• বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

রথযাত্রা থামিয়ে দিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র

রথের চাকা বেঁকে গিয়ে দুর্ঘটনা এড়াতেই এই নিদান। রথযাত্রার প্রেক্ষাপটেই সাহিত্যসম্রাট লিখেছিলেন উপন্যাস ‘রাধারাণী’। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের নানা স্মৃতি।

God
দেববিগ্রহ: নৈহাটিতে বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ির গৃহদেবতা রাধাবল্লভ, গরুড়বাহন বেশে।

সে  দিন ছিল উল্টোরথ। নৈহাটির কাঁটালপাড়ায় চট্টোপাধ্যায় পরিবারের গৃহদেবতা রাধাবল্লভের পূর্ণযাত্রা। ন’দিন ব্যাপী উৎসবের শেষ দিন। সকাল থেকেই ভক্তদের ভিড়। বিকেলে অর্জুনা পুকুর থেকে পূর্ণযাত্রা শুরু হল। শোভাযাত্রায় ছিলেন গৃহকর্তা রায়বাহাদুর যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কাঁসর-ঘণ্টা, ঢাক, জগঝম্প আর সঙ্কীর্তনের মাঝেই ধীর গতিতে এগিয়ে চলল রথ। হঠাৎই যাদবচন্দ্রের সেজ ছেলে বঙ্কিমচন্দ্র লোক মারফত বলে পাঠালেন, রথ যেন আর না টানা না হয়! এমন কথা শুনে উপস্থিত সকলে হতবাক। সে সময় বঙ্কিমচন্দ্র বারাসত মহকুমার ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তাই তাঁর আদেশ অমান্য করে কে? ভাটপাড়ার পণ্ডিত-অধ্যাপক এবং ভক্তরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে এর কারণ জানতে চাইলেন যাদবচন্দ্রের কাছে। উত্তরে তিনি হাসিমুখে বলেছিলেন, আমার বঙ্কিমের হুকুম!

এর মধ্যে হঠাৎই দেখা গেল, রথের ন’টি চাকার মধ্যে একটি বেঁকে গিয়েছে। আরও দু’টি বাঁকার উপক্রম। সে জন্যই রথ টানার সময় বার বার ঘর্ষণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। উৎসবের কোলাহলে সে দিকে কেউ গুরুত্ব না দিলেও খবরটা কোনও ভাবে বঙ্কিমচন্দ্রের কানে পৌঁছেছিল। আর তাই দুর্ঘটনা এড়াতেই তিনি রথটান অর্ধসমাপ্ত অবস্থাতেই বন্ধ করতে বলেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র সে দিন বাড়িতেই ছিলেন। যদিও রথটানে উপস্থিত ছিলেন না। এই ঘটনাটির উল্লেখ মেলে বঙ্কিমচন্দ্রের ভাইপো জ্যোতিষচন্দ্রের লেখায়।

রাধাবল্লভের রথযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনের নানা স্মৃতি। ১৮৮৯ সালে তাঁর দুই দাদার মৃত্যুর পরে রথযাত্রার খরচের বেশির ভাগটাই দিতে হত বঙ্কিমচন্দ্রকে। ১২৮২ বঙ্গাব্দের (১৮৭৫ সালে) কার্তিক-অগ্রহায়ণ সংখ্যা বঙ্গদর্শন-এ প্রকাশিত ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট শ্রীরামপুরের মাহেশের রথযাত্রা। যদিও বঙ্কিমচন্দ্রের ভাইপো শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ১৮৭৫ সালে রথের মেলায় প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে একটি মেয়ে হারিয়ে গিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র সেই সময় কাঁটালপাড়ার বাড়িতেই ছিলেন। তিনি নিজেও মেলার মধ্যে মেয়েটির অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলেন। এই ঘটনার দু’মাস পরেই তিনি ‘রাধারাণী’ লিখেছিলেন।

রথযাত্রার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনের এমন আরও কিছু ঘটনা। এক বার রথের সময় দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষে যাদবচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র ও পরিবারের অন্যান্যরা বৈঠকখানায় যাচ্ছিলেন। তখন কয়েক জন ভিখারি তাঁদের ঘিরে ধরেন। বঙ্কিমচন্দ্র হঠাৎই পকেট থেকে দু’-তিন টাকা বার করে মাটিতে ফেলে দিলেন। যে যা পারল কুড়িয়ে নিল, আর যারা কিছু পেল না তারা হইচই করতে লাগল। ইতিমধ্যেই বঙ্কিমচন্দ্র ইঙ্গিতে বাবাকে দেখিয়ে দিয়ে বৈঠকখানায় ঢুকে পড়লেন। জানালায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে দেখতে লাগলেন, বাবা যাদবচন্দ্র ভিখারিদের যথাসাধ্য দান করছেন। এর পরে যাদবচন্দ্র যখন বৈঠকখানায় ঢুকলেন তখন বঙ্কিম হাসতে হাসতে বাবাকে বলেছিলেন, আজ একটু নষ্টামি করতে গিয়ে দেখছি সৎ কাজই হয়ে গেল।

রাধাবল্লভের রথ

রাধাবল্লভের কষ্টিপাথরের বিগ্রহটি বহু প্রাচীন। বলরামের বিগ্রহটি কাঠের। পারিবারিক ইতিহাস অনুসারে নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা জয় করতে যাওয়ার সময় অর্জুনা পুকুরের কাছে ছাউনি ফেলেছিলেন। সেই সময় রঘুদেব ঘোষাল নবাবের সৈন্যের রসদ সংগ্রহ করে নবাবের আনুকূল্য পেয়েছিলেন। পরবর্তী কালে রঘুদেবের সম্পত্তির অধিকারী হন তাঁর দৌহিত্র রামহরি চট্টোপাধ্যায়। তিনিই বঙ্কিমচন্দ্রের পরিবারের আদিপুরুষ। প্রচলিত কিংবদন্তি, এক সন্ন্যাসী তাঁর ঝোলার মধ্যে রাধাবল্লভের বিগ্রহ নিয়ে অর্জুনা পুকুরের ধারে বিশ্রামের জন্য বসেছিলেন। বিশ্রাম শেষে তিনি ঝোলাটি তুলতে গেলে সেটি আর তুলতে পারেননি। তখন সেই সন্ন্যাসী রঘুদেব ঘোষালকে সেই বিগ্রহের সেবার দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। সেই থেকেই রাধাবল্লভ হয়ে ওঠেন গৃহদেবতা।

রথযাত্রার সূচনা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের দাদা শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায়। তমলুকের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন সেখানকার কারিগরদের দিয়ে একটি রথ তৈরি করেছিলেন। সেই রথ রূপনারায়ণ এবং গঙ্গাযোগে নৈহাটির ঘাটে নৌকা করে নিয়ে আসা হয়েছিল। রথযাত্রার সূচনা ১৮৬২ থেকে। উল্লেখ্য, ১৮৬২-র রথযাত্রার দিনই শুরু হয় শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট ট্রেন চলাচল।

রথটি উৎসর্গ করা হয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্রের মা দুর্গাসুন্দরী দেবীর নামে। তাই তিনি সবার আগে রথের রশিতে টান দিতেন। শোনা যায় এই রথের রশি এতটাই লম্বা ছিল যে তা রথ থেকে বাড়ির ভিতরে অন্দরমহল পর্যন্ত চলে যেত। সেখানেই তিনি রথের রশি স্পর্শ করতেন। প্রথা অনুসারে রথের দিন সকালে রাধাবল্লভের বিশেষ পুজো করা হয়। আবালবৃদ্ধবনিতা প্রবল উৎসাহে জিতেন সাহার মোড় পর্যন্ত রথটিকে টেনে নিয়ে যান।

রথের দিন থেকে উল্টোরথ পর্যন্ত রাধাবল্লভ ও বলরামের বিগ্রহ গুঞ্জঘরে অধিষ্ঠান করেন। এই সময় প্রতিদিনই তাঁদের নতুন বেশে সাজানো হয়। রথ ও উল্টোরথের দিন রাখালরাজা বেশ এবং অন্যান্য দিনে নৌকাবিহার, কালীয়দমন, কৃষ্ণকালী, বস্ত্রহরণ, গরুড়বাহন, সত্যভামার তুলাব্রত ইত্যাদি নানান বেশ হয়।  বিগ্রহের এই বেশ দেখতে আজও বহু মানুষ ভিড় করেন।

রথ উপলক্ষে এই পরিবারে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন সে কালের বহু বিশিষ্টজন। তার মধ্যে দীনবন্ধু মিত্র, দেওয়ান কার্তিকচন্দ্র রায়, শম্ভুচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখযোগ্য। রথযাত্রা উপলক্ষে বসত গানের আসরও। জ্যোতিষচন্দ্রের লেখা থেকে জানা যায়, রাত আটটা-ন’টা কিংবা তারও পরে চলত গানের আসর।  সে সময় যদুনাথ ভট্টাচার্য তথা যদুভট্ট কাঁটালপাড়ায় থাকতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসর মাতাতেন তিনি। তাঁর কাছেই বঙ্কিমচন্দ্র হারমোনিয়াম শিখতেন।

সময় বয়ে গিয়েছে সে কাল থেকে এ কালে। আজও অমলিন মেলার আকর্ষণ। আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি আরও এক আকর্ষণ ছিল পুতুলনাচ। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই মেলার ছবিও। তবু আজও আসে কাঠের নাগরদোলা, মাটির পুতুল। বদলায়নি রাধাবল্লভের রথের সাবেক আচার-অনুষ্ঠান। ঐতিহ্য বজায় আছে আজও।

 

তথ্যসূত্র: বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ি।
গৌতম সরকার

 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন