মন মন চাল নিত্য জমা হত গঙ্গার ধারের এই আড়তে। নৌকায় চলে যেত দূর-দূরান্তরে। চন্দননগরের চাউলপট্টিতে এক সময় নাকি এক-এক ব্যবসায়ীর কাছেই থাকত লক্ষ মন চাল। টাকাপয়সার অভাব নেই। তবু এলাকার ব্যবসায়ীদের মন খারাপ। প্রতি বছর যে সময় দুর্গাপুজোয় সারা বাংলার মানুষ উৎসবে মাতেন, সেই সময়টা তাঁদের শুধু কাজ আর কাজ। চাল মেপে আড়তে তুলে নৌকা ভরে নানা জায়গায় পাঠাতে হয়। এত ব্যস্ততা থাকে যে চারটে দিন কী ভাবে কেটে যায় টেরও পান না তাঁরা। এ বার এর একটা বিহিত না করলেই নয়।

গঙ্গার ধারে নিজের প্রাসাদোপম বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নন্দদুলাল মন্দির থেকে সন্ধ্যারতির শব্দ ভেসে আসছে। দীর্ঘদেহী পুরুষ, সর্বাঙ্গে আভিজাত্যের ছাপ। এক সময়ে যশোরে তাঁদের বিশাল জমিদারি ছিল। জ্ঞাতিদের চক্রান্তে শৈশবে মায়ের সঙ্গে তিনি আর তাঁর ভাই রাজারাম চৌধুরী কপর্দকশূন্য অবস্থায় চলে আসেন চন্দননগরে। আজ তিনি সমাজের বিশিষ্ট মানুষ। ধনী ব্যবসায়ী— চাল, পাট, আখ, গুড়ের ব্যবসা। ফরাসি ভাষাটাও রীতিমতো আয়ত্তে তাঁর। চন্দননগরে ফরাসিদের ডান হাত তিনি। ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে বাৎসরিক ১২,০০০ টাকার বিনিময়ে চন্দননগরের ইজারা নিয়েছেন। প্রয়োজনে ফরাসি রাজকর্মচারীদের টাকাও ধার দেন।  

চাউলপট্টির ব্যবসায়ীরা তাঁর কাছে এসে দরবার করলেন, এ বছর পুজোর আনন্দে শামিল হতে চান তাঁরাও। ইন্দ্রনারায়ণ যেন একটা ব্যবস্থা করে দেন। ফাঁপরে পড়লেন ইন্দ্রনারায়ণ। অশান্ত মনে সারা রাত বসে রইলেন নন্দদুলাল মন্দিরে, বিগ্রহের সামনে। ভোরের দিকে যখন ক্লান্তিতে চোখ জুড়ে এসেছে, স্বপ্নে দেখা দিলেন এক জ্যোতির্ময়ী দেবীমূর্তি। দেবী সিংহের ওপর আসীন। চতুর্ভুজা। গায়ের রং সকালের সূর্যের মতো। সেই আলোয় যেন পৃথিবী আলো হয়ে যাচ্ছে। ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ডেকে পাঠালেন সবাইকে। বললেন, দুর্গাপুজোর ঠিক এক মাস পরে তাঁর বাড়িতে মহা সমারোহে দুর্গারই আর এক রূপ— জগদ্ধাত্রীর পুজো করবেন তিনি। সেই পুজোয় সকলের আমন্ত্রণ। দুর্গাপুজোয় অংশগ্রহণ করতে না পারার কষ্ট ভুললেন চাউলপট্টির ব্যবসায়ীরা। খুশি মনে বাড়ি ফিরলেন। 

আরও পড়ুন: প্রোফেসর শঙ্কুরও আগে

তবে সুখের দিন স্থায়ী হল না। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে চন্দননগরে জলপথ ও স্থলপথে সাঁড়াশি আক্রমণ চালালেন লর্ড ক্লাইভ। ব্যাপক লুঠতরাজ হল চন্দননগরে। শোনা যায়, শুধু ইন্দ্রনারায়ণের বাড়ি লুঠ করেই প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকার অলঙ্কার নিয়ে যায় ইংরেজরা। ক্লাইভের গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল নন্দদুলালের মন্দিরও। প্রায় ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল ইন্দ্রনারায়ণের প্রাসাদ। নিরাশ্রয় হলেন দেবীও। পরিস্থিতি দেখেশুনে ইন্দ্রনারায়ণের বাড়ির পুজো চাউলপট্টিতে নিয়ে গেলেন ব্যবসায়ীরা। আজও এই পুজো হয় সেখানেই। জগদ্ধাত্রীকে এখানে বলা হয় আদি মা। 

চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনার প্রচলিত গল্প এটাই। তবে এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে মতভেদও আছে। চাল ব্যবসার সূত্রে যোগাযোগ ছিল নদিয়া ও চন্দননগরের। সখ্য ছিল ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ও মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রেরও। কর বকেয়া রাখার অভিযোগে আলিবর্দি খান কৃষ্ণচন্দ্রকে গ্রেফতার করলে সেই করের অনেকটাই বহন করেন ইন্দ্রনারায়ণ। আত্মীয়দের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে তাঁর কাছে আশ্রয় নেন কবি ভারতচন্দ্রও। ইন্দ্রনারায়ণের অনুরোধেই ভারতচন্দ্রকে সভাকবি নিযুক্ত করেন কৃষ্ণচন্দ্র। এক বার ইন্দ্রনারায়ণকে নিজের ভবনেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রাজা। কেউ কেউ বলেন, কৃষ্ণচন্দ্রের জগদ্ধাত্রী পুজো দেখেই নিজের বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো প্রচলনের কথা ভাবেন ইন্দ্রনারায়ণ। কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্রের প্রবর্তিত জগদ্ধাত্রী পুজোর সময়কাল আনুমানিক ১৭৬২-১৭৬৩, যখন তিনি মিরকাশিমের হাতে বন্দি হয়ে মুঙ্গের জেলে প্রেরিত হন। কথিত, কৃষ্ণচন্দ্র যখন ছাড়া পান তখন দুর্গাপূজার দশমী পেরিয়ে গিয়েছে। তখন স্বপ্নাদেশ পেয়ে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন তিনি। ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী কিন্তু মারা যান তারও কয়েক বছর আগে, ১৭৫৬ সালে। কাজেই এই তত্ত্ব টেকে না। এর আগে আরও একবার (১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে) কর না দেওয়ার অভিযোগে আলিবর্দি গ্রেফতার করেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্রকে। এক মাত্র সেই সময় যদি তিনি জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন করে থাকেন, তবেই বন্ধুকে দেখে ইন্দ্রনারায়ণেরও জগদ্ধাত্রী পুজো প্রচলনের সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু অত আগে জগদ্ধাত্রী পুজো কৃষ্ণনগরে শুরু হয়নি বলেই মনে হয়। তা ছাড়া ১৭৯০-এ গুপ্তিপাড়ায় যদি প্রথম বারোয়ারি পুজো হয়ে থাকে, তা হলে চাউলপট্টির পুজো তার আগে স্থানান্তরিত হয়েছিল, এ কথা মানা যায় না। কারণ ইন্দ্রনারায়ণের বাড়ি থেকে সরে আসার পর থেকে এই পুজো বারোয়ারি ভাবেই হত। 

চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরুর আর একটি তত্ত্ব আছে। বলা হয়, এক বার কৃষ্ণনগরের এক দল চাল ব্যবসায়ী ব্যবসার কাজে চন্দননগরে আসেন। প্রবল বৃষ্টির জন্য তাঁরা পুজোর সময়ে কৃষ্ণনগরে ফিরতে পারেননি। চাউলপট্টিতেই পুজো করেছিলেন তাঁরা। কৃষ্ণনগরের রাজাকে স্মরণে রেখে সিংহের মাথায় পরিয়ে দেওয়া হয় সোনার মুকুট। সেই প্রথম নাকি জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু চন্দননগরে। তবে এই সব কিছুই পুরোপুরি সংশয়াতীত নয়। চাউলপট্টির পুজোর প্রথম সঙ্কল্প করা হয়েছিল ইন্দ্রনারায়ণের নামে। এখনও এই পুজোর সঙ্কল্প হয় চৌধুরী পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যের নামে। বারোয়ারি পুজোয় কোনও পরিবারের সদস্যের নামে সঙ্কল্পের এমন উদাহরণ বিরল।

আরও পড়ুন: মাতৃসঙ্গীত গেয়েছেন তানসেন থেকে নজরুল

কৃষ্ণচন্দ্র রাজবাড়ির নায়েব, গোমস্তা, কোষাধ্যক্ষ, সবাইকে অনুদান দিয়েছিলেন নিজ নিজ এলাকায় পুজো করার জন্য। তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারীদের এক জন ছিলেন দাতারাম সুর। আনুমানিক ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ বা তার কিছু পরে চন্দননগর সংলগ্ন গৌরহাটিতে নিজের বাড়িতে দুই বিধবা মেয়েকে নিয়ে তিনি জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন। গৌরহাটি যেহেতু চন্দননগর এলাকায় ছিল, তাই এই পুজোকেই কেউ কেউ চন্দননগরের প্রথম পুজো বলেন। প্রায় ৩০ বছর পুজো চলার পর দাতারাম সুরের অবর্তমানে এই পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। পরে স্থানীয় মানুষদের উদ্যোগে পুজো স্থানান্তরিত হয় কাছেই বিশালাক্ষীতলায়। সেখানেও কিছু অসুবিধা দেখা দেয়। তখন শ্রীরামপুরের জমিদার গোস্বামীরা ভদ্রেশ্বরের তেঁতুলতলায় গঙ্গার ঘাটের কাছে পুজোর জন্য জমি দেন। সেখানেই এই পুজো হচ্ছে এখনও। তেঁতুলতলার পুজোয় রীতিমতো জাঁকজমক হয়। পুজোয় পুরোহিতই থাকেন প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন। ১০০টি বেনারসি দিয়ে দেবীর বস্ত্র তৈরি হয়। দেবীর গায়ের রং এখানেও প্রভাতসূর্যের মতো। তেঁতুলতলার পুজোয় ছেলেরা দেবীকে বিদায়ের সময় বরণ করেন মহিলাদের মতো শাড়ি ও সিদুঁর পরে। কী ভাবে এই অদ্ভুত প্রথার উদ্ভব, তা জানা যায় না। কেউ কেউ বলেন, দাতারাম সুরের কন্যারা যে হেতু পুজো শুরু করেছিলেন, তাই তাঁদের স্মরণে পুজো বারোয়ারি হওয়ার পর থেকে এই ভাবে দেবীবরণ হয়। পুজোর প্রধান পুরোহিতের মতে, সেই সময় ফরাসিরা এবং পরবর্তী কালে ইংরেজরা এই পুজো দেখতে আসতেন। বাড়ির মেয়েরা তাঁদের সামনে বেরোবেন না বলে পুজোর যাবতীয় কাজ করতেন পুরুষরা। সেই থেকেই এই প্রথার জন্ম। তবে এখনও চাউলপট্টি বা তেঁতুলতলার মতো প্রাচীন জগদ্ধাত্রী পুজোগুলির আচার-অনুষ্ঠানে মেয়েরা ব্রাত্য। এই নিয়ে আপত্তিও কম ওঠেনি।

এই পুজো যেখানে হয় তার পিছনেই কয়েক ঘর মুসলমান মানুষের বাস। স্থানীয় বাসিন্দা তুলা মিঞার পরিবারের সদস্যেরা প্রতি দিন গঙ্গাস্নান করে গঙ্গাজল এনে ঠাকুরের কাঠামোতে দিয়ে তবেই জলগ্রহণ করেন। পুজোর সময় গঙ্গা থেকে ঠাকুরদালান পর্যন্ত দণ্ডী কেটে আসেন। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে সম্পন্ন হয় এই পুজো।

কৃতজ্ঞতা: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়