সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সাহিত্যের মতো সংগীত ছিল তাঁর প্রাণ

উপন্যাস লেখার কায়দাকানুন অনেকটাই আত্মস্থ করেন ধ্রুপদী আসরে গান শুনে! সাহিত্যিক বিমল মিত্রের এমন অসংখ্য অজানা কাহিনি শোনাচ্ছেন কন্যা শকুন্তলা বসু

Bimal Mitra

সন্ধেবেলা। আচমকা বেজে উঠল টেলিফোনটা। বাবা ধরলেন। ওপার থেকে ভেসে এল নারীকণ্ঠ, ‘‘হ্যালো, বিমল মিত্র আছেন?’’

‘‘বলছি,’’ মহিলা নিজের নাম বললেন। শুনে বাবা বললেন, ‘‘আচ্ছা। বলুন, কী ব্যাপার?’’

‘‘আমি আপনার একজন গুণমুগ্ধ পাঠিকা। কিছু বই নিয়ে আলোচনা করতে আপনার বাড়ি যেতে চাই।’’ এ বার আঁতকে উঠলেন বাবা, ‘‘দয়া করে আসবেন না। আপনি এলে বাড়িতে পুলিশ আসবে। লোকজন চড়াও হবে। হামলাও করতে পারে। তার চেয়ে আমিই আপনার কাছে চলে যাব ’খন।’’

এর পর ঠিক কী হয়েছিল, আজ আর মনে নেই। কিন্তু ফোনটা যিনি করেছিলেন, তিনি যে তত দিনে চলচ্চিত্র জগতের এক মহাতারা হয়ে জ্বলজ্বল করছেন, তা নিশ্চিত করেই বলতে পারি। নারীকণ্ঠটি ছিল সুচিত্রা সেনের! সময়টা সত্তরের দশক।

সুচিত্রা সেন তো তাও ফোন করে আসতে চেয়েছিলেন, ফোনের ধার ধারেননি উত্তমকুমার। আমাদের বাড়িতে তাঁর আসা একেবারে হঠাৎই। ভাগ্যিস লোকজন টের পায়নি! বাড়িতে এসে বাবার মুখোমুখি হয়ে দু’-চার কথার পরই ওঁর প্রস্তাব, ‘‘আপনার ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ নিয়ে ছবি করতে চাই।’’

জবাবে বিনীত স্বরে বাবা বলেছিলেন, ‘‘আপনি সিনেমা করলে সবাই ওটাই দেখবে। আমার বই আর কেউ পড়বে না। তাই এখন না, কিছু দিন পরে না হয় করবেন।’’

ভাবুন, উত্তমকুমার বাড়ি বয়ে এসে কোনও কাহিনিকারের গল্প নিয়ে সিনেমা করার কথা বলছেন। আর সাহিত্যিক কিনা তাঁর প্রস্তাব উড়িয়েই দিচ্ছেন!

‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ অবশ্য সিনেমা হয়েছিল। তখন উত্তমকুমার আর ইহজগতেই নেই। তবে ’৭২ সালে বাবার লেখা নিয়ে যখন ‘স্ত্রী’ হল, সেখানে উনি তো ছিলেনই, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন।

সুচিত্রা সেনের ‘টেলিফোন গল্প’টার মতো বাবার জীবনে এমন কাহিনি আরও আছে। ‘সাহেব বিবি গোলাম’। মুম্বইয়ের এক বিখ্যাত অভিনেতার কী ভাবে যেন নজরে এসে গেল বাবার এই বিখ্যাত উপন্যাসটি। কলকাতায় সেক্রেটারি মারফত তিনি খবর দিলেন, বাবা যেন একবারটি মুম্বই যান। কিছু কথা আছে। শুনে সেক্রেটারিমশাইকে ফোনেই বাবা সটান বলে বসলেন, ‘‘ওঁর দরকার, উনি আসবেন। আমি যেতে পারব না।’’ কাহিনিকারের প্রতিক্রিয়ার খবর গেল সেই ‘তারকা’ অভিনেতার কাছে। ফের একটা ফোন। বাবার কাছে।

প্রাথমিক সম্ভাষণ শেষে বাবা বললেন, ‘‘হুম, বলুন কী বলতে চান!’’ ঝরঝরে বাংলায় জবাব এল, ‘‘শরীরটা বড্ড খারাপ, যদি দয়া করে বম্বে আসেন।’’ ফোন রেখে বাবা বললেন, ‘‘ওঁর গলায় কী যেন একটা রয়েছে। আমি ‘না’ করতে পারলাম না। বম্বে যাব।’’

এ বারের কণ্ঠটি ছিল গুরু দত্তের। বাবা মুম্বই গেলেন। উঠলেন গুরু দত্তেরই পালি হিলের বাড়িতে। সেই প্রথম আলাপ। আলাপ গড়িয়ে শেষে তুমুল বন্ধুতা। দিনে দিনে তার গভীরতা বাবাকে কতটা ছুঁয়েছিল, পরে বুঝতে পারি।

খবর এল গুরু দত্ত আত্মহত্যা করেছেন, তখন বাবা যে কী প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলেন! বারবার বলতেন, ‘‘ও পারে গিয়ে না হয় কথা হবে আমার বন্ধুর সঙ্গে।’’

বাবা পরলোকে বিশ্বাসী। ঘোর আস্তিক। ২৯/১/১ চেতলা সেন্ট্রাল রোডে তিন তলার যে লালবাড়িটা বাবা কিনেছিলেন, তার কাছেই কেওড়াতলা মহাশ্মশান। কে জানে সেখানেও বাবার ওই পরলোক-চিন্তাটা কাজ করেছিল কিনা!

কিন্তু শ্মশান পারে বাড়ি হলে যা হয়, খুব অস্বস্তি হত আমাদের। বিশেষ করে আমার আর ভাইয়ের। কেবলই ভেসে আসে ডাক, ‘বলো হরি, হরি বোল...’ দিনে তাও এক রকম, রাতে অমন চিৎকার শিরশিরানি ভাব ধরাত শরীরে। একদিন বললাম বাবাকে, ‘‘এমন জায়গায় আর থাকব না।’’

(দাঁড়িয়ে বাঁ দিক থেকে) রমাপদ চৌধুরী, বিমল মিত্র, সাগরময় ঘোষ, মন্মথনাথ সান্যাল, সুবোধ ঘোষ, (বসে বাঁ দিক থেকে) নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুশীল রায়, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়। ছবি: বিবেক দাস

শুনে খানিক চুপ করে বসে রইলেন বাবা। তার পর শান্ত ভাবে বললেন, ‘‘অমন করে বলে না, সব সময় জানবে, ওই একটা জায়গাতে আমাদের সবার জীবনের শেষ। এই স্থানটি অবজ্ঞা করার নয়।’’

জীবন বাবাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তার সঙ্গে ছিল ওঁর মন। দুইয়ে মিলেই বাবার যত লেখালেখি। সাহিত্যের জন্য বাবা  যে কী করতেন!

একবারের কথা বলি। আমরা রাজস্থান গিয়েছি। বেড়াতে। জয়পুর, যোধপুর... সেখানেও বাবাকে দেখতাম, কী ভাবে পথচলতি লোকজন, রকে বসে থাকা প্রবীণ, এমনকী দোকানদারের সঙ্গেও সেই এলাকা, সেখানকার মানুষজন, তাদের স্বভাব-অভাব নিয়ে কথা বলেই চলেছেন।

বাবার গানের গলাটাও ছিল ভারী মিষ্টি। ওঁর গানের রেকর্ডও আছে। বন্ধুরা তাঁর গানের কথা জানতেন। এ নিয়ে বাবার কলেজবেলার একটা ঘটনা বলি। 

তখন তিনি বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র। কলেজে গানের কম্পিটিশন। এ দিকে বাবা কিছুতেই গান গাইবেন না। বন্ধুরাও বাবাকে ছাড়বেন না। গাইতেই হবে। কিছুক্ষণ পরে ওঁরা বুঝলেন, বিমলকে বেশি বুঝিয়ে লাভ নেই। তখন অন্য ফন্দি আঁটলেন সবাই। হঠাৎ মাইকে ঘোষণা হয়ে গেল, ‘‘এ বার সঙ্গীত পরিবেশন করবেন বিমল মিত্র।’’ আর তো উপায় নেই এড়ানোর। ছুটে পালিয়ে যাওয়াটাও লোক হাসানো হয়ে যাবে। ফলে থতমত খেয়ে লাজুক স্বভাবের বাবা খানিক নিমরাজি হয়েই মঞ্চে উঠলেন। গান করলেন। ফলাফল বেরোবার সময় দেখা গেল, বাবাই প্রথম হয়েছেন।

এই ঘটনার কিছু কাল বাদের কথা। শঙ্কর ঘোষ লেনের মুখে বাস থেকে সবে নেমেছেন বাবা।

হঠাৎ পিছন থেকে ডাক, ‘‘একটু শুনবেন?’’ ঘাড় ঘোরালেন বাবা। একটি ছেলে। মুখ চেনা। কলেজে তাঁর এক ক্লাস সিনিয়র। থলথলে গড়ন। গায়ের রং দুধে-আলতা। সোনালি মুগা রঙা জামা। জরি পাড়ওয়ালা চুনোট করা ধুতি। হরিণ-চামড়ার চটি। হিরের আংটি।

এ ছেলে আবার আমায় ডাকে কেন! মনে মনে ভাবলেন বাবা।

ছেলেটি এগিয়ে এসে বলল, ‘‘কলেজের বাংলার শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র ঘোষ দেখা করতে চান আপনার সঙ্গে। একবার আসবেন আমাদের বা়ড়ি? কাছেই। কলেজের পাশে ব্রাহ্ম মন্দিরের উলটো দিকে।’’ হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটির পরিচয় পাওয়া গেল। নাম, সতু লাহা। বিখ্যাত ধনি পরিবার লাহা বংশের ছেলে। ওর সঙ্গে লাহাবাড়ি গেলেন বাবা। বাড়ি ঢুকে মাথা ঘুরে যাওয়ার দাখিল। বাড়ি তো নয়, প্রাসাদ! দারোয়ান, আস্তাবল, বারমহল, অন্দরমহল, ঠাকুরদালান, নাচঘর! 

বসার ঘরে পূর্ণচন্দ্রবাবু। বাবা সে ঘরে গিয়ে দাঁড়াতে, উনি বসতে বললেন। তার পরই গান গাওয়ার অনুরোধ। ভয়ে ভয়ে গান ধরলেন বাবা। পরে শুনেছি, সে দিনের সেই ঘরদালান, পরিবেশ, মানুষজনকে দেখেশুনেই ‘সাহেব বিবি গোলাম’ উপন্যাসের প্লটটা মনে মনে এঁকে ফেলেছিলেন বাবা।

বাবার উপন্যাস লেখা আয়ত্ত করার ব্যাপারটাও বেশ অদ্ভুত। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল। উস্তাদ আবদুল করিম খান এসেছেন গাইতে। শ্রোতার আসনে বাবা। গান শুরু করলেন উস্তাদ। রাগ ভৈরবী। ‘যমুনা কে তীর...’ তিন-চার ঘণ্টা ধরে একই কথা অসংখ্যবার। সুরের আরোহণ, অবরোহণ শুনতে শুনতে মনে হল, ‘‘এ গান নয়, যেন কোনও এপিক উপন্যাস পড়ছি।’’

মনে পড়ে গিয়েছিল, কিছু দিন আগে বন্ধুর কাছ থেকে আনা ‘এ টেল অফ টু সিটিজ’-এর কথা। বাবার লেখকজীবনে এই উপন্যাসটি বিশেষ প্রভাব ফেলে। কিছু দিন পরে শুনলেন উস্তাদ ফৈয়াজ খানের পরিবেশনা। তিনি শোনালেন, ‘ঝন ঝন ঝন ঝন পায়েল বাজে’। পরে বাবা লিখেছিলেন, ‘গ্রহণ ও বর্জনের সমন্বয়’। সাহিত্য তথা শিল্প সৃষ্টির এই সার কথাটুকুর হদিশ উনি পেয়েছিলেন ওই দুই আসর থেকেই। একলব্যের মতো তখনই এই দুই উস্তাদের কাছে সাহিত্যিক জীবনের নাড়া বাঁধেন তিনি।

তবে এমন সঙ্গীতপ্রীতি বাবাকে মাঝেসাঝে বিড়ম্বনার মুখেও ফেলেছে। সেও বাবার মুখ থেকেই শোনা। যৌবনের কথা। প্রায় দিনই বাবা বাড়ি ফেরেন ভোর রাতে। কেন? সৌজন্যে দুই বন্ধু, অনুপম ঘটক এবং পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ।

৬ নম্বর অক্রুর দত্ত লেনে ‘হিন্দুস্থান রেকর্ডিং মিউজিক্যাল প্রোডাকশন’-এর সঙ্গে তখন অনুপম ঘটক যুক্ত, যিনি পরবর্তী সময়ে ছায়াছবির বিখ্যাত সুরকার। তাঁকে পাকড়াও করে বাবা প্রায়ই যাচ্ছেন হাজরা পার্কে। সেখানে সবুজ মাঠের উপরে বসে গান করেন অনুপম। কখনও বা কলেজ কেটে পান্নালালবাবুকে সঙ্গে নিয়ে ঢুঁ মারেন বালিগঞ্জ লেকে।
আড়বাঁশি শোনান পান্নালাল। মুগ্ধ শ্রোতা বাবা।

সেই মুগ্ধতার রেশ চলত ভোর রাত পর্যন্ত। অনেক সময় এমনও হয়েছে, বাবা যখন ১৫ নম্বর সব্‌জি বাগান লেনের পৈতৃক ভিটেয় ঢুকছেন, তখন আমার ঠাকুরদা সতীশচন্দ্র মিত্র প্রাতঃভ্রমণে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাড়ির এই ছোট ছেলেটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন সতীশচন্দ্র। ছেলেকে চাটার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট করতে চান। এ দিকে ছেলের যে কী মতিগতি, তিনি বুঝতে পারেন না। বলেন না কিছু, তবে চিন্তা তো হয়ই!

সতীশচন্দ্রের ইচ্ছেতেই কয়েক দিন চাটার্ডের ক্লাসে গিয়েও ছিলেন বাবা। তার পর তাঁর উপলব্ধি, এই ‘ব্যালান্স সিট’ বিষয়টি তাঁর জন্য নয়। তখন ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলায় এমএ।

গান শোনার মতো বাবার আরও একটা প্রাণের জিনিস ছিল, বই। চাকরি জীবন শেষে সকালে উঠে একটা কাজ ছিল বাবার। ঘড়ির কাঁটা ১০টা ছুঁেলই, কোনও রকমে কিছু খেয়ে চলে যেতেন ন্যাশনাল লাইব্রেরি। সেখানে বাবার জন্য নির্দিষ্ট ঘরও বরাদ্দ ছিল।

সন্ধে হব-হব, এমন সময় আমার মা আভাদেবী গাড়ি নিয়ে বের হতেন। লাইব্রেরি থেকে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে চলে যেতেন ভিক্টোরিয়ায়। ঘাসের উপর বসে দু’জনের চলত প্রাণ খুলে আড্ডা। সাংসারিক কথাবার্তা নয়, সে কথার বেশিটাই জুড়ে থাকত সাহিত্য, দেশ, বিদেশের লেখক ও তাঁদের জীবন।  কখনও এমনও হয়েছে আড্ডার টানেই ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে হাঁটতে হাঁটতে হাজরা রোডের মোড় পর্যন্ত চলে গিয়েছেন বাবা। তখন সঙ্গী অনুজ সাহিত্যিক শ‌ংকর।

পড়াশোনা শেষ করে বাবা প্রথমে ঢুকেছিলেন রেলের চাকরিতে। সেই চাকরিও বাবার অভিজ্ঞতার ভাঁড়ারে অনেক রসদ জোগায়। একবারের কথা। ট্রেনে চেপে কোথাও যাচ্ছেন বাবা। ট্রেন থামল ঘাটশিলা স্টেশনে। উঠে এলেন এক ভদ্রলোক। তাঁর সঙ্গের স্টেথোস্কোপটি জানান দিচ্ছে, উনি ডাক্তার। দু’জনের আলাপ শুরু হল। ভদ্রলোক বললেন, ‘‘আমার দাদার নাম হয়তো জানেন। উনি লেখক।’’

‘‘কে?’’

‘‘বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।’’

‘‘আরে, তাই নাকি!’’ ভদ্রলোক নিজের নাম বললেন, নূটবিহারী।

কতবার যে এমন অবাক করা ঘটনার সামনে পড়েছেন বাবা! সবটাই যে এমন মধুর-মধুর, তা হয়তো নয়। তেমনই এক ঘটনা ঘটে বাবার চাকরিজীবনে। বাবা তখন দুর্নীতি দমন শাখার গোয়েন্দা। গিয়েছেন বিলাসপুরে। আমার স্বামী কর্মসূত্রে তখন ভিলাইয়ের বাসিন্দা। ফলে আমিও থাকি ওখানেই। বস্তারের মহারানির সঙ্গে বাবার ছিল ভীষণ খাতির। সেই সূত্রে ছত্তীসগড়ের একটা বড় অংশ বাবা প্রায় অবাধে চষে ফেলতে পেরেছিলেন। বিশেষ করে আদিবাসী জীবন খুব কাছ থেকে দেখার দুর্লভ সুযোগ পান তখনই। আর এই দেখার উপর ভর করেই বাবা লেখেন ‘সরস্বতীয়া’।

বহু পরে একটি সর্বভারতীয় পত্রিকায় রচনাটির হিন্দি অনুবাদ বেরোয়, ‘সুরসতিয়া’ নামে। তারপর ধুন্ধুমার কাণ্ড! কাহিনির বর্ণনায় আছে, আদিবাসীদের মধ্যে ‘পারা’ রোগের প্রকোপ, চিকিৎসা পরিষেবা পেতে গিয়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়ার কথা। ব্যস, প্রচণ্ড খেপে গেল মধ্যপ্রদেশ সরকার। ‘সুরসতিয়া’ নিষিদ্ধ হল। রায়পুরে বিরাট মিছিল বেরোল বাবার বিরুদ্ধে। তবে এই নিষিদ্ধকরণের জন্য প্রতিবাদও হল। সে অবশ্য দিল্লিতে। বিভিন্ন কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পথে নামলেন। তখন চাপে পড়ে সরকার বাধ্য হল নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে।

লেখা নিয়ে এমন তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে খোদ কলকাতাতেও। বাবার লেখা ‘একক দশক শতক’ মঞ্চস্থ হচ্ছে, স্টার থিয়েটারে। সেখানে বিশেষ কিছু রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় নাটক বন্ধ করতে বললেন। তাঁর সেই আদেশনামা নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক। জনসভায় এ নিয়ে প্রচণ্ড সমালোচনা করেন বিরোধী নেতা জ্যোতি বসুও।

এই সব চাপানউতোরের সময়গুলোয় বাবা যে সব সময় খুব অস্থির থাকত, এমন নয়। বরং এক এক সময় মনে হত, একটু বেশিই যেন স্থিতধী!  তবে মাঝেসাঝে মনে হত, বাবার আচার-আচরণগুলো যেন রোজের জীবনের চেয়ে একটু হলেও আলাদা। উঁকি মারতাম, বাবার লেখার ঘরে। কখনও কখনও দেখতাম টানা পায়চারি করছেন, ঘরের সামনের বারান্দাটায়।

আমাদের বাড়ির উলটো দিকে তখন একটা বালির কারখানা ছিল। সে দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বাবাকে বহুবার গুণগুণ করে গানও করতে শুনতাম। একটা গানের কথা খুব মনে পড়ে, ‘শ্যামা মা কি আমার কালো রে...’ ভাবুক, আনমনা হয়ে দূরে তাকিয়ে বাবা। গলায় সুর। আমরা জানতাম, এমন সময় বাবাকে ডাকতে নেই। তাই শুধু দেখে যেতাম অলক্ষে দাঁড়িয়ে।

বাবার ঘরের উত্তর কোণে বড় টেব্‌লের পাশের চেয়ারে বসে কত বার এমনই আনমনা থাকতে দেখেছি। ঘরে ইতিউতি ছ়ড়ানো সোফা। বইয়ের পাহাড়। গেঞ্জিতে গোঁজা সোনার নিব্ওয়ালা পার্কার পেন। কোলের উপরে ফাইল, নয় বোর্ড। হঠাৎই লিখতে শুরু করলেন। আর সেই যে লিখতে লাগলেন, সারা রাত লিখেই গেলেন। পরের দিন সকালেই কোনও না কোনও পত্রিকা দফতর থেকে তাড়া দেবেন কেউ। প্রত্যেককে দু’-তিন পাতা করে লিখে হাতে ধরিয়ে দিতেই হবে। শুধু চিরকুটে কাকে কী দিলেন, সেটা এক লাইনে লেখা থাকত। আবার পরের সংখ্যার জন্য লিখতে হবে, তাই। লিখতে লিখতে যাতে হাতে কড়়া না পড়ে, তাই ভিজে কাপড় জড়িয়ে রাখতেন আঙুলে।

লেখালেখির অবসরে বাবার একটা অদ্ভুত অভ্যেস ছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘শান্তিনিকেতন’ বইটিকে বুকে আঁকড়ে রাখা। কখনও দেখতাম, আপন মনেই অনর্গল মুখস্ত বলছেন বইটি থেকে। কখনও বা কাউকে পড়ে শোনাচ্ছেন ভাললাগা কোনও অংশ। শুধু রবীন্দ্র-রচনা নয়, ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের প্রতিও বাবার যে কী প্রবল আকর্ষণ ছিল, বলে বোঝানোর নয়। এক বার শুনলেন হিন্দুস্তান রেকর্ডিংয়ের স্টুডিয়োয় কবিগুরু এসেছেন আবৃত্তি রেকর্ড করতে। সব কাজ ফেলে ছুটে গিয়েছিলেন সে দিন স্টুডিয়োয়।

অথচ অদ্ভুত, রবীন্দ্রনাথের এই ভাবশিষ্য বিমল মিত্র কিনা কবি জীবিত থাকাকালীন কোনও দিন শান্তিনিকেতন যাননি! 

জাগতিক ব্যাপারে বাবা ছিলেন বরাবরই নির্লিপ্ত। একটা কথা মনে পড়ে। মা রান্না করেছেন। দোতলায় ডাইনিং টেব্‌লে আমরা খেতে বসেছি। বাবা আগেই খেয়ে নিয়েছেন। এ বার আমি, মা আর ভাই খাব। ভাত বেড়ে খেতে ডাকল মা। খাবারে মুখ দিয়ে গা-টা গুলিয়ে উঠল আমার। একটু চেখেই মাও দেখি বলছেন, ‘‘এ হে, দেখো কাণ্ড! ও তো বলল না, রান্নায় নুন দিতে ভুলে গিয়েছি।’’

আমার অমন উদাসীন বাবার অন্য রূপও দেখেছি, যখন ছেলেমেয়ে কষ্ট পাচ্ছে।

ছোটবেলায় আমার একবার স্মল পক্স হয়েছিল। সারা গায়ে ব্যথা। জ্বর। ফোসকা ফোসকা বসন্ত।

বাবা আমায় কোলে নিয়ে সারাটা দিন বসে থাকতেন। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আরাম দিতেন। আমি সেরে উঠলাম, কিন্তু সংক্রমণ হল বাবার বাঁ চোখে। আর সে সংক্রমণ এমনই যে, জন্মের মতো একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেল।

বাবার চলে যাওয়াটা একেবারে হঠাৎই। সালটা ১৯৯১। শেষ দিকে ঘুম আসত না বাবার, তাই রাতে ঘুমের ওষুধ খাওয়াটা ছিল বাঁধাধরা। সে দিনও তাই। ডিসেম্বরের ১। সকালে উঠে মা দেখলেন, বাবা তখনও ঘুমোচ্ছেন। ভাবলেন, বুঝি তখনও ঘুমের রেশ কাটেনি। আরও কিছুক্ষণ সময় গড়ালে, তখনও উঠছে না দেখে মা এ বার চিন্তিত হয়ে ডাকাডাকি শুরু করলেন। তাতেও কিছু হল না। প্রায় ঘণ্টা তিনেক এ ভাবে চলার পর আর অপেক্ষা না করে নার্সিংহোম। তাতেও অবস্থার কিছুই উন্নতি হল না।  সন্ধে ঠিক ৬টা ২৫। বাবা চলে গেলেন। তার পর থেকে মা কেবলই আফসোস করতেন, সকালে কেন তিনি বুঝতে পারেননি। তখনই হয়তো কোমায় চলে গিয়েছিলেন বাবা। একটু আগে বুঝতে পারলে হয়তো মানুষটাকে বাঁচনো যেত!

বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে কেবলই একটা ছবি আমার চোখের সামনে ভেসে বেড়াত। সেই ছেলেবেলার ছবি। শ্মশানঘাটের ধারে বাড়ি বলে বাবার কাছে যখন অনুযোগ করেছিলাম, বাবা কেমন চুপ করেছিলেন! তার পর বলেছিলেন, ‘‘সব সময় জানবে, ওই একটা জায়গাতে আমাদের সবার জীবনের শেষ!’’

 

অনুলিখন: অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

(ঋণ: কমলেশ বসু,  দেশ পত্রিকা ১৩৮২ সাহিত্য সংখ্যা, বিমল মিত্র শতবার্ষিকী সংকলন, সম্পাদনা: বারিদবরণ ঘোষ)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন