ওই পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির চেহারাটা দেখলে কারও মাথায় আসত না, ছেলেটা কী করে হিরো হতে পারে! দেখতে শুনতেও আহামরি নয়। বরং বলিউডের পরিভাষায় নায়কোচিত চেহারা বলতে যা বোঝায়, তার পুরো উল্টো। ইন্ডাস্ট্রিতে মামা-কাকাও নেই। অথচ সেই ছেলেটাই ২৫ বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রি শাসন করে গেল! বাদশা বোধহয় এ ভাবেই রাজপাট চালায়।
তিন-খানের ডায়নেস্টি টপকানোর মতো ধক এখনও পর্যন্ত আগামী প্রজন্মের কারও মধ্যে দেখা যায়নি। আর গেলেই বা কী! নেক্সট জেনের প্রায় সকলেই তো ইন্ডাস্ট্রির লতায়পাতায়। আমির-সলমন দু’জনের বলিউডে বড় খুঁটি ছিল। অমিতাভ বচ্চনকে বাদ দিলে শাহরুখ খান একমাত্র ব্যক্তিত্ব  ইন্ডাস্ট্রিতে যাঁর খুঁটির জোর ছিল না। তালিকায় অক্ষয়কুমারও আছেন। কিন্তু ‘অরা’ বলতে যা বোঝায় তাতে অক্ষয় পিছিয়েই। আমির বা সলমনকে মাথায় রেখেও বলা যায়, শাহরুখের মতো ফেনোমেনা দুর্লভ।
শাহরুখ যে ২৫ বছর ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখলেন, তার পিছনের রহস্যটা কী? পরপর হিট? তাও নয়। অন্যদের তুলনায় তাঁর ফ্লপের তালিকা বোধহয় বেশিই। দুমদাম ঝুঁকি নিয়েছেন। কেরিয়ারের উঠতি সময়ে কেউ খলনায়ক হতে রাজি হন না। শাহরুখ নির্দ্বিধায় ‘বাজিগর’, ‘ডর’ করেছেন। তিনি একটি মেয়েকে ছাদ থেকে ফেলে দিচ্ছেন তাও ভক্তরা তাঁকে ঘেন্না করতে পারছে না। ভিলেনের মৃত্যুতে লক্ষ লক্ষ তরুণী চোখের জল ফেলেছে। এটাই শাহরুখের ক্যারিশমা। আসলে শাহরুখকে নির্দিষ্ট পরিধিতে মাপা মুশকিল। দাগিয়ে দেওয়া যাবে না এই এই কারণে তিনি জনপ্রিয়। সিনেমায় আসার আগেই বিয়ে করেছেন। তাও কম পড়েনি মহিলা-ভক্ত সংখ্যায়। 
 
 

Eve of the birthday! @iamsrk #alibaugdiaries

A post shared by Karan Johar (@karanjohar) on

শাহরুখের অভিনয় ক্ষমতা নিয়ে বহু বার প্রশ্ন উঠেছে। ‘‘ওভার অ্যাক্টিং করাটা কিন্তু মুশকিল। সারাক্ষণ এনার্জি লেভেলকে একটা উচ্চতায় রাখতে হয়। স্বাভাবিক অভিনয়টাই বরং সোজা,’’ প্রশ্নকর্তাদের উদ্দেশে বাদশার জবাব। ভুলে গেলে চলবে না, ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার এই ছাত্রই কিন্তু মণি কৌল, কুন্দন শাহের ছবিতে কাজ করেছেন। শাহরুখ-সমসাময়িক আর কোনও মেনস্ট্রিম হিরোর বায়োডেটায় কি এমন উদাহরণ আছে? ক্রমাগত ভাঙচুর করে চলেছেন নিজেকে। ‘ডিয়ার জিন্দেগি’তে অবলীলায় সেকেন্ড লিড হয়েছেন। আনন্দ এল রাইয়ের ছবিতে বামন চরিত্র করছেন। 
শাহরুখের স্মার্টনেস তাঁর জনপ্রিয়তার একটা কারণ। তাঁকে যা খুশি প্রশ্ন করা যায়। চূড়ান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্নেও তিনি হাসতে হাসতে জবাব দিতে পারেন। ইন্ডাস্ট্রির ক’জন তারকাকে যৌন পছন্দ নিয়ে প্রশ্ন করা যায়! গেলেও ঘাড়ধাক্কা ছাড়া আর কিছু কি মিলবে? শাহরুখই একমাত্র তাঁর সেন্স অব হিউমর দিয়ে বলতে পারেন, ‘‘আই অ্যাম ট্রাইসেক্সুয়াল।’’ অসহিষ্ণুতা বিতর্কের কথা ভাবুন। সমালোচনায় জর্জরিত হয়েও একাধিক বার সেই প্রসঙ্গে স্পষ্ট কথা বলেছেন। ‘ধর্ষণ’ বিতর্কের পর সলমনকে মন্তব্যের জন্য পাওয়া যায়নি। সেলিম খান ছেলের হয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন। অমিতাভ বা আমিরের মতো তারকাও অত্যন্ত সাবধানী। 
শাহরুখের ধাতে বোধহয় সাবধান হওয়া নেই। নিজেকে নিয়ে মজা করতে পারেন। হাসতে হাসতে কঠিন সত্যিটা বলতে পারেন। যে কারণে তিনি মিডিয়ার নয়নের মণি। সাংবাদিক সম্মেলনে চার ঘণ্টা দেরিতে এলেও, সকলে জানেন শাহরুখ মুখ খোলা মানে পরতায় পুষিয়ে দিয়ে উপরি... রাত ২টোয় সাক্ষাৎকার দিতে বসলে সেই সাংবাদিক যাতে ঠিক মতো বাড়ি পৌঁছতে পারেন, সেই খেয়ালটাও রাখেন। 
যেমনটা নিজের পরিবারের রাখেন। যেমনটা রেড চিলিজের কর্মীদের। রেড চিলিজের সহকর্মীরা তাঁকে ‘শাহ স্যার’ নামে ডেকে থাকেন। যথার্থ নামকরণ। দিল্লির মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসে একটা ছেলে যে এ ভাবে সাম্রাজ্য বিস্তার করবে, সেটা ক’জন ভেবেছিলেন? লম্বা সিঁড়ি ভাঙতে হয়েছে তাঁকে। সাহায্যের জন্য পরিবার নামক ‘লিফট’ ছিল না। 
স্টারডম আয়ত্ত করতে হয়েছে। অনায়াসে কিছুই আসেনি। তাই প্রত্যেক বছর জন্মদিনে ভক্তদের উদ্দেশে হাত নাড়তে থাকা ওই ব্যক্তি জানেন, সব কিছু একদিন ফুরিয়ে যেতে পারে। 
সেই সত্যিটা মেনে নিয়েই শাহরুখ অকপটে বলতে পারেন, ‘‘স্টারডম উপভোগ করছি। যে দিন তা চলে যাবে, হাসিমুখে মেনে নেব। কিন্তু কী করে হাসব সেটা ভেবেই ভেতরে ভেতরে ভয় লাগে।’’