গালিব হয়ে ঘিঞ্জি মার্কেট স্ট্রিট, সেখান থেকে এঁকেবেঁকে, ভিড় ঠেলে তস্যগলি গোলতালাও স্ট্রিট। রমজানের সন্ধ্যায় কলকাতার এই অংশে রাস্তাগুলোকে দু’পাশ থেকে ঠেসে ধরে সার সার অস্থায়ী ছাউনি। নতুন জামাকাপড়ের সুবাস ওঠে, ভেসে আসে ইফতারি বন্দোবস্তের সুঘ্রাণও।

সেই মহল্লাতেই প্রিন্স লজের দোতলার একটা ঘরে তখন জোড়াখাটের এক্কেবারে প্রান্তে জড়োসড়ো হয়ে বসে রয়েছেন জামাল। এ বার তাঁর রমজান নেই, রোজা নেই, ইফতার নেই। আসন্ন উৎসব নিয়ে উচ্ছ্বাস নেই। একটা ট্রেন সফর হঠাৎ সাংঘাতিক ভাবে বদলে দিয়েছে জীবনটাকে। নিজের দেশ, নিজের মাটি বলে চিনতেন যে ভূখণ্ডকে, তা কতটা নিজের, জামাল বুঝতে পারছেন না এখন।

দেশে জন্মালেই হয় না, দেশের প্রধানমন্ত্রীকে চিনতে হয়, জাতীয় সঙ্গীত জানতে হয়, তবেই দেশ নিজের হয়— সম্প্রতি তুমুল মারধর এবং অকথ্য গালিগালাজের মাধ্যমে জামালকে এমনই ‘শিক্ষা’ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সে আতঙ্ক এখনও ঘিরে রয়েছে প্রত্যন্ত এক গ্রামের প্রায় নিরক্ষর তরুণকে।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী কে জানিস না! সপাটে চড়, গালি

হুস্‌ করে ২১ বছর পিছিয়ে যায় সময়। এমনই একটা বৃষ্টিভেজা দিন। তবে সন্ধে নয় সকাল। কলকাতা নয়, সুদূর মালদার ততোধিক প্রত্যন্ত কালিয়াচক, অখ্যাত গ্রাম শেরশাহি। সফিকুল, গোপাল, সিরাজ, চন্দন, আমিনা, মোস্তাফা— দোচালা ছাউনির প্রাইমারি স্কুলটার সামনে হাজির সবাই। জামালও রয়েছে, চোখের সামনে যেন নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে তার। হেডমাস্টার পতাকা তুলছেন, সবাই মিলে জোর গলায় বন্দে মাতরম বলছে। তার পরে হাতে পতাকা নিয়ে রাস্তায় মিছিল, ভারত দেশ, দেশাত্মবোধ, স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরব। ছোট্ট শরীরে অদ্ভুত শিহরণ খেলে যাচ্ছে।

দেখুন ভিডিও:

 

 

সব শেষে বাড়ি ফেরার আগে ‘জনগণমন’ গানটা গেয়েছিল সে দিন জামালরা। ওই গানটা রোজই গাইতে হত স্কুলে গিয়ে। ১৫ অগস্টের সকালের সঙ্গে বাকি দিনগুলোর ওই একটাই মিল। বাকি সবই নতুন লাগছিল ক্লাস ওয়ানের জামালের কাছে। কিন্তু সেই প্রথম, সেই শেষ। ক্লাস টুয়ে পৌঁছনোর আগেই স্কুলছুট। ঈষৎ ভারসাম্যহীন বাবা, সৎ মা আর তিন বৈমাত্রেয় ভাই-বোনকে নিয়ে যে টানাটানির সংসার, তাকে খানিক ঠেকনো দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। দুটাকা-তিনটাকা রোজে চায়ের দোকানে বা মিষ্টির দোকানে কাজ করা অথবা মাঠ থেকে ঘাস কেটে বোঝা বেঁধে গরু-ছাগলের খাবার হিসেবে বেচে আসা।

দেশটাকে ওই ভাবেই চিনতে শুরু করেছিল জামাল মোমিন ওরফে মনিরুল শেখ। স্কুলের বেঞ্চে বসে দেশ চেনার সুযোগ আর সে ভাবে হয়নি। ‘জনগণমন’ গানটার আসল নাম যে জাতীয় সঙ্গীত, তা আর জানা হয়ে ওঠেনি। প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রীর ফারাক বোঝা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সে সবের মাশুল যে হাওড়া থেকে মালদহগামী ট্রেনের সিটে বসে এমন ভয়ঙ্কর ভাবে দিতে হবে কোনও দিন, জামাল তা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি।

আরও পড়ুন: অভিযোগের আট দিন পরেও চিহ্নিত করা গেল না দোষীদের

কথা বলতে গিয়ে কান্না দলা পাকিয়ে আসে ২৭ বছরের যুবকের গলার কাছটায়। প্রিন্স লজের দোতলায় বসে জামাল ঢোঁক গিলে নেন, বিহ্বল চোখ নিয়ে বলেন, ‘‘ভিডিয়োতে আপনারা সবটা দেখতে পাননি। ভিডিয়ো পরে করেছে। তার আগেও মেরেছে, প্রচণ্ড মেরেছে। আমি কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছিলাম না, কান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।’’

দেখুন ভিডিও:

 

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এক মর্মান্তিক ভিডিয়োর দৌলতে কারও জানতে আর বাকি নেই, জনা চার-পাঁচ যুবক হাওড়া থেকে মালদহগামী ট্রেনে কী ভাবে হেনস্থা করেছে জামাল মোমিনকে। প্রধানমন্ত্রীর নাম বলতে না পারায় বা ‘জাতীয় সঙ্গীত’ গাইতে না পারায় কী ভাবে অকথ্য গালিগালাজ, অপমান এবং মারধর করা হয়েছে কালিয়াচকের তরুণকে, সে দৃশ্য হাতে হাতে ঘুরেছে।

জামাল মোমিন কিন্তু চেপে গিয়েছিলেন গোটা ঘটনাটা। দুঃস্বপ্ন বলেই ধরে নিয়েছিলেন। বাড়িতে বলেননি। বন্ধু-বান্ধব-পরিজন— কাউকে জানতে দেননি। পেটের টানে ঘর-পরিবার ছেড়ে সুদূর গুজরাতের অমদাবাদে থাকতে হয়। বছর পাঁচেকের মেয়েকে নিয়ে কালিয়াচকের গ্রামে সংসার আগলে বসে থাকেন স্ত্রী। দুমাসে বা তিন মাসে ফিরবে ‘ঘরের লোকটা’— পথ চেয়ে থাকা নিত্যসঙ্গী। চিন্তায়-দুশ্চিন্তায় দিন কাটে। তাই ট্রেনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বাড়িতে বলেননি জামাল।

‘‘ছানা-বাচ্চা নিয়ে একা থাকে, ভয় পেয়ে যাবে, কান্নাকাটি শুরু করে দেবে। আমি তাই কিছু বলিনি। ভোট দিয়ে গুজরাতে ফিরে গিয়েছিলাম।’’ বলেন জামাল। কিন্তু চাপা থাকেনি কোনও কথাই। বাড়ি থেকে জামালকে ফোন করে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছিল পরিবার। আর যাঁদের সঙ্গে কাজ করতেন জামাল, তাঁদের অনেকে হাসাহাসি শুরু করেছিলেন, খুব মজার একটা ঘটনা ঘটেছে যেন!

দেশ না বিদেশ, আপন না পর, ঠিক না ভুল— সব হিসেব গুলিয়ে গিয়েছে জামাল মোমিনের। কথা বলতে বলতে চোখ বার বার ঝাপসা হয়ে আসে তাঁর, গলা আটকে আসে। বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক অবশ্য জামালের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের উদ্যোগে থানায় এফআইআর হয়েছে। অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। গুজরাত থেকে জামালকে পাকাপাকি ভাবে ফিরিয়ে আনার বন্দোবস্ত হয়েছে। কলকাতার হোটেলে কয়েক দিনের থাকা-খাওয়া এবং চিকিৎসার ব্যবস্থাও মঞ্চই করছে। তবু দিশাহারা লাগে জামালের, অসহায় বোধ হয়। কোথাকার ছেলে, কোথায় গিয়েছিলেন, কোথায় এসে আক্রান্ত হলেন, কেন হলেন, কেনই বা ফিরে আসছেন— কিছুই যেন স্পষ্ট নয়। জীবন হঠাৎ অনির্দিষ্ট হয়ে পড়েছে যেন। সামনেটা কী রয়েছে অপেক্ষায়, জামালের কাছে স্পষ্ট নয়।

‘‘যে ভাবে ছড়িয়েছে ভিডিয়োটা, আর যা হইচই শুরু হয়েছে, তাতে এ বার গুজরাতে জামালের থাকাটা একটু ঝুঁকিরই হয়ে যায়। তাই মালদাতেই ওঁর একটা কাজের বন্দোবস্ত করেছি।’’ বলছিলেন বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের সামিরুল। পঞ্চায়েত ভোটের আগে জামাল ফিরেছিলেন কালিয়াচকে। ভোট পিছিয়ে যাওয়ায় কিছু দিন কলকাতায় কাজ করছিলেন। কলকাতা থেকে কালিয়াচক ফেরার পথেই হামলার মুখে পড়েছিলেন। মুখ বুঁজে বাড়ি ফেরেন, ভোট সেরে গুজরাতে ফিরে যান। কিন্তু বিহ্বল পরিবার-পরিজন-শুভানুধ্যায়ীদের দেখে নিজেও আর শক্ত থাকতে পারছেন না।

বৃষ্টিভেজা রমজানি সন্ধ্যায় কলকাতার লজে জামাল মোমিনের মুখোমুখি বসে থাকতে থাকতে চারপাশটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে, সব শব্দ-কথাবার্তা ফিকে হয়ে আসে, সব মুখ ম্লান হয়ে যায়। ক্ষয়াটে চেহারার বাঙালি তরুণকে ছাড়া আরও কাউকে যেন দেখা যায় না। আর সে তরুণের মুখের অবয়বটা যেন রেখায় রেখায় মিলে যেতে থাকে ১৬ বছর আগে গুজরাতের অমদাবাদে দেখা একটা তরুণ মুখের সঙ্গে— জোড়হাত, ঝাপসা চোখ, মুখমণ্ডলে বাঁচার আকুতি— কুতুবুদ্দিন আনসারি।

আশ্চর্য অমিল জামাল আর কুতুবুদ্দিনের মধ্যে। বিস্তর মিলও।

দাঙ্গার দাগ লেগেছিল যে গুজরাতের গায়ে, কুতুবুদ্দিন সেই গুজরাতের। ভয়ঙ্কর দিনগুলোতে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল এই বাংলা।

আর আট বছর আগে কাজের খোঁজে এই বাংলা থেকেই গুজরাতে গিয়েছিলেন জামাল। সেখানে কখনও সাম্প্রদায়িক বিষের শিকার হননি। শিকার হলেন এই বাংলায় ফিরে।

২০০২-এর দাঙ্গার পরে নিজের রাজ্য, নিজের শহর ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন কুতুবুদ্দিন আনসারি। কিন্তু মাটির টানে আবার ফিরে গিয়েছেন অমদাবাদের নিম্নবিত্ত মহল্লা সোনি কি চালিতে।

২০১৮-এ নিজের রাজ্যে আক্রান্ত হলেন জামাল, আক্রান্ত হলেন সাম্প্রদায়িক বিষেই। গুজরাতে চলে গেলেন চুপচাপ। কিন্তু অচিরেই ফিরে এলেন নিজের মাটিতে।

কুতুবুদ্দিনের পাশে দাঁড়িয়েছিল কলকাতা, জামালের ক্ষেত্রেও তাই হল। ১৬ বছর কাটিয়ে এসেও কুতুব বলেন, ‘‘সে দিন কলকাতা আমাকে বুকে টেনে না নিলে আমি আজ স্বাভাবিক জীবনে থাকবে পারতাম না, ভুল পথে চলে যেতাম হয়তো।’’ জামাল তেমন কিছু বলছেন না। কারণ বলার অবস্থাতেই নেই তিনি।