ডিমাপুর স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমেছেন দুই যুবক।  এক জন মধ্য-তিরিশ, অন্য জন আর একটু কমবয়সি। দু’জনের হাতে ঢাউস সুটকেস। গাড়ি আসার কথা। শ’তিনেক কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে নাগাল্যান্ড পেরিয়ে তাঁরা যাবেন ইম্ফল। দু’জনের যিনি বড়, কালোপানা সেই ঢ্যাঙা যুবকটি চলেছেন ভাগ্যান্বেষণে। সত্যজিৎ-ঋত্বিকদের আগে যে মহারথীরা বাংলা তথা ভারতীয় ছবির প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যমণি তাঁর বাবা— দেবকী বসু। কিন্তু একমাত্র সন্তান ছবিওয়ালা হোক, তা তাঁর মোটে পছন্দ নয়। 

নিজেকে প্রমাণ করবেন বলে তরুণ দেবকুমার চলে গিয়েছিলেন অসম। প্রায় কিছুই না জেনে অসমিয়ায় বানিয়ে ফেলেন তাঁর প্রথম ছবি ‘সংগ্রাম’— সুপারহিট! ছবি তৈরির কারিকুরি জানলে না জানি কী হত? এই ভেবে জোরদার পড়াশোনা করলেন। পরিণাম? পরের ছবি ‘শেষ বিচার’ ফ্লপ। এবং দেবকুমারের কলকাতা প্রত্যাবর্তন। মন খারাপ করে বসেই ছিলেন। হাতে দু’একটা ছোট কাজ শুধু। হঠাৎ কী মনে হল, বেড়াতে চলে গেলেন শিলং। অসম তো হল, এ বার নয় মেঘালয়ে গিয়েও ছবি করবেন! কিন্তু গারো পাহাড়ের মনে ছিল অন্য কিছু। এক দিন পরিচিত এক পরিবেশকের সূত্রে এক জন এসে বললেন, ‘‘তুমি মণিপুরে এসো, ভাল সিনিক বিউটি পাবে।’’ ভদ্রলোকের নাম করম মনমোহন সিং ওরফে করম আমুমাচা। মণিপুরি ব্যবসায়ী। বন্ধুরা তাঁকে বলছিল, ‘আর সব জায়গার মতো আমরাও কেন ছবি বানাতে পারি না?’ ব্যবসা আর পোষা হাতির দায়িত্ব অন্যের হাতে দিয়ে তিনি তখন পরিচালক খুঁজতে বেরিয়েছেন। 

কিন্তু মণিপুর? সেখানে তো তখনও পর্যন্ত কোনও ছবিই হয়নি! সিনেমা-হল দু’চারটে আছে বটে, কিন্তু ছবি কী করে তৈরি হয়, তা নিয়ে কারও বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। না আছে ক্যামেরা চালানোর লোক, না স্টুডিয়ো। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর মতো অভিনেতাই বা কোথায়? ছবি হবে কী করে? 

সত্তর দশকের গোড়া। সে কালে কলকাতা থেকে ইম্ফল পর্যন্ত ছোট-ছোট ফকার ফ্রেন্ডশিপ বিমান উড়ত। কিন্তু সে বড় কাঁপে। তাতে চড়তে ভীষণ অস্বস্তি দেবকুমারের। মনমোহন বললেন, আপনি নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর পর্যন্ত ট্রেনে আসুন। ওখান থেকে গাড়িতে ইম্ফল যাওয়ার ব্যবস্থা করব। 

সে জন্যেই এই ডিমাপুরে এসে নামা, সঙ্গে সহকারী জয়ন্ত পুরকায়স্থ। কিন্তু স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখেন, গাড়ি-টাড়ি কিছু নেই। একটা ঠিকানা জানা ছিল, হাঁটতে-হাঁটতে সেখানে পৌঁছে দেখা গেল, একটা কাপড়ের দোকান। ভিতরে একটা ছেলে ঘুমোচ্ছে। ডেকে তুললেন দেবকুমার, ‘‘এই ভাই, শুনছ? আমরা সিনেমা বানাতে এসেছি!’’ সে তো কাঁচা ঘুম ভেঙে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে। গলা এক পর্দা চড়িয়ে দেবকুমার ফের বললেন, ‘‘আরে, মনমোহন যে গাড়ি পাঠাবে বলেছিল?’’ 

ছেলেটা হঠাৎ ঘোর ভেঙে লাফিয়ে উঠে বলল, ‘‘আপ কেয়া কলকাত্তা কা ফিল্ম পার্টি হ্যায়?’’ দু’জনে তাড়াতাড়ি মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘‘হাঁ! হাঁ!’’ শুনেই ছেলেটা উঠে খুব লাফঝাঁপ শুরু করে দিল। কিছু একটা বোঝাপড়ার গোলমাল হয়েছিল আসলে। ঘণ্টা দেড়েক বাদে গাড়ি এল। দু’জনে রওনা দিলেন ইম্ফল। 

মণিপুরে তখনও ছবি তৈরি হয়নি বটে, কিন্তু সলতে পাকানোর কাজটা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতারও আগে। ১৯৪৬ সালে ‘শ্রীগোবিন্দজি ফিল্ম কোম্পানি’ খোলা হয় ইম্ফলে। তাদেরই চেষ্টায় কলকাতা থেকে বাঙালিরা গিয়ে ‘মাইনু পেমচা’ নামে একটি ছবি তৈরির কাজ শুরু করেন। কিন্তু প্রোডাকশন ম্যানেজার টাকা নিয়ে গড়বড় করায় মাঝপথে তা বন্ধ হয়ে যায়। 

পরিচালক: দেবকুমার বসু।

দেবকুমার বুঝেছিলেন, এখানে ছবি করতে গেলে আগে টানা ওয়ার্কশপ চাই। কলকাতা থেকে তাঁদের সংস্থার লোক এসে নাহয় কারিগরি দিকটা সামলাবেন, কিন্তু ক্যামেরার সামনে কেমন করে কথা বলতে হয়, চলাফেরা করতে হয়, সেটা তো আগে অভিনেতাদের শেখাতে হবে!  

পাহাড়ের ধারে ভারী সুন্দর একটা জায়গা বাছা হয়ে গিয়েছে। অন্তত ছ’মাস ওয়ার্কশপ হবে। কিন্তু অভিনেতা কোথায়? দেবকুমার স্মৃতিচারণ করেন, ‘‘যেখানে আগে ছবি হয়নি, সেখানে অভিনেতা পাওয়া যে কী সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার! খবর পেলাম, পাহাড়ে বর্মা (এখন মায়ানমার) বর্ডারের কাছে একটি মেয়ে আছে। গিয়ে দেখি, ভারী সুন্দর দেখতে। কিন্তু সে মুখ নিচু করে রইল, আর তুললই না!’’ 

আর এক গোলমাল গল্প বাছাই নিয়ে। ছবি হবে মেইতেই ভাষায়। বাংলা হরফে লেখা হলেও সেই ভাষা বা তার পুরাণ, গাথা, সাহিত্য দেবকুমারের অজানা। প্রযোজক দু’টো গল্প বেছে রেখেছিলেন। একটা বিখ্যাত মণিপুরি লোকগাথা ‘খাম্বা থোইবি’, অন্যটা ‘উরিরেই মাধবী’ নামে একটা জনপ্রিয় উপন্যাস। চূড়ান্ত বাছাইয়ের জন্য মিটিং ডাকা হল। অধ্যাপক থেকে নাট্যকর্মী, অনেকেই হাজির। কিন্তু দেবকুমার কিছুতেই একমত হতে পারছেন না। প্রথম গল্পটা পুরাণ-ঘেঁষা হওয়ায় সেট-কস্টিউমেই বড় টাকা খরচ হবে। সেই টাকা যদি তোলা না যায়, প্রথম ছবিই যদি মুখ থুবড়ে পড়ে, তা হলে মণিপুরে সিনেমার ভবিষ্যৎ ফের অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আর দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে তিনি যে ভাবে গল্প বলতে চান, প্রযোজক তার সঙ্গে একমত নন। অন্যেরাও তাঁকেই সমর্থন করছেন। 

ভিন্‌ভাষী পরিচালক যখন প্রায় কোণঠাসা, তাঁর হয়ে মুখ খুললেন গোলগাল দেখতে এক তরুণ। ইম্ফলের ডিএম কলেজে তিনি দর্শন পড়ান। নাম অরিবাম শ্যাম শর্মা। পরিচিত সকলেই ডাকেন ‘শ্যাম’ বলে। তাঁর সোজা কথা, ‘‘পরিচালক যা চাইছেন, সেটাই করা উচিত। প্রযোজকের সঙ্গে যদি মতে না মেলে, অন্য গল্প বাছা উচিত।’’ মনমোহন বললেন, ‘‘অন্য কোনও গল্পই তো নেই!’’ শ্যাম বললেন, ‘‘অনেক গল্প আছে। না হলে থিয়েটার দলগুলো চলছে কী করে? আপনারা বরং একটা সামাজিক গল্প বাছুন, খরচ অনেক কমবে।’’ 

দেবকুমার তখনও জানেন না, এই তরুণ শান্তিনিকেতনের ছাত্র। ভাল বাংলা জানেন। নাটক লেখেন, মঞ্চে অভিনয় করেন, গান করেন, সুর দেন, নাচেনও। শান্তিদেব ঘোষ আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গান শিখেছেন, মণিপুরিতে চিত্রাঙ্গদা অনুবাদ করেছেন। বাদল সরকারের সামনেই মণিপুরিতে করে দেখিয়েছেন ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ (আমাসুং ইন্দ্রজিৎ)। শ্যামও ছবি বানানোর স্বপ্ন দেখেন। 
শ্যামের স্বপ্ন, গোটা মণিপুরের সিনেমার স্বপ্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘মাইনু পেমচা’র কাজ যখন শুরু হয়, শ্যাম তখন স্কুলে পড়েন। বাড়ির কাছেই শুটিং হত, রোজ দাঁড়িয়ে দেখতেন তিনি। মাদ্রাজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়েছিলেন, মন টিকল না। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখবেন বলে শান্তিনিকেতনে চলে এলেন। দর্শন নিয়ে ভর্তি হলেন বিদ্যাভবনে। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষের আগে সত্যজিৎ রায় শান্তিনিকেতনে এলেন ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্র করতে। শ্যাম দেখলেন দূর থেকে। তার আগেই তাঁকে মুগ্ধ করেছেন অন্য এক জন। এক-এক দুপুরে বোলপুরে সিনেমা দেখতে যেতেন। ১৯৫৮ সালে সেখানেই ঋত্বিক ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’ দেখা। ‘‘আমার দেখাটাই বদলে গেল, ফিল্মের প্রেমে পড়ে গেলাম,’’ বলছেন শ্যাম। ওটাই প্রথম অনুপ্রেরণা। আর ছিলেন লাইটহাউসে চ্যাপলিন। ’৬৬-র মধ্যে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের হাওয়া পৌঁছে গেল ইম্ফলে। ঋত্বিক আর চ্যাপলিনের পরে আকিরা কুরোসাওয়াতেও মজলেন শ্যাম। 
কিন্তু ওই মুগ্ধ হওয়াই সার। হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ ছিল না। সেই সুযোগটাই সামনে চলে এল, যখন মণিপুরি সিনেমার ঘুম ভাঙাতে হাজির হলেন দেবকুমার। আর প্রথম মোলাকাতেই শ্যাম দাঁড়িয়ে পড়লেন তাঁর পাশে। আরিয়ান থিয়েটারে তাঁরা একটা নাটক করতেন ‘তীর্থযাত্রা’ নামে। শ্যাম সেই গল্প নিয়ে ছবি করার প্রস্তাব দিলেন। দেবকুমারেরও সেটা পছন্দ হয়ে গেল। মনমোহন বললেন, ছবির নাম হোক ‘মাতমগি মণিপুর’। মানে ‘আজকের মণিপুর’। 
নাটকটা যিনি লিখেছিলেন, সেই অরাম্বম সমরেন্দ্র শ্যামের ছোট্টবেলার বন্ধু, সহপাঠী। কিন্তু তাঁর অন্য পরিচয়টাই বড়— স্বাধীন সমাজতন্ত্রী মণিপুর আদায়ের লক্ষ্যে তৈরি ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা-সাধারণ সম্পাদক তিনি। এবং তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে। তাই ঠিক হল যে তাঁর ভাই, ডিএম কলেজের ইতিহাস-শিক্ষক তথা আরিয়ান থিয়েটারের কর্মী অরাম্বম লোকেন্দ্র ইংরেজিতে নাটকটা অনুবাদ করবেন। ছায়াছবির উপযোগী সংলাপ লিখবেন। আর তা থেকে চিত্রনাট্য চূড়ান্ত করবেন দেবকুমার। পরে ফের তা মণিপুরিতে তর্জমা করবেন লোকেন্দ্রই। 

সম্মান: ‘মাতমগি মণিপুর’ (১৯৭২) ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার নিচ্ছেন দেবকুমার বসু।

কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, বেশ অসুবিধা হচ্ছে। শ্যামই সরাসরি বাংলায় তর্জমার দায়িত্ব নিলেন। পরিচালকের দোভাষীর কাজও তিনিই চালাতেন। আগেই তাঁর নিজের গানের রেকর্ড বেরিয়ে গিয়েছিল। ছবিতে সুরসৃষ্টির ভারও তাঁকেই দিলেন দেবকুমার। গানের কথা লিখবেন মহারাজকুমারী বিনোদিনী ও ফুলেন্দ্র। গাইবেন কমলা, যমুনা আর বুধচন্দ্র। আরিয়ান তো বটেই, মণিপুর ড্রামাটিক ইউনিয়ন এবং আরও কিছু নাট্যদলের ছেলেমেয়ে— রবীন্দ্র, রোমা, ইন্দিরা, বীরবাবু, বেদা, রাশি, তোম্বা, আমুজাও জুটে গেলেন। 
১৯৭১-এ ইম্ফলে কিছু নির্বাক বহির্দৃশ্য তুলে শুটিং চালু হল। কিন্তু বেশির ভাগ দৃশ্যই তুলতে হবে স্টুডিয়োর মধ্যে। সময়টা অস্থির। পুবে মুক্তিযুদ্ধ, পশ্চিমে মুক্তির দশক— দুই বাংলা রোজ রক্তস্নান করছে। দেবকুমার নিয়মিত কলকাতা-ইম্ফল করছেন। টেকনিশিয়ান্স স্টুডিয়োয় গান রেকর্ড হবে বলে শ্যাম এসেছেন কলকাতায়। এরই মধ্যে ইন্দ্রপতন! ১৭ নভেম্বর সকালে ব্যস্তসমস্ত হয়ে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলেন দেবকুমার, পিছু ডাকলেন বাবা। ‘‘কোথায় যাচ্ছ?’’ দেবকুমার জানালেন, প্রচুর কাজ। শূন্য থেকে গড়ে তুলতে হচ্ছে সব। দেবকী বসু শুনলেন, তার পর বললেন, ‘‘ট্রাই টু ক্রিয়েট, ডোন্ট ম্যানুফ্যাকচার।’’ ছেলের প্রতি এটাই ছিল শেষ উপদেশ। দেবকুমার বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই হৃদরোগে মারা গিয়েছিলেন দেবকী বসু।
ছবির গল্প এক বৃদ্ধ বাবা আর তাঁর ছেলেমেয়ে-বৌমাকে কেন্দ্র করে। একেবারে শেষ মুহূর্তে জানা গেল, বাবার চরিত্রটি যাঁর করার কথা, তিনি আসতে পারছেন না। মরিয়া দেবকুমার বললেন, ‘শ্যাম শর্মা, তুমিই রোলটা করো।’’ শ্যামের বয়স তখন মোটে পঁয়ত্রিশ। ‘‘ওই বয়সে কে আর বাবার রোল করতে চায়?’’ একগাল হাসেন শ্যাম, ‘‘কিন্তু উপায় ছিল না। না হলে ছবিটাই হত না।’’ 
তখন কলকাতার নামকরা মেক-আপ আর্টিস্ট দেবী হালদার। তাঁর উপরেই ভার জোয়ানকে বুড়ো বানানোর। টান-টান কপালে বলিরেখা হল। কিন্তু চ্যাপ্টা চোখ আঁকার অভ্যেস ছিল না বাঙালি শিল্পীর। রোমার কথায়, ‘‘মেক-আপ ছিল খুব ভারী। আসলে, আমাদের মতো মুখ নিয়ে কাজ করতে ওঁরা জানতেন না, বড় চোখ নিয়ে কাজ করতেই অভ্যস্ত ছিলেন।’’
ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে নামল ভারত। কলকাতার আকাশে বোমারু বিমানের ওড়াউড়ি। সন্ধে নামলেই সাইরেনের ভোঁ আর ব্ল্যাক আউট। তারই মধ্যে শুটিং‌। গেস্ট হাউস থেকে স্টুডিয়ো অবধি যেতেও গাড়ির হেডলাইট জ্বালানো যাচ্ছে না, পার্কিং লাইট দিয়ে কাজ সারতে হচ্ছে। যুদ্ধের বাজারে অভিনেতাদের বাড়ির লোকজনও পড়ে গিয়েছেন দুশ্চিন্তায়। অবিরত ডাক আসছে। প্রথম ছবি ভালবেসে করতে এসেছেন সকলে, টাকাকড়ির ব্যাপার নেই। যাঁরা কাজকম্ম ছেড়ে এসেছেন, তাঁদের বাড়িতে টান পড়ছে। দিনের পর দিন বাঙালি খাবারও মুখে রুচছে না।
জানুয়ারিতে শুটিং শেষ হল। এ বার এডিটিং। কিন্তু ছবির এডিটর মধুসূদন বন্দ্যোপাধ্যায়ও মণিপুরি জানেন না। দেবকুমারকে তাঁর বাবা দিয়েছিলেন এক অমোঘ পরামর্শ, ‘‘ঠোঁট শুধু নড়ে, কথা বলে চোখ।’’ পিতৃবাক্য শিরোধার্য করে অজানা ভাষায় শুটিং চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। ‘‘আউটডোরে এক দিন রোদ্দুর পড়ে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে, শট নিচ্ছি। কিন্তু যে মেয়েটি অভিনয় করছিল, সে কিছুতেই ঠিক করতে পারছে না। কথা তো বুঝছি না, চোখের ভাব দেখেই বুঝছি। পাঁচটা টেক নেওয়া হয়ে গিয়েছে। আমি তো চেঁচামেচি করছি! পরে বোঝা গেল, আমার সহকারী শট ডিভিশনে গোলমাল করায় সেখানে উল্টো সংলাপ চলে গিয়েছে। ওই চোখই আমায় বলে দিল,’’ হাসেন দেবকুমার।
কিন্তু সম্পাদকের তো সেই সুযোগ নেই। কাটাকুটির সময়ে তাঁকে সংলাপ বুঝতেই হবে। ফলে শুটিং শেষে বাকি সবাই মণিপুরে ফিরলেও আধা-বাঙালি শ্যামকে থেকেই যেতে হল। এতে হল কী, চিত্রনাট্য লেখা থেকে সম্পাদনা পর্যন্ত ছবি তৈরির গোটা সিলেবাসটাই শ্যাম একটা ছবিতে পড়ে ফেললেন। ফল? দু’বছরের মধ্যে তাঁর নিজের প্রথম ছবি তৈরি। এবং কালক্রমে মণিপুরি ছবির ভগীরথ হিসেবে উঠে আসা। 
শুধু কি তিনিই? ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন লোকেন্দ্রও। কিন্তু প্রধান নারী চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছিলেন, সেই ইয়েংখোম রোমা পরে তারকা হয়ে যান। আর সমরেন্দ্র নিজবলে হয়ে উঠেছেন মণিপুরের প্রধান নাট্যকার-সাহিত্যিক। ২০০০ সালের ১০ জুন অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা তাঁকে গুলি করে মারে। 
সমরেন্দ্রর স্বাজাত্যবোধ ধ্বনিত হয়েছিল ‘মাতমগি মণিপুর’-এও। সে-ও এক বিপ্লবই বলা চলে! উত্তর-পূর্বের এই বৈষ্ণবপ্রধান রাজ্যে বহু আগেই বাংলার গুঁতোয় পিছনে চলে গিয়েছিল মণিপুরি হরফ। সবই লেখা হত বাংলা হরফে। ভূমিপুত্রেরা যাতে অনুভব করেন এই ছবি তাঁদেরই, তার জন্য ছবির টাইটেল কার্ডে ইংরেজির পাশাপাশি ব্যবহার করা হল মেইতেই হরফ। বহু যুগ পরে এই প্রথম!
১৯৭২ সালের ৯ এপ্রিল, ইম্ফলে উষা সিনেমা ও ফ্রেন্ডস টকিজ়, কাকচিংয়ে আজাদ সিনেমায় মুক্তি পেল ছবি। প্রিমিয়ার কাকচিংয়েই। পতাকায় মোড়া রাস্তায় ভিড় সামলাতে পুলিশের ব্যারিকেড। ‘‘পর্দায় যখন মেইতেই হরফে নাম ভেসে উঠল আর শোনা গেল প্রথম সংলাপ, গোটা হল খুশিতে ফেটে পড়ল,’’ সেই উত্তেজনা বছর চুরাশির দেবকুমারের গলায় আজও। ছবির শেষে অভিনেতাদের দেখতে জনতা এমন খেপে উঠল যে রোমাকে প্রোজেকশন রুমে গিয়ে লুকোতে হল। সিনেমা হিট! জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে এল রাষ্ট্রপতির পদকও। 
‘‘শো-এর পরে ওরা সব অটোগ্রাফ দিচ্ছে আর আমি ভাবছি কিছু দিন আগেই পাহাড়ের কোলে সেই ওয়ার্কশপের কথা,’’ বলতে বলতে যেন স্মৃতির স্ফটিকজলে স্নান করেন দেবকী-পুত্র। ‘‘মনে হয়, কী করে যে সব সম্ভব হল!’’