নতুন নামের সঙ্গে অন্তত যেন ‘ইউনাইটেড’ শব্দটা থাকে। তা হলেও স্মৃতিটা বয়ে নিয়ে যেতে পারব।’’ বলছিলেন ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার গ্রাহক আন্দুলের কৃষ্ণধন ঘোষ। ইউবিআইয়ের প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই তাঁর পরিবার ওই ব্যাঙ্কের গ্রাহক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষণার জেরে ‘ইউবিআই’ নামের অস্তিত্ব বিলোপের পথে। পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক, ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অব কমার্স এবং ইউবিআই— তিনটি ব্যাঙ্ক মিলে তৈরি হবে নতুন একটি ব্যাঙ্ক। তার নামও হবে নতুন। ষাটোর্ধ কৃষ্ণধনের ইচ্ছে, নতুন নামের মধ্যে অন্তত ইউনাইটেড শব্দটা থাকুক। দুই প্রজন্ম ধরে যে নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের পরিবার, তার রেশটুকু অন্তত ধরে রাখা যায় তা হলে।

পশ্চিবঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মধ্যে ইউবিআইকেই বলা হয় ব্যাঙ্ক ‘ফর দ্য বেঙ্গলি, বাই দ্য বেঙ্গলি, অব দ্য বেঙ্গলি’। বাঙালিরা এই ব্যাঙ্কটিকে যেন নিজেদের ব্যাঙ্ক বলেই মনে করে। তার নাম মুছে যাওয়ার আশঙ্কায় কৃষ্ণধনের মতো অনেকেই মুষড়ে পড়েছেন। ইউবিআই যে ‘বাই দ্য বেঙ্গলি’, সেটা তার জন্মবৃত্তান্ত ঘাঁটলেই জানা যায়। ১৯৫০ সালের ১৮ ডিসেম্বর, কুমিল্লা ব্যাঙ্কিং কর্পোরেশন, বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক, কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক এবং হুগলি ব্যাঙ্ক মিলে গঠিত হয় ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া। ওই চারটি ব্যাঙ্কেরই প্রতিষ্ঠাতা চার বাঙালি। সবার আগে তৈরি হয় কুমিল্লা ব্যাঙ্কিং কর্পোরেশন। ১৯১৪ সালে কুমিল্লার আইনজীবী এন সি দত্ত পত্তন করেন কুমিল্লা ব্যাঙ্কিং কর্পোরেশনের। মাত্র ৩০০০ টাকা ছিল সম্বল। এর পর ১৯১৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক জ্যোতিষচন্দ্র দাস তৈরি করেন বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক। ব্যাঙ্কিং ব্যবসায় অভিজ্ঞ কুমিল্লার ইন্দুভূষণ দত্ত ১৯২২ সালে স্থাপন করেন কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক। আর উত্তরপাড়ার জমিদার, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ধনেখালির তৎকালীন বিধায়ক ধীরেন্দ্রনারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের হাতে ১৯৩২ সালে তৈরি হয় হুগলি ব্যাঙ্ক লিমিটেড, যার সদর দফতর ছিল ধর্মতলায়।

দেশের যে সব অঞ্চলে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা এখনও পৌঁছয়নি, কেন্দ্রীয় সরকার এখন সেই সব অঞ্চলেই ব্যাঙ্কের শাখা খোলার ব্যাপারে বেশি উৎসাহ দিচ্ছে ব্যাঙ্কগুলিকে। ইউবিআই কিন্তু জন্মলগ্ন থেকে সেই কাজটিই করে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের যে সব অঞ্চলে ব্যাঙ্ক নেই, সেখানে শাখা খোলাই ছিল এর পরিষেবা সম্প্রসারণ কর্মসূচির অঙ্গ। এক সময়ে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা প্রায় ছিলই না। সুন্দরবনের মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নদী। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য এক সময়ে নদীপথই ছিল সম্বল। আজ থেকে প্রায় ৪৪ বছর আগে নদীপথকে ব্যবহার করেই সেখানে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা চালু করেছিল ইউবিআই। দুটি ভ্রাম্যমাণ লঞ্চে ব্যাঙ্কের শাখা চালু করে তারা। সেগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মানুষকে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা দিত। টাকা জমা দেওয়া, তোলা-সহ বিভিন্ন ব্যাঙ্কিং পরিষেবা দেওয়ার জন্য এই লঞ্চদুটিই ব্যাঙ্কের শাখা হিসাবে কাজ করত। 

বাংলার মানুষও এই ব্যাঙ্কের পাশে দাঁড়িয়েছে। এক সময়ে প্রায়ই ব্যাঙ্ক ফেল করার ঘটনা ঘটত। ব্যাঙ্কে ‘রান হওয়া’ ছিল পরিচিত ঘটনা। অনেক সময়েই কোনও ব্যাঙ্কের নামে ভুয়ো (কখনও সখনও সত্যিও) খবর রটত যে, ব্যাঙ্কটি সমস্যায় পড়েছে। আতঙ্কিত গ্রাহকরা ছুটতেন ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার জন্য। এক সঙ্গে অত মানুষ টাকা তুলতে চাইলে ব্যাঙ্কের পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব হত না। সমস্যা বাড়ত আরও, অনেক সময়েই এর জেরে ব্যাঙ্ক ফেল পড়ত। শুরুর কয়েক বছর পর ইউবিআই-ও এক বার এই সমস্যায় পড়েছিল। এক সঙ্গে বহু গ্রাহক এসে লাইন দিয়েছিলেন টাকা তুলে নেওয়ার জন্য। খবর চলে যায় পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের কানে। তিনি স্বয়ং চলে আসেন ব্যাঙ্কের রয়্যাল এক্সচেঞ্জ প্লেস শাখায়। সেখানে একটা টেবিলের উপর উঠে দাঁড়িয়ে গ্রাহকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। বলেন, ব্যাঙ্কে কোনও সমস্যা নেই, সকলের টাকাই সুরক্ষিত। অযথা আতঙ্কিত হয়ে কেউ যেন টাকা তুলে না নেন। তাঁর কথায় রান হওয়ার হাত থেকে সে যাত্রায় বেঁচেছিল ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক। যে টেবিলের উপরে দাঁড়িয়ে বিধানবাবু বক্তব্য রেখেছিলেন, সেটি এখনও রয়্যাল এক্সচেঞ্জ প্লেস শাখায় সংরক্ষিত।

বিধানচন্দ্র রায় নিজেও ছিলেন ইউবিআই-এর গ্রাহক। এই ব্যাঙ্কের গ্রাহক তালিকায় আছেন নামকরা বহু মানুষ, যেমন দেশের প্রাক্তন চার রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ, জৈল সিংহ, প্রতিভা পাটিল ও প্রণব মুখোপাধ্যায়। এ ছাড়া রয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, প্রাক্তন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গাঁধী, পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব। ফকরুদ্দিন আলি আহমেদের উদ্যোগেই ইউবিআই-এর রজত জয়ন্তী বর্ষ উপলক্ষে ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি ভবনে ব্যাঙ্কের একটি শাখার উদ্বোধন হয়, যার পোশাকি নাম প্রেসিডেন্ট এস্টেট ব্রাঞ্চ। রাষ্ট্রপতি ভবনে এটাই কোনও ব্যাঙ্কের প্রথম শাখা। পরে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আমলে রাষ্ট্রপতি ভবনেই আরও বড় জায়গায় শাখাটি স্থানান্তরিত করা হয়।

বাংলার ছোট-বড় শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ইউবিআই-এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। রাজ্যের চা শিল্পে এই ব্যাঙ্কই সব থেকে বেশি ঋণ দিয়েছে। এক সময়ে ব্যাঙ্কের মোট ঋণের ৩০ শতাংশই পেত চা শিল্প। ঋণের আওতায় রয়েছে পাট শিল্পও। রাজ্যের বহু ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে ইউবিআই-এর ভূমিকা কম নয়। ফুলের চাষ, কুমোরটুলির প্রতিমা শিল্প, তাঁত শিল্প, চিরুনি বা পিতলের জিনিস তৈরির মতো উদ্যোগকে চাঙ্গা করতেও এগিয়ে এসেছে ইউবিআই। এ রাজ্যের হিমঘরগুলিকেও বিমুখ করেনি। ঋণ নিয়ে ব্যবসা বাড়িয়েছে বড় মাপের অনেক শিল্প সংস্থাও। প্রথম যে বড় শিল্পগোষ্ঠীকে এই ব্যাঙ্ক ঋণ দেয়, সেটি হল টাটা গোষ্ঠী। তাদের একটি কাপড়ের মিল ইউবিআই-এর থেকে ঋণ নেয়। বিড়লা গোষ্ঠীর প্রথম যে দুটি সংস্থা ইউবিআইয়ের দেওয়া ঋণের তালিকায় আসে, তারা হল হিন্দ সাইকেল এবং ইন্ডিয়ান রেয়ন। কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেল বা ওবেরয় গোষ্ঠী, বেঙ্গল কেমিক্যালস, বেঙ্গল এনামেল, সরস্বতী প্রেস, মার্টিন বার্ন, টিস্কো ইত্যাদি সংস্থার ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ইউবিআই-এর ঋণের বড় ভূমিকা রয়েছে।

ইউবিআই-এর ৯০ শতাংশ আমানতই পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের পূর্বাঞ্চলের গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত। একটি জাতীয় স্তরের ব্যাঙ্ক হলেও এই ব্যাঙ্কের মোট ঋণের ৫০ শতাংশই খাটছে এক পূর্বাঞ্চলেই। তাই ব্যাঙ্কটিকে অন্য ব্যাঙ্কের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ঘোষণায় গ্রাহকদের অনেকেই ক্ষুব্ধ। তুলনামূলক ভাবে অনেক দুর্বল, এমন বহু ব্যাঙ্ক-কে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে ইউবিআই-এর সঙ্গে এ হেন আচরণ কেন, প্রশ্ন জেগেছে অনেকের মনেই।

ছবি সৌজন্য ও তথ্য সহায়তা: রাকেশচন্দ্র নারায়ণ, জেনারেল ম্যানেজার (ইউবিআই)