E-Paper

অ্যাডেনিয়াম

কথাটা গত তিরিশ বছরে শুনতে শুনতে গা-সওয়া হয়ে গেছে আত্রেয়ীর। তবু একটা উত্তর ঠোঁটের ডগায় এসে গেছিল। নিজেকে সংযত করে বাকি খাবার শেষ করে উঠে পড়ল। এখন বেরোলে দশটা তিরিশের মেট্রো পেয়ে যাবে।

বিতস্তা ঘোষাল

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৫:৫১

ছবি: বৈশালী সরকার।

বৌদি, বাঁধাকপিটা কেমন রান্না হয়েছে বললে না তো?”

“ভালই তো হয়েছে, তবে আমি ভাবছিলাম এটা চচ্চড়ি। এত মোটা করে কপি তো তুমি কাটো না কখনও।”

“চচ্চড়িই করেছি। শিম, গাজর, পোস্ত-সরষে বাটা দিয়ে। আপনার জা এরকম করে বানায়, তাই মাসিমাই বলল এরকম ভাবে করতে।”

“ও, আচ্ছা...” বলে আত্রেয়ী এক হাতে বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে মুখে গ্রাস তুলতে লাগল।

টেবিলে ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে বসুন্ধরাদেবী বললেন, “কাল মিমি ফোনে বলল, এই রান্নাটা দিয়ে ভাত-রুটি খেতে তোমার ছেলে খুব ভালবাসে। তাই রান্নার মাসিকে বললাম রেসিপিটা শিখে নাও। তোমার দাদার ভাগ্যে তো চিরকাল সেই থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়...”

কথাটা কোন দিকে ঘুরছে, বুঝতে অসুবিধে হল না আত্রেয়ীর।

সে প্রসঙ্গ বদলে দিতে বলল, “মিমি বড় ভাল রাঁধে। একটা খাবারের হোটেল বা অন্তত হোম ডেলিভারি শুরু করলে অনেকেই ওর রান্না খেতে পেত।”

“না, না, সারা দিন ধরে এত সব করার সময় কোথায় ওর! সংসার, স্বামী, সন্তান, সকলের প্রতি দায়দায়িত্ব ওকে একাই সামলাতে হয়। মেয়েটা এ বার বোর্ড দেবে। আকাশ তো সময়ই পায় না বাড়ির কাজ দেখার। সারা দিন খাটছে। বাড়ি ফিরে যদি বৌয়ের সেবা-যত্ন না পায়, শরীর টিকবে?”

“কিন্তু মাঝে যে মিমি চাকরি করছিল...” মনে করায় আত্রেয়ী।

“ছেড়ে দিল। পরিবার আগে। স্বামী-সংসার ফেলে অত কিসের রোজগার বাপু! তোর মতো উড়নচণ্ডী তো সবাই নয়।”

কথাটা গত তিরিশ বছরে শুনতে শুনতে গা-সওয়া হয়ে গেছে আত্রেয়ীর। তবু একটা উত্তর ঠোঁটের ডগায় এসে গেছিল। নিজেকে সংযত করে বাকি খাবার শেষ করে উঠে পড়ল। এখন বেরোলে দশটা তিরিশের মেট্রো পেয়ে যাবে।

বসুন্ধরাদেবীর দুই পুত্র। ছোট পুত্র থাকে হুগলির পৈতৃক বাড়িতে। স্ত্রী মিমি আর এক কন্যাকে নিয়ে। আর বড় ছেলে, পুত্রবধূ আত্রেয়ী আর তাদের কন্যা মুসকানকে নিয়ে স্বামীহারা বসুন্ধরা কলকাতার বাসিন্দা। শরীর যত দিন মজবুত আর সচল ছিল, তত দিন নিয়মিতই হুগলির বাড়ি যাতায়াত করতেন। কিন্তু এখন আর এত দূর গাড়ি করে একটানা বসে যেতে পারেন না।

তা ছাড়া সেখানে বাথরুম বাগানের দিকে, আগেকার দিনের নিয়ম মেনে, মূল ভিটে থেকে বাইরে। বড় বাথরুমের ভারতীয় ব্যবস্থা। জলের সমস্যা। রাতবিরেতে কিছু হলে ডাক্তার পাওয়াও মুশকিল। ফলে মন সেখানে পড়ে থাকলেও দেহ এখানেই।

আত্রেয়ী বহু বার দেওর, জাকে বলেছে, “মাকে ক’দিন ঘুরিয়ে নিয়ে আসি বাড়ি থেকে। বার বার তোদের কাছে যাওয়ার কথা বলেন। আমি না-হয় এক জন চব্বিশ ঘণ্টার আয়া, মুভিং কমোড দিয়েই পাঠাব। প্রায়ই বলেন, ‘যে বাড়িতে বিয়ে হওয়া থেকে ছিলাম, কী জানি জীবিত অবস্থায় আর তা দেখা হবে কি না!’ দেখ না ভেবে, যদি এক বার নিয়ে যাওয়া যায়! দু’-চার দিন থেকে একটু মন ভাল করে আসুক। আজীবন খোলামেলা জায়গায় থেকে এখন ফ্ল্যাটে বদ্ধ লাগে মানুষটার।”

“বেশ, এক বার তোমার ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করে জানাই...” বলেছে মিমি।

সেই ফোন আর আসে না। শুধু তার আর মিমির মধ্যে তুলনা চলতে থাকে অবিরত।

আত্রেয়ীর বিয়ের প্রায় সাত বছর পর মিমি এই পরিবারের বৌ হয়ে এসেছে। তখন থেকেই সংসারের কর্ত্রী হয়ে উঠেছে সে।

বসুন্ধরা প্রতি বার ওখান থেকে ফিরে এসে বলতেন, “মেয়েটা বয়সে ছোট হলে কী হবে, সব দিকে খেয়াল। যেমন পুজো-আচ্চার কাজ জানে, তেমন রান্নার। আমি বাথরুমে যাওয়ার আগে চৌবাচ্চায় জল ভরে, শাড়ি-গামছা রেখে দিয়ে আসে। ভেজা জিনিসগুলো হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ছাদে মেলে দেয়, আবার সময়মতো তুলেও আনে। ঘরে এসে পাশে বসে গল্প করে, হাত-পা টিপে দেয়। কী খাব, কী পছন্দ করি, সব দিকে নজর। যৌথ পরিবারের মেয়ে তো, গুরুজনকে কী ভাবে মান-মর্যাদা দিতে হয়, ভাল করেই জানে। আর এখানে এসে দরজায় তালা খুলে ঘরে ঢুকতে হয়। এতটুকু জল পান করতে হলেও নিজেকেই নিয়ে খেতে হবে। আমার বড় বৌমার সে হুঁশও থাকে না যে, শাশুড়ি ফিরবেন, আজ বাড়িতে থাকি। শুধু পেটে বিদ্যে থাকলে, ছাত্র পড়ালেই শিক্ষিত হওয়া যায় না। এ-সব আচার-আচরণ, সংস্কার জানতে হয়...” দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসত বসুন্ধরার গলা থেকে।

খানিক চুপ থেকে আত্রেয়ী হাসতে হাসতে বলত, “ভাল পরিবারের মেয়ে, তাই ঘর-ভর্তি লোককে প্রণাম করলেও আমি যে তার থেকে অনেকটাই বড়, সম্মানে বড় জা, সেটাই সে ভুলে গিয়ে প্রণামটুকুও করে না।”

“তোর এত হিংসে কেন রে ছোট জায়ের উপর? বলিহারি! এত পেয়েও মন সব সময় নিম্নমুখী!” তীব্র গলায় বলে উঠতেন বসুন্ধরা।

বসুন্ধরার এহেন কঠোর আক্রমণে সহসা কথা খুঁজে পায় না উচ্চশিক্ষিত অধ্যাপিকা আত্রেয়ী। চোখে জল এসে যায়। বুকটা চিন-চিন করে ওঠে। মনের ভিতরটা চিৎকার করে বলে উঠতে চায়, ‘মিমি আমার ঈর্ষার পাত্রী! কেন এমন অসম লড়াই চাইছ তুমি? আমার বিয়েতে পাওয়া একটি উপহারও আমাকে দাওনি, এক বারও জিজ্ঞেস না করেই বাড়ির প্রত্যেকে মিলে সে-সব নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলে। তখন আমি খুব উদার বলে মনে হয়েছিল তোমার। আর এখন এতই যখন আমি খারাপ, ওখানে গিয়ে থাকলেই হয়! আয়ার পিছনে এতগুলো টাকা আমার বেঁচে যায়!’

মনের সব প্রতিবাদ মনেই থেকে যায়, পরমুহূর্তে নিজেকেই বলে, ‘ছি! এ-সব ভাবতে নেই।’

প্রতিদিনের মতোই আজও আত্রেয়ী কথাগুলো শুনে বেরিয়েই যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে মুসকানের ভিডিয়ো কল এল, “মা এখনও বাড়িতে? কলেজ যাচ্ছ না? ঠাম্মা ঠিক আছে তো?”

আত্রেয়ী ফোনটা বসুন্ধরার দিকে ঘুরিয়ে দিতেই তিনি নাতনিকে ফ্লাইং কিস ছুড়ে বললেন, “তোমার মা আবার কবে বাড়িতে থাকে? তার পা বেরিয়েই আছে, না কোনও দিন তোমাকে দেখল, না বাবাকে, আর আমি তো…”

ঠাম্মা-অন্ত-প্রাণ মুসকান মৃদু হাসল, তার পর তাঁকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল, “সামান্য পেনশনভোগী বৃদ্ধা অসুস্থ শাশুড়িকে সব রকম ভাবে ভাল রাখতে গেলে দু’জনে রোজগার না করলে চলবে তো ঠাম্মা! বাবা কি পারবে এত আরামে তোমায় রাখতে? আমি এখন থেকে বলে দিলাম, যতই রক্তের হই তোমাদের, মা ছাড়া কারও দায়িত্ব নিতে পারব না কিন্তু...”

আত্রেয়ী ফোন রেখে জুতো পরার সময় দেখে, জানলায় রাখা অ্যাডেনিয়াম গাছটায় এত দিন বাদে কুঁড়ি এসেছে।

সে ফিসফিস করে বলল, “শুধু রক্ত দিয়ে নয়, ভালবাসলে এক দিন ঠিক ফুল ফুটবেই।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Literature Bengali Short Story Bengali Story Short story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy