ফাগুনের শুরুতেই বসন্ত উধাও! দরজায় কড়া নাড়ছে গ্রীষ্ম। পারদ ছুঁয়ে ফেলল ৩৬ ডিগ্রি। তারপরে হঠাৎ বৃষ্টি। টানা ৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিতে তাপমাত্রা নেমে এল স্বাভাবিকের অনেক নীচে।

আবহাওয়ার এমন খামখেয়ালিপনা দেখে বিজ্ঞানীরা কিন্তু মোটেই তাজ্জব বনে যাচ্ছেন না। তাঁদের বক্তব্য, সবটাই বিশ্বজুড়ে উষ্ণায়নের ফল। একটু একটু করেই ক্রমশ ভোল বদলাচ্ছে আবহাওয়া। এবং ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন এমন ঘটনার সাক্ষী থাকবে বঙ্গবাসী। আর তাতে সব চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি।

হাতে গরম উদাহরণ রয়েছে। মাঠের গম ছাড়া রবিশস্যের অন্যান্য ফসল ঘরে তুলেছে চাষিরা। অন্য বছরে বিঘা প্রতি দুই কুইন্টাল সর্ষে উৎপাদন হলেও, এ বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে এক কুইন্টালেরও নীচে। মসুর ডালের ফলনও কম। হোগলবেড়িয়ার ধনারপাড়ার প্রান্তিক চাষি জাব্বার মণ্ডল জানাচ্ছেন, দু’বিঘা জমিতে দেড় কুইন্টাল সর্ষে হয়েছে। অথচ গত বছর একই জমিতে প্রায় পাঁচ কুইন্টাল ফলন হয়েছিল। চাষিদের শেষ আশা ছিল গম। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে আচমকা গমের শিস পাকতে শুরু করায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন নদিয়া ও মুর্শিদাবাদের চাষিরা। একই কথা জানান ‘ধনারপাড়া ফার্মারস ক্লাব’-এর সদস্য দিলীপ সরকার বা রফিকুল বিশ্বাস। তাঁদের কথায়, “রাসায়নিক ওষুধ দিয়েও লাভ হচ্ছে না।”

ডোমকল, বেলডাঙ্গা, লালবাগ-সহ গোটা মুর্শিদাবাদেই গমের ফলন নিয়ে চিন্তিত চাষিরা। আলে দাড়িয়ে লম্বা শীষ দেখে খুশি হয়েছিলেন ডোমকলের কুপিলার জালালুদ্দিন বিশ্বাস। মনে মনে ভেবে ছিলেন এ বছর আর আটা কিনতে হবে না বাজার থেকে। কিন্তু শীষে হাত লাগাতেই কপালে ভাঁজ পড়ল তাঁর। ভেঙে দেখেন দানাপুষ্টি বলতে কিছুই হয়নি। রানিনগর ও লালবাগ ব্লকের সহ-কৃষিঅধিকর্তা মিঠুন সাহা বলেন, ‘‘আমাদের কাছে এসে চাষিরা বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইছে। কিন্তু আমরাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। কৃষি দফতর বলছে, রাত ও দিনের আবহাওয়ার তারতম্য মূলত দায়ী এই অবস্থার জন্য। তা ছাড়া দিনের বেলা অতি গরমের ফলেও এমনটা হয়েছে। আর অকাল বৃষ্টিও কিছুটা দায়ি এই অবস্থার জন্য।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আবহাওয়ার এই পরিবর্তন দু’ধরনের। তাৎক্ষণিক ও ধারাবাহিক। তেমনই, এর ফলে কৃষিতেও দু’রকম প্রভাব পড়ছে। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী শাওন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘আবহাওয়ার ধারাবাহিক পরিবর্তনের ফলে আচমকা কিছু বদল ঘটছে। এ বার যেমন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ছ’ডিগ্রি বেশি হয়ে গিয়েছিল। যে কোনও সময় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে পাঁচ ডিগ্রি বেশি থাকলেই তাকে চাষের পক্ষে প্রতিকূল বলে ধরা হয়।’’ তার পরে হঠাৎই এল বৃষ্টি। ‘‘এ সময় এত বৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। এতে বিপদ আরওই বেড়েছে। যে ফলনটুকু হয়েছে, তা-ও পচে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে,’’ বলছেন শাওনবাবু।

বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা, যে কোনও ফসল, সে সব্জি বা খাদ্যশস্য কিংবা তৈলবীজ— প্রত্যেকেরই চাষের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। শীত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেলে শীতের সব্জির আকার ছোট হয়ে যাবে। ফলন অতিরিক্ত মাত্রায় কমে যাবে। সময়ের অনেক আগেই গাছে ফল ধরা বন্ধ হয়ে যাবে।

এটা যদি তাৎক্ষণিক সমস্যা হয়, আবহাওয়ার ধারাবাহিক পরিবর্তন আরও ভয়ঙ্কর। শাওনবাবুর মতে, জলবায়ুর ধারাবাহিক পরিবর্তনে যেমন বদলে যাচ্ছে ঋতু-চরিত্র, তেমনই কৃষি-মরসুমের উপরও তার প্রভাব মারাত্মক। রবি, বোরো বা খরিপ সব মরসুমের চাষের তো নির্দিষ্ট একটা সময়সীমা থাকে। উষ্ণায়নের ফলে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি মরসুমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্বাভাবিক ভাবে যে সময় বর্ষা শুরু হওয়ার কথা অনেক সময় তা হচ্ছে না। অথবা সময়ে শুরু হয়ে মাঝে তা হারিয়ে যাচ্ছে। আবার যে সময় তার বিদায় নেওয়ার কথা, তখন সে বিদায় নিচ্ছে না। ধান রোয়ার সময় যে বৃষ্টির দরকার, তখন তা হচ্ছে না। আবার ধান কাটার সময়ে বৃষ্টি পাকা ধানে মই দিয়ে চলে যাচ্ছে। এর পর আবার শীতের চাষ শুরু করতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। শীত আবার ক্ষণিকের অতিথি। ফলে সব মিলিয়ে ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে চাষের মরসুম।

তা হলে উপায়? কী বলছেন কৃষি-বিজ্ঞানীরা? বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক অসিত চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘শীত-গ্রীষ্ম-বসন্ত গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসল ঋতু হল বর্ষা। বর্ষা যদি ঠিক সময়ে আসে এবং বিদায় নেয়, তা হলেই জলবায়ু চাঙ্গা হবে।’’ কিন্তু, পরিবেশ নিয়ে মানুষ সচেতন না হলে সর্বনাশ ঠেকানো যাবে না, জানাচ্ছেন তিনি।

কারণ, শীত চটজলদি শেষ হয়ে গেলেও চেনা চাষাবাদের কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না। ফলে, সেচের জন্য মাটির নীচের থেকে আরও বেশি জল উঠবে। তাতে ভূগর্ভস্থ জলস্তর আরও নেমে যাবে। সমস্যা আরও বাড়বে।

কৃষি-বিজ্ঞানীদের মতে, শস্য-পর্যায়ের পরিবর্তন করা দরকার। এক জমিতে একই ধরনের চাষ বারবার না করে, তার পরিবর্তন করা। মাঝে অল্প সময়ের কোনও ফসলের চাষ করা। বর্ষা দেরি করে বিদায় নিলে ‘লেট ভ্যারাইটি’ জাতের ফসলের দিকে ঝোঁকা। আবার স্বল্পকালীন জাতের কিছু ফসল রয়েছে, চাষিদের সে সব চাষের দিকেও ঝুঁকতে হবে।

এ ছাড়া, অতিরিক্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে এমন কিছু বীজ তৈরি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। অসিতবাবুরা মনে করছেন এগুলি কোনওটাই পাকাপাকি সমাধান নয়। জলবায়ু যে ভাবে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তার সঙ্গে যুঝে ওঠার মতো অস্ত্র এই মুহূর্তে কৃষি বিজ্ঞানীদের ভাঁড়ারে নেই।