বাড়ির কাছে গরুমারা জঙ্গল। স্কুল যাওয়ার পথে প্রায় প্রতিদিন মুখোমুখি হতে হয় বন্যজন্তুদের। ৭ কিলোমিটার রাস্তা পার করা একপ্রকার যুদ্ধই। তবে এই মেয়ে স্বপ্ন দেখেছে বড় কিছুর। এমন ছোট ছোট যুদ্ধ করেই চলছে সে। কাঁধে গুরুদায়িত্ব। গ্রাম থেকে সে-ই প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী!
জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি ব্লকের বুধুরাম বনবস্তির কোনও বাসিন্দা মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোননি। পেশা মূলত কষিকাজ। তা ছাড়াও চা-বাগানের শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন অনেকে। সেই গাঁয়ের মেয়ে সুমিলা এ বার মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গ্রামবাসীরা বলছেন, এখনই ‘ইতিহাস সৃষ্টি’ করেছে মেয়ে। এর আগে সেই গ্রামের কেউ দশম শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষাও উতরেছেন কি না, সন্দেহ!
২০১১ সালের রিপোর্ট বলছে, জলপাইগুড়ি জেলায় সাক্ষরতার হার ৭৩.২৫ শতাংশ। মহিলাদের সাক্ষরতার হার ৬৫.৭৮ এবং পুরুষদের হার ৮০.৫৭ শতাংশ। কিন্তু জ্ঞানের আলো এই জঙ্গলঘেরা গ্রামে প্রবেশাধিকার পায়নি। গ্রামের প্রায় সকলেই স্কুলছুট। তার পর জীবন সংগ্রাম।
ময়নাগুড়ি ব্লকের রামশাইয়ের প্রত্যন্ত গ্রাম বুধুরাম বনবস্তিতে পৌঁছোতে হয় জঙ্গলের ভিতর দিয়ে দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে। দিনের বেলাতেই সেখানে ঢুকতে গা ছমছম করবে বাইরের কারও। রয়েছে বণ্যপ্রাণীর আতঙ্ক। এমন প্রাকৃতিক পরিবেশ, আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া গ্রামের কাছে পড়াশোনা মানে বিলাসিতা। এই জেলায় ২০২৫ সাল পর্যন্ত কেউ মাধ্যমিক পরীক্ষাতেই বসেননি। তাই সুমিলাকে ঘিরে গোটা গ্রাম উচ্ছ্বসিত আবার কৌতূহলীও।
সুমিলা পড়াশোনা করে পানবাড়ি ভবানী হাই স্কুলে। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ৭ কিলোমিটার। কিন্তু দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে যেতে দূরত্ব বড্ড বেশি মনে হয়। রাজ্য সরকারের দেওয়া সবুজসাথীর সাইকেল সে জন্য বড় ভরসা সুমিলার। সকালে স্কুল। তার পর টিউশন। ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যায়। যাতায়াতের পথে ‘দেখা হয়’ হাতি, গন্ডার, বাইসনের সঙ্গে। আগে ভয় পেত কিশোরী। এখনও পায়। তবে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। এটাই মেয়ের রোজনামচা।
সুমিলার বাবা মঞ্চাল ওরাওঁ কাজের সূত্রে বাইরে থাকেন। মা রূপালি ওরাওঁ কৃষিকাজ করেন। কিন্তু তাতে কুলিয়ে ওঠে না সাত জনের সংসার। তাই চা-বাগানেও কাজ করতে হয় রূপালিকে। অনটন যে পরিবারের নিত্যসঙ্গী, সেই বাড়ির কর্তা-গিন্নি গ্রামের অন্যদের চেয়ে ‘অন্যরকম’ কিছু ভেবেছেন। তাঁরা তাঁদের চার কন্যাসন্তানকেই শিক্ষিত করতে চান। অনেক দূর পড়াতে চান চার বোনকে। সেই সহোদরাদের মধ্যে প্রথম প্রতিনিধি সুমিলার হাতেখড়ি হয়েছিল এলাকার একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বর্তমানে পানবাড়ি ভবানী হাই স্কুলের ছাত্রীটি একবুক স্বপ্ন নিয়ে সমস্ত প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। গাঁয়ের মেয়ে সুমিলা চায় নার্স হতে। না, বাইরে কোথাও চাকরি করবে না সে। ইচ্ছা, বনবস্তির মানুষকে পরিষেবা দেবে। তাই পড়াশোনা তাকে চালিয়ে যেতেই হবে। কিশোরীর কথায়, ‘‘আমাকে পড়াশোনা করতেই হবে। বাবা-মা আমাদের জন্য এত পরিশ্রম করছে। আমি নার্স হতে চাই। গ্রামের পরবর্তী প্রজন্মকে পড়াশোনার দিকে এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে। সে কাজও করব।’’
রূপালি বলেন, ‘‘যত দূর সামর্থ্য রয়েছে, মেয়েকে পড়াতে চাই। এই এলাকার রাস্তাঘাট খারাপ, পানীয় জলের অভাব। বন্যপশুর আতঙ্ক। নানা সমস্যায় কেউ বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেনি। কিন্তু এখন তো আর আগের যুগ নেই যে পড়াশোনা না করে এমনি থাকবে। মেয়ের পড়াশোনা করে বড় হবে, ওদের সুনাম হবে, এটাই চাওয়া।’’
আরও পড়ুন:
হবু মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীকে উৎসাহের অন্ত নেই প্রতিবেশীদের। সুমিলা বাড়ি ফেরা না পর্যন্ত মা যেমন প্রহর গোনেন, তেমনই গ্রামের মেয়ের জন্য জেগে থাকে এলাকা৷ নিজের কন্যাসন্তান কোলে নিয়ে রুকমি ওরাওঁ বলেন, ‘‘আমাদের গ্রামের প্রথম মেয়ে মাধ্যমিক দেবে! অনেক বাধা-বিপত্তিতে আমাদের কারও পড়াশোনা হয়নি। ও করে দেখাচ্ছে। ও আমাদের সন্তানকেও পথ দেখাবে।’’
সমস্ত প্রতিকূলতাকে ঠেলে বনবস্তির মেয়ে সফল হবে, এই আশায় গোটা গ্রাম। ময়নাগুড়ি ব্লকের বিডিও প্রসেনজিৎ কুন্ডু বলেন, ‘‘প্রত্যেক বছর আমরা পরীক্ষার্থীদের জন্য সবরকম ব্যবস্থা করি। প্রয়োজনীয় বাস, বন দফতরের টহলদারি— সবটাই থাকে। সুমিলার যাতে কোনও সমস্যা না-হয় সে দিকে অবশ্যই নজর থাকবে৷’’
আগামী ২ ফেব্রুয়ারি থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা। হাতে আর সপ্তাহ দুয়েক। এখন ‘রিভিশন’ দিচ্ছে সুমিলা।