আজ এই দল, কাল সেই দল। এই বঙ্গে এ সব আজ অহরহ। কিন্তু এটি আদতে অভিনব কিছু নয়। দুশো বছর আগের কলকাতাতেও এমনই ঘটত। তখন অবশ্য দলবাজি নয়, বলা হত দলাদলি। দুইয়ের মধ্যে তফাত আছে। এখনকার দলবাজি রাজনৈতিক ক্ষমতার মধুভাণ্ডকে ঘিরে। সে কালে তা ছিল সামাজিক ক্ষমতার দণ্ডটি হাতে পাওয়ার লোভে। 

আঠারো শতকের অন্তিমলগ্নেই বাঙালি বুঝতে পেরেছিল, রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমশ চলে যাচ্ছে বিদেশি শাসকের হাতে। তাদের সঙ্গে লড়াই করে ক্ষমতা অধিকারের ইচ্ছে বা সামর্থ্য কোনওটাই ছিল না বাঙালির। অথচ ক্ষমতা লাভের বাসনা ছিল মনের ভিতর— বিশেষত কলকাতার বিত্তশালী অভিজাতদের। আঠারো শতক থেকে কলকাতার বিত্তবানেরা অস্থির হয়ে ওঠেন ক্ষমতা লাভের জন্য। এঁরা দেখলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিসরের বাইরে একটা ক্ষেত্র আছে, যেখানে বিদেশি শাসকদের মাথা গলানোর সুযোগ নেই। তা হল সামাজিক ক্ষেত্র। নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাই তাঁরা বাইরের শক্তির নিয়ন্ত্রণমুক্ত দলাদলিতে জড়িয়ে পড়লেন সামাজিক সার্বভৌমত্ব হাসিল করতে। 

সমাজ শাসনের অধিকার দখলে দাবিদার ছিল অনেক। বর্ণ ও পেশার ভিত্তিতে বিভক্ত কলকাতায় গোটা বাঙালি সমাজের ওপর অখণ্ড প্রভুত্ব অর্জন করা সম্ভব ছিল না কারও পক্ষে। তাই এক-একটা খণ্ডকে ভিত্তি করে দেখা দিল অনেক দল। বহু দলপতি, প্রত্যেকেই উচ্চবিত্ত, উচ্চবর্ণ। ১৮২০-১৮৫০-এর মধ্যে কলকাতায় প্রধান পাঁচটা দল ছিল। নেতা ছিলেন রাধাকান্ত দেব, আশুতোষ দে, পাথুরিয়াঘাটা-জোড়াসাঁকোর দুই ঠাকুর পরিবার, বিশ্বনাথ মতিলাল ও কাশীনাথ মুনশি। 

কলকাতায় দলের উদ্ভব কবে হয়েছিল সে তথ্য মেলা ভার। তবে কলকাতায় দলাদলির অস্তিত্ব টের পাওয়া গিয়েছিল নবকৃষ্ণ দেবের কলকাতায় আবির্ভাবের পরেই। কলকাতায় সে সময় মাত্র দুটো দল। একটার নেতা মদনমোহন দত্ত, অন্য দলের দলপতি কৃষ্ণচরণ মিত্র। কলকাতার বাঙালি সমাজ তখন ছোট। সবাই এই দুই দলপতির অধীন। নবকৃষ্ণ তখনও দলপতি হননি, তিনি মিত্র মশাইয়ের দলের সদস্য। 

তবে দলপতির আসন পেতে নবকৃষ্ণকে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। পলাশির পরে কলকাতার সামাজিক সাম্রাজ্যে তিনি হয়ে উঠলেন প্রায় মুকুটহীন সম্রাট। তাঁর সামাজিক গুরুত্ব তখন রাজনৈতিক নেতাদের থেকে বেশি। এই সামাজিক গুরুত্ব লাভে তাঁকে সাহায্য করেছিল তাঁর সরকারি পদের গুরুত্ব এবং কলকাতার কোম্পানির কর্তাদের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক। নিজের সামাজিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তিনি কলকাতায় ডেকে এনেছিলেন উঁচুদরের কুলীনদের। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের দান করেছিলেন জমি বাড়ি। এই সবই দলপতি হওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি। দলপতি হতে প্রয়োজন ছিল বিত্ত-বৈভব প্রদর্শন। তার মাধ্যম ছিল শ্রাদ্ধ, বিয়ে বা অন্য পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অপরিমিত অর্থব্যয়। সে কালে ধনীদের দু’হাতে দানধ্যান করাকে বদান্যতা ভাবলে ভুল হবে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘‘বড় লোকেদের যেন একটা ধারণা ছিল যে ভাল মন্দ বিচার না করিয়া খুব খরচ করিতে পারিলেই সমাজের মধ্যে প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাইবে।’’ মাতৃশ্রাদ্ধে নবকৃষ্ণ দেবের ন’লক্ষ টাকা খরচের পিছনে এই উদ্দেশ্য উঁকি দেয়। 

একটা দলে নানান বর্ণের মানুষ থাকলেও কয়েকটি ঐতিহ্যপূর্ণ পরিবার শুধু নিজেদের বর্ণের মানুষ নিয়েই দল গড়েছিলেন। পাথুরিয়াঘাটা বা চোরবাগানের সুবর্ণবণিক মল্লিকদের যেমন নিজস্ব দল ছিল। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতায় ঠিক কতগুলো দল ছিল তার সঠিক তথ্য মেলে না। তবে নবকৃষ্ণের দল প্রায় শতাধিক বছর ধরে ক্ষমতা ও প্রভাব বহাল রেখেছিলেন। উনিশ শতকে অনেকটা সময় কলকাতার সমাজে সবচেয়ে শক্তিশালী দলপতি ছিলেন রাধাকান্ত দেব। ১৮৪০-এ দেখা যায় তাঁর দলের সদস্য সংখ্যা প্রায় এক হাজার। কলকাতার সবচেয়ে শিক্ষিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের অধিকাংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণরাঢ়ীয় কায়স্থ পরিবারগুলো তাঁর নেতৃত্বের সামনে নতশির। 

শুধু সমাজকল্যাণের উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ দলপতি হওয়ার বাসনা পুষত না। ক্ষমতা ভোগের লক্ষ্য তো ছিলই, উপরি লাভ, আক্ষরিক অর্থে কিছু প্রাপ্তি। যার বহর নেহাত কম ছিল না। দলের কোনও সদস্য বাড়িতে শ্রাদ্ধ বা বিয়ের অনুষ্ঠান করতে চাইলে দলপতির অনুমতি নিতে হত। তিনি দলপতির কাছে নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী ব্যয়ের অঙ্কটা জানাতেন। দলপতিই নৈকষ্য কুলীন, ভঙ্গকুলীন, অধ্যাপক প্রমুখের সংখ্যা স্থির করে নিমন্ত্রিতদের তালিকা তৈরি করে দিতেন। গৃহস্বামীর কোনও স্বাধীনতা ছিল না। সুখের কথা, এ কালে রাজনৈতিক নেতারা অন্তত এটুকু ব্যক্তিস্বাধীনতা বিবেচনা করে থাকেন। অবশ্য একটা শর্তে, প্রতিস্পর্ধী দলের কোনও নেতাকে আমন্ত্রণ নয়। তা হলেই গোলমাল। 

অনুষ্ঠানের দিন দলপতি অনিবার্য ভাবেই আসতে বিলম্ব করতেন— ঠিক এ কালের নেতাদের মতো। সদস্যেরা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতেন তাঁর আশায়। অনুষ্ঠানে বিশেষ আসন, অভ্যর্থনা ও সম্মান লাভ করতেন দলপতি। অনুষ্ঠান শেষে নিমন্ত্রিতদের বিদায় দক্ষিণার পরিমাণ ও দানসামগ্রী ঠিক করে দিতেন। ‘ইহাতে দলপতির যে লভ্য হয় তাহা আমি অধিক কি কহিব,’ লিখেছেন ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। 

কোনও একটা দলে নাম না লিখিয়ে উপায় ছিল না। কারণ দলে থাকলে তবেই জাত-ধর্ম রক্ষা পেত। দলপতির শাসন ছিল কড়া। কেউ কুকর্ম করলে নিস্তার ছিল না। এ কালে তার বিপরীত। প্রভাবশালী নেতার হাত মাথায় থাকলে কুকথা-কুকর্মেও শাস্তি হয় না। সে কালে কিন্তু কেউ অন্যায় করলে দলপতির নির্দেশে তার বাড়ি কেউ জলস্পর্শ করত না। তার সঙ্গে আত্মীয়তা থাকলেও দলপতির অনুমতি ছাড়া তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ছিল নিষিদ্ধ। কেউ মিথ্যে অপবাদ দিলে রক্ষা করতেন দলপতি। সে পতিত হওয়ার দুঃস্বপ্ন থেকে রক্ষা পেত। দলভুক্ত হয়ে না থাকা ছিল সমাজ পরিত্যক্ত হয়ে থাকার মতো। 

বস্তুত দলপতিরা ছিলেন সমাজ শাসক। অসীম ক্ষমতা ভোগ করতেন তাঁরা। দলপতির হাতে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ছিল জাতিচ্যুত বা একঘরে করার ক্ষমতা। তাকে সমীহ না করে উপায় ছিল না, বিশেষত বিত্তহীন সাধারণ সদস্যের। কেউ একঘরে হলে তার পরিণাম ছিল ভয়াবহ। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে হত না। বাড়িতে কোনও অনুষ্ঠান করলে কেউ যোগ দিত না। শ্রাদ্ধ, বিয়ে, পুজোয় পুরোহিত মিলত না। তার সামনে খোলা থাকত দুটো পথ। অন্য দলে যোগ দেওয়া, কিংবা অর্থবান বা প্রভাবশালী হলে স্বতন্ত্র দল গড়ে তোলা। ১৮৩৩-এর ৫ জানুয়ারি ‘সমাচার দর্পণ’ লিখেছিল, ‘দলপতির মতের সহিত অনৈক্য হইলেই প্রায় সকলেই পৃথক হন। নির্ধন ব্যক্তি অন্য দলে প্রবিষ্ট হইয়া থাকেন। ধনবান স্বয়ং দল করেন।’ হুবহু এ কালের রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্র যেন! 

দলপতিদের মধ্যে কলহ-বিবাদের অন্যতম কারণ ছিল জাতপাতকে কেন্দ্র করে একে অপরকে হেয় করার চেষ্টা। অনেক সময় অর্থব্যয় করেও জাতে ওঠা যেত না। দর্পনারায়ণ ঠাকুরও অর্থের বিনিময়ে পিরালী হওয়ার অসম্মান থেকে মুক্তি পাননি। শোনা যায়, কুলীন ব্রাহ্মণের তকমা পেতে ঠাকুররা নাকি কৃষ্ণনগরের মহারাজা ও নবদ্বীপের পণ্ডিতসমাজকে এক লক্ষ টাকা উৎকোচ দিতেও রাজি ছিলেন। সমাজপতিদের এই গুমোর ঠাকুররা পরে ভেঙে দিয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদের প্রভাব খাটিয়ে পারিবারিক ইতিহাস পুনর্লিখনের কাজে নিয়োগ করেন ঘটকদের। ফিরে পান কৌলীন্য। কুলীন ঘরের বধূ ও জামাতা আনতে আর সমস্যায় পড়তে হয়নি। 

সে কালে ধনী অভিজাতদের মধ্যে যে সব কারণে রেষারেষি ছিল, এ কালের চোখে তা বালখিল্য মনে হয়। মৃত্যুর ধরন নিয়ে‌ও ছিল প্রতিযোগিতা। নবকৃষ্ণের সঙ্গে হাটখোলার বিখ্যাত ধনী চূড়ামণি দত্তের রেষারেষি ছিল প্রবল। ১৭৯৭-এর ২২ নভেম্বর নবকৃষ্ণ ঘরে পালঙ্কে শুয়ে মারা যান সকলের অলক্ষে। সে কালের চোখে এই ধরনের মৃত্যু গৌরবের ছিল না। মৃত্যুর আগে গঙ্গাতীরে তিন রাত কোমরজলে শুয়ে থেকে মৃত্যু হলে, মনে করা হত মৃত ব্যক্তি পুণ্যাত্মা। নবকৃষ্ণের এই অগৌরবের মৃত্যুর খবর শুনে পুলকিত হন চূড়ামণি দত্ত। ঠিক করেন, তিনি মৃত্যুবরণ করবেন সাড়ম্বরে। এক সময় কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হলে চূড়ামণি রুপোর চতুর্দোলায় চেপে, সর্বাঙ্গে হরিনাম লিখে, চন্দনচর্চিত হয়ে, অগুনতি ঢুলি ও লাল পতাকার শোভাযাত্রা-সহ গঙ্গাতীরে চললেন গঙ্গাপ্রাপ্তির জন্য। পথে নবকৃষ্ণের বাড়ির সামনে শোভাযাত্রা থামল। কীর্তনীয়ারা গেয়ে উঠল, ‘চূড়া যায় যম জিনিতে।’

রাধাকান্ত দেব ব্যক্তিগত ভাবে সমাজে প্রভাব রাখলেও সতীপ্রথার অবসানের বিরুদ্ধে যে ‘ধর্মসভা’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার অস্তিত্ব সঙ্কটাপন্ন হচ্ছিল ক্রমশ।

সতীদাহ প্রথাকে টিকিয়ে রাখতে রাধাকান্ত দেব তাঁর ধর্মসভায় রক্ষণশীলদের টেনে আনতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই প্রথাবিরোধী আইন পাশ হয়ে যাওয়ার পরে তাঁদের অনেকে রাধাকান্ত দেবের দল ত্যাগ করে সিমুলিয়ায় স্বতন্ত্র ধর্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন। যেমন আশুতোষ দে, রাজা শিবকৃষ্ণ বাহাদুর, দুর্গাচরণ দত্ত প্রমুখ। ১২৫৫ বঙ্গাব্দের ৪ জ্যৈষ্ঠ ‘সংবাদ প্রভাকর’ লিখেছিল, ‘দলপতি মহাশয়রা সকলেই মান্য ও প্রধান মনুষ্য, অতএব তাঁহারদিগের মধ্যে পরস্পর মনোমালিন্য হওয়াতে সুতরাং দেশের দারুণ দুর্ভাগ্য ভিন্ন আর কি কহিব।’

এই মনোমালিন্য এবং দল-ভাঙার একটা বড় কারণ ছিল দলপতিদের দুর্নীতি এবং দলের নিয়ম ভঙ্গ করে অন্য দলের লোককে সামাজিক অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ। এই দ্বিচারিতায় ক্ষুণ্ণ হতেন দলের সদস্যরা। ১২১৬ বঙ্গাব্দে গোপীমোহন দেব ছ’হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে জনৈক শূদ্রের শ্রাদ্ধে দলের ব্রাহ্মণ-কায়স্থদের উপস্থিত থাকার অনুমতি দেন। আবার এই গোপীমোহন দেবের শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল কালীনাথ মুনশির দলের কৃষ্ণমোহন বিদ্যাভূষণকে। দলের বাইরের ব্যক্তির নিমন্ত্রণে ‘সমাচার দর্পণ’ ব্যঙ্গ করে লিখেছিল, ‘ইহাতেও দোষ নাই।’

স্বার্থের সংঘাত, মতের অমিল, ঈর্ষাকাতরতা, আমিত্ববোধের লড়াই জন্ম দিয়েছিল অসংখ্য দলের। শোভাবাজারের দেব পরিবারের ছোট শরিকরা বড়দের নেতৃত্বে ধর্মসভায় যোগ দিলেও পরে ১৮৪৪ সালে সেই দল থেকে বেরিয়ে আসেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারও বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল তিন দলে— গোপীমোহন ঠাকুর ও তাঁর ছেলে প্রসন্নকুমার ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুর ও উমানন্দ ঠাকুর। উমানন্দ অবশ্য নিজে দল করেননি, যোগ দিয়েছিলেন ‘দেব’দের দলে। অনেক সময় দলের কোনও সদস্য দলপতির সমান বিত্তবান ও প্রভাবশালী হয়ে উঠলে তাঁর মধ্যে নিজস্ব দল গড়ে তোলার বাসনা জেগে উঠত। ১৮৩৩ সালে আশুতোষ দে হাটখোলার দত্তদের দল থেকে বেরিয়ে এসে গড়ে তোলেন নিজস্ব দল। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ধনী সদস্য দলের মধ্যে অসম্মানিত বোধ করলে তিনি নতুন দলপতির মুখ খুঁজতেন।

দুই বিত্তবান ও প্রভাবশালী দলপতির মধ্যে স্বার্থের সংঘাত হলে দেখা দিত বাহুবলের সংঘাত। একেবারে এ কালের প্রতিচ্ছবি। প্রত্যেকে নিজ নিজ এলাকায় ছিলেন এ কালের মতো এক-এক জন অমিত শক্তিধর ‘মস্তান’। এক দলপতি অন্য দলপতির এলাকায় অধিকার ফলানোর চেষ্টা করলেই ঘটে যেত তুলকালাম। প্রত্যেক দলপতির নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী ছিল। ১৮৪৫ সালে মতিলাল শীল ও আনন্দ ঘোষের মধ্যে বাজারের এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ বাধে। দু’পক্ষের লাঠিয়ালরা জড়িয়ে পড়ে লাঠালাঠিতে। ‘বেঙ্গল স্পেকটেটর’ পত্রিকা সমাজের মধ্যে কলহ-বিবাদ সৃষ্টি ও বাঙালি পরিবারগুলোকে ভেঙে দেওয়ার প্রবণতার কঠোর নিন্দা করেছিল।

দলাদলির সমাজ-মন্থনে অবশ্য অমৃতও সৃষ্টি হয়েছিল। দলপতিরা তাঁদের ব্যক্তিগত ও দলীয় প্রভাব বাড়াতে জনহিতকর কাজে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। জনকল্যাণমূলক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেকেই আগ্রহী ছিলেন একই কারণে। হিন্দু কলেজ-সহ বেশির ভাগ স্কুল কমিটির কর্তৃত্ব ছিল রাধাকান্ত দেবের দলের হাতে। তাঁদের বিরোধিতায় রামমোহন হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে না পারলেও অ্যাংলো-বেদান্ত স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ব্রাহ্মণদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে। সামাজিক প্রশ্নে দলগুলোর মধ্যে বিরোধিতা থাকলেও অনেক সময় তাঁরা পরস্পর হাতও মেলাতেন। দেব ও ঠাকুরদের মধ্যে সম্পর্ক যখন অতি তিক্ত, সে সময় তাঁরা ১৮২৮-এর লাখেরাজ জমি পুনরধিকার আইনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। অন্য দিকে স্বাগত জানান ১৮৩২-এর জুরি আইনকে। একযোগে কাজ করেছিলেন স্কুল সোসাইটি, স্কুল বুক সোসাইটি, হিন্দু কলেজ ও জনশিক্ষা সমিতিতে। ১৮৩৩-এ রাধাপ্রসাদ রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুর যৌথ ভাবে জমিদার সমিতির ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব নেন। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনে দেব ও ঠাকুররা কর্তৃত্ব ভাগ করে নিয়েছিলেন। রাধাকান্ত দেব প্রথম সভাপতি, দেবেন্দ্রনাথ প্রথম সচিব। বেশ বোঝা যায়, সামাজিক ব্যাপারে দলপতিদের মধ্যে মেরুকরণ হলেও, আর্থিক উদ্যোগ বা অন্য অ-সামাজিক ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে ঘটে যেত সমীকরণ। এই সদিচ্ছা ও মুক্তমন এ কালের দলবাজিতে প্রায় অদৃশ্য।

আসলে দলাদলির পক্ষে যুক্তিটা আর পুরনো আদর্শ ধরে রাখতে পারছিল না। উনিশ শতকের তিরিশের দশক থেকে বাজতে শুরু করেছিল ধর্মসভার মৃত্যুঘণ্টা। দলগুলো প্রায় মতাদর্শহীন হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর মতো আচরণ করতে শুরু করে। আর এই ফাটল দিয়ে গজিয়ে ওঠে নতুন চেহারার দল, যাদের মতাদর্শ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, দলপতিদের ক্ষমতাভোগের নীতির বিরোধী। সামাজিক মেলামেশা সম্পর্কে দলপতির বিধানের প্রতি তারা মোটেই অনুগত ছিল না। তেমনই ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও ভাবনাচিন্তার প্রতি আগের দলপতিদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের বিচারে ছিল যুক্তিহীন। ‘দলাদলি’ শব্দের নতুন ব্যাখ্যার জন্য বাংলায় নতুন শব্দ ‘দলবাজি’র উদ্ভব হয়, লিখেছেন ইতিহাসবিদ প্রদীপ সিংহ। এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ব্রাহ্মসমাজের দলাদলিতে। ব্রাহ্মসমাজের ভাঙনের মুখ্য কারণ মতাদর্শের পার্থক্য ততটা নয়, যতটা নেতৃত্বের লড়াই।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালির দলাদলিতে এক অন্য প্রসাধনের প্রলেপ পড়ে। কয়েক জনকে নিয়ে দল নয়, পরিবর্তে দেখা দেয় বিশিষ্টজনের মধ্যে মতানৈক্য, অনেক ক্ষেত্রে যা রূপ নিয়েছিল ব্যক্তিগত বিদ্বেষের। তখন আগের দলপতিদের মতো বৈভব প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা হত না। বিদ্বজ্জনেরা বিরোধে লিপ্ত হতেন একে অপরের পাণ্ডিত্য ও রচনাশৈলীর মূল্যায়ন করতে গিয়ে। তাঁরা নিজেরা দল না করলেও বাঙালি তাঁদের প্রশংসা বা সমালোচনা করতে গিয়ে ভাগ হয়ে গিয়েছিল এক-একটা দলে। পত্রপত্রিকাও ছিল এই দলাদলিতে।

বাঙালির দলাদলিতে মতাদর্শের ভিন্নতা কোনও কালেই তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়নি। সার কথা ছিল ক্ষমতালাভের লড়াই। আপাতদৃষ্টিতে যা মতাদর্শ বলে মনে হয়েছে, তা ছিল নিছক ছল। রাধাকান্ত দেব তথাকথিত ভারতীয় ঐতিহ্যকে সমর্থন করার নীতি গ্রহণ করে ধর্মসভা স্থাপনের মাধ্যমে সতীপ্রথার অবসানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিবারে কেউ কখনও সতী হননি। নিজের মতাদর্শের প্রতি তাঁর যে ঐকান্তিক নিষ্ঠা ছিল না, তা প্রমাণ করার পক্ষে এই তথ্যই যথেষ্ট। অগুনতি দল গড়ে উঠেছিল দলপতিদের স্বার্থের সংঘাত বা ক্ষমতা অর্জনের লড়াইয়ের কারণে। সে কালের দল ভাঙা, নতুন দল গড়া, অন্য দলের অনুগত হওয়ার ট্র্যাডিশন এ কালেও চলছে। ছবিটা কেবল অন্য রঙে, ভিন্ন ক্যানভাসে।