ঘটনাস্থল, অবিভক্ত পঞ্জাবের এক গ্রাম। লাল পাগড়ির পুলিশ সকাল থেকে মোতায়েন। খবর রটেছে, এক ব্রিটিশ মহিলা নাকি ব্রিটিশ সরকারেরই বিরুদ্ধে জনসভায় ‘লোক খেপাবেন’। কিন্তু সেই মহিলার খোঁজ দিতে পারছে না ‘সোর্স’রা।

জনসভা শুরু হচ্ছে। কাতারে কাতারে লোক। হঠাৎ দেখা গেল যেন মঞ্চ ফুঁড়ে উদয় হলেন সেই মহিলা। দৃপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘‘ইংরেজ শাসন নিপাত যাক।’’ গর্জন করে উঠল জনতাও। প্রমাদ গুনলেন পুলিশকর্তা। মঞ্চে সেই ব্রিটিশ মহিলাকে বললেন, ‘‘খুবই খারাপ লাগছে বলতে, কিন্তু...’’

‘‘কিন্তু কী?’’ প্রশ্ন বছর ত্রিশের মহিলার। ‘‘চাকরির খাতিরে আপনাকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হচ্ছি।’’ তাঁদের নেত্রীকে পুলিশ গ্রেফতার করছে দেখে চিৎকার করে উঠল জনতাও— ‘লং লিভ গাঁধী’, ‘লং লিভ কমরেড...’! ফুলে ফুলে ঢাকল প্রিজ়ন-ভ্যানের পথ।

এ বার বিচারপর্ব। সময়, ১৯৪১।

বিচারক জিজ্ঞাসা করলেন, কোথাকার নাগরিক? ‘‘ইংল্যান্ড,’’ অভিযুক্তের উত্তর শুনে বিচারক খানিক থমকে গেলেন। ফের প্রশ্ন, ‘‘আপনার জন্মস্থান?’’ ‘‘ডার্বি।’’ আর থাকতে পারলেন না তরুণ বিচারক। বললেন, ‘‘তা হলে আপনার জন্য এটা খুবই অপমানজনক হতে চলেছে।’’

বিচারকের নির্দেশ, লাহৌরের ‘ফিমেল জেল’-এ পাঠানো হোক অভিযুক্তকে। অক্সফোর্ড-ফেরত মহিলা সংশোধন করে দিলেন বিচারককে, ‘‘ওটা লাহৌর উইমেন’স জেল হবে।’’ জেলে গিয়ে পড়াতে শুরু করলেন মার্কস, গাঁধী। পরে লিখেছিলেন বই— ‘বিহাইন্ড দ্য মাড ওয়ালস’।

মুক্তি পেয়ে ফিরলেন শ্বশুরবা়ড়ি। সবার আবদার, ‘বহূ’র ‘দর্শন’, অর্থাৎ আশীর্বাদ পাওয়া। বৌমার গর্বে চোখ ভিজে গেল শাশুড়ি মায়ের। বৌমা শুধু নন, তাঁর ছেলেটিও যে তখন বন্দি রাজস্থানে ‘দেওলি’ জেলে, টানা চার বছরের জন্য।

সেই ব্রিটিশ মহিলাটি, ফ্রিডা বেদী। স্বাধীনতা সংগ্রামী, কৃতী সাংবাদিক ফ্রিডাই পাশ্চাত্যের প্রথম মহিলা যিনি তিব্বতি বৌদ্ধ ‘ভিক্ষুণী’ হন। আসলে  এক আত্মানুসন্ধানের নাম ফ্রিডা।

সেই অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল শৈশব থেকেই। ফ্রান্সিস হোস্টন আর নেইলি হোস্টনের এই কন্যাটিকে ছোট থেকেই দেখা যেত শুধু বই হাতে। তন্ময় হয়ে যেতেন খ্রিস্টান সন্তদের জীবন পড়তে পড়তে। পার্কফিল্ড সেডার্স স্কুল থেকে প্রাথমিক পাঠ চুকিয়ে ঢুকলেন অক্সফোর্ডে।

সেখানেই এক দিন। কিসের যেন বক্তৃতা হবে। ফ্রিডা পৌঁছলেন একটু আগেই। দেখলেন, দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে সুঠাম এক ভারতীয় যুবক। কী যেন পড়ছেন। ‘‘সুপ্রভাত,’’ ফ্রিডার সম্ভাষণ। আলতো হেসে ফের পড়ায় মন দিলেন সেই যুবক। একটু অভদ্রতা হয়ে গেল, ভাবলেন বুঝি। কিছু ক্ষণ পরেই প্রস্তাব, ‘‘চা খেতে আসবেন?’’ অবাক ফ্রিডা। এক জন ভারতীয়ের ঘরে...। চা খেতে-খেতেই শুরু হৃদয় বিনিময়। 

যুবকটি, বাবা পেয়ারেলাল বেদী। স্বয়ং গুরু নানকের বংশধর। বাড়ি পঞ্জাবে। ‘হ্যামার থ্রো’ প্রতিযোগিতায় সেরা। পড়াশোনার পাশাপাশি হইচই, বিস্তর খাওয়াদাওয়া নিয়ে মেতে থাকেন বেদী। ফ্রিডা এক্কেবারে উল্টো। তাঁর পরিধি শুধু ক্লাস আর লাইব্রেরি। তবুও কোথাও যেন মোচড় দিল ছেলেটা। দুজনের আলাপ ঘন হয়। কথা হয় মার্ক্সবাদ নিয়ে। ঘোরাঘুরি চলে বস্তিতে। পড়াশোনা চলে বোদলেয়ান লাইব্রেরিতেও। হুমায়ুন কবীর, মাহমুদ জাফর-সহ বেদীর বামমনস্ক বন্ধুদের সঙ্গে পরিচিত হলেন ফ্রিডা। 

কিন্তু বেদী-ফ্রিডার ‘সম্পর্ক’-এর কথা শুনে শিউরে উঠল অক্সফোর্ড-সমাজ। আক্রান্ত হলেন বেদী। অবশ্য ‘রেসিস্ট’ আক্রমণকারীরাই উল্টে মার খেয়ে পালালেন। তবে ফ্রিডাকে এক বছরের জন্য সাসপেন্ড করা হল। দোষ, ওই চা খেতে যাওয়া! ব্রিটিশ মেয়ে ও ভারতীয় ছেলের প্রকাশ্য প্রেম অক্সফোর্ডে এর আগে ঘটেনি। এই সময়েই বেদীর ‘অফিশিয়াল প্রোপোজ়াল’— ‘আমি আমার দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সৈনিক। গাঁধী-ভক্ত। ভেবে দেখো, আমাকে বিয়ে করলে তোমাকে অনেকটা সময় জেলের বাইরে, অপেক্ষায় কাটাতে হবে।’ প্রস্তাব কবুল বান্ধবীর। তিনিও ঝাঁপ দিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে। চার হাত এক হল। ইংল্যান্ডের দৈনিকগুলি লিখল, অক্সফোর্ডের ইতিহাসে সম্ভবত এটাই প্রথম সাদা ও অ-সাদা চামড়ার বিয়ে।

অক্সফোর্ড-জীবন শেষ হল এক দিন। ফ্রিডা চাকরি নিলেন সাংবাদিকের, ‘ডেলি টেলিগ্রাফ’-এ। বেশি দিন চাকরিটা করা হল না, স্বামীটি যে গবেষণা-বৃত্তি নিয়ে ছুটলেন জার্মানি! কিছু দিনের মধ্যে ফ্রিডা অন্তঃসত্ত্বা। শাশুড়িমা’টি বেশ। পঞ্জাব থেকে বৌমার জন্য পাঠান রকমারি পোশাক আর খাবারদাবার। জার্মানিতেই জন্মাল বেদী দম্পতির প্রথম সন্তান। নাম দেওয়া হল রঙ্গা।

হ্রদের ধারের ছোট্ট বাড়িটায় বেশ চলছিল সংসার। সেখানেই এক দিন টোকা। ও পারে দাঁড়িয়ে সুভাষচন্দ্র বসু। কিন্তু বেশি দিন এ সব চলল না। কারণ, জার্মানির আকাশে তখন হিটলারি মেঘ। সুইটজ়ারল্যান্ড পাড়ি দিলেন বেদী দম্পতি। পরে ইটালি থেকে জাহাজে মুম্বই।

দেশের মাটিতে পা রেখেই ধাক্কা। ‘চেকিং’। ব্রিটিশ পুলিশের। একরত্তি রঙ্গাও সেই তল্লাশি থেকে বাদ গেল না। চেকিংয়ের ঝক্কি পেরিয়ে ছেলে কোলে ফ্রিডা উঠলেন শ্বশুরবাড়িতে। শাশুড়ি আর বাড়ির বড়রা নতুন বৌ আর নাতিকে বরণ করলেন, এগারো টাকা আর লাল দোপাট্টা দিয়ে। কিছু দিনের মধ্যে ফ্রিডা শিখে ফেললেন উর্দুও। দেখলেন, এ দেশের মানুষ দু’হাত বাড়িয়ে আপন করে নিল এক বিদেশিনী বৌকে।

কিন্তু এই ভারতীয় মানুষগুলোকে পথে-ঘাটে, অফিস-কাছারিতে ইংরেজ কর্তাদের কাছে অপমানিত হতে দেখে বড্ড খারাপ লাগে ফ্রিডার। ওদের মুক্তির জন্যই বামপন্থার পথ বাছলেন বেদী দম্পতি। ‘অল ইন্ডিয়া সিভিল লিবার্টিজ় ইউনিয়ন’-এর সংগঠক হলেন ফ্রিডা। এক দিন গ্রাম থেকে কয়েক জন কমরেড এসেছেন। কিন্তু বাড়ির পরিচারকেরা জানিয়ে দিলেন, সাহেব, মেমসাহেব ঘুমোচ্ছেন।— এ কথা কানে যেতেই ‘সাহেব-মেমসাহেব’ তকমা ঘুচিয়ে নিজেদের যাবতীয় সম্পত্তি বিলিয়ে দিলেন দুজনেই।

কিন্তু নিজেদের রুটিটুকু কোথা থেকে জুটবে! স্বামী-স্ত্রী মিলে প্রকাশ করলেন সংবাদপত্র, পত্রিকা। তা দিয়ে সংসার চলল না। ফ্রিডা অধ্যাপনার কাজ নিলেন, লাহৌরের ফতেচাঁদ কলেজে। কিছু দিনের মধ্যে সপরিবার উঠলেন লাহৌরের কাছে, ‘মডেল টাউন’-এ। তাঁদের কুটিরে প্রায়ই আসেন শেখ আবদুল্লা, বলরাজ সাহনি, ইন্দ্রকুমার গুজরাল, হাফিজ জালান্ধারিরা।

এখানেই জন্ম দম্পতির দ্বিতীয় সন্তানের। নাম দেওয়া হল তিলক। কিন্তু তাঁবু-ঘরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ মানাতে পারল না তিলক। আন্ত্রিকে মৃত্যু হল তার। বাবা-মা প্রতিজ্ঞা করলেন, দেশ-স্বাধীন হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হলে আর সন্তান নয়। মৃত্যুশোক সামলে ফ্রিডা ঠিক করলেন, দেশের মানুষকে আরও কাছ থেকে দেখতে হবে। পায়ে হেঁটে ঘুরলেন অবিভক্ত পঞ্জাব। দেখলেন মানুষের, বিশেষত চাষি ও নারীদের দুর্দশা। রাগ হল, দুঃখও।

কিন্তু দুঃখ-যন্ত্রণা এ মেয়ের কাছে নতুন কিছু নয়। ফ্রিডার প্রায়ই মনে পড়ত একটা বিশেষ দিনের কথা। তখন ছোট, ভাই জন আরও খুদে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষ তখন। মা রান্নাঘরে চা বানাচ্ছেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে একটা ছোট্ট টেলিগ্রাম এল। মৃত্যুসংবাদ, বাবার। কিছু না বুঝেই যেন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল জন। 

পরিবার হারানোর এমন ‘কান্না’ ফ্রিডা আরও দেখেছেন। কখনও কাশ্মীরে, কখনও বা নিজের শ্বশুরবাড়ির অলিগলিতে। ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্ট, ফ্রিডা এক সোশ্যালিস্ট আলোচনাসভায় যোগ দিতে রয়েছেন ইংল্যান্ডে। পেয়ারেলাল তখন লাহৌরের কাছেই পৈতৃক বাড়িতে। সদ্যোজাত পাকিস্তানে হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টানদের উপরে নেমে এল অমানবিক বর্বরতা— খুন, ধর্ষণ, লুট। এক জনপ্রিয় দৈনিক লাহৌরকে বর্ণনা করল ‘সিটি অব দ্য ডেড’ নামে। এই পরিস্থিতিতে টেলিগ্রাম করে স্ত্রীকে লাহৌরে ফিরতে বারণ করলেন স্বামী। মুষড়ে পড়লেন ফ্রিডা। এ কোন স্বাধীনতা!

ভিটে হারিয়ে বেদী-দম্পতি গেলেন কাশ্মীরে। ডাল লেকের ধারে বাঁধলেন ছোট্ট ঘর। সেখানে তখন পাক-মদতপুষ্ট পাঠান হানাদারদের হাতে আক্রান্ত মুসলমানরাই! দুর্বিষহ হয়ে উঠল কাশ্মীরি মেয়েদের জীবন। রুখে দাঁড়ালেন ফ্রিডা। লেগে পড়লেন ‘উইমেন’স সেল্ফ ডিফেন্স কোর’ তৈরিতে। সমর্থন এল প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, শেখ আবদুল্লা আর বামপন্থীদের কাছ থেকে। তত দিনে শান্তিতে বিশ্বাসী ফ্রিডা বেছে নিলেন দুই পথ। এক দিকে কান্না মুছে কাশ্মীরিদের চোখের জল মোছানো, অন্য দিকে শ্রীনগরে আসা উদ্বাস্তুদের জন্য কাজ, কলেজে পড়ানো— সবই চলতে থাকল সমান তালে।

কাশ্মীরেই জন্ম বেদী দম্পতির চতুর্থ সন্তান, গুলহিমার। তার আগে ১৯৪৬-এর শুরুতে জন্ম হয়েছে তৃতীয় সন্তানটিরও। তার নাম কবীর। পরে সিনেমার পর্দায় দর্শক যাঁকে চিনবেন কবীর বেদী হিসেবে। এই কবীর তখন পেটে, একটা স্বপ্ন দেখলেন ফ্রিডা। দেখলেন, এক তিব্বতি লামা শিশুপুত্রকে তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছেন। অথচ বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে তখনও সে ভাবে পরিচয়ই হয়নি তাঁর।

স্বাধীনতার কিছু কাল পরেই উত্তর ভারতে বন্যা। ফ্রিডা ছুটলেন দুর্গতদের জন্য ত্রাণের কাজে।

এই সময় থেকেই ‘আধ্যাত্মিক সত্য’ কী, তা খুঁজতে শুরু করলেন ফ্রিডা। ফিরে পড়লেন বিশ্বের বেশ কয়েকটি ধর্মের মূল গ্রন্থগুলি। এক বছর ধরে ইসলামি রীতি-রেওয়াজ অনুশীলন চলল। আকর্ষণ অনুভব করলেন ‘জু়ডাইজ়ম’-এও। কিন্তু তিনি যা খুঁজছেন, তা পাচ্ছেন কই!

ইতিমধ্যে কাশ্মীর-জীবনেও ইতি পড়ল, শেখ আবদুল্লার সঙ্গে কাশ্মীরে গণভোটের প্রস্তাব নিয়ে বন্ধু পেয়ারেলালের তীব্র মতান্তরের কারণে। এই কাশ্মীরের সঙ্গেই কী ভাবে যেন ফের জড়িয়ে গিয়েছিলেন এই দম্পতি। তখনও দেশ স্বাধীন হয়নি। পুরনো বন্ধু আবদুল্লার বার্তা, তাঁর সঙ্গীসাথীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন ফ্রিডাই। এই পর্বেই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয় জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গাঁধী, ফিরোজ গাঁধীর সঙ্গেও।

কাশ্মীর ছেড়ে বেদী-দম্পতি এলেন দিল্লি। কিন্তু থাকবেন কোথায়! উঠলেন পাটিয়ালার মহারানির দেওয়া এক খণ্ড জমিতে। সেখানেই কুটির বেঁধে থাকা। গুরু গোবিন্দ সিংহ, ভাই নন্দলালের লেখাগুলির অনুবাদে মন দিলেন পেয়ারেলাল। সঙ্গে চলল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ধৃত আবদুল্লার মুক্তির জন্য চেষ্টা। ফ্রিডাও একটা কাজ নিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের মুখপত্র ‘সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার’-এ। পেলেন ছোট্ট দু’কামরার সরকারি ফ্ল্যাট।

ফের বাঁক-বদল ঘটল জীবনে। ১৯৫৩ সালে ইউনেস্কোর মিশনে ফ্রিডাকে বর্মা পাঠালেন নেহরু। পথে পথে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী! সেই সময়েই এক দিন আচমকা চোখের সামনে রঙিন এক অলৌকিক দিব্য-স্রোত! জ্ঞান হারালেন ফ্রিডা। দিল্লি ফিরলেন। কিন্তু মুখে রা নেই। চিনতে পারেন না কাউকেই। তিন মাস পরে অবস্থা স্বাভাবিক হল। স্বামীকে বললেন, ‘‘বুদ্ধের শরণে যাচ্ছি।’’

ব্রহ্মচর্য পালন করলেও ছেলেমেয়ে-স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ কোনও দিনই ছিন্ন হল না। খোঁজ রাখলেন সাংসারিক খুঁটিনাটিরও। তা কেমন, বোঝা যাবে ১৯৫৯-এ। তিব্বত থেকে পালিয়ে চতুর্দশ দলাই লামা এলেন ভারতে। প্রধানমন্ত্রী নেহরুর অনুরোধে তাঁদের পাশে দাঁড়ালেন মুণ্ডিতমস্তক, গেরুয়া বসনধারী ফ্রিডা। মিছামারি ও বক্সায় তিব্বতি উদ্বাস্তু শিবিরে দিনরাত এক করে চলল পরিশ্রম। এমনকি, স্কুল-কলেজ ছুটির সময়ে কবীর ও মেয়ে গুলহিমাকেও উদ্বাস্তুদের মধ্যে এনে রাখলেন, যাতে ওঁরা জীবনকে খুব কাজ থেকে দেখতে পারে। তিব্বতি উদ্বাস্তুদের জন্য কাজ করতে গিয়ে বুঝলেন, ওদের দরকার আধুনিক শিক্ষার। এই পর্বেই সিকিমের রুমটেক গোম্ফায় পরিচয় ১৬তম কর্মপা রানজুন রিংপো দোরজির সঙ্গে। 

তিব্বতি বিশ্বাস অনুযায়ী কর্মপা দলাই লামার মতো এক বোধিসত্ত্ব। মানুষের মুক্তির জন্য জন্মান্তর নিয়ে বারংবার আবির্ভূত হন এই ধরায়। তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মে রয়েছে বিভিন্ন সম্প্রদায়। দলাই লামা গেলুকপা সম্প্রদায়ের প্রধান, আর কর্মপা কর্মা কাগ্যু সম্প্রদায়ের প্রধান। 

অবশেষে এল ১৯৬৬-র অগস্ট মাসে বহু-প্রতীক্ষিত সেই দিন। সিকিমের রুমটেক গোম্ফায় ষোড়শ কর্মপার কাছে ভিক্ষুণী হিসেবে দীক্ষা নিলেন ফ্রিডা। নতুন নাম: ‘সিস্টার পালমো’। বসবাস গোম্ফারই চিলতে এক ঘরে। ফ্রিডা বেদীই প্রথম ইংরেজ মহিলা, যিনি ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের সহস্রাধিক বছরের ইতিহাসে তিনিই প্রথম পাশ্চাত্য-ভিক্ষুণী। তাঁর বয়স তখন প্রায় ৬০। 

বড় ছেলে রঙ্গার তত দিনে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কবীর কলেজের ছাত্র। ‘‘আমাদের টাকাপয়সা বিশেষ ছিল না। মায়ের ভিক্ষুণী হওয়ার সিদ্ধান্তে তাই আমার প্রবল ক্ষোভ এবং অভিমান জন্মেছিল। এই সময়ে তো মায়ের আমার পাশে দাঁড়ানোর কথা। তা না করে ভিক্ষুব্রত! মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সিদ্ধান্তটা এখনই কেন? মা উত্তর দিয়েছিলেন, আপেল কখন গাছ থেকে পড়ে? সময় হলেই,’’ বহু পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন কবীর বেদী। 

এতেই শেষ হল না ফ্রিডার যাত্রা। ষোড়শ কর্মপাকে ইংল্যান্ড, আমেরিকা সফর এবং সেখানে তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম নিয়ে বক্তৃতায় রাজি করানো, বৌদ্ধ দর্শনের বই ইংরেজিতে অনুবাদের কাজ, সবই চলতে থাকল সমান তালে। তার পরে ডাক এল দক্ষিণ আফ্রিকার এক সংগঠন থেকে। সেখানকার জোহানেসবার্গ, প্রিটোরিয়া, নাটাল, এই জায়গাগুলোর নাম তো কত বার শুনেছেন মহাত্মার ব্রিটিশ সহযোগী! বিদেশ সফরে এ বারেও রাজি হয়ে গেলেন ভিক্ষুণী। সেখানে গিয়ে বললেন গাঁধীদর্শন ও তিব্বতের বৌদ্ধ দর্শনের কথা। 

অতঃপর ফের ভারত, সিকিমের রুমটেক গোম্ফা। এটাই তো তাঁর দেশ! ’৭৬ সালের বড়দিনটা কাটালেন পরিবারের সঙ্গে। ‘‘কবীর ইতালির টিভিতে বেশ নামডাক করেছে,’’ অস্ট্রেলিয়ার বন্ধুদের লিখেছিলেন ফ্রিডা। ভিক্ষুণী হয়েও স্বামী, ছেলেমেয়েদের খবর রাখেন তিনি। ফ্রিডা বেদী জানেন, সন্ন্যাস আর সংসার মোটেই দুই আলাদা মেরু নয়। সবই পার্থিব ঘটনামাত্র। এই ঘটনার আড়ালেই তাঁকে খুঁজে পেতে হবে সত্যকে, বজ্রকঠিন শূন্যতাকে। সেটাই তো বৌদ্ধ ধর্মের সারাৎসার। 

২৮ মার্চ ১৯৭৭। সকালে ঘুম থেকে উঠে বছর ছেষট্টির ফ্রিডা তাঁর দীর্ঘ দিনের সঙ্গী ভিক্ষুণী পেমা জাংমাকে বললেন, ‘‘আমার এই ঠিকানার খাতাটা রাখো। আর এক জন ভিক্ষুণীকে ডেকে নাও।’’ ‘‘কেন?’’ উত্তর মিলল, ‘‘ও তুমি বুঝবে না। আমি জানি।’’ প্রতিদিন দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলাটা তাঁর রুটিন, সেটাও হল।

সন্ধ্যা ছ’টা। দুই ভিক্ষুণী হাঁটছেন। কিছু চিঠিপত্র আর ফেলে আসা জীবনের কিছু ফোটোগ্রাফ নেড়েচেড়ে দেখে স্মিত একটা হাসি ফুটল ফ্রিডার মুখে। রাত দশটায় কিছু উপহার আর টাকা তুলে দিলেন পেমাকে। বললেন, ‘‘এগুলো সব নির্দিষ্ট লোককে পৌঁছে দিও।’’ ধ্যানে বসলেন সিস্টার পালমো। পেমা ঘুমোচ্ছেন। রাতে হঠাৎ ঘুমটা 

ভেঙে গেল, জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার শব্দে। দেখলেন, পালমোর শ্বাস ধীরে ধীরে থেমে গেল। ধ্যানস্থ অবস্থাতেই ১৯৭৭-এর ২৯ মার্চ ইহজগৎ ত্যাগ করলেন ফ্রিডা।

শোকে স্তব্ধ হয়ে রইল তাঁর ভারতবর্ষ।

 

তথ্য ও ছবি সৌজন্য: ‘দ্য রেভলিউশনারি লাইফ অব ফ্রিডা বেদী: ব্রিটিশ ফেমিনিস্ট, ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিস্ট, বুদ্ধিস্ট নান’: ভিকি ম্যাকেঞ্জি